শনিবার ১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ইং

শরিয়ত বয়াতীর মুক্তি চাই

জানুয়ারি ১৩, ২০২০ | ৬:৪২ অপরাহ্ণ

প্রভাষ আমিন

একেক দেশের, একেক জাতির একেকরকম বৈশিষ্ট্য। যেমন বাংলাদেশ বা বাঙালি বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একতারা হাতে উদাস বাউলের ছবি, কানে বাজে লোকগানের সুর। আমি অত বিশেষজ্ঞ নই, তবে মোটামুটি ধারণা থেকে বলতে পারি, বাংলার মত এমন সুর বৈচিত্র্য আর কোনো জাতির নেই। এই জাতির প্রায় প্রতিটি সম্প্রদায়ের আলাদা আলাদা গান আছে। এই জাতির প্রতিটি ধর্মের আলাদা আলাদা প্রার্থনা সঙ্গীত আছে। মাঝি নৌকা বাইতে বাইতে ভাটিয়ালি গায়, গাড়োয়ান গাড়ি চালায় ভাওয়াইয়া গাইতে গাইতে। মুসলমানরা ঈদের চাঁদকে স্বাগত জানায় গান গেয়ে, হিন্দুরা পুজা দেয় গান গেয়ে। জারি, সারি, মুর্শিদী, মাইজভান্ডারি- গানের যে কত ধরন ইয়ত্তা নেই। এই সঙ্গীতময়তাই আমাদের আলাদা করেছে অন্য সবকার চেয়ে। ‘টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল/সব ভুলে যাই, তাও ভুলি না, বাংলা মায়ের বোল…’ গান আমাদের প্রাণ, গান আমাদের মায়ের
বোল।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে গান গেয়ে বেড়ান বাউল, বয়াতি, গায়েনরা। বাতাসে ভেসে বেড়া্য় সুরের মায়াজাল। এরা স্বভাবকবি। কথায় কথায় গান বানান।
তাৎক্ষণিকভাবে সুর করেন। গ্রামে-গঞ্জে কবির লড়াই হয়। তাৎক্ষণিক যুক্তি-পাল্টা যুক্তি দিয়ে চলে লড়াই। তারা সুশীল সমাজে দাম পান না। কিন্তু তাদের প্রতিভা সবসময় আমাকে মুগ্ধ করে। সেকেন্ডের মধ্যে ভেবে কবিতার ছন্দে পাল্টা যুক্তি তৈরি করে সুর করে জবাব দিতে হয়। ভাবা যায়!

এমন প্রতিভা গ্রামে-গঞ্জে খেতে পায় না। অবশ্য বাংলার বাউল সাধকদের কোনো জাগতিক চাহিদাও নেই। তারা মনের আনন্দে গান করেন। তাদের গানে থাকে ধর্ম, দর্শন, আধ্যাত্মবাদ। এমনই এক দেহাতি বয়াতী শরিয়ত সরকার। গত ২৪ ডিসেম্বর রাতে ঢাকার ধামরাই উপজেলার রৌহাট্টেক এলাকার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, গান-বাজনা হারাম বলে ইসলাম ধর্মে কোথাও উল্লেখ নেই। কেউ এটা প্রমাণ দিতে পারলে তিনি ৫০ লাখ টাকা দেবেন। তার বক্তব্য ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ে। সেটা দেখে গত ২৮ ডিসেম্বর মাওলানা ফরিদুর রহমান নামে একজন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মির্জাপুর থানায় ডিজিটাল নিরোপত্তা আইনে মামলা করে। গত শুক্রবার রাতে পুলিশ এই নিরীহ বয়াতিকে গ্রেপ্তার করে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীর মত হাতকড়া
পড়িয়ে আদালতে নেয় এবং ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে। আদালত সন্তুষ্ট হয়ে তিনদিনের পুলিশ রিমান্ডে নেয়ার অনুমতি দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

সাধারণত আসামির কাছ থেকে কোনো গোপন বা বাড়তি তথ্য আদায়ের জন্য পুলিশ রিমোন্ডে নেয়। রিমান্ড শব্দটি এক ধরনের আতঙ্ক ডেকে আনে। রিমান্ডে শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ প্রায় সবাই জানে। কিন্তু শরিয়ত সরকার যা বলার তা প্রকাশ্যেই বলেছেন। সেটি ইউটিউবেই আছে। চাইলে পুলিশ কয়েকবার শুনে নিতে পারে। এর বাইরে এই নিরীহ বয়াতির কাছ থেকে পুলিশ আর কী তথ্য আদায় করতে পারবে?

শরিয়ত বয়াতির হাতকড়া আজ আমাদের সবার মতপ্রকাশের বাধা হয়ে আছে, তার চোখের জল আজ বাঙালির হৃদয়ে হাহাকার তুলেছে।

ভারতীয় উপমহাদেশ এবং বাংলা দীর্ঘদিন মুসলমান শাসকরা শাসন করেছেন। কিন্তু কখনোই ধর্ম জাতিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর চেপে বসেনি। মানুষ ধর্মের সাথে কখনো সংস্কৃতিকে মেলায়নি, বিরোধাত্মক করে তোলেনি। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠনের পর ধর্ম সামনে চলে আসে। বাঙালী সংস্কৃতিকে হিন্দু সংস্কৃতির সাথে গুলিয়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। আরবি হরফে বাংলা লেখারও চেষ্টা হয়েছে। রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ হয়েইছিল ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু ৭৫এর ১৫ আগস্ট
সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশ আবার পেছনে হাটা শুরু করে। সামরিক সরকারগুলো নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে বারবার ধর্মকে ব্যবহার করেছে। সাম্প্রদায়িক শক্তি ও স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতে ইসলামীও ক্ষমতার অংশীদার হয়। জিয়াউর রহমান সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে সরিয়ে দেন। আর এরশাদ সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে অন্তুর্ভূক্ত করেন। আশা ছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে পড়া থেকে মুক্তি পাবে বাংলাদেশ। কিন্তু তা হয়নি। আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনলেও বহাল আছে রাষ্ট্রধর্ম।

তবে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা এখন শুধু সংবিধানের কাগজেই সীমাবদ্ধ। ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় আওয়ামী লীগও এখন কখনো গোপনে, কখনো প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে আপোস করে। তাদের অন্যায় আবদার মেনে নেয়। যে হেফাজতে ইসলাম আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হটাতে মতিঝিল দখল করতে এসেছিল, তারাই এখন সরকারের পোষা। তাদের দাবিতে বদলে যায় পাঠ্যপুস্তক। তাদের দাবির মুখে হাইকোর্টের সামনে থেকে সরিয়ে নিতে হয় গ্রিক ভাস্কর্য। এর আগে সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতিবাদের মুখে বিমানবন্দরের সামনে বাউলের ভাস্কর্য বসানোর উদ্যোগ বাতিল করা হয়। ভোটের হিসাবে হোক, কৌশল হোক আর আপোস হোক; এটা মানতেই হবে আস্তে আস্তে দেশ আরো অনেক বেশি সাম্প্রদায়িক হয়ে গেছে। জঙ্গিরা মাঝে মাঝেই রক্তক্ষয়ী হামলা করে আমাদের ভেতরের ভয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে, যা আমাদের আরো বেশি সাম্প্রদায়িক করে তুলেছে। বারবার মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা আক্রান্ত হয়েছে।

কদিন আগে ড. আহমেদ শরীফের ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নেহাল করিম বলছিলেন, ভাগ্যিস আমার বাবা আগেই মারা গেছেন। এখন বেঁচে থাকলে তাকে বারবার মরতে হতো। আসলেই এখন ভাবতেও ভয় লাগে ড. আহমেদ শরীফ আশির দশকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘুরে ঘুরে নাস্তিক্যবাদ নিয়ে কথা বলতেন। কারো পছন্দ হতে পারে, কারো অপছন্দ হতে পারে; কিন্তু এটাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এখন সে স্বাধীনতা নেই। প্রচারণা তো দূরের কথা, নিজের বিশ্বাস জোর গলায় ঘোষণা দেয়ারও সাহস নেই কারো। স্বশিক্ষিত আরজ আলী মাতুব্বর দার্শনিকের মর্যাদা পেয়েছেন। ড. আহমেদ শরীফ বা আরজ আলী মাতুব্বর আগেই মরে গিয়ে বেঁচে গেছেন। কিন্তু হুমায়ুন আজাদ বাঁচতে পারেননি, অভিজিৎ রায় বাঁচতে পারেননি।

শরিয়ত বয়াতীর বক্তব্য আমি শুনেছি। তার বক্তব্য আমার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়নি। শুধু আমি নই, কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার মত কিছুই বলেননি তিনি। শুধু বলেছেন, ইসলামের কোথাও গান-বাজনা হারাম, এটা লেখা নেই। কেউ প্রমাণ করতে পারলে ৫০ লাখ টাকা দেবেন। চাইলে কেউ চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করে তাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারতেন। সেটা হতো একজন প্রকৃত মুসলমানের কাজ। কারণ ইসলাম শান্তির ধর্ম, যুক্তির ধর্ম, পরমতসহিষ্ণুতার ধর্ম। আর সত্যি কথা হলো, ছেলেবেলো থেকেই শুনে আসছি, কোন কিতাবে লেখা আছে গো হারাম বাজনা-গান…। গান-বাজনা হারাম, আমি অন্তত এমন কোনো সুনির্দিষ্ট উল্লেখ পাইনি। রমজানের চাঁদ দেখার সাথে সাথে বাংলাদেশে রেডিও-টিভিতে বেজে ওঠে, ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ইদ…। এমন অনেক গজল আছে, যা ইসলাম সম্পর্কে, আল্লাহ সম্পর্কে, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ)এর প্রতি মানুষের
হৃদয়ে গভীর আবেগ ও ভালোবাসার সৃষ্টি করে।

তারচেয়ে বড় কথা হলো, বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এই দেশের একটি জাতীয় সঙ্গীত আছে। বাংলাদেশের লাখো মানুষ গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। অল্পকিছু সাম্প্রদায়িক এবং অতি দুর্বল অনুভূতি সম্পন্ন কিছু মানুষ ছাড়া গা্ন ভালোবাসেন না, এমন মানুষ আমি দেখিনি। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও দেখেছি জাতীয় সঙ্গীত বা দেশাত্মবোধক গানে গলা মেলান্। এমন একটি দেশে গানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার অপরাধে বয়াতীকে রিমান্ডে নেয়া হবে; এটা অবিশ্বাস্য।

সরকারের ঘোষিত নীতির সাথে পুলিশের অতি উৎসাহের কোনো মিল নেই। আমি অবিলম্বে শরিয়ত বয়াতীর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি এবং মিথ্যা মামলা করার দায়ে মাওলানা ফরিদুল ইসলামকে সতর্ক করে দেয়ার অনুরোধ করছি।

আগেই বলেছি শরিয়ত বয়াতির বক্তব্যে কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মত কিছু নেই। আসলে আমাদের যাদের ঈমান দুর্বল, কথায় কথায় তাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে। কেউ প্রশ্ন করলেই অনুভূতিতে আঘাত লেগে গেলে আপনাদের উচিত ধর্ম সম্পর্কে আরো পড়াশোনা করা। ইসলাম এত ঠুনকো বিশ্বাসের ধর্ম নয়। হলে ১৪০০ বছর ধরে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস হয়ে টিকে থাকতে পারতো না।

কথায় কথায় ধর্মকে টেনে এনে আপনারাই বরং ইসলামকে দুর্বল করছেন। ইসলাম মানুষের মন জয় করেছে শান্তির বাণী দিয়ে। বিশেষ করে এই উপমহাদেশে সুফি ভাবধারার ইসলাম এক প্রশান্তির বারতা ছড়ায়। সেখানে ধর্মের নামে এই উগ্রতা, এই হিংস্রতা ইসলামকেই বরং হেয় করে। ইসলামের পক্ষে লড়াই করার হাজারটা যুক্তি আছে। পারলে সেগুলো জেনে লড়াই করেন, নইলে চুপ থাকেন।

আপনারা কথায় কথায় মামলা করে ইসলামকে অপমান করছেন, যেটা আমাদের মত আরো অনেকের অনুভূতিতে আঘাত করছে। শরিয়ত বয়াতী ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। বলেছেন, ধর্মের নামে যারা ব্যবসা করেন, সেই ভন্ড কাঠমোল্লাদের বিরুদ্ধে। রাগের মাথায় একবার তিনি তাদের ‘শালা’ বলে গালিও দিয়েছেন, তাও সেটা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে নয়। বাংলাদেশে ‘শালা’ একটি সাধারণ গালি, রিমান্ডে নেয়ার মত অপরাধ নয়। বরং ইউটিউব খুজলে আপনারা এরচেয়ে অনেক বেশি অশ্লীল অনেক ওয়াজ শুনতে পাবেন।

সাম্প্রদায়িক শক্তির চাপে, জঙ্গিবাদের ভয়ে বাঙালি সংস্কৃতি এখন অনেকটাই কোনঠাসা। এই অপশক্তি পহেলা বৈশাখের উৎসব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, ইউনেস্কোর বিশ্ব এতিহ্যের অংশ হওয়া বর্ষকবরণের শোভাযাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আগে শীত এলে গ্রামে গ্রামে ওয়াজ মাহফিল যেমন হতো, পাশাপাশি যাত্রাও হতো। এখন যাত্রা হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। বাউল, বয়াতিরা আগে থেকেই ভয়ে কোনঠাসা। তাদের কণ্ঠে এখন আর উদার গান খুব একটা শোনা যায় না। চেষ্টা হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতির, মতপ্রকাশের কণ্ঠ চেপে ধরার। আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে অনুরোধ, তারা যেন, কঠোরভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার উদ্যোগে নেন। সবাই যাতে স্বাধীনভঅবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারে, নিজ নিজ সংস্কৃতি লালন করতে পারে, নিজের মতপ্রকাশ করতে পারে। ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। আপনার বিশ্বাস করার অধিকার যেমন আছে, আরেকজনের অবিশ্বাস করারও অধিকার আছে। এই বাংলার মানুষ আবহমান কাল ধরে ধর্ম যেমন পালন করছে, উৎসবও পালন করছে। আমরা সেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ফিরে পেতে চাই। ধর্ম আর সংস্কৃতি যেন পরস্পরের পরিপুরক হয়। গ্রামবাংলায় হেঁটে বেড়ালে যেন ভেসে আসে বাউল, জারি, সারি, ভাটিয়ালি বা ভাওয়াইয়ার সুর।

প্রভাষ আমিন : বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন