রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ জমাদিউস-সানি ১৪৪১

বিজ্ঞাপন

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষতাবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে নারীর ক্ষমতায়ন

ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২০ | ১০:১৪ অপরাহ্ণ

রাজনীন ফারজানা

ঢাকা: তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিভিন্ন পর্যায়ের নারীদের দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে জাতীয় প্রবৃদ্ধি বাড়বে। নারীরা আরও বেশি আয় করতে শুরু করলে তা ক্রমেই বেড়ে চলা ধনী ও দরিদ্যের বৈষম্য ঘোচাতেও ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (৫ ফেব্রুয়ারি) কোডারস ট্রাস্ট বাংলাদেশের বনানী শাখায় আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় এ সব কথা উঠে আসে। আলোচনার বিষয় ছিল ‘নারীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও ক্ষমতায়ন।’

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন করতে হবে।’

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানের শুরুতেই কোডারস ট্রাস্ট বাংলাদেশের কার্যক্রম ও নারীর ক্ষমতায়নে তাদের ভূমিকা বিষয়ক একটি মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন দেখানো হয়। সেখানে বলা হয়, কোডারস ট্রাস্ট শুধু নারীদের জন্যই নয়, অটিস্টিক, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের দক্ষতা বৃদ্ধি, সমতা ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়নেও কাজ করছে।

২০১৪ সালে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করা কোডারস ট্রাস্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও বোর্ডের সদস্য আজিজ আহমেদ বলেন, ‘নারীদের দক্ষতা বাড়লে তারা আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে। পাশাপাশি চাকরি করার মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবে।’ এ ছাড়াও তথ্য প্রযুক্তি ও বিপিও খাতে বাংলাদেশের অংশ গ্রহণ বাড়ানোর জন্য প্রাথমিক পর্যায় থেকেই প্রযুক্তি শিক্ষা যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।

কোডারস ট্রাস্টের কান্ট্রি ডিরেক্টর ওসমান গনি বলেন, ‘দক্ষতা থাকলে সবই সম্ভব। তাই কোডারস ট্রাস্ট দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে।’ বর্তমানে ঢাকায় পাঁচটি ক্যম্পাসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালালেও ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

ওসমান গনি বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ফ্রি ল্যান্সিংয়ে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু বড় বড় কাজ ধরতে না পারায় আমাদের আয় অনেক কম। প্রায় ৩০০ টি কাজের ক্ষেত্র থাকলেও আমাদের অংশগ্রহণ মাত্র ৭২টির মতো ক্ষেত্রে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ মার্কেটিংয়ে যা প্রায় ৪০ শতাংশ।’

এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য চারটি চ্যালেঞ্জ দূর করতে হবে বলেন তিনি। একটি চ্যালেঞ্জ হলো একবছরের মধ্যে এক হাজার নারীকে কর্মদক্ষ করে তুলতে হবে। কোডারস ট্রাস্ট বাংলাদেশ সেই লক্ষ্য অর্জনে গৃহিণী ও ছাত্রীদের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ করে তুলতে কাজ করছে বলে জানান ওসমান গনি।

কোডারস ট্রাস্ট বাংলাদেশের শিক্ষিত, অশিক্ষিত সব শ্রেণির নারী-পুরুষের দক্ষতা অর্জনে কাজ করছে। তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ওসমান গণি কড়াইল বস্তির উদাহরণ দেন। সেখানে ২০ জন নিরক্ষর ছেলেমেয়েকে সাত মাস বেসিক ইংরেজি ও বেসিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই ২০ জন এখন ফ্রি ল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হয়েছেন। কড়াইল বস্তিতে এখন ৩৫০ থেকে ৪০০ টি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ কাজ করছে।

গোলটেবিল আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে সফটওয়্যার নির্মাতাদের সংগঠন বেসিসের সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম।’ এর পেছনে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক ভয় ও সংশয় কাজ করে বলে জানান তিনি। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তি খাত নারীদের জন্য বেশি উপযুক্ত বলে জানান আলমাস কবির।

এর কারণ হিসেবে ওই উদ্যোক্তা বলেন, ‘এই খাতে নারীরা চাইলেই ঘরে বসে কাজ করতে পারেন যা তাদের নিরাপত্তার অভাব ও অন্যান্য অসুবিধা দূর করতে পারে।’

এ ছাড়াও নারী কর্মীরা বেশি যৌক্তিক (লজিক্যাল) ও কাজে মনযোগী বলেও মন্তব্য করেন দেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ এই সংগঠনের প্রধান। বাংলাদেশ আইটি খাতে ১ বিলিয়ন ডলার আমদানি করতে সক্ষম হয়েছে যার একটা বড় অংশ নারীদের অবদান।

এছাড়াও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে বাংলাদেশের অদক্ষ, নিরক্ষর ও অল্প শিক্ষিত জনগোষ্ঠির একটি বড় অংশ কাজ হারাবে জানিয়ে তিনি তাদের তথ্য প্রযুক্তি খাতে দক্ষতা বৃদ্ধির পরামর্শ দেন। আলমাস কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের আরএমজি বা তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ নারী শ্রমিক কাজ করছেন যাদের অধিকাংশই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন।’ চতুর্থ শিল্প বিল্পবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রোবোটিকস ও অটোমেশনকে সামনে রেখে দক্ষ নাগরিক গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি। এসব নারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী নতুন করে দক্ষতা অর্জনের শিক্ষা দিতে হবে জানান তিনি।

বর্তমান যুগ বিশেষ দক্ষতার যুগ তাই আমাদের লক্ষ্য নির্দিষ্ট রেখে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সফটওয়্যার, অ্যাপস নির্মাণ কিংবা কোডিং যেটিই হোক না কেন, একটা বা কয়েকটা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বাছাই করার কথা বলেন তিনি।

কোডারস ট্রাস্ট

তথ্যপ্রযুক্তি ও বিপিও খাতে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ বিশেষত নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন দরকার। আলমাস কবির বলেন, ‘দেশে প্রতিবছর ২২ হাজার ছেলেমেয়ে তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হন কিন্তু তাদের জ্ঞান থাকলেও দক্ষতা নেই। চার বছরের পড়াশোনা শেষ করে তিন থেকে ছয় মাসের ইন্টার্নশিপ করার মাধ্যমে আলাদা করে দক্ষতা অর্জন করতে হয়।’ তাই এই তিন থেকে ছয়মাসের দক্ষতা অর্জনের শিক্ষা তিন থেকে চার বছরের কোর্সের মধ্যেই যোগ করার কথা বলেন তিনি।

আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত যে অর্থনৈতিক অর্জন তা মূলত সস্তা শ্রমের ভিত্তিতে অর্জিত হয়েছে।’ কৃষি, গার্মেন্টস, বিদেশি রেমিটেন্স- সবই সস্তা বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।’

দক্ষতা নিয়ে উদ্যোগ থাকলেও তা ফলপ্রসূ হচ্ছে না, বলেন তিনি। এর জন্য ‘সাহসী’ নারীদের এগিয়ে আসার কথা বলেন হোসেন জিল্লুর রহমান। একজন সাহসী নারী কেন্দ্রে এলেও আরও কয়েকজন নারীকে এগিয়ে আনতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সাবেক এমপি ইয়াহিয়া চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীদের অবদান অনেক। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই খাতে তাদের অবদান বাড়তে পারে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আ স ম আরেফিন সিদ্দিকী স্বল্পশিক্ষিত মেয়েদের প্রযুক্তি শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতে কোডারস ট্রাস্টের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘দেশে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হলেও অনেক ছেলেমেয়ে স্কুলে যায় না বা ঝরে পড়ছে। যেকোন দক্ষতা অর্জনের প্রাথমিক শর্তই হলো সাক্ষরতা অর্জন। এছাড়া মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই পাঠ্যসূচিতে প্রযুক্তি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন তিনি।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ‘নারীর জন্য এগিয়ে আসা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের। এর প্রধান কারণ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার নারী ও পুরুষ। এছাড়াও নিয়মকানুন ও আইন থাকলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনও এখনও বন্ধ করা যায়নি। যার কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন।’

তাই তিনি কোডারস ট্রাস্টের নীতি-নির্ধারকদের উদ্দেশ্যে বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে যেসব নারী দক্ষতা অর্জনের জন্য আসেন তাদের যেন পারিবারিক নির্যাতনসহ যে কোনো নির্যাতন প্রতিরোধ করতেও শেখানো হয়।’

সাংবাদিক সামিয়া রহমান বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমকে অগ্রগণ্য মাধ্যম বলা হলেও সংবাদকর্মীরা অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক সস্তা শ্রম দেন। বিশেষত নারী সংবাদকর্মীরা তাদের পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় অনেক কম টাকা বেতন পান।’ এভাবে নারীর ক্ষমতায়ন বাস্তবায়ন অনেকটাই অসম্ভব, বলেন তিনি।

কাজী আইটির কান্ট্রি ডিরেক্টর জারা মাহবুব জানান, তার প্রতিষ্ঠানে ২৩ শতাংশ নারী কর্মী। তারা সম্প্রতি রাত ৯টা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত কাজ করতে পারবে এমন নারী কর্মী চেয়ে বিজ্ঞাপন দেন। সেখানে ১৬০০ আবেদন জমা পড়ে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে যোগ্য নারী কর্মীর অভাব নেই। কিন্তু অবকাঠামো ও নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা পিছিয়ে আছে।’

নারীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ছাড়াও সামাজিক বাধা অনেক বড় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এ সব দূর করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে।’

সারাবাংলা/আরএফ/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন