সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৯ জমাদিউস-সানি ১৪৪১

বিজ্ঞাপন

‘পুলিশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বদলানো বড় চ্যালেঞ্জ’

ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২০ | ১:৩৮ অপরাহ্ণ

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বাংলাদেশ পুলিশের সেবা সম্পর্কে মানুষের মনে আগে থেকেই নানা নেতিবাচক ধারণা আছে। এই নেতিবাচক ধারণা বদলাতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। এটিই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কাজে নিয়োজিত বিশাল এই বাহিনীর চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ৪৫তম রেইজিং ডে উপলক্ষে এক সাক্ষাৎকারে সারাবাংলার কাছে এ সব কথা বলেন ডিএমপি কমিশনার। ডিএমপি কমিশনারের সাক্ষাতকার নেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মাসুদুর রহমান।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘ডিএমপির ৪৫ তম পদার্পণ উপলক্ষে সবাইকে শুভদিনের শুভেচ্ছা জানাই। শুরুতে ছোট্ট একটি ইউনিট ছিল। এখন সেখানে ৫০টি থানায় উন্নীত হয়েছে। ৩৪ হাজার পুলিশ সদস্যের একটি বিশাল পরিবার। আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণের জন্য। সবসময় সফল হয়েছি, এ দাবি করব না। কিন্তু নগরবাসী আমাদের সঙ্গে আছে। তাদের পাশে দাঁড়াতে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: নগরবাসীকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়ার জন্য কোন কোন জায়গায় ঘাটতি রয়েছে আপনাদের?

শফিকুল ইসলাম: মূল ঘাটতি আমাদের মানসিকতার। পুলিশের যারা চাকরি করেন, মানুষকে সেবা করার ব্রত নিয়ে কাজটা শুরু করা সেই জায়গায় আমাদের ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থা থেকে বের করার জন্য আমরা নিরন্তরভাবে কাজ করে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীও মানুষকে সেবা করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। আইজিপি থেকে শুরু করে সকলে আমরা এই জায়গাটাতেই কাজ করছি। আমরা যখনই যেখানে যাচ্ছি, একটা ম্যাসেজ সকল সদস্যদের পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। আপনি ভালো কাজ করেন। আপনি সকলকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না কিন্তু আপনি ভালো ব্যবহার করতে তো পারবেন। আপনার আচরণে আপনি যে কর্মচারী মানুষকে সেবা করার জন্যই আপনাকে এখানে বসানো হয়েছে, সেই বোধটি যেন একজন নাগরিক থানা থেকে পায়। একজন নাগরিক পুলিশের যে কোনো ইউনিটে গেলে তিনি যেন মনে করেন, আমি অন্তত শোভন আচরণ পেয়েছি। সেই মানসিকতা প্রতিষ্ঠায় আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

আর মানুষের আস্থা অর্জন করা খুব কঠিন কাজ। ১০ জন লোক থানায় গেলে ৫ জন পেয়েছেন আর ৫ জন পাননি। যে ৫ জন পেয়েছেন তারা তো পুলিশ সম্পর্কে পজিটিভ ধারণা পাবেন। আর যারা সেবা পাননি তারা সারাজীবন মনে রাখবে যে তারা সেবা পাননি। আমাদের সামর্থ্য ও চেষ্টা সবক্ষেত্রে করে যাই। সব ক্ষেত্রে সফল হতে পারি না। যার ক্ষেত্রে সফল হতে পারিনি, তিনি তো কোনোভাবেই আমাদের আস্থা হিসেবে নেবে না।

আরেকটি বিষয় হলো, মানুষের প্রত্যেকেরই পুলিশ সম্পর্কে একটি প্রিভিয়াস ধারণা তার মনের ভেতরে তৈরি করে রেখেছেন। এই ধারণা খুব একটা পজিটিভ না। যিনি জীবনে কোনো দিন থানায় যাননি তারপরেও থানা পুলিশ সম্পর্কে একটা নেগেটিভ ধারণা করছেন। ওনি ধরেই নিয়েছেন যে, থানায় গেলে দুর্ব্যবহার হবে, পয়সা ছাড়া কাজ হবে না। এ ধারণাগুলোর যে পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ যে থানায় গিয়ে প্রকৃতপক্ষে সেবা পাচ্ছেন তা ওনি জানলেন না। যিনি থানায় যাচ্ছেন তিনি পজিটিভ এটিচুড শো করছেন। আর যিনি যাচ্ছেন না তিনি তো নেগেটিভই থাকছেন। মানুষ যদি আস্থাই খুঁজে না পায় তবে যতই সেবা দেন কাঙ্খিত পর্যায়ে নিতে পারবেন না। এই ধারণাগুলোই পরিবর্তন করার চেষ্টা চলছে।

সারাবাংলা: আপনি জয়েন করার পর বলেছিলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা থানায় বসবেন। এখন কী অবস্থা?

শফিকুল ইসলাম: প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন একজন ডিসি ও একজন এডিসি থানায় বসছেন বিকেলের দিকে। সেই সময় যারা আসেন তাদের কথা শোনেন এবং থানাকে নির্দেশনা দেন।  এর পাশাপাশি থানায় প্রতিদিন যেসব মানুষ সেবাপেতে আসেন বিশেষ করে যারা মামলা ও জিডি করার জন্য আসেন। মামলার ক্ষেত্রে শতভাগ বাদীর সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কথা বলেন। তিনি কাঙিক্ষত সেবা পেলেন কিনা। তার যদি কোনো অসন্তুষ্টির জায়গা থাকে, সেবা পেতে কোনো ক্ষোভ থাকলে তা প্রতিকার করার চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে সেই জায়গাটাতে কাজ করা হয়।

জিডির ক্ষেত্রে বলব, মহানগরীতে প্রতিদিন ৫০০ জিডি হয়। গুরুত্বপূর্ণ জিডিগুলো বাছাই করা হয়। সেই অনুযায়ী কাজ করা হয়। বাদীর সঙ্গে কথা বলা হয়। তিনি কাঙিক্ষত সেবাটি পেলেন কি না? অধিকাংশ সেবাগ্রহীতা পুলিশের কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

সারাবাংলা: জবাবদিহিতার জায়গা থেকে আপনি কতটা সোচ্চার আর জনগণের আস্থা অর্জনে আপনি কী করেছেন?

শফিকুল ইসলাম: আমার জানামতে, ঢাকা মহানগর পুলিশে এমন কোনো ক্ষমতাধর কর্মকর্তা নেই যাকে আমি মনে করি, তাকে আমি এখানে রাখব না, এতে কিছু করতে পারবেন না। এই ম্যাসেজটা পরিস্কারভাবে জানা আছে সকলের। এটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে আইজিপিসহ সব পর্যায় থেকে কমিশনারকে স্বাধীনতা দেওয়া আছে। আমার ইচ্ছামত কর্মকর্তাদের আচরণগত সমস্যা হলেই আমি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারব। এখন বিষয় হচ্ছে, প্রত্যেক নাগরিককেও তার জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে। কেউ কিন্তু সচেতন না। সচেতন হওয়াটা হচ্ছে নাগরিক অধিকার। থানায় যাবেন কোনো হয়রানি ছাড়া উনি মামলা করবেন। দেখবেন প্রতিটা থানার গেটে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। থানায় কোনো  হয়রানির শিকার হলে আপনি ফোন করে জানাতে পারবেন। এখন যদি আপনি না জানিয়ে আমাকে দোষারোপ করেন যে, খারাপ আচরণ পেলাম কিন্তু এটির প্রতিকার হলো না। এটি তো ঠিক না। আমি অনুরোধ করব, যদি এ রকম ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে জানান, ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপনি অন্যায়ের শিকার হলেন, আমাদের জানান, দেখেন ব্যবস্থা নেওয়া হয় কীনা।

সারাবাংলা: মাদক নিয়ে অভিযান কেমন চলছে, এতে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কীনা?

শফিকুল ইসলাম: মাদকের বিরুদ্ধে ডিএমপির যে চলমান অভিযান রয়েছে, যেভাবে কাজ চলছে তাতে আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট না। যারা মাদক ব্যবসা করছে, শুধুমাত্র তাদের ধরে কারাগারে পাঠালে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যেভাবে ডিমান্ড বেড়েই চলেছে তা মাদক নিয়ন্ত্রণ করা মোটেই সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গুলশান এলাকায় হাজার হাজার পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে যারা মাদক ঢুকায় তাদের ধরা হলো। কিন্তু ওই এলাকায় যারা মাদক গ্রহণ করেন, তারা কি মাদক গ্রহণ বন্ধ করবেন। তারা তো অন্য জায়গায় যেখানে মাদক পাওয়া যায় সেখানে যাবেন। মাদকগ্রহণকারীরা পরবর্তী সময়ে মাদক ব্যবসায়ী হয়ে যায়। মাদক সেবন শিখেছে বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে। কিছু দিন পরিবার থেকে টাকার সাপোর্ট পায়। এরপর তারা আর টাকার সাপোর্ট পায় না। তখন তারা মাদক কারবারি হয়ে ওঠে। কমিশনের টাকা থেকে মাদক নিজে গ্রহণ করে আর বিক্রির বাকি টাকা মহাজনকে দেয়। এক্ষেত্রে ডিমান্ড বন্ধ করতে হবে। প্রতিটা পরিবারে নজর দিতে হবে। সন্তানরা যেন মাদক গ্রহণ না করেন। সেবন করলেও তাকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সেবন বন্ধ হলেই মাদক ব্যবসা বন্ধ হবে।

সারাবাংলা: আপনি পুলিশের সবচেয়ে বড় একটি ইউনিটের দল নেতা। ডিএমপির রেইজিং ডে উপলক্ষে আপনার সদস্যদের উদ্দেশ্যে কী বার্তা রয়েছে?

শফিকুল ইসলাম: ডিএমপির ৩৪ হাজার সহকর্মীদের বলতে চাই, আপনার এবং আমার গায়ে পুলিশের পোশাক রয়েছে, আপনার সন্তানের গায়ে কিন্তু পোশাক থাকবে না। আমার সন্তানের গায়েও পোশাক থাকবে না। এই শহরে আমার সন্তান ও আপনার সন্তান বাস করবে। এখন আমার আপনার হাতে ক্ষমতা আছে। আসুন এই শহরকে এমন একটা শহরে পরিণত করি, যেখানে আমার আপনার সবার সন্তান একটি বাসযোগ্য শহরে বাস করতে পারবে।

সারাবাংলা/ইউজে/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন