শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬, ৪ রজব ১৪৪১

বিজ্ঞাপন

লাশের পাশে পড়ে থাকা মোবাইল সন্ধান দিল খুনির

জানুয়ারি ২১, ২০২০ | ৮:৩৬ অপরাহ্ণ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় পাঁচ দিন আগে এক যুবককে নৃশংসভাবে খুনের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। গ্রেফতার করা হয়েছে খুনের সঙ্গে জড়িত এক নারীসহ দুজনকে।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ জানিয়েছে, ওই নারী আবুধাবি ফেরত যুবককে প্রেমের ফাঁদে ফেলেন। এরপর সাতজন মিলে রাতের আঁধারে তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করে। এসময় ওই যুবক চিৎকার করলে তার গলায় থাকা মাফলার দুদিক ধরে টান দেয়। এতে শ্বাসরোধ হয়ে তার মৃত্যু হয়। মৃতদেহ যেখানে পড়েছিল, তার কাছে পড়ে থাকা একটি মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে এই মামলার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে।

গ্রেফতার হওয়া দুজন হলেন- সুমি আক্তার শারমিন (২৭) ও বাদশা মিয়া (৩১)। হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে এবং বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) সুমি চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহনাজ রহমানের আদালতে এবং বাদশা আরেক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সফি উদ্দিনের আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

গত শনিবার (১৮ জানুয়ারি) রাতে কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা সিডিএর টেক এলাকা থেকে মো. রায়হানুল ইসলাম চৌধুরী সজীব (২৭) নামে এক যুবকের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার গলায় শ্বাসরোধের চিহ্ন ছিল। রায়হান চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার খরনা গ্রামের আতাউর রহমান চৌধুরীর ছেলে।

কর্ণফুলী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জোবাইর সৈয়দ সারাবাংলাকে জানান, রায়হান ছিলেন আবুধাবি প্রবাসী। তিন বছর পর পর চট্টগ্রামে আসেন। গত ১৪ নভেম্বর আসার পর ১৯ ডিসেম্বর তিনি চট্টগ্রাম নগরীর কদমতলী এলাকার এক মেয়েকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন। ২৫ জানুয়ারি স্ত্রীকে ঘরে তোলার জন্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন তিনি।

গত শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) বিকেল রায়হান নগরীর বাকলিয়ায় ফুপুর বাসায় অনুষ্ঠানের দাওয়াত দিতে যান। সেখান থেকে ফুপাত ভাইকে নিয়ে যান বহদ্দারহাট এলাকায় চিকিৎসকের চেম্বারে। সেখান থেকে নগরীর গরীবউল্লাহ শাহ মাজার এলাকায় চাচার বাসায় দাওয়াত দিতে যাবার কথা বলে বের হন। চাচার বাসায় যাবার কথা মূলত রায়হান সেখানে যাননি। শনিবার সকালে সিডিএর টেক এলাকায় কবরস্থানের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এই ঘটনায় রায়হানের বাবার দায়ের করা মামলায় সোমবার রাতে কর্ণফুলী থানার মইজ্যারটেক এলাকা থেকে বাদশা ও সুমিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে বাদশার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তার কাছ থেকে রায়হানের একটি ঘড়ি উদ্ধার করা হয়েছে, যেটি ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন পুলিশ পরিদর্শক জোবাইর সৈয়দ।

তদন্তে পাওয়া নেপথ্যের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা জোবাইর সারাবাংলাকে জানান, চাচার বাসায় না গিয়ে রায়হান গিয়েছিলেন তার প্রেমিকা সুমির সঙ্গে দেখা করার জন্য। স্বামী মো. সেলিমের সম্মতিতে সুমি গত একবছর ধরে ফেসবুকে ও মোবাইলের মাধ্যমে রায়হানের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। আবুধাবি থেকে ফেরার পর রায়হান সেলিমের উপস্থিতিতে বাসায় গিয়ে সুমির সঙ্গে দেখা করে। সেলিম বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়ে তাদের একান্তে থাকার সুযোগ করে দেন। রায়হানের বিয়ের বিষয়টি জানতে পেরে সেলিম ও সুমি এবং আরও পাঁচজনসহ মোট সাতজন মিলে তাকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করে।

‘সেলিম-সুমিসহ সাতজন একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। তারা সুমির মাধ্যমে ধনী পরিবারের সন্তানদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে। গত বৃহস্পতিবার রায়হানের সুমির সঙ্গে বাসায় গিয়ে সাক্ষাতের কথা ছিল। তাকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের জন্য আগের রাতে (বুধবার) সাতজন মিলে শাহ আমানত সেতুর নিচে মিটিং করেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার রায়হান পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে যেতে পারেননি। শুক্রবার সুমি তাকে ফোন করে জানায়, মইজ্যারটেক এলাকায় গেলে সেলিম তাকে নিয়ে যাবে বাসায়।’

পুলিশ পরিদর্শক জোবাইর জানান, মইজ্যারটেক থেকে সেলিম ও রায়হান হেঁটে যাচ্ছিল। সিডিএরটেক এলাকায় পৌঁছার পর রায়হানকে কয়েকজন মিলে ঝাপটে ধরে মারধর করে টেনেহিঁচড়ে একটি কবরস্থানের পাশে অন্ধকারে নিয়ে যায়। সেখানে তার হাত-পা এবং মুখ বেঁধে ফেলা হয়। প্রথমে ২০ লাখ, পরে ১৫ লাখ এবং এরপর ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ১০ লাখ টাকায় রাজি হলে রায়হানের মুখের বাঁধন আলগা করে দেওয়া হয়। এসময় রায়হান চিৎকার করে ওঠেন। তখন তার গলায় থাকা মাফলার দুদিক থেকে টান দেন দুজন। আর দুজন গিয়ে মাথা নিচু করে ঠেসে ধরে রাখে মাটিতে। শ্বাসরোধে মৃত্যু হয় রায়হানের। এরপর রায়হানের মানিব্যাগ ৯ হাজার ৮০০ টাকা, হাতঘড়ি ও দুটি মোবাইল নিয়ে তারা চলে যায়।

‘দুটি মোবাইল নিলেও অন্য একটি মোবাইল লাশের আনুমানিক ৫০ গজ দূরে পড়ে ছিল। আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সেটি উদ্ধার করি। এরপর প্রযুক্তির সহায়তায় আমরা সুমি ও সেলিমের সন্ধান পাই। তারপর তদন্তে একে একে আরও পাঁচজনের নাম পেয়েছি। সেলিমসহ পাঁচ জন পলাতক আছেন। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’ বলে পুলিশ কর্মকর্তা জোবাইর সৈয়দ।

সারাবাংলা/আরডি/এমআই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন