শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬, ৪ রজব ১৪৪১

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানিদের হাতে বাঙালি নারীকে তুলে দেওয়ায় প্রথম মৃত্যুদণ্ড

জানুয়ারি ১৪, ২০২০ | ১:২৮ অপরাহ্ণ

আব্দুল জাব্বার খান. সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: মুক্তিযুদ্ধের সময় এক নারীকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দিতে সহায়তা করেছিলেন জাতীয় পার্টির (জাপা) সাবেক নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার। তার বিরুদ্ধে আনা অনেকগুলো অভিযোগের মধ্যে এক বাঙালি নারীকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট।

বিজ্ঞাপন

সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এ রায়ের মধ্য দিয়ে এই প্রথম কোনো নারীকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনার অভিযোগে সর্ব সম্মতিক্রমে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলেন আদালত।

মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ রায় দেন।

বিজ্ঞাপন

কায়সারকে যে সাতটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। তার মধ্য তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড, তিনটিতে যাবজ্জীবন ও একটি অভিযোগ থেকে খালাস দিয়ে মঙ্গলবার রায় দেন আপিল বিভাগ।

এর মধ্যে ১২ নম্বরে ধর্ষণের অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড সর্বসম্মতিক্রমে বহাল রাখেন আদালত।

রায়ের পর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের জানান, ধর্ষণে সহায়তা করায় এই প্রথম একটি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো।

আসামিপক্ষের আইনজীবী এসএম শাজাহান সাংবাদিকদের বলেন, পূর্নাঙ্গ রায় প্রকাশ হলে তা দেখে আপিল বিভাগে রিভিউ আবেদন করা হবে।

জাপা নেতা কায়সারের মৃত্যুদণ্ড বহাল

মানবতাবিরোধী অপরাধে সৈয়দ কায়সারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ৩, ৫, ৬, ৮, ১০, ১২ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আপিল বিভাগ এর মধ্যে ৫, ১২ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ৬, ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড থেকে কমিয়ে যাবজ্জীবন সাজা দেন আপিল বিভাগ। ৩ নম্বর অভিযোগে তাকে খালাস দিয়েছেন।

১২ নম্বর অভিযোগ বলা হয়েছে সৈয়দ কায়সার ও তার বাহিনী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি কোনো একদিন মাজেদা বেগমকে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়।

পাকিস্তানী বাহিনী তাকে ধর্ষণ করে। যা পরবর্তী ট্রাইব্যুনালে এসে তিনি সাক্ষ্যও দেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কায়সারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর রায় দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

কায়সারের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো হচ্ছে:

অভিযোগ ১: একাত্তরের ২৭ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া (তৎকালীন কুমিল্লা মহকুমা) সদরের পুলিশ ফাঁড়ি ও ইসলামপুর গ্রামের কাজীবাড়িতে শাহজাহান চেয়ারম্যানকে হত্যা, নায়েব আলী নামের একজনকে জখম ও লুটপাট করে কায়সার ও তার লোকজন।

অভিযোগ ২: একই দিনে হবিগঞ্জ জেলার (তৎকালীন মহকুমা) মাধবপুর বাজারের পশ্চিমাংশ ও পার্শ্ববর্তী কাটিয়ারায় লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে সৈয়দ কায়সার ও তার লোকজন। এ সময় কামিনী রায়, বিনোদ বিহারী মোদক, শচীন্দ্র রায়, হীরেন্দ্র রায়, রতি বাবু, অহিদ হোসেন পাঠানের দোকানসহ প্রায় ১৫০টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অভিযোগ ৩: একই দিনে হবিগঞ্জ জেলার (তৎকালীন মহকুমা) মাধবপুর থানার কৃষ্ণনগর গ্রামের অহিদ হোসেন পাঠান, চেরাগ আলী, জনাব আলী ও মধু সুইপারকে হত্যা করে কায়সার ও তার লোকজন। তাদের বাড়িঘরে লুটপাট করার পর আগুন দেয় তারা।

অভিযোগ ৪: পরদিন ২৮ এপ্রিল সৈয়দ কায়সার ও তার বাহিনী হবিগঞ্জের মাধবপুর বাজারের উত্তর পূর্ব অংশে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় তারা পূর্ব মাধবপুরের আবদুস সাত্তার, লালু মিয়া ও বরকত আলীকে হত্যা করে এবং কদর আলীকে জখম করে।

অভিযোগ ৫: একাত্তরের ২৯ এপ্রিল দুপুর থেকে বিকেলের মধ্যে হবিগঞ্জ সদরের শায়েস্তাগঞ্জ খাদ্যগুদাম এবং শায়েস্তাগঞ্জ পুরান বাজারের রেলসেতু এলাকায় আবদুল আজিজ, আবদুল খালেক, রেজাউল করিম, আবদুর রহমান এবং বড়বহুলা এলাকার আবদুল আলী ওরফে গ্যাদা, লেঞ্জাপাড়া এলাকার মাজত আলী ও তারা মিয়া চৌধুরীকে আটক করে নির্যাতনের পর হত্যা করে সৈয়দ কায়সার ও তার বাহিনী।

অভিযোগ ৬: একাত্তরের ২৯ এপ্রিল সন্ধ্যার পর হবিগঞ্জ সদরের পুরানবাজার পয়েন্টে সাবেক বিচারপতি সৈয়দ এ বি এম মহিউদ্দিনের বাড়িতে হামলা হয়। এছাড়া, লস্করপুর রেললাইনের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে সালেহ উদ্দিন আহমেদ এবং হীরেন্দ্র চন্দ্র রায়কে ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করে সৈয়দ কায়সার ও তার বাহিনী।

অভিযোগ ৭: সৈয়দ কায়সার ও তার বাহিনী ৩০ এপ্রিল হবিগঞ্জ সদরের এনএনএ মোস্তফা আলীর বাড়িসহ ৪০/৫০টি বাড়িঘর, দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে।

অভিযোগ ৮: একাত্তরের ১১ মে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার চাঁদপুর চা বাগানে সাঁওতাল নারী হীরামণিকে ধর্ষণ করে সৈয়দ কায়সারের বাহিনী। সৈয়দ কায়সার এ সাঁওতাল নারীকে ধর্ষণে সহায়তা করেন।

অভিযোগ ৯: একাত্তরের ১৫ মে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুরের লোহাইদ এলাকার আবদুল আজিজ, আবদুল গফুর, জমির উদ্দিন, আজিম উদ্দিন, এতিমুনেছা, নূর আলী চৌধুরী, আলম চাঁনবিবি ও আবদুল আলীকে হত্যা করে সৈয়দ কায়সার ও তার বাহিনী। ওইদিন আকরাম আলী চৌধুরী নামে একজনকে জখমও করেন সৈয়দ কায়সার।

অভিযোগ ১০: এরপর ১৩ জুন হবিগঞ্জ সদর, মোকাম বাড়ি, শায়েস্তাগঞ্জ থানার আর অ্যান্ড এইচ ডাকবাংলো এবং মাধবপুর থানার শাহাজীবাজার এলাকার হামলা চালায় সৈয়দ কায়সার ও তার বাহিনী। এ সময় শাহ ফিরোজ আলী নামের একজনকে অপহরণের পর নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। সাবু মিয়া নামের আরেকজনকে অপহরণের পর চালানো হয় নির্যাতন।

অভিযোগ ১১: একাত্তরের ২৩ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হরিপুর থানার নাসিরনগরের গোলাম রউফ ও তার পরিবারের লোকজনদের উপর নির্যাতন চালায় সৈয়দ কায়সার ও তার বাহিনী। এছাড়া গোলাম রউফকে অপহরণ ও আটকের পর তার ওপর নির্যাতন চলে। একপর্যায়ে মুক্তিপণ আদায় করে তার বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এছাড়া একই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর থানার দয়াল গোবিন্দ রায় ওরফে বাদল কর্মকারের বাড়িতে হামলা চালায় সৈয়দ কায়সার ও তার বাহিনী। লুটপাটের পর ওই বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

অভিযোগ ১২: সৈয়দ কায়সার ও তার বাহিনী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি কোনো একদিন হবিগঞ্জের মাধবপুর থানার বেলাঘর ও জগদীশপুর হাইস্কুল থেকে আতাব মিয়া, আইয়ুব মিয়া, মাজেদা বেগমকে অপহরণ করে। একপর্যায়ে মাজেদাকে ধর্ষণ করা হয়।

অভিযোগ ১৩: একাত্তরের ১৮ আগস্ট হবিগঞ্জের নলুয়া চা বাগান থেকে মহিবুল্লাহ, আবদুস শহীদ, আকবর আলী, জাহির হোসেনকে অপহরণ করে নরপতিতে আবদুস শাহীদের বাড়ি ও রাজেন্দ্র দত্তের বাড়িতে স্থানীয় শান্তি কমিটির কার্যালয় এবং কালাপুরের পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করে সৈয়দ কায়সার ও তার বাহিনী।

অভিযোগ ১৪: একাত্তরের ২৯ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জের মাধবপুরে সোনাই নদীর ব্রিজ এলাকা থেকে সিরাজ আলী, ওয়াহেদ আলী, আক্কাস আলী, আবদুল ছাত্তারকে অপহরণ করে নিয়ে যায় সৈয়দ কায়সার ও তার বাহিনী। তাদের আটকে রেখে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়।

অভিযোগ ১৫: অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি কোনো একদিন সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুরে শালবন রঘুনন্দ পাহাড় এলাকায় শাহাপুর গ্রামের নাজিম উদ্দিনকে অপহরণের পর আটকে রেখে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।

অভিযোগ ১৬: সৈয়দ কায়সার ও তার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাছিরনগর থানায় বিভিন্ন গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের ১০৮ জনকে হত্যা করে।

সারাবাংলা/এজেডকে/জেএএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন