বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক কূটনীতি: সক্ষমতার অভাবে মিলছে না ফসল

January 1, 2020 | 11:15 pm

এমএকে জিলানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: চলতি বছরের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের সময় দেশের অর্থনীতির সূচকগুলো ছিল ঊর্ধ্বমুখী। বছর শেষে অর্থনীতির সেসব সূচক এখন অনেকটাই নিম্নমুখী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) জোগানেই শেষ পর্যন্ত গতি ধরে রেখেছে অর্থনীতি। অথচ বছরের শুরুতেই পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারের ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কূটনতিকদের প্রয়োজনীয় সক্ষমতার অভাবে অর্থনৈতিক কূটনীতির ফসল ঘরে তোলা যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি ড. এ কে আব্দুল মোমেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর বলেছিলেন, বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করেছেন, তা বাস্তবায়নে সামনে অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর জোর দেওয়া হবে। বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়াতে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্ত করতে এবার কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে জোর দেওয়া হবে।

চলমান বছরের অর্থনৈতিক কূটনীতির গতিপ্রবাহ মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সামনে অর্থনৈতিক কূটনীতির চ্যালেঞ্জ আসছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত (লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রি, এলডিসি) দেশের তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাবে, তখন ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমরা এখন বৈশ্বিক যেসব সুবিধা পাচ্ছি, তার সবগুলোই চলে যাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে আমরা যে বাণিজ্য সুবিধা পাচ্ছি, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরেও এলডিসির কারণে আমরা একাধিক দেশে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পাই। এমন দেশের তালিকায় অস্ট্রেলিয়াও আছে। ২০২৪ সালের পর আমরা যখন উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হব, তখন এসব সুবিধা নিয়ে আমাদের নতুন করে দরকষাকষি করতে হবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, এগুলোর জন্য আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। আমি যতদূর জানি, ২০২৪ সালের পর আমরা উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে, এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত করার কথা ছিল। সেটা করতে দেরি হয়েছে, কিন্তু আমি এখনো তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেখিনি। জাতিসংঘের ‘ডেভেলপ কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি’ কিছু গবেষণা করেছে। সেখানে দেখা গেছে, তৈরি পোশাক খাতে সাত থেকে আট বিলিয়ন ডলারের মতো রফতানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার ওষুধ শিল্পের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটসের ওয়েভার ২০৩১ পর্যন্ত দেওয়া থাকলেও এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে সেই ওয়েভারও চলে যাবে।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। যাদের কাছ থেকে যেসব সুবিধা পাচ্ছি, সেগুলোর বিকল্প নিয়ে তাদের সঙ্গে নেগোসিয়েশন করতে হবে। যেমন— ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দীর্ঘ দিনের অভিযোগ, আমদানির ক্ষেত্রে যে শুল্ক আরোপ করা হয়, তা উৎপাদনকারী দেশের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হয়। যেমন কোনো পণ্য জার্মানি থেকে আমদানি করলে যে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়, চীন থেকে আমদানি করলে তার শুল্ক ভিন্ন হয়। ইইউ এটিকে বৈষম্যমূলক বলে থাকে। তবে এলডিসিভুক্ত দেশ হওয়ায় তারা এটি মেনে নিয়েছে। বাংলাদেশ এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে তারা হয়তো আর এটি মেনে নেবে না। এসব ক্ষেত্রে আমাদের করণীয়গুলো নির্ধারণ করতে হবে, অনেক হোমওয়ার্ক করতে হবে। কোথায় ঝুঁকি, কোথায় সম্ভাবনা— এগুলো চিহ্নিত করতে হবে। অর্থনৈতিক কূটনীতির মূল কাজ এটিই। দেশের বাইরে আমাদের মিশনগুলোর কর্মকাণ্ডও এই কেন্দ্রিক হওয়ার কথা। কিন্তু এ বিষয়ে তাদের উদ্যোগী হতে দেখা যায় না।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মোটা দাগে আমাদের এখানে কিছু বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। যেমন— জাপান টোবাকো বা হোন্ডার মতো কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করেছে। এর বাইরে তেমন উল্লেখ করার মতো সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসেনি।

ড. জাহিদ হোসেনের মতে, অর্থনৈতিক সম্ভাবনাগুলোর ফসল ঘরে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের মন্ত্রণালয় ও মিশন— দুই পক্ষেরই ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, হোমওয়ার্ক দু’দিক থেকেই হতে হবে। বিদেশের মিশনগুলো জানে, ওইসব দেশের চাহিদা কী, অবস্থা কী, কোথায় ইনপুট দিতে হবে। এখন মিশনগুলোকে সেসব সম্ভাবনা চিহ্নিত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। আমার মনে হয়, এসব ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতার ঘাটতি আছে। যেমন— যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে আমরা কিছুই পাই না, কিন্তু ভিয়েতনাম পায়। আবার রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর জিএসপি সুবিধা উঠে গেল। অথচ ওই দুর্ঘটনার পর আমরা অনেক সংস্কার করেছি। অ্যালায়েন্স, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা ও ইউরেপিয়ান ক্রেতাদের সঙ্গে মিলেই আমরা সংস্কার করেছি। তাহলে কেন আমরা জিএসপি বহাল করতে পারছি না? তাই আমাদের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নজর দিতে হবে। অন্তত আমাদের এটুকু তো বলতে পারা উচিত, আমাদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমেরিকানরা রাজি হয়নি। আমরা কি এতটুকু বলতে পারছি?

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ বিনিয়োগ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান এবং মেরিডিয়ান ফাইন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, অর্থনৈতিক কূটনীতিতে জোর দেওয়ার ফলে চলতি বছর আমাদের অর্থনীতিতে কিছু সাফল্য এসেছে। যেমন— সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকলেও গত একবছরে অর্থনৈতিক খাতে দেশটির সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যখন এ বছরে সৌদি সফর করেন, তারপরই কিন্তু রিয়াদের একটি বড় প্রতিনিধি দল ঢাকা করেছে এবং তাদের সঙ্গে বিনিয়োগ বিষয়ে দুই দেশের একাধিক ইস্যুতে সমাঝোতা হয়েছে। তবে সৌদির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কূটনীতি যেভাবে কাজ করেছে, তা সব দেশের ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করেনি।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক কূটনীতিতে জোর দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানিক বা অন্যান্য সক্ষমতা উন্নয়নের বিষয়গুলোতেও জোর দেওয়া প্রয়োজন। আর এই যে অর্থনৈতিক কূটনীতি, এই বিষয়ের ভালো জ্ঞান-সমৃদ্ধ জনবল না থাকলে তা শতভাগ বাস্তবায়ন করা যাবে না। নেগোশিয়েশনের লোক প্রয়োজন, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের বিষয় বোঝেন— এমন লোকবল প্রয়োজন। যেসব কর্মকর্তা রয়েছেন, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা অর্জনের বিষয়ও আছে।

বিজ্ঞাপন

কাজী এম আমিনুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক কূটনীতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজেরই অংশ। এতকাল এ বিষয়ে এমন জোরালোভাবে ঘোষণা আসেনি। এবার তারা ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু এটা তাদের দায়িত্বের অংশ সবসময়ই ছিল। আবার বিষয়টি কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একক কাজ নয়, এটা সবার সম্মিলিত কাজ।

তিনি আরও বলেন, আমি এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিবের সদিচ্ছা দেখিছি। যেহেতু অর্থনৈতিক কূটনীতিতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে, তাই বিশেষভাবে নিজেদের সক্ষমতা অর্জন করা দরকার, সক্ষমতা তৈরি করা দরকার এবং সক্ষমতাকে প্রয়োগ করা দরকার। যেমন— ভারতে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো হয়। অর্থনৈতিক বিষয়গুলো মাথায় রেখে যেকোনো দেশের সঙ্গে যেকোনো ইস্যু পাকাপাকিভাবে সামাল দেয় তারা। আমাদের ক্ষেত্রেও বিষয়গুলো সেরকম দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়া প্রয়োজন।

সারাবাংলা/জেআইএল/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন