বিজ্ঞাপন

৩২ বছর পর প্রমাণ হলো, গণহত্যা ছিল ‘পরিকল্পিত’

January 20, 2020 | 7:17 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে উত্তাল গণআন্দোলনের মধ্যে চট্টগ্রামে পুলিশের একটি গণহত্যার পরিকল্পনা এবং সংঘটনের ৩২ বছর পর আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। এই মামলার রায়ে আদালত সুষ্পষ্টভাবে বলেছেন, এটি ছিল গণহত্যা। চট্টগ্রামের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদার নির্দেশে এবং কোতোয়ালী থানার পেট্রল ইন্সপেক্টর গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডলের হুকুমে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (২০ জানুয়ারি) বিভাগীয় বিশেষ জজের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ মো. ইসমাইল হোসেন ‘চট্টগ্রাম গণহত্যা’ হিসেবে পরিচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম লালদিঘীর ময়দানে যাবার পথে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালালে নিহত হন ২৪ জন। আহত হন কমপক্ষে দু’শতাধিক মানুষ। শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা হিসেবে আলোচিত ঘটনাটি ‘চট্টগ্রাম গণহত্যা’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

বিজ্ঞাপন

এই ঘটনার নির্দেশদাতা হিসেবে আলোচিত তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদা মৃত্যুবরণ করায় মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। তবে ‘হুকুমদাতা’ পলাতক গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডলের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়েছে। একইসঙ্গে আরও চারজন তৎকালীন পুলিশ কনস্টেবলের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। কারাগারে থাকা এসব আসামিরা হলেন- মোস্তাফিজুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, শাহ মো. আব্দুলাহ এবং মমতাজ উদ্দিন।

রাষ্ট্রপক্ষে নিযুক্ত মামলার প্রথম কৌঁসুলি স্বভু প্রসাদ বিশ্বাস সারাবাংলাকে বলেন, ‘আদালত বলেছেন পরিকল্পিতভাবে গণহত্যার উদ্দেশে জনগণের ওপর আঘাত করা হয়েছে। ঘটনার একদিন আগে অর্থাৎ ১৯৮৮ সালের ২৩ জানুয়ারি এই ঘটনা ঘটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত বলেছেন, এটি পরিকল্পিত গণহত্যা।’

আলোচিত এই মামলায় রায়ের শুধু সারসংক্ষেপ পাঠ করেছেন আদালত। সারসংক্ষেপে আদালত বলেন, ‘চট্টগ্রামের তদানীন্তন মেট্রোপলিটন কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদা কর্তৃক ওয়াকিটকির মাধ্যমে প্রদত্ত অবৈধ নির্দেশে কোতোয়ালী থানার পলাতক আসামি গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল ওরফে জে সি মণ্ডলের অবৈধ হুকুমে আসামিগণ এলোপাতাড়ি রাইফেলের গুলি ছুঁড়তে আরম্ভ করে। উক্ত আসামির নির্দেশে নির্বিচারে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করলে মিছিলকারীদের মধ্যে ২৪ জন মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে পুলিশ কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদার নির্দেশে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত সাক্ষ্যপ্রমাণাদি গোপন ও বিনষ্ট করার জন্য নিহতদের মৃতদেহ ধমবর্ণ নির্বিশেষে অনেক মুসলিম ও হিন্দুদের তাদের আত্মীয়স্বজনের অগোচরে কোতোয়ালী থানার অর্ন্তগত অভয়মিত্র শ্মশানঘাটে পোড়াইয়া ফেলে।’

সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলেছেন, ‘ঘটনার তারিখ ও সময়ে ঘটনাস্থলে আসামি গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল, প্রদীপ বড়ুয়া, শাহ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, মমতাজ উদ্দিন, মোস্তাফিজুর রহমান শান্তিপ্রিয় জনগণের ওপর বিনা উসকানিতে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে শত, শত নিরীহ লোককে আহত ও পঙ্গু করে।’

রায় ঘোষণার সময় আদালত বলেন, ‘এটা গণহত্যা। বিভিন্ন কারণে এই মামলা বিঘ্নিত হয়েছে। ৫৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। সাক্ষ্যপ্রমাণে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিমানবন্দর থেকে ট্রাকে করে বিভিন্ন জায়গায় পথসভা করতে করতে লালদিঘীর দিকে আসছিলেন। লালদিঘীর মাঠে ছিল তৃতীয় কর্মসূচি এবং চতুর্থ কর্মসূচি ছিল পেশাজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময়। ওইসময় পুলিশ তিনটি ব্যারিকেড দেয়। একটি ছিল লালদিঘীতে, একটি কোতোয়ালীর মোড়ে এবং আরেকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে। কোতোয়ালীতে প্রথম ব্যারিকেড সরিয়ে গাড়িবহর এগিয়ে যাবার পর জে সি মণ্ডল ওয়াকিটকিতে বলেন, চলে আসছে। তখন পুলিশ কমিশনার ওয়াকিটকিতে নির্দেশ দেন, হামাইয়া দাও, গুলি করে শোয়াইয়া দাও। কমিশনারের নির্দেশে গুলিতে ২৪ জন নিরীহ ছাত্র-জনতা মারা যান। শেখ হাসিনাকে আইনজীবীরা উদ্ধার করে আদালত ভবনে নিয়ে যান।’

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরাপত্তার কারণে আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসতে পারেননি উল্লেখ করে আদালত বলেন, ‘চার জন সাফাই সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে পরিষ্কার হয়েছে, কোনো ধরনের সহিংস ঘটনার আগেই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।’

২৪ জনকে হত্যার দায়ে আদালত পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আর আহত ও পঙ্গু করার অপরাধে প্রত্যেককে ১০ বছর করে কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন।

এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯২ সালের ৫ মার্চ আইনজীবী শহীদুল হুদা (বর্তমানে প্রয়াত) বাদি হয়ে চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলাটি দায়ের করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে মামলাটির কোনো অগ্রগতি হয়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মামলাটি বিচারের পথে এগোয়।

আদালতে দুই দফায় আলোচিত এ মামলার চার্জ গঠন (দ্বিতীয় দফায় সংশোধিত আকারে) করা হয়। প্রথম দফায় ১৯৯৭ সালের ৫ আগস্ট এবং দ্বিতীয় দফায় ২০০০ সালের ৯ মে ৮ আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/১০৯/৩২৬/৩০৭/১১৪/৩৪ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর ১৯৯৭ সালের ২২ অক্টোবর থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি ফের ক্ষমতায় আসার পর মামলাটি আবারও গতি হারায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মামলাটি আবারও পুনরুজ্জীবিত হয়। এরপরও ২০১৬ সাল পর্যন্ত মামলাটি চলছিল ঢিমেতালে। ওই বছর মামলাটি বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে আসে। ওই আদালতের পিপি মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরীর তৎপরতায় সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রমে গতি আসে। সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, শিক্ষাবিদ ড. অনুপম সেন, সাংবাদিক নেতা অঞ্জন কুমার সেনসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই আদালতে বিচারকাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়।

মামলার মোট সাক্ষী ১৬৭ জন। গত ১৪ জানুয়ারি ৫৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্য কার্যক্রম শেষ হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত রোববার (১৯ জানুয়ারি) রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করেন। সোমবার আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন করার কথা ছিল। কিন্তু আসামিপক্ষ যুক্তি উপস্থাপনে অসম্মতি জানালে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে রায়ের সময় নির্ধারণ করেন।

মামলার রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কারাগারে থাকা চার আসামির আইনজীবী সাঈদ আহসান। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা এই আদালতের ওপর অনাস্থা এনে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫২৬ ধারায় একটা আবেদন করেছিলাম যে, আমরা উচ্চ আদালতে যাব। সেজন্য আমরা যুক্তিতর্কে অংশ নিইনি। কারণ, ১৯৮৮ সালে ঘটনার পর একটা বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়েছিল। সেই তদন্ত প্রতিবেদন মামলার ডকেট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আমরা বিষয়গুলো আদালতের নজরে এনেছিলাম। এরপরও একদিনের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ করে একদিনও সময় না নিয়ে আমাদের যুক্তি উপস্থাপন করতে বলা হয়। আবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রায় ঘোষণা করা হল। এই তড়িঘড়ির কারণে আমাদের কাছে বিষয়টি ঘোলাটে মনে হচ্ছে।’

সারাবাংলা/আরডি/এমআই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন