শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬, ৩ রজব ১৪৪১

বিজ্ঞাপন

জলবায়ু পরিবর্তন কী, জানুন ১০ প্রশ্নে!

ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২০ | ১:৫২ অপরাহ্ণ

পরিবেশ ও জলবায়ু ডেস্ক

শিল্পায়নসহ মানুষের নানাবিধ কর্মকাণ্ডে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসের নিঃসরণ বাড়ছে বায়ুমণ্ডলে। সেইসঙ্গে বেড়ে চলেছে পৃথিবীর তাপমাত্রা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়া বৈরি রূপ নিয়েছে। মেরু অঞ্চলে গলছে বরফ। বিগত প্রায় ২৫০ বছর ধরে বৃদ্ধি পাওয়া বৈশ্বিক উষ্ণতা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে আমাদের এই সবুজ পৃথিবীতে।

বিজ্ঞাপন

১. জলবায়ু পরিবর্তন কাকে বলে?

বর্তমান পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। তবে অতীতে তা এর চেয়ে বেশি বা কম ছিল। এই ওঠানামার ঘটনা প্রকৃতিগত। তবে বিজ্ঞানীরা এখন আশঙ্কা করছেন, বর্তমানে তাপমাত্রা বাড়ছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত। যার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে গ্রিনহাউজ প্রতিক্রিয়ার। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়া জলবায়ু পরিবর্তন।

বিজ্ঞাপন

২. গ্রিনহাউজ প্রতিক্রিয়া কী?

পৃথিবীতে সূর্যের আলো পড়লে বায়ুমণ্ডল কিছু কিছু সূর্যশক্তির আটকে রাখে। এ তাপমাত্রা বায়ুমণ্ডল ও পৃথিবীপৃষ্ঠ উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে। এই প্রাকৃতিক ঘটনা না থাকলে পৃথিবী হয়ে পড়ত বর্তমান তাপমাত্রার চেয়ে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অধিকতর ঠান্ডা, জীবনধারণের অনুপযুক্ত। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, শিল্প ও অনিয়ন্ত্রিত কৃষিকাজের মাধ্যমে আমরা প্রাকৃতিক গ্রিনহাউজ গ্যাসের সঙ্গে আরও অধিক গ্যাস ক্রমাগত যুক্ত করে চলেছি। এভাবেই জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে, বাড়ছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা।

৩. গ্রিনহাউজ গ্যাস কোনগুলো?

গ্রিনহাউজ গ্যাসগুলোর মধ্যে জলীয়বাষ্প, কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড পৃথিবীর উষ্ণায়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। তবে বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্প বজায় থাকে মাত্র কয়েকদিন। অপরদিকে, শিল্পায়নের কারণে আমাদের বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে শতকরা ৩০-৪০ ভাগ। তাই পৃথিবীও উষ্ণ হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি (তেল, কয়লা ও গ্যাস) পুড়লে সবচেয়ে বেশি কার্বন ডাইঅক্সাইডের নির্গমন হয়। এছাড়া কার্বন শোষণ করে এমন সব বন যখন উজাড় করায় অথবা পুড়িয়ে ফেলায়, কার্বন মুক্ত হয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতায় প্রভাব রাখছে।

৪. কীভাবে বুঝতে পারছি পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে?

১৭৫০ সালে শিল্পবিপ্লব শুরু হওয়ার পর থেকে বেড়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড এর পরিমাণ বেড়ে চলেছে। গত ৮ লাখ বছরের মধ্যে বর্তমানেই কার্বন ডাইঅক্সাইডের ঘনীকরণ বর্তমানে সর্বোচ্চ। দ্য ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (ডিব্লিউএমও) জানিয়েছে, বিস্তৃত শিল্পায়নের আগের সময় হতে বর্তমানে পৃথিবী গড়ে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণ হয়েছে। বিগত ২২ বছরের মধ্যে ২০টি বছরই সবচেয়ে বেশি উষ্ণতায় কেটেছে। এরমধ্যে ২০১৫-২০১৮ হচ্ছে তাপমাত্রা বৃদ্ধির শীর্ষ চার বছর।

এছাড়া, ১৮৮০ এর দশকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ছিল ১৩.৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৮৯০ এর দশকে ১৩.৭৫, ১৯০০ এর দশকে ১৩.৭৪, ১৯১০ এর দশকে ১৩.৭২, ১৯২০ এর দশকে ১৩.৮৩, ১৯৩০ এর দশকে ১৩.৯৬, ১৯৪০ এর দশকে ১৪.০৪, ১৯৫০ এর দশকে ১৩.৯৮, ১৯৬০ এর দশকে ১৩.৯৯, ১৯৭০ এর দশকে ১৪.০০, ১৯৮০ এর দশকে ১৪.১৮, ১৯৯০ এর দশকে ১৪.৩১, ২০০০ এর দশকে ১৪.৫১

৫. ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বাড়তে পারে কতটা?

বিগত ৫ হাজার বছরে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়েছে ৪ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অপরদিকে বিগত ১০০ বছরেই তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা গড়ে ১২ হাজার বছর পূর্বের বরফ যুগের পরবর্তী উষ্ণতা বৃদ্ধির ১০ গুন।

ধারণা করা হচ্ছে, আগামী শতাব্দীতে পৃথিবীর তাপমাত্রা ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। ১৮৫০ সালের পর হতে পরবর্তী ১৫০ বছরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে যা ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা জোরারোপ করছেন বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই রাখার জন্য।

৬. কেন সমুদ্র উপকূলের মানুষ হুমকির মুখে?

বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে মরু অঞ্চলের বরফ গলছে। এর ফলে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। ২০০৫ থেকে ২০১৫ সালে সারাবিশ্বে সুমদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতিবছর বেড়েছে গড়ে ৩.৬ মিলিমিটার করে। যদি ২১০০ সালে পৃথিবীর তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে ৩.৬ ফুট। এতে পৃথিবীর অনেক উপকূলীয় অঞ্চল এবং শহর পানির নিচে তলিয়ে যাবে। স্যাটেলাইটের তথ্য থেকে পাওয়া যায় ১৯৭৯ সাল থেকে আর্কটিক সাগরে হিমবাহ রেকর্ড পরিমাণে গলছে। গ্রিনল্যান্ডের বরফস্তরও হ্রাস পাচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে। একই ঘটনা ঘটছে পশ্চিম ও পূর্ব এন্টার্কটিকায়ও।

৭. বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য বর্তমানে কোন দেশ সবচেয়ে দায়ী?

কলকারখানা ও শিল্পের বিকাশ ও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করে চীন। এরপরেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ও রাশিয়ার অবস্থান। চীন বছরে ১১ হাজার ২৫৬ মেগাটন কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করে, যুক্তরাষ্ট্র ৫ হাজার ২৭৫ মেগাটন। অপরদিকে, ইইউ ৩ হাজার ৪৫৭ মেগাটন ও ভারত ২ হাজার ৬২২ মেগাটন কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করে। তবে মাথাপিছু হারে যুক্তরাষ্ট্র আর ইইউ বেশি কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণের জন্য দায়ী।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখনই যদি গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে দেওয়া হয়। তবুও পরিবেশে সে প্রভাব পড়তে ও তাপমাত্রা কমতে শতবছর লেগে যাবে। বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস সরে যেতে লেগে যাবে কয়েক দশক।

৮. জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে আমাদের ক্ষতি করবে?

এটা খুব স্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয়, জলবায়ু পরিবর্তন কখন, কীভাবে ও কতটা ক্ষতি করবে পৃথিবীর। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হাতেনাতে এখনই পাওয়া যাচ্ছে। যেসব সমস্যাগুলো প্রবল হবে সেগুলো হলো, সুপেয় পানির অভাব দেখা দেবে, খাদ্য উৎপাদন বিঘ্নিত হবে। বন্যা-ঝড়-তাপদাহের সংখ্যা বাড়বে। কোথাও কোথাও হবে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, কোথাও তুষারপাত ঘটবে। আবার গ্রীষ্মে খরায় আক্রান্ত হবে শস্যভূমি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হবে। খাপ-খাওয়াতে না পারায় এতে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাসস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হওয়ায় অনেক প্রাণী-প্রজাতির বিলুপ্তির আশঙ্কা থাকবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বাড়বে ম্যালেরিয়াসহ পানি বাহিত রোগ। অপুষ্টির শিকার হবে শিশুরা।

৯. কেন জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ব্যবস্থা নিতে পারছেন না বিশ্বনেতারা?

উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে একমত হতে পারেনি। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত শিল্পায়ন, জ্বালানির ব্যবহার ও বৈশ্বিক উষ্ণতার সম্পর্ক। বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার এখনো সহজলভ্য নয়। ইউরোপের কিছু দেশ এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দেখালেও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর কখন মানুষের নির্ভরতা কমে আসবে তা বলা যাচ্ছে না। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোর বিশ্বনেতারাও নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন। এরসঙ্গে রয়েছে, চাষাবাদ ও গবাদি পশু পালনে বন উজাড় ও প্লাস্টিক বর্জ্য সমস্যা। সবমিলিয়ে পরিবেশ রয়েছে নাজুক অবস্থায়।

১০. আপনি-আমি পৃথিবী রক্ষা করতে কী ভূমিকা রাখতে পারি?

আমরা যদি জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সাহায্য করতে চাই তাহলে আমাদের জীবনাচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। যত বেশি সম্ভব গাছ লাগাতে হবে। কারণ কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণে বৃক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র অ্যামাজন বন বছরে ২ হাজার মেগাটন কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে। বলা হয়ে থাকে, একজন মানুষের জন্য ১ বছরের অক্সিজেন সরবরাহ করতে ২টি পূর্ণ বয়ষ্ক গাছের প্রয়োজন। তাই নিজেদের কথা চিন্তা করেও আমাদের গাছ লাগানো উচিত। একইসঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনার বিকল্প নেই। তাই খাবার-পোশাক-যানবাহন ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া ও গুরুত্বপূর্ণ। বিলাসিতা পরিহার করলে ব্যক্তি হিসেবে আপনি হয়ত জলবায়ু পরিবর্তন রোখে কিছুটা সাহায্য করতে পারবেন। বর্তমানে অনেক সংস্থা এ নিয়ে কাজ করছে। তাদের তহবিলে অর্থ-সহায়তাও করা যেতে পারে।

 

 

তথ্যসমূহ বিবিসি, সিএনএন, উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত।

সারাবাংলা/এনএইচ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন