বুধবার ২২ জানুয়ারি, ২০২০ ইং

ভাষা সংগ্রামের সেই দিনের কথা জানালেন আহমদ রফিক

ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৮ | ১১:০৮ অপরাহ্ণ

ফাগুনের আগুন লাগা অনন্য এক দিন: ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ফাল্গুনের আগমনে গাছে গাছে শিমুল পলাশের সমারোহ। সাথে উত্তরের হিমেল হাওয়া। পরিবেশ মনোরম। অনেকটাই উপভোগ্য। তবে ইতিহাসে স্থান করে নেওয়া এই দিনটিতে সকাল থেকেই উত্তেজনা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। মধুর ক্যান্টিন, কলাভবন, ছাত্রদের হলগুলোতে চাপা উৎকণ্ঠাও অনেকের মনে। সবারই শঙ্কা-আতঙ্ক-উত্তেজনা ১৪৪ ধারা নিয়ে। ভাষা আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষা তথা আত্মসম্মান রক্ষার আন্দোলনে দিনটি পরিণত হয়েছে এক ফলাফল নির্ধারণী দিনে। ভাষার প্রশ্নে ১৪৪ ধারা ভাঙা নিয়ে ছাত্রনেতারা দ্বিধাবিভক্ত। ২০ ফেরুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৪৪ ধারা না ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্ত মানেননি অলি আহাদ, আবুল হাশিমসহ অনেকেই। সবশেষ বাস্তবতা ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে কলা ভবনের সভায় যে সিদ্ধান্ত হবে, সেটাই হবে আন্দোলনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। সেখানে যদি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে ভেঙে দেওয়া হবে সংগ্রাম পরিষদও।

বিজ্ঞাপন

সকাল আটটা থেকেই আমতলায় জড়ো হতে শুরু করে শিক্ষার্থীরা। সভা শুরু হলে শামসুল হক ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে মতামত তুলে ধরেন। উত্তেজনা ছড়িয়ে  পড়ে সভায়। এরপর অনেক যুক্তি-তর্ক, বাক-বিতণ্ডার পর ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়। পরের ইতিহাস সবার জানা। ১০ জনের দল করে করে ১৪৪ ধারা ভাঙার পরিকল্পনা। পুলিশের গুলি। অনেক অনেক রক্ত। আর অধিকার আদায়ে পুরো বাংলার জেগে ওঠা। ইতিহাসের এই ঘটনাক্রম অনেক কাছে থেকে দেখেছেন ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক। ছিলেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। তাঁর কাছ থেকে জানাতে চাওয়া ইতিহাসের রক্ত ধরা সেই দিনের বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহ।

রাহাত মিনহাজ: একুশে ফেব্রুয়ারির সকালটা কেমন ছিল?
আহমদ রফিক: ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ। শীত বেশ জেঁকে বসেছে। কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। তবে চাপা উত্তেজনা ছিল পুরো ক্যাম্পাসে। সূর্যের দেখা পাওয়ার আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ে জড়ো হয়েছিল শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছ্ত্রাীদের পদচারণায় সরব কলাভবন। মধুর ক্যান্টিনে অনেই আগেই এসেছেন ছাত্রনেতারা। আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক চলছিল ১৪৪ ধারা ভাঙা নিয়ে। এদিকে কলাভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছে খাকি হাফপ্যান্ট পরা পুলিশ। কারও হাতে লাঠি, কারও কারও হাতে অস্ত্র। পাশে দাঁড়ানো জিপ, ট্রাক। বলা যায় পুরোপুরি প্রস্তুত নূরুল আমিনের পুলিশ বাহিনী।

বিজ্ঞাপন

রাহাত মিনহাজ: ভাষা আন্দোলনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা পর্যায় ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি সকালের আমতলার ছাত্রসভা। যেখান থেকে ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ওই সভা সম্পর্কে আপনার কী জানা আছে?
আহমদ রফিক: যতদূর মনে আছে আমতলায় ওই ছাত্র সভা শুরু হয় সকাল ১১টার দিকে। সেখানে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে বক্তব্য দেন। তবে ছাত্ররা তা প্রত্যাখান করে। মাঝ পথেই তিনি বক্তব্য বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটির আহ্বায়ক আব্দুল মতিন ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে মত দেন। ধীর স্থির সাবলীল যুক্তিতে ১০ জনের ছোট ছোট দলে ১৪৪ ধারা ভাঙার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। যার গন্তব্য হবে অ্যাসেম্বলি হল। এরপর সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি সভাপতি গাজীউল হকের বক্তব্যের মাধ্যমে সভা শেষ হয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়, ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’ স্লোগানে প্রকম্পিত কলা ভবন।

রাহাত মিনহাজ: এরপর কী হলো? অর্থাৎ গুলিতো শুরু হলো বিকেলের দিকে এর মাঝের সময়টাতে কী ঘটল?
আহমদ রফিক: সভা শেষ হতে হতেই চারদিকে উত্তেজানা ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা ১০ জনের দল করে কলা ভবনের বাইরে আসতে থাকেন। এ সময় পুলিশ প্রচুর কাঁদুনে গ্যাস ছোড়ে। হাফপ্যান্ট পরা পুলিশের সাথে লাঠি চার্জ। কয়েকজনকে আটক করে গাড়িতেও তোলা হয়। যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, হাবিবুর রহমান শেলী (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, প্রধান বিচারপতি), আব্দুস সামাদ, আনোয়ারুল হক খানসহ আরও কয়েকজনকে। এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয় ছাত্রীরাও ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মিছিলে যোগ দিয়েছিল। যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পুলিশের লাঠি চার্জে আহতও হন, তবে তাদের আটক করা হয়নি। এ সময় মূলত আমতলা থেকে ব্যারাক পর্যন্ত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

রাহাত মিনহাজ: ছাত্রদের এ আন্দোলনে কারা কারা যোগ দিয়েছিলেন? শোনা যায় অনেক অছাত্রও সেদিন ওই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন?
আহমদ রফিক: আসলে ভাষার প্রতি মমতা সবারই ছিল। এখনো আছে। তাই ছাত্রদের এ আন্দোলনে সবারই সমর্থন ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন থেমে থেমে ছাত্র পুলিশ সংঘর্ষ চলছে, তখন বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। যেমন— সচিবালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী, দোকান রেস্তোরাঁর কর্মী ও সাধারণ মানুষ। পুরাতন ঢাকার মানুষ এক সময়ে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করলেও এ দিন পুরাতন ঢাকার অনেক সাধারণ মানুষকেও ভাষা আন্দোলনের পক্ষে রাস্তায় নেমে আসতে দেখা যায়।

রাহাত মিনহাজ: ওই দিন প্রথম গুলি কোথায়, কখন হলো? তাতে কে মারা গেলেন বা কারা আহত হলেন?
আহমদ রফিক: আমার যতদূর মনে পড়ে ওইদিন বিকেল সোয়া তিনটা থেকে সাড়ে তিনটা মাঝামাঝি কোনো সময় পুলিশ গুলি চালায়। ছাত্ররা আসলে কলাভনের মূল দরজা দিয়ে বাইরে আসতে চাচ্ছিল। পুলিশ কাঁদানো গ্যাস ও লাঠিচার্জের মাধ্যমে তা আটকে রেখেছিল। তবে দু’পক্ষ থেকে ক্রমাগত ইট পাটকেল নিক্ষেপেরে ফলে পরিস্থিতির অবনতি হয়। যার এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি চালায়। সরকারি প্রেস নোটে বলা হয় পুলিশ গুলি চালায় ৩টা ২০ মিনিটে। গুলির সংখ্যা ২০ রাউন্ড। পুলিশের গুলিতে প্রথমে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন বরকত। দীর্ঘদেহী বরকত ছিলেন এমএ ক্লাসের শেষ বর্ষের ছাত্র। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ হন সালামসহ আরও অনেকে। যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পরে হাসপাতালে মারা যান।

রাহাত মিনহাজ: গুলিতে ছাত্র হত্যার প্রতিক্রিয়া…?
আহমদ রফিক: সে ছিল এক অভূতপূর্ব অবস্থা। গুলিতে ছাত্র হত্যার পর যেন মুহূর্তেই প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল পুরো ঢাকা শহর। তখন আর এ আন্দোলন ছাত্রদের ছিল না। পুরো ঢাকা শহর তখন বিক্ষোভের নগরী। নূরুল আমিন সরকারের পুলিশ বাহিনীর নির্মমতা দেখে ক্ষুব্ধ সারাদেশ। ১৪৪ ধারা, সরকারের সব বিধি নিষেধ ভেঙে রাজপথে হাজার হাজার মানুষ। সবাই তখন ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে ফুঁসছিল। ছাত্র হত্যার ঘটনায় সেদিন পরিষদ ভবনেও ঝড় ওঠে। মাওলানা আব্দুল তর্কবাগীশসহ বেশ কিছু নেতা এ ঘটানার প্রতিবাদে সোচ্চার হন। পরিষদের সভা মুলতবি রাখার প্রস্তাব গৃহিত না হলে ভবন থেকে বেড়িয়ে আসেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মনোরঞ্জন ধর, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুনসহ অন্যান্যরা। সেদিন পুলিশের গুলির পর যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা ২২ ফেব্রুয়ারিও অব্যাহত ছিল। ওই দিনও পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন নিহত হন।

রাহাত মিনহাজ: ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের গুলি হত্যার ঘটনায় একটা বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করা হয়েছে। সে কমিশন প্রতিবেদনে কি বলেছিল?
আহমদ রফিক: এ ঘটনার পর সরকার বিচারপতি এলিস দিয়ে একটা কমিশন গঠন করেছিল। যা ‘এলিস কমিশন’ নামেই পরিচিতি লাভ করে। এ কমিশন যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তা ছিল পক্ষপাতদুষ্ট। মিথ্যাচারে পরিপূর্ণ। একজন বিচারপতি এমন প্রতিবেদন দিতে পারেন বিষয়টি সে সময় খুবই আশ্চর্যজনক বিষয় ছিল। তিনি তার প্রতিবেদনে বলেন, সেদিন ছাত্ররা ছিল উচ্ছৃঙ্খল, দাঙ্গাবাজ। আর পুলিশ যে ২৭ রাউন্ড গুলি চালিয়েছে তা ছিল নিতান্তই আত্মরক্ষামূলক। আর পুলিশ গুলি চালিয়েছে কলাভবনের বাইরে থেকে। অর্থাৎ পুলিশ আত্মরক্ষার স্বার্থেই গুলি চালিয়েছে। বিচারপতি এলিসের এমন প্রতিবেদন পূর্ব বাংলার মানুষ প্রত্যাখান করে। এ ছাড়া ওই প্রতিবেদন তৈরির আগে তিনি বেশ কিছু ছাত্রের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। যারা বলেছিলেন, সেদিন গুলি চালানোর মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। তারপরও পুলিশ গুলি চালিয়েছে। বিচারপতি এলিসের প্রতিবেদনে এসব কিছুই আসেনি।

রাহাত মিনহাজ: ভাষার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণ এবং এরপরেও বেশ কিছু ঘটানায় কিছু বাঙালি অনেকটা বিশ্বাসঘাতকের মতো ভূমিাকা পালন করেছিলেন। তারা কারা তাদের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন।
আহমদ রফিক: বাঙালি হয়েও ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে যিনি সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ভূমিকা রাখেন তিনি নূরুল আমিন। তিনি তখন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তার নির্দেশে না হলেও তার অনুমোদনেই ছাত্রদের ওপর গুলি চালানো হয়। এমনকি গুলি করে ছাত্র হত্যার পর এক বেতার ভাষণে তিনি বলেন, সেদিন পুলিশ বাধ্য হয়ে গুলি চালিয়েছে। আর সেদিন যদি পুলিশ এ দায়িত্ব পালন না করত তাহলে তারা আগামী প্রজন্মের কাছে অপরাধী হয়ে থাকতেন। এ ছাড়া বাঙালি এসপি মোহাম্মদ ইদরিস, ডিআইজি ওবাইদুল্লাহও অত্যন্ত নেতিবাচক ভূমিকা রাখেন। একজন বাঙালি হিসেবে বাংলা ভাষার আন্দোলনের বিরুদ্ধে তাদের এই অবস্থান সবার মধ্যে তীব্র ঘৃণা তৈরি করে।

আহমদ রফিক
মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আহমদ রফিকের জন্ম ১৯২৯ সালে। ছাত্রজীবন থেকেই বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির প্রতি সমানভাবে সংবেদনশীল ছিলেন। প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় তাঁর শিক্ষা জীবন বার বার বিপর্যস্ত হয়েছে। বর্তমানে তিনি সাহিত্য সাধনায় মগ্ন আছেন। সক্রিয় আছেন বিভিন্ন সামাজিক কর্মযজ্ঞে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ত্রিশ। সেগুলোর মধ্যে শিল্প সংস্কৃতি জীবন (১৯৫৮), আরেক কালান্তর (১৯৭৭), ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও তাৎপর্য (১৯৯১), রবীন্দ্রভূবনে পতিসর (১৯৯৮) ও ‘একাত্তরের পাক বর্বরতার সংবাদ ভাষ্য’ (২০০১) অন্যতম। তিনি ১৯৭৯ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও ১৯৯২ সালে অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার পান। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালে সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি সম্মানসূচক একুশে পদকে ভূষিত হন। কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইন্সস্টিউট থেকে তাঁকে ‘রবীন্দ্রতত্ত্বচার্য্য’ উপাধি দেওয়া হয়।

সারাবাংলা/আইজেকে

Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন