বিজ্ঞাপন

পাহাড়ি জনপদে সূর্য উৎসব, ভালোবাসার গল্পে যোগ হলো বিজ্ঞান

January 4, 2020 | 2:29 pm

পার্থ সনজয়

সবুজ পাহাড়ের রোমাঞ্চ তো ছিলই, হাতছানিতে তার চেয়েও বেশী ছিল সে পাহাড় ছুঁয়ে থাকা মানুষগুলো। ১১ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্মভিটে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি। জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমের এই জনপদেই এবারের বছরের প্রথম সূর্যোদয় লগ্নের উৎসব, সূর্য উৎসবের আয়োজন করলো বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন।

বিজ্ঞাপন

গেল ১৯ বছর ধরে এই উৎসবের আয়োজন করছে সংগঠনটি। দুই দশকে দেশের নানা প্রান্তের জনপদে পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়েছে। নতুন বছরকে করেছে বরণ। তাতে যেমন সূর্য উৎসবের অভিযাত্রী দলের নতুন জনপদের পাঠ হয়েছে, তেমনি সেই জনপদের মানুষেরা পরিচিত হয়েছে মহাকাশ বিজ্ঞানের সাথে। প্রকৃতি, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান আর প্রত্যাশায় মিলে মিশে তাই সূর্য উৎসব যেন আলোকময়তা!

বিশতম আয়োজনের যাত্রাটা ২০১৯ এর ৩০ ডিসেম্বর রাতে। রাজধানীর কলাবাগান থেকে বাসে করে রাত পেরিয়ে ৩১ ডিসেম্বর সকালে অভিযাত্রী দল পৌঁছালো নাইক্ষ্যংছড়িতে। নাইক্ষ্যংছড়ি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ই এবারের উৎসব ভেন্যু।

বিজ্ঞাপন

দুপুর গড়ানোর আগেই সবাই মিলে ঘুরে দেখলো এই পাহাড়ি জনপদের আশপাশ। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ম্রো পাড়ার জীবন আর মানুষদের সাথে হলো আলাপ। সে পাড়া ছুঁয়েই হাসছিল নাইক্ষ্যংছড়ি লেক আর তার ঝুলন্ত সেতু। সেতু পাড় হয়ে ছিমছাম পার্ক। সেখানে ভাওয়াইয়া সুর ভাসালেন রংপুরের সাইদুজ্জামান। দীর্ঘ সময় ধরে এখানেই বসবাস তার। লেকের জলে পা চালিত নৌকায় ভাসলেন অভিযাত্রীরা।

পাহাড়ি জনপদে সূর্য উৎসব, ভালোবাসার গল্পে যোগ হলো বিজ্ঞান

দুপুরের পর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হাতে কলমে শিক্ষা নিল রকেট বানানোর কলা-কৌশল। জানলো, মহাকাশের অসীমতা। নতুন বছরের প্রথম দিনে এই শিক্ষার্থীরাই স্থানীয় আরো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আয়োজন করেছিল বিজ্ঞান উৎসব। বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মশহুরুল আমিনের নেতৃত্বে বিজ্ঞান উৎসবে অংশ নেওয়া প্রায় একশ শিক্ষার্থী ছোট ছোট দলে রকেট তৈরি করলো। তাদের বানানো রকেট আর বিজ্ঞানীদের ছবি নিয়ে তারা বাড়ি ফিরলো। উপহার হিসেবে পেল টি শার্ট। উৎসবটি পরিচালনায় সহযোগিতা করলো অভিযাত্রীদলের ভিকারুন্নিসা বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী রুশাব ও রহাব।

কয়েক দল মিলে এদিন ছবিও আঁকলো। কাগজ আর রং পেন্সিল সরবরাহ করলো এসোসিয়েশন। যারা সুন্দর ছবি আঁকলো তারা পেলো উপহার।

পাহাড়ি জনপদে সূর্য উৎসব, ভালোবাসার গল্পে যোগ হলো বিজ্ঞান

তবে ৩১ ডিসেম্বরই উৎসব ভেন্যু ঠিক রেখে সূর্য উৎসবের অভিযাত্রীদলের রাত যাপনের ব্যবস্থা হলো নাইক্ষ্যংছড়ির স্থানীয় সরকারি গেস্ট হাউসে। ব্যবস্থাটি করলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি চেয়ারম্যান সাইফুল্লাহ।

২০১৯ সালের শেষ দিনের সূর্য বিদায় নিলো পশ্চিম আকাশে। সেই আকাশে তখন ফুটেছে বছরের শেষ সন্ধ্যাতারা। স্কুলের শিক্ষার্থীরা মিলেই অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের অভিযাত্রীরা তৈরি করলো সূর্য মুকুট। যে মুকুট পরেই পরদিন বছরের নতুন প্রভাতকে স্বাগত জানানো হবে। তৈরি হলো ল্যাম্প শেড। ফোলানো হলো শত বেলুন। ম্রো পাড়ার অধিবাসীরা বানিয়ে দিল ফানুস। সেই ফানুস উড়লো ঘড়ির কাঁটায় যখন মধ্যরাত। তবে তার আগেই লাইট শেডের মধ্যকার মোমের আলোয় আলোকিত নাইক্ষ্যংছড়ি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়টি।

অন্ধকার মুছে দিয়ে উচ্চারিত হলো আলোর প্রত্যয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরাও শামিল হলো নতুনের প্রত্যয়ে। আকাশ উদ্ভাসিত হলো ফানুসে আর হৃদয় বললো, হেথা হতে যাও পুরাতন, হেথায় এখন নতুনের আবাহন।

সেই আবাহনেই প্রভাত আসলো। সূর্য উৎসবের টি শার্ট পরে মাথায় সূর্য মুকুটে রঙিন র‌্যালী, বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে ঘুরে বেড়ালো ছোট্ট শহরে। শহরের মাঝেই বড় পুকুর। সেই পুকুরেই শত বেলুন ভাসালো র‌্যালীতে যোগ দেয়া সবাই। তবে শেষ হলো না উৎসব।

বছরের প্রথম দিনে পাহাড়ে চড়লো অভিযাত্রী দল। ঘুরে বেড়ালো রাবার আর চা বাগান। দেখা হলো, রাবারের প্রক্রিয়াজাতকরণ। জারুলিয়াছড়ি বিওপি ক্যাম্প পেরিয়ে ছুঁয়ে এলো দক্ষিণ পশ্চিমের সর্বশেষ রেখা!

আর সন্ধ্যায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে হলো সাংস্কৃতিক ও র‌্যাফেল ড্র। চাক আর মারমা ভাষায় গান যেমন হলো, তেমনি দেশাত্ববোধক গানেও নুপুরে সাজলো সন্ধ্যা! মেলাবে আর মিলিবের এই সন্ধ্যাও শেষ হলো একসময়। তবে রয়ে গেলো রেশ। আবার হবে ডিসেম্বরে।

পাহাড়ি জনপদে সূর্য উৎসব, ভালোবাসার গল্পে যোগ হলো বিজ্ঞান

যে উৎসবের শুরুটা ২০০১ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপে। এরপর ২০০২ এ সুন্দরবন, ২০০৩ এ বান্দরবানের কেওক্রাডং , ২০০৪ এ নিঝুম দ্বীপ, ২০০৫ এ ঠাকুরগাঁওয়ের তেঁতুলিয়া , ২০০৬ এ নেত্রকোনার বিরিশিরি, ২০০৭ এ সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, ২০০৮ এ খাগড়াছড়ির পাহাড় , ২০০৯ এ রাঙামাটির পাবলাখালি জঙ্গল, আর সূর্য উৎসবের প্রথম দশকটায় আবার সুন্দরবন, ২০১১ তে জামালপুরের লাওয়াচাপরা, দ্বীপজেলা ভোলার দক্ষিণে চর কুকরি-মুকরি দ্বীপে ২০১২ তে। ২০১৩ তে শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল। ২০১৪ তে ঢাকার রবীন্দ্র সরোবর। থানচি রেমাক্রি ছুঁয়ে এলো অ্যাস্ট্রনমক্যিাল এসোসিয়েশন ২০১৫ তে। ২০১৬ তে চরফ্যাশন। ২০১৭ তে হালুয়াঘাট, ২০১৮ তে গেলো ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী। গেলো বছরকে বরণ করেছিল ঢাকার হাতিরঝিলে।

আপনি যেতে চান? তাহলে তৈরি থাকুন ডিসেম্বরে। তবে জানবেন, এটি কোন বিলাস ভ্রমণ নয়। অ্যাস্ট্রনমিক্যাল এসোসিয়েশন ভ্রমণ সংস্থাও নয়। এটি একটি অ্যাডভেঞ্চারমূলক অভিযান। পুরো অভিযানে থাকা-খাওয়া সব কিছুতেই সর্বোচ্চ কষ্ট করতে হবে। তবেই মিলবে রোমাঞ্চ ঘেরা এই আনন্দের সন্ধান!

সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন