বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা: সাক্ষ্য শেষে রায়ের পথে মামলা

January 14, 2020 | 8:50 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: সাবেক সামরিক শাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মামলাটির বিচার চলছে আদালতে। দীর্ঘসময় ধরে মামলাটির কার্যক্রম চলায় এরই মধ্যে প্রধান আসামিসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া মামলার আট আসামির মধ্যে একজন পলাতক রয়েছেন এবং চারজন আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে যাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

দশদিন পর ২৪ জানুয়ারি ‘চট্টগ্রাম গণহত্যা’ হিসেবে পরিচিত এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার ৩২ বছর পূর্ণ হবে। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির আশা, এর মধ্যেই আদালতে চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষণা হবে।

মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) বিশেষ জজের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ ইসমাইল হোসেনের আদালতে ৫৩ তম সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরার মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর আদালত ৩৪২ ধারায় আসামিদের কাছে তারা দোষী নাকি নির্দোষ এবং সাফাই সাক্ষী আছে কি-না জানতে চান। আসামিরা সাফাই সাক্ষী নাই বলে জানালে আদালত ১৯ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় নির্ধারণ করেন বলে সারাবাংলাকে জানিয়েছেন বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী।

বিজ্ঞাপন

আদালতে ৫৩তম সাক্ষী হিসেবে চট্টগ্রাম বারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শম্ভুনাথ নন্দী সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষ্যে তিনি জানান, ঘটনার দিন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা আসছেন শুনে তিনি চট্টগ্রাম নগরীতে আদালতের পাহাড়ের নিচে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রাক যখন এগিয়ে আসছিল, তখন ওয়্যারলেস সেটে সিএমপির তৎকালীন কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদার নির্দেশে পুলিশ ট্রাক লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। এতে ২৪ জন মারা যায়।

মেজবাহ উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘মোট ১৬৮ জন সাক্ষী ছিল। আমরা ৫৩ জনের পর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করার আবেদন করি আদালতে। ৩৪২ ধারায় আসামিদের পরীক্ষাও শেষ হয়েছে। এবার রাষ্ট্রপক্ষে ও আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক হবে। এরপর রায় ঘোষণা করা হবে। আশা করছি, সামনের ২৪ জানুয়ারির মধ্যেই রায় হয়ে যাবে।’

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি নগরীর লালদিঘী ময়দানে সমাবেশে যাওয়ার পথে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালালে ২৪ জনের মৃত্যু হয়। এ সময় আহত হন কমপক্ষে দুই শতাধিক মানুষ। নিহতরা হলেন- হাসান মুরাদ, মহিউদ্দিন শামীম. স্বপন কুমার বিশ্বাস, এথলেবারট গোমেজ কিশোর, স্বপন চৌধুরী, অজিত সরকার, রমেশ বৈদ্য, বদরুল আলম, ডিকে চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন, আব্দুল মান্নান, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, বিকে দাশ, পঙ্কজ বৈদ্য, বাহার উদ্দিন, চান্দ মিয়া, মসর দত্ত, হাশেম মিয়া, মো. কাশেম, পলাশ দত্ত, আব্দুল কুদ্দুস, গোবিন্দ দাশ, মো. শাহাদাত।

এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯২ সালের ৫ মার্চ ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে প্রয়াত আইনজীবী শহীদুল হুদা বাদি হয়ে চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় হত্যাকাণ্ডের সময় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারের দায়িত্বে থাকা মীর্জা রকিবুল হুদাকে প্রধান আসামি করা হয়। এতে রকিবুল হুদাকে ‘হত্যার নির্দেশদাতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বহুল আলোচিত মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। আদালতের নির্দেশে সিআইডি দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রথম দফায় ১৯৯৭ সালের ১২ জানুয়ারি সিএমপির তৎকালীন কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদাকে এবং পরবর্তী সময় ১৯৯৮ সালের ৩ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে মীর্জা রকিবুল হুদাসহ ৮ পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। অভিযুক্ত অন্যরা হলেন- কোতোয়ালি জোনের তৎকালীন পেট্রল ইন্সপেক্টর (পিআই) জে সি মন্ডল, পুলিশ কনস্টেবল আব্দুস সালাম, মোস্তাফিজুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, বশির উদ্দিন, মো.আব্দুলাহ এবং মমতাজ উদ্দিন।

আসামিদের মধ্যে রকিবুল হুদা, বশির উদ্দিন ও আব্দুস সালাম মারা গেছেন। জে সি মন্ডল পলাতক আছেন। বাকি চারজন আদালতে নিয়মিত হাজিরা দেন।

আদালতে দুই দফায় আলোচিত এ মামলার চার্জ গঠন (দ্বিতীয় দফায় সংশোধিত আকারে) করা হয়। প্রথম দফায় ১৯৯৭ সালের ৫ আগস্ট এবং দ্বিতীয় দফায় ২০০০ সালের ৯ মে ৮ আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/১০৯/৩২৬/৩০৭/১১৪/৩৪ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর ১৯৯৭ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ২০০০ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার পর ২০০১ সালের ১৭ মে থেকে ২০০৬ সালের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে মাত্র দুজনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়।

সেনাসমর্থিত তত্তাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র একবছরে সাক্ষ্যগ্রহণ হয় ১৩ জনের। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ওই বছরের ২৫ জুলাই তদন্তকারী কর্মকর্তা হাফিজ উদ্দিন দেওয়ানের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। এরপর ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচারিক আদালত চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে আর কোন সাক্ষীকে হাজির করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ।

এই অবস্থায় ২০১৬ সালের ২০ জানুয়ারি মামলাটি বিচারের জন্য আসে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে। এই আদালতে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আওয়ামী লীগ নেতা গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ড.অনুপম সেন, সাংবাদিক অঞ্জন কুমার সেন ও হেলাল উদ্দিন চৌধুরীসহ ১৮ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।

সারাবাংলা/আরডি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন