রবিবার ২১ জুলাই, ২০১৯ ইং , ৬ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৭ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

আমাদের দুই বিঘে জমি

ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৮ | ৩:১৪ অপরাহ্ণ

সমাজের ভেতরে গেঁথে যাওয়ার জন্য পুঁজিবাদের একটি বিশেষ নিদর্শন হল, এক-কে এককে পরিণত করা। সম্প্রতি বাংলাদেশের থিয়েটারে দুটো ঘটনায় সেটার আগমনী দেখা গেল, জামিল আহমেদের ‘রিজওয়ান’ এবং তারিক আনাম খানের ‘নিখোঁজ সংবাদ’ ।

‘রিজওয়ান’ নিয়ে আজাদ আবুল কালামের মন্তব্যটাই আমার কাছে সবচেয়ে সঠিক মনে হয়েছে। তিনি বলেছেন, ” রিজওয়ান একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা।”

সত্যি তো, অফিস পাড়াতে কিংবা দুর্গা পূজায় বছরে একবার নাটক করা তো আমরা মূল ধারার কাজ বলি না ! তাই ওটা আমার এই লেখার প্রসঙ্গ নয়।

এই লেখাটি কোকা কোলা নিবেদিত ‘নিখোঁজ সংবাদ’ নিয়ে, যা ‘কোকা কোলা নিখোঁজ শব্দের খোঁজে’ প্রচারের অংশ হিসেবে তারিক আনাম খানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘কথা ও কাহিনী’র প্রযোজনা, সহযোগীতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।

বিজ্ঞাপন

ঐ কাজটির উদ্দেশ্য ও বিধেয় নিয়েই এই কথামালা।
উদ্দেশ্য ১ । পণ্য বিক্রির জন্য একটি ফরমায়েশি নাটক তৈরি
উদ্দেশ্য ২ । ব্যক্তির অর্থলাভ
উদ্দেশ্য ৩ । ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার আত্মপ্রসার
তবে অন্তর্গত উদ্দেশ্য ও বিধেয় নিয়ে ভাবনার অবকাশ আছে বৈকি।

উদ্দেশ্য ১ নিয়ে প্রথম কথাই হল, থিয়েটারের দলগুলো কি ফরমায়েশি নাটক করে? হ্যাঁ, করে তো। প্রাচ্যনাট করে, পালাকার করে, দেশ নাটক করে।

বহুদিন আগে বার্ড – এর সাথে আরন্যক পিপলস থিয়েটার করেছিল একবার, ঢাকা থিয়েটার ইউনিসেফের সাথে কাজ করেছে (যদিও এই দুটো কাজ পণ্য বিক্রয়ের সাথে যুক্ত নয়, তবে সেই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য কার্যকর করাটা বিষয় ছিল বটে)।

তাহলে?

একবার আই, টি, আই- এর একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে দু’জন নেপালী নারী এসেছিলেন। বলেছিলেন, নেপালের সরকার জনস্বার্থে কোন প্রচারণার দরকার হলে একটি নির্ধারিত দল তৈরি করে দেয়, সেই দলটি নির্দিষ্ট কিছু জায়গায়, চুক্তি অনুযায়ী সংখ্যার মঞ্চায়ন করেন, সেটাই তাঁদের থিয়েটার করা।

শুনে আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম ! সেটা বেশ আগের কথা। এখন অবশ্য সেখানে কিছু দল নিয়মিত আদর্শিক থিয়েটার করছে।

কিন্তু ‘নিখোঁজ সংবাদ ‘ জনস্বার্থে প্রচার কি ? অথবা, আদর্শিক থিয়েটার হয়েছে কি ? জনস্বার্থে হলে, সেটা ঠিক কি স্বার্থ? জনস্বার্থে প্রচার হলে, কে, কবে কথা বলার সময় ‘কিংকর্তব্যবিমুঢ়’ , ‘মনোহারিণী’ , ‘অয়োময়’ , ‘মৃন্ময়’ , ‘প্রত্যুৎপন্নমতি’ বা এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করতেন?

তবে লেখায় আগে ব্যবহার হতো, এখন একেবারে হয় না নয়, তবে কম। সাহিত্যের ভাষায়ও বিবর্তন না ঘটলে এবং গ্রহণযোগ্যতা না পেলে সেই হাজার বছরের পুরনো নিয়মে ব্রাত্যজনের ভাষা আর প্রাকৃতজনের ভাষা কি আলাদাই থাকবে? ভাষার শ্রেণি বিভেদে বিশ্বাসী হবো আবার ?

কথ্য ভাষা সহজিয়া হবে, এটাই স্বাভাবিক। যদি আমি বিজ্ঞানভিত্তিক কথা বলি, তবে জানা দরকার, যে প্রতি ১০ মাইল অন্তর এলাকাভিত্তিক ভাষার উচ্চারণ ও প্রয়োগ ভিন্ন হতে শুরু করে। যেমন শ্যালক বদলে শালা হয়, কোথাও সেটা গালি হিসেবেও প্রয়োগ হয়, একইভাবে মিয়াঁ শব্দটিও সম্মান এবং অসম্মানে এলাকাভিত্তিক ব্যবহার হয়।

বাংলা ভাষার উৎপত্তিস্থল কোন ভাষাকে আশ্রয় করে ? সংস্কৃত না? এক্ষেত্রে শিকড়ে ফিরতে চাইলে জটিলতা তৈরি হয় কিনা ভাববেন?

আর ইংরেজি শব্দের বাংলায় ঢুকে যাওয়া যেমন সত্য, তেমনই আরবি ফারসিও তো আছে। কোনটা রাখবো, কোনটা রাখবো না, সেটা নিয়ে গবেষণা করে কি কাজটা হয়েছে ?

আমার কিন্তু মনে হয় নি তা। মনে হয়েছে, একেবারে সাময়িক উত্তেজনায় পাওয়া একটি ভাবনা। যার সামনে পেছনে আরও ভেবে থিয়েটারটা করতে হতো।

কিন্তু সেটা তো হবে না, কারণ, সুনির্দিষ্ট ব্যবসায়িক প্রচারনার অংশ এটি, গভীরে যাওয়ার চেয়ে তাৎক্ষণিক লাভের বিষয়টিই মুখ্য এখানে। যে কারণে, বাংলা শব্দ হারিয়ে যাওয়ার শ্লোগানটি আদর্শ কিংবা নৈতিক কোন অবস্থানে না গিয়ে, ভাষার মাসে, ভাষাকে ব্যবহার করে একটি পণ্য বিক্রির কাজই কেবল হয়ে ওঠে।

কিন্তু ঐ যে বললাম, সে কাজটি, মানে ফরমায়েশি নাটক অনেক থিয়েটার দলই করে, কর্পোরেটদের স্পন্সরশিপও নেয়, তাহলে এই হৈ চৈ কেন?

কারণ, দল্গুলো কর্পোরেটের নির্দিষ্ট কাজ এবং আদর্শিক কাজে একটি সীমারেখা টেনে রাখে। থিয়েটার করতে অর্থ দরকার হয় প্রতিনিয়ত, শুধুমাত্র দর্শকের আনুকুল্য আর সরকারি সামান্য পৃষ্ঠপোষকতায় তা যথেষ্ট হয় না। তাই দলবদ্ধভাবে অন্যত্র শ্রম বিক্রি করে, সেই অর্থ দলীয় কর্মকাণ্ডে ব্যয় করে দলকে সচল রাখি, আমাদের আদর্শিক জায়গাটির পবিত্রতা ধরে রাখি। ঠিক যেভাবে আমরা আমাদের পরিবারের প্রতি নিষ্কলুষ দায়িত্ব কর্তব্য পালন করি।

কিন্তু সেই আদর্শের আঙ্গিনায় এবার এই ঘটনা ! হৈ চৈ ? সেজন্যই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুই বিঘে জমি কবিতার প্রতিফলন যেন !!!

তবে এই ক্ষেত্রে আমার মনে বিশেষ প্রশ্নের উদয় হয় যে, শিল্পকলা একাডেমি সহযোগিতা করলো কেন? একটি বিশেষ পণ্য বিক্রিতে শিল্পকলার এত আগ্রহের কারণ কী? আর সহযোগিতার ধরনটাই বা কী?

আমি যতদূর জানি, বিভিন্ন দলের উৎসব বা অনুষ্ঠানে, শুধু মিলনায়তন ভাড়া না-নিয়ে শিল্পকলা সহযোগিতায় থাকার বায়না
করে। এখানেও কি তাই হয়েছে? তা হয়ে থাকলে, আমার প্রশ্ন, সরকার নাট্যদলগুলোর জন্য এই মিলনায়তনে যে ভর্তুকি দেয়, তা কি বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ?

প্রশ্ন আসতে পারে, রেপারেটরি নামক একটি কর্মকাণ্ডও কিন্তু এই সুযোগ পায় । তাতে আমাদের আপত্তি হয় না, কারণ সেটি পেশাদারিত্বের চেষ্টা, ‘বাণিজ্যিকিকরণের’ না। পেশাদারিত্বের কাজগুলো এখনও আদর্শিক বা নৈতিক জায়গাগুলো গুলিয়ে ফেলেনি।

থিয়েটার দল্গুলো যখন কোন প্রতিষ্ঠানের স্পন্সরশিপ বা বিজ্ঞাপন নেয়, তখন নিজ শর্তে নেয়, ঐ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য পুরণের জন্য করে না। নিজ নাটক নিজ উদ্দেশ্য ও বিধেয় মেনেই করে, নাটকের ওপর বিন্দুমাত্র আঁচড় বসাতে দেয় না ঐ প্রতিষ্ঠানকে।

উদ্দেশ্য নম্বর ২, কিছু ব্যক্তির অর্থলাভ !

থিয়েটার করে কিছু ছেলেমেয়ে অর্থোপার্জন করলে সমস্যা কি?

এইক্ষেত্রেও একটি পুরনো ঘটনা মনে করাতে চাই। ৯০ দশকে নাটকের কিছু মানুষ হঠাৎ করেই দেশ বিদেশের বর্ণনা আর উদাহরণ সহযোগে বলা শুরু করলেন, ” আহা, শুধু অভিনয় করে যদি আমরা বাঁচতে পারতাম, কত ভালোই না হতো।”

এরপর প্রাইভেট চ্যানেল আর প্যাকেজ নাটকের জোরশোর কাজ শুরু হল, আর শুধু অভিনয় করে বাঁচতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ছুটছে সেই দৌড়ে। পারছে না থিয়েটারে সময় দিতে। তখন সেই উপদেশকরাই, দলের তরুণ প্রজন্ম থিয়েটার না করে মিডিয়ায় ছুটছে বলে মহা বিরক্তি প্রকাশ করেন !

আমি তখনও বলেছি, এখনও বলছি, বাংলাদেশের আর্থ – সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ না করে বলা গড় কথা এসব! যে দেশে সরকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে জাতীয় হাতিয়ার না ভেবে, দান- খয়রাতের খাত ভাবে, যে দেশে ৪০ টাকা দরের চাল কিনতে মানুষকে হিমশিম খেতে হয়, যে নগরে দিনের পর দিন মানুষ রাস্তায় কর্মঘণ্টা হারায়, ইত্যাকার নানাবিধ অর্থনৈতিক ও সামাজিক টানাহেঁচড়ায় থেকে, আদর্শ আর নৈতিকতা বিক্রি না করে, অর্থোপার্জন করবেন থিয়েটার করে? অর্থাৎ, অবকাঠামো তৈরি হল না যে মঞ্চের তার আলোক পরিকল্পনা করা শেষ! আলোটা ঝোলাবেন কোথায় ?

CAT প্রতিষ্ঠানের কথা একটু মনে করি, কামালউদ্দিন নীলুকে কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিদেশিরা যদি থিয়েটার করার টাকা না দেয়, তখন কি করবেন ? তিনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিলেন, করবো না। আমি উত্তর দিয়েছিলাম, আমি তখনও থিয়েটার করবো।

একটি প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব লাভ করার জন্য একটি বাণিজ্যিক কাজ করলেন, মুনাফা নিলেন, আর সেই মুনাফা থেকে কয়েকজন নাট্যকর্মীকে এককালীন কিছু টাকা দিয়েই ভাবলেন, থিয়েটারকে পেশাদারিত্বের পথে নিয়ে এলেন !

এগুলো ছেলেমানুষি তৃপ্তি … !

এই কাজে ব্যক্তির ব্যবসায়িক সাফল্যই একমাত্র অভীষ্ট হয়ে যায়, কোন পথ নির্দেশনা তৈরি হয় বলে আমি মনে করি না।

এবার আসি উদ্দেশ্য-৩ ব্যক্তিকেন্দ্রিক আত্নপ্রসার- এ।

এই কাজটির প্রথম বিন্দু থেকে যেদিকেই রেখা টানুন, ব্যক্তির লাভ অ-লাভের প্রশ্নটিই মূল কথা।

এবার একটি পুরনো কথা বলি। ১৯৯০ সালের দিকে তারিক আনাম খান আরও কয়েকজনকে নিয়ে যখন ‘থিয়েটার’ নাট্যদলটি থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন, তখন আমি এই বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে একটি পর্যালোচনা লিখেছিলাম। সেখানে আমি যুক্তি দিয়ে স্পষ্ট বলেছিলাম, নাট্যদল্গুলোয় এই বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবণতা মূলত তিনটি কারণে ঘটছে, ১। আদর্শিক মত পার্থক্য , ২। সৃষ্টিশীলতার বিকাশে সুযোগ না পাওয়া, ৩। নেতৃত্ববাদের প্রতিষ্ঠায় জটিলতা।

আমি উদাহরণ দিয়ে, ব্যাখ্যা করেই বলেছিলাম, ‘থিয়েটার’ দল থেকে এই বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাটি ব্যক্তির ব্যক্তি- বিকাশে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব থেকেই সৃষ্টি হওয়া, এখানে আদর্শিক বা নৈতিক কিংবা সৃষ্টিশীলতার বিকাশে সুযোগের অভাব প্রতীয়মান হয়নি।

আজ একই কথা আবারও প্রমাণিত হয়। প্রমাণিত হয়, পুঁজিবাদের প্রভাবে ভোগবাদী শিক্ষা আমাদের ভেতরে এক- কে
এককে পরিণত হওয়ার দাসত্ব তৈরি করেছে। তাই আমরা যূথবদ্ধতার বিশ্বাস থেকে সরে যাচ্ছি ক্রমে। আর থিয়েটারের মতো একটি যূথবদ্ধ কাজেও তৈরি হচ্ছে আমিত্ব !

কিন্তু বিবর্তন তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া— সেটাকে দোষারোপ করা কি ঠিক? কোলকাতায় বিবর্তনটি প্রায় এভাবেই ঘটানোর চেষ্টা হয়েছে। এই রেপারেটরির ভাবনা কিন্তু সেই ধারারই একটি অংশ। তবে কোলকাতার মূলধারার থিয়েটারেও কখ্খোনও এমন বাণিজ্যিকিকরণের কাছে বিক্রি হওয়ার কথা আমি জানি না।

আর সেখানে বাণিজ্যিক থিয়েটার আলাদা, নির্ধারিত স্থানেই হয়, নয় কি?

থিয়েটার কর্মের দুই বিঘে জমিতে যিনিই ব্যক্তি বাণিজ্য- ফল লাভের আশা করবেন, তিনিই সমালোচিত হবেন, এটাই সত্য।

আপনি সেটা করবেন কি না সেটাও আপনার অভিরুচি।

যতদূর মনে পড়ে, বাংলাদেশ গ্রূপ থিয়েটার ফেডারেশন একবার এরকমই এক কোমল পানীয়ের বিজ্ঞাপনসহ, মূলব্যানার টাঙিয়ে শহীদ মিনারে অনুষ্ঠান করেছিল, সেখানে বয়োজ্যেষ্ঠ নাট্যজনদের তিরস্কার শুনে তাঁদের বেশ শিক্ষা হয়েছিল, কাজটি পুনর্বার তারা আর করেননি।

আমরাও নাহয় এবার এটি অভিজ্ঞতা হিসেবেই নেই, নিজেদের দুই বিঘে জমি, বাবুদের বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে আর ব্যবহার না করি… শুভ বুদ্ধির শুভস্য শীঘ্রম হোক …।

[এই নিবন্ধে উপস্থাপিত সকল বক্তব্য ও মতামত লেখকের নিজস্ব। সম্পাদক দায়ী নন।]

ইশরাত নিশাত নাট্য অঙ্গনের একজন নিয়মিত নাট্যকর্মী

সারাবাংলা/এমএম

Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন