শনিবার ১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ইং

সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো

জানুয়ারি ১৪, ২০২০ | ৭:০৯ অপরাহ্ণ

মনজুরুল আহসান বুলবুল

বাঙালির শতবর্ষের রাজনীতির ইতিহাসে এমন সাধক ও প্রেমিক আর একজনও পাওয়া যাবে না। তাঁর সাধনায় বাংলা নামের দেশ; আর তাঁর প্রেমময় অন্তর জুড়ে এ দেশের মানুষ। এমন কোনো সাধক ও প্রেমিককে চিত্রিত করেই হয়তো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সৃষ্টি করেছেন পূজাপর্বের একটি গান। ১৯১০ সালে শান্তিনিকেতনে বসে কবি লিখেছেন- ‘কোন্ আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস/সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো/পাগল ওগো, ধরায় আস।’ গানটি রচনার পটভূমি সম্পর্কে রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞরা দুই রকম মত দেন। কেউ বলেন যিশু খ্রিষ্টের প্রতি সন্মান জানিয়ে তাঁর এই রচনা; কেউ বলেন নিজের বাবার স্মরণে লেখা এটি। প্রেক্ষাপট যাই হোক, এই গানের সঙ্গে আমরা আমাদের সাধক প্রেমিককে যখন মেলাই তখন নিশ্চিতভাবেই মানি, কবিরা যে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা তা আবারও প্রমাণিত।

বিজ্ঞাপন

ওই গানটি রচনার মাত্র দশ বছরের মাথায় ১৯২০ সালের বঙ্গের পূর্বঅংশের এক অজপাড়া গাঁয়ে এক সাধক প্রেমিকের আগমন ঘটে। কবিগুরু যেন নিশ্চিত হয়েই সুর-তাল-লয় ও ছন্দে এই প্রেমিক পুরুষের চিত্রকল্প তৈরি করেছিলেন। দেশমাতৃকার সাধনায় দেশের অবহেলিত নিষ্পেষিত মানুষের প্রেমে পাগল এই সাধক। পরে ‘অকুল সংসারে’ এই সাধক-প্রেমিকের প্রাণের বীণা ঝংকৃত হয়েছে নানা পর্বে, নানা মাত্রায়। দুঃখ-আঘাতে বার বার পর্যদুস্ত হওয়ার পর, এমনকি ঘোর বিপদেও জননীর মুখের হাসি দেখে তিনি নিজেও বার বার হেসেছেন। একটি জাতির স্থায়ী হাসির ঠিকানা হিসেবে গড়ে দিয়েছেন একটি স্বাধীন আবাসভূমি।

এই সাধক প্রেমিক ‘কাহার সন্ধানে সকল সুখে আগুন জ্বেলে’ বেড়িয়েছেন তাঁর জবাব দিয়েছেন নিজের জবানিতেই। বলেছেন- “কলকাতা যাব, পরীক্ষাও নিকটবর্তী। লেখাপড়া তো মোটেই করি না। দিনরাত রিলিফের কাজ করে কুল পাই না। আব্বা আমাকে এ সময় একটা কথা বলেছিলেন- বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এ তো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না। আর একটা কথা মনে রেখ ’sincerity of purpose and honesty of purpose’ থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না।’- একথা কোনোদিন আমি ভুলি নাই।” [বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী- পৃ. ২১]

বিজ্ঞাপন

বাবার ওই কথাগুলোই তাঁর জীবন দর্শন। সাধক ও প্রেমিকরা নিজের ভাবাদর্শে পাগল। আমাদের এই সাধক প্রেমিকও তা থেকে ব্যতিক্রম নয়। মাত্র ৫৪ বছর বয়সের জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন এই সাধক; যা তাঁর মোট জীবনের সিকিভাগ। এই জেল কোনো অপকর্মের জন্য নয়; তার ভাবদর্শনের জন্যই। কারণ শাসকচক্র দেশ ও মানুষের জন্য এই সাধকের প্রেমকেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছিল। তিনিও হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলেন সবকিছু।

তাঁর এই দর্শনের ব্যাখ্যা কী? যাদের জন্য তাঁর প্রেম তাদের জন্যই তাঁর সবটুকু চাওয়া। তিনি অবলীলায় বলেন- আমি কী চাই? আমি চাই, বাংলার মানুষ পেট ভরে খাক।/ আমি কী চাই? আমার বাংলার বেকার কাজ পাক।/আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক।/আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ হেসে খেলে বেড়াক।/ আমি কী চাই? আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণ ভরে হাসুক।’ নিজের প্রশ্ন ও জবাবে নিজেই বলছেন তিনি মানুষের জন্য কি চান। আবার তিনি বলছেন একটি স্থায়ী আবাস ও সোনার বাংলার কথা। এই সোনার বাংলাই তার আজন্মের সাধনা। এই বাংলা ও বাংলার মানুষের জন্য ভালোবাসাই জীবনভর তাকে ‘ব্যাকুল করে আর কাঁদায়‘। তাইতো নিজের সম্পর্কে তিনি অবলীলায় বলেন- ‘আমি মারা গেলে আমার কবরে একটা চোঙ্গা রেখে দিস। লোকে জানবে, এই একটা লোক একটা টিনের চোঙ্গা হাতে নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিল এবং সারাজীবন সেই টিনের চোঙ্গায় বাঙালি বাঙালি বলে চিৎকার করতে করতেই মারা গেল।’

এই সাধক কবি নন; day should কিন্তু তিনি দেখতে পান দূর ভবিষ্যত। একজন ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মতোই তিনি বলেন- “জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি - আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির ‘পূর্ব পাকিস্তানে’র পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’( ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯)।” কেমন নিশ্চিত করে একজন এমনটি বলতে পারেন? একজন সাধক যখন তাঁর সাধনার শীর্ষচূড়ায় নিজেতে নিজে বিলীন হন তখন তিনি পারেন। তখন তারা স্বপ্নকে বাস্তবে দেখেন। এই ‘বাংলাদেশ’কে তিনি দেখেন সেই ছাত্রজীবন থেকে। পরে তাঁর সাধনায় এই বাংলাদেশ ক্রমশ পূর্ণ রূপ পায়।

সাধক ও প্রেমিক পুরুষ ছিলেন বলেই যে দেশটির জন্মই হয় নাই সেই দেশের জাতীয় সংগীত চূড়ান্ত করেন; দেশটি গড়তে মেধাবী তরুণদের উদ্দীপ্ত করেন, এমনকি চূড়ান্ত আঘাতের আগেও তিনি বলেন- ‘কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না’। নিজের সাধনার ফল লাভে এতোটাই আত্মবিশ্বাসী ও নিশ্চিত তিনি। আমাদের সাধক নিশ্চিত তাঁর সাধনা বিফলে যেতে পারে না। তারপর অনেক কান্না, অনেক রক্ত, অনেক আর্তনাদ ছাপিয়ে মূর্ত হয় সাধনার ধন। স্বাধীনতা আসে বিজয়ের হাত ধরে।

কিন্তু সাধক প্রেমিকের সাথে পূর্ণ মিলন ছাড়া এই পাওয়াতো অর্থহীন। কে যে তার সাথের সাথী তাই নিয়ে ভাবার আগেই দেখি- এই সাধক খেলছেন বিশ্ব লয়ে। তিনি এমন এক উচ্চতায় উঠে গেছেন, যাকে কুর্নিশ করছে গোটা বিশ্ব। কার শক্তি আছে পরাজিত গোষ্ঠীর কুৎসিত কারাগারে তাকে আটকে রাখে। হিমালয় না দেখার অতৃপ্তি মেটে যাকে দেখে, তাকে ধারণ করার শক্তি কার? আমাদের এই সাধক ফেরেন তাদের কাছেই যাদের সাথে তার প্রেমময় অটুট বন্ধন। তিনি এই প্রেমের শক্তির বর্ণনা দেন অপূর্ব ভাষায়- ‘আমার সবচেয়ে বড় শক্তি, আমি দেশের মানুষকে ভালবাসি; আর আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে, আমি তাদেরকে খুব বেশি ভালবাসি।’ নিজের প্রেম বা ভালোবাসার এমন গভীরতর ব্যাখ্যা আর কোন সাধক এমনভাবে দিতে পেরেছেন? জানা নেই।

সাধনার স্বপ্নের দেশে তিনি ফিরলেন। তিনি যাদের প্রেমের আরাধ্য সেই মানুষের কাছে ফিরলেন। তার সাধনার রূপ তিনি প্রকাশ করলেন- ‘আমি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দিতে চাই যে, আমাদের দেশ হবে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক দেশ। এদেশে কৃষক-শ্রমিক, হিন্দু-মুসলমান সবাই সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে [১০ জানুয়ারি ১৯৭২]।

তিনি এমনই এক সাধক যিনি নিজের মত ও পথ নিজেই তৈরি করেছেন। তিনি বলেন- ‘অনেক সময় থিওরি ও প্র্যাকটিসে গণ্ডগোল হয়ে যায়। থিওরি খুব ভালো। কাগজে-কলমে লেখা থিওরি অনেক মূল্যবান। পড়ে শান্তি পাওয়া যায়। কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল কাজের সঙ্গে মিল না থাকলে থিওরি কাগজে-কলমে পড়ে থাকে, কাজে পরিণত হয় না [১৮ জানুয়ারি ১৯৭৪]।

প্রেমিক যিনি তিনি শুধু ভালোবাসেন না; ভালোবাসা চান এবং পানও। সব প্রেমিকই ভালোবাসার কাঙ্গাল। আমাদের এই প্রেমিক নিজেই বলেন- ‘আমি মাঝে মাঝে বলি যে, গেছি চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে গেছি সেখানে- বেতবুনিয়া; সে গ্রামের মধ্যে লক্ষ লক্ষ লোক দুই পাশে বসে আছেন, ওরা এসেছেন আমাকে দেখার জন্য— মনে মনে আমি বলি যে, আমি কি করেছি ওদের জন্য? আমার দুঃখ হয়- স্টিল দে লাভ মি। দুনিয়ার নিয়মই এই। ভালোবাসা পেতে হলে ভালোবাসতে হয় এবং সে ভালবাসা সিনসিয়ারলি হওয়া দরকার। তার মধ্যে যেন কোনো খুঁত না থাকে। ইফ ইউ ক্যান লাভ সামবডি সিনসিয়ারলি, ইউ উইল গেট দ্য লাভ সামবডি। দেয়ার ইজ নো ডাউট এবাউট ইট। আমার জীবনে আমি দেখেছি, লাখ লাখ লোক দুপাশ দিয়ে কি অবস্থার মধ্যে; আমিতো কল্পনাও করতে পারি না। হোয়াই দে লাভ মি সো মাচ?’ আবার জবাবটা দিয়েছেন তিনি নিজেই। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ করি, ‘মবিলাইজ দ্য পিপল অ্যান্ড ডু গুড টু দ্য হিউম্যান বিংস অব বাংলাদেশ। দিজ আনফরচুনেট পিপল সাফার্ড লং জেনারেশন আফটার জেনারেশন। এদের মুখে হাসি ফোটাতে হবে, এদের খাবার দিতে হবে [১৯ জুন ১৯৭৫]।

বাঙালির শতবর্ষের রাজনীতির ইতিহাসে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির আকাশস্পর্শী এই সাধক ও প্রেমিক পুরুষের নাম শেখ মুজিব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার সাথে তুলনা করা যায় এমন আর কাউকেই পাওয়া যাবে না। কিন্তু একটি স্বাধীন দেশ উপহার দেওয়ার মাত্র চার বছরের মাথায় ভালোবাসার কাঙ্গাল এই সাধক ও প্রেমিককে আমরা উপহার দেই ১৮টি বুলেট! হায়! হতভাগা বাংলাদেশ!

তবে নিশ্চিত জানি, বাঙালি কায়মনে বিশ্বমানবের আসনে অধিষ্ঠিত আমাদের এই সাধক ও প্রেমিকের জন্মশতবার্ষিকী পালনের জন্য মরণ ভুলে অনন্ত প্রাণসাগরে ভাসছেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

সারাবাংলা/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন