শনিবার ১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ইং

পাখি আর প্রাণীদের জন্য মানবিক নগর চাই

জানুয়ারি ১৩, ২০২০ | ৪:০৮ অপরাহ্ণ

জান্নাতুল ফেরদৌস আইভী

কখনো কখনো একটি ছবিই যে একটি বড় উদ্যোগের ভিত্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে তার উদাহরন হিসেবে আমরা সাধারণত প্রতিবাদের বিভিন্ন ঘটনা জানি। যেমন ভূমধ্য সাগরের পাড়ে পড়ে থাকা শিশুর মৃতদেহ। এই ছবিটি বিশ্বজুড়ে অভিবাসীদের অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তাহীনতার সাক্ষী হয়ে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এমন ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোর গল্প আমরা কমবেশি সবাই জানি এবং সেসব ক্ষেত্রে বিশ্ব বিবেককে জাগিয়ে তোলায় সামান্য হলেও আশা খুঁজে পাই। তবে কোনও প্রতিবাদের ছবি নয়, বরং একটি নিখাদ ভালোবাসাময় ছবি কয়েকদিন যাবত আমার মনে প্রায় মুহূর্তে উঁকি দিচ্ছে। সেই সঙ্গে বার বার ভাবাচ্ছে এর সঙ্গে যুক্ত আরও কিছু বিষয়।

গত ৯ জানুয়ারি শ্রদ্ধেয় সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা তার পোষা প্রাণীর সঙ্গে তোলা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করেছেন। ছবিটিতে তিনি ক্যাপশন দিয়েছেন, 'রাতে দেরি করে ফিরলে এমন একটা অবস্থা হয়'। এটিই আমাদের গল্প। আমরা ভাবছি কী অবস্থা হয়? ছবিতে দেখা যাচ্ছে, রেজা ভাইয়ের পোষা বেড়াল ব্রুস রেজা ভাইয়ের কোলে উঠে অত্যন্ত দুশ্চিন্তার দৃষ্টিতে রেজা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তিনিও নিজ সন্তানকে আশ্বস্ত করার সময় যে দৃষ্টিতে তাকাই সেই পরিমাণ স্নেহের স্পর্শ দিয়ে বেড়ালকে আগলে রেখেছেন। আজ সোমবার (১৩ জানুযারি) পর্যন্ত তিন দিন ধরে এই ছবিটি আমাকে ভাবিয়েছে। ছবিটি কেন ভাবিয়েছে সেটি নিয়েই আজ আমার এই লেখা।

বিজ্ঞাপন

আমরা দেখেছি সাধারণত শিশুরা পশু-পাখির প্রতি অনেক ভালোবাসা দেখায়। আমার চেনা বেশ কয়েকজন নারী আছেন যারা বাড়িতে বিড়াল পোষেন পরম ভালোবাসা নিয়ে। কিন্তু শুধু আমাদের দেশেই নয়, গোটা বিশ্বেও একজন পুরুষের সঙ্গে তার পোষা বেড়ালের আদুরে ছবি বিরল। প্রিয় পোষা বেড়াল কোলে রেজা ভাইয়ের ছবিটা তাই আমাকে ছুঁয়ে গেছে। এমন যে আর দেখিনি।

ভালোবাসামাখা সেই ছবিটি যখন ফেসবুকের ওয়ালে দেখছি তখন সেই গভীর রাতে আমাদের পাড়ায় উচ্চস্বরে রাস্তায় ডেকে চলছিল কয়েকটি কুকুর। এই শীতের রাতে ওদের ডাক শুনে মনটা কেমন যেন করে উঠলো। তখন থেকেই আমার ভাবান শুরু হল, আচ্ছা এই শহরে যেসব প্রাণী রাস্তায় জীবন কাঁটায়, রাতে ওরা কোথায় ঘুমায়? ওরা সারাদিন কি খায়? আচ্ছা, খাবার নাহয় আস্তাকুড় থেকে জুটে যায় কিন্তু ওরা পানি খায় কোথায়?

আমি কিছুতেই ভেবে পাইনি এর উত্তর কি হবে। আমাদের এই শহরে পশুদের পানি পানের কোন জায়গা কী আছে? কিছুতেই মনে আসে না এমন কোন জায়গার কথা কিংবা এমন দৃশ্য আমি দেখেছি কিনা। শহরটা এখন নগরের নেতা খুঁজতে অনেক ধরণের শ্লোগানে মুখর। ভবিষ্যৎ মেয়রের উদ্দেশ্যে আমি আমাদের এই নগরের পশু-পাখিদের প্রতি মানবিক হবার জন্য কিছু সেবা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব জানাচ্ছি :

  • প্রতিটি এলাকায় ২ থেকে ৩ টি জায়গায় পশুদের দিনে-রাতে ঘুমানো জন্য কিছুটা জায়গা পাকা করে দেওয়া
  • এসব নির্দিষ্ট জায়গায় কিছু খাবার ও পানির ব্যাবস্থা রাখা
  • পশুদের জন্য বরাদ্দ খাবার ও পানি যেন কোনভাবেই মানুষ আত্মসাত না করে তার জন্য নগরের এলাকাভিত্তিক কয়েকজন ব্যক্তিদেরকে দায়িত্ব দেওয়া। যেমন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের এমন দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
  • এসব জায়গা খুব ভালভাবে পরিস্কার রাখার ব্যবস্থা করা। নাহয় এই দেখা যাবে এই জায়গাগুলো এতটাই নোংরা করে রাখা হবে যে সেখানে রাস্তার কুকুরও বসতে চাইবে না।
  • রাস্তার আইল্যান্ডে প্রচুর পরিমাণ দেশি ফলের গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করা যেগুলোয় পাখি বসতে পারে। আম, জাম, কাঠাল, নিম, নারকেল, খেজুর ইত্যাদি গাছ লাগানো যেতে পারে। বিদেশি জাতের গাছে সাধারণত পাখি বসে না।
  • এসব গাছের আশেপাশে পাখীদের জন্য কিছু সশ্যজাতীয় খাবার ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।
  • পাখিদের জন্যও পানি খাবার ব্যাবস্থা করা।

একজন বাবার কোলে এমন দৃশ্য দেখে আমি আশাবাদী হয়েই ভাবছি- এই নগর পাখি আর প্রাণীদের জন্য হোক সম্পূর্ণ মানবিক।

 

লেখক - চলচ্চিত্র নির্মাতা

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন