বিজ্ঞাপন

নিচ্ছিদ্র ভালোবাসায় ‘তারা-সিতারা’

February 13, 2020 | 5:54 pm

মুন্নী সাহা

গার্লস কলেজের বাড়াবাড়ি শাসনের গণ্ডি পেরিয়েছি সবে। আহা... ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর! ’৯০ পরবর্তী রাজনীতির ঝমঝম্ মিছিল, আন্দোলন, পোস্টার, দেয়ালে দেয়ালে ‘মুক্তি চাই’ দাবি। কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের উচ্ছ্বাস অপরাজেয় বাংলার পীঠস্থানে। সেই উচ্ছ্বাসেরই ‘এক কণা’ হয়ে আমি সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হওয়া বোকাটি। হন্তদন্ত হয়ে প্রথম দিনের প্রথম ক্লাসে ঢোকার অনুমতি চাইলাম, ‘আসব স্যার?’

বিজ্ঞাপন

লেকচার থিয়েটারের ক্লাসরুমে একটু হালকা উঁচু বেইজ। তার ওপর শিক্ষকের চেয়ার-টেবিল। পেছনে বোর্ড। বেইজে দাঁড়িয়ে মুখভরা দাড়ি-গোঁফের একজন মিষ্টি-মৃদু স্বরে বললেন, ‘আসুন।’

বন্ধুদের পাশে বসেই বললাম, ‘আরে, আসাদুজ্জামান নূর! উনি আমাদের স্যার! জানতাম না তো?’

বিজ্ঞাপন

পাশে বন্ধু সায়কা। বললো, ‘না, উনি নাটকের নূর না। তবে তারই কেউ হইতে পারে, দ্যাখ না গলার আওয়াজ, কথা সব এক— দাড়ি চেহারা। শুধু উনাকে একটু সাধু সাধু লাগছে।’

দিন কয়েক আগের একটি অনুষ্ঠানে প্রায় এক লহমায় ২৭ বছর আগের সেই স্মৃতির ক্লাসে নিয়ে গেলেন আহাদ স্যার। অধ্যাপক ড. আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ‘অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী’ মিলনায়তনে ২৭ জানুয়ারির পড়ন্ত বেলায় ঘটলো সে ঘটনা।

স্যারের প্রথম কবিতার বইয়ের প্রকাশনা উৎসব চলছিল। দর্শক সারিতে আমরা, তার ছাত্র-ছাত্রীরা ছাড়াও অনেকেই উপস্থিত। সম্প্রতি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্যার রিটায়ার করেছেন। কিন্তু ‘টায়ার্ড’ হননি। পূর্ণোদ্যমে বই পড়া, ডায়েরি লেখার পুরনো নিত্য অভ্যাসের সঙ্গে বরং যুক্ত করে নিয়েছেন ‘ফেসবুকিং’। ‘নক্ষত্র নিভে যায়’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে নিজের কবিতা লেখা, প্রকাশের তাগিদ এসবের ফিরিস্তি। যেভাবে মাইকের সামনে এসে বলছিলেন, তাতে আমরা তার ২৭ বছরের পুরোনো ছাত্র-ছাত্রীরা দর্শক সারিতে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম, সবাই হারিয়ে গিয়েছিলাম যে যার মতো করে— আহাদ স্যারের ক্লাসে।

‘নক্ষত্র নিভে যায়’ বইটির প্রকাশক ‘অন্যপ্রকাশ’। আমাদের ব্যাচের মাজহার এর কর্ণধার। সঙ্গে বন্ধু নাসের, কমল, আরও অনেকেই আছে। সেসময় মাজহার, কমলরা মিলে গাইড বই বের করলো প্রথম। রমরমা ব্যবসার গন্ধ। ইউনিভার্সিটির টগবগে তরুণ। এমন ব্যবসা সফল উদ্যোগের চিন্তা যখন ঘুরপাক খায়, তখন কি আর আহাদ স্যারের কমিউনিকেশন থিওরির ক্লাসে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, মতি নন্দী বা ফাউস্টের আলোচনা ভালো লাগে? তাও আবার সক্রেটিসের মতো একজন সাধুসন্ত গোছের শিক্ষকের মৃদুভাষ্যে?

আজকের ‘অন্যপ্রকাশ’ নামের ডাকসাইটে প্রভাবশালী প্রকাশনার মালিক মাজহার-দুলালও যেন ভুলে গেল সব ঠাঁটবাঁট। স্যারের বই প্রকাশের অনুভূতি বলতে গিয়ে কী বলবে না বলবে! ক্লাসে তো স্যারের বকা খাওয়া, ফাঁকিবাজদের শাস্তি পাওয়ার ভয় ছিল না কারও। ছিল স্যারের মেধা-প্রজ্ঞা-জ্ঞানের ভারিক্কির ভয়।

সে ভয় আজও বর্তমান। মাজহারের হাত পা নেড়ে গলা খাকাড়ি দিয়ে ‘নক্ষত্র নিভে যায়’-এর প্রেক্ষাপট শুনতে গিয়ে, আমরা ২৭ বছর আগের ব্যাচ এদিক ওদিক তাকিয়ে কানেকশন তৈরি করলাম। মনে মনে চলে গেলাম ক্লাসে, আহাদ স্যারের কবিতার মতো করে। স্যার যেমন লিখেছেন-

‘আমার বিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর
গ্রন্থাগার মধুর ক্যান্টিন
টিএসসি কিংবা দোয়েল চত্ত্বর
আমার বিদ্যালয়
তরুণ শিক্ষার্থীর নির্ভয়
বুদ্ধিদীপ্ত জিজ্ঞাসু দৃষ্টি
গাঢ় উষ্ণ হৃদয়।’

আমাদের ব্যাচের মেধাবীরা, পড়ুয়ারা, যেমন— কাবেরী গায়েন, নিউটন, সাবেরী আলম, শহীদ, রানা, কাজী তাপস ও আরও অনেকেই স্যারের পাবলো নেরুদা থেকে মার্কেজ আলোচনায় পার্টিসিপেট করতে পারত। আমরা যারা মধ্যম, তারা মানিক বা জীবনানন্দ দাশ হলে গল্প শোনার মতো করে ‘হা’ করে থাকতাম।

স্যার একদিন শেষের কবিতা থেকে খানিকটা মুখস্থ বলে গেলেন। আমরা দুষ্টুরা এর মধ্যে ‘মহাপ্রেমিকে’র লেভেল লাগিয়ে দিয়ে খলখল করে ক্লাস থেকে বের হয়েই ড. সিতারা পারভীনের রুমের পর্দা সরিয়ে একঝলক দেখে নিয়ে খিলখিলিয়ে চলে যাই। আহাদ স্যারের ‘লাবণ্য’। ‘লাবণ্য’ নাম। যখন বিশেষণ হিসেবে ভাবি, তখন ওই উঠতি বয়সে আমার চোখে একটা ছবিই ভাসত— ছিপছিপে গড়ন, মিহি গলার স্বর, হলদেটে উজ্জ্বল রঙে মেকাপহীন সিমপ্লিসিটি। বাংলাদেশের গ্রামের মেয়েদের চিকন-পাড় মোটা সুতার একরঙা শাড়ি পাটপাট করে কাঁধে তুলে একটা লম্বা বেণী হেঁটে যাওয়ার স্মার্টনেসের ছবি। হুবহু সিতারা আপার মতো। আমাদের আহাদ স্যারের ‘লাবণ্য’।

বোদলেয়ারের কবিতা কিংবা ‘কান্ট’-এর থিওরি, কমিউনিকেশনের সঙ্গে এর যোগ-বিয়োগের মাথা মুণ্ডু কি আমরা বুঝি? তাও স্যার ডি কে বার্লোর বই থেকে উদ্ধৃতি দেন। আমরা নচ্ছারের দল, ক্লাস শেষে গবেষণা করি, স্যার কেন সহপাঠিনী সিতারার প্রেমে বুঁদ হয়েছেন। দু’জনেই ফার্স্ট হবেন। আহাদ-সিতারা দু’জনেই জানতেন, তারপর ফট করে পরীক্ষার হল থেকে আহাদুজ্জামান হাওয়া হয়ে গেলেন। সিতারাকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে। পরের বছর অবশ্য আহাদুজ্জামানই সাংবাদিকতা বিভাগের ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট।

এরপর তারা ‘তারা-সিতারা’— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার শিক্ষক জুটি। এই জুটির স্নিগ্ধ প্রেম চর্চা করতে গেলে স্টুডেন্ট হিসেবে আমাদেরকে আহাদ স্যারের কবিতাই আওড়াতে হবে।

‘কে কাকে কত বেশি ভালোবাসে
কিংবা ভালোবেসেছে কে আগে
এ নিয়ে তর্কের শেষ ছিলো না,
তুমি বলতে, আমি বলেছি আগে
কবিতার মতো করে।
আমি বলতাম তা ঠিক,
কিন্তু তোমার চোখের পাতায়
ভিজে ওঠেছে ভালোবাসা,...’

২৭ জানুয়ারির পড়ন্ত বিকেলটা বড় বেশি পরানপোড়া যেন। ‘নক্ষত্র নিভে যায়’ নিয়ে বলতে সভাপতির আসনে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, শিক্ষাবিদ কথাশিল্পী সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী। তারা বইটি হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছেন। হয়তো উৎসর্গ করার লাইন দুটিই দেখছেন—

‘সিতারা পারভীনকে
সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়’

দেখেই বইয়ের এফোঁড় ওফোঁড় খুঁজছেন।

হ্যাঁ, প্রিয়বন্ধু সহপাঠী প্রেমিকা, স্ত্রী, সহকর্মী সিতারাকে নিয়েই আহাদুজ্জমানের হাহাকার কাব্য থেকে সমাজ-রাজনীতি-বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে হুবহু খাপ খাওয়া কবিতার লাইন উদ্ধৃত করবার।

তাই কেউ একজন পড়ে শোনালেন ‘অ্যালবার্ট এখনো স্বপ্ন দেখে’ কবিতাটি।

‘নির্ভীকতার নাম নুসরাত জাহান’ বা আমাজন পুড়ে যাওয়া নিয়ে কবিতা ‘জ্বলে যাচ্ছে ভুবনের বন’ উল্লেখ করে কতটা সমাজ সচেতন কবিতা লেখেন আহাদুজ্জামান, তাই জাস্টিফাই করার চেষ্টা করলেন। যেন ড. সিতারার প্রতি বা একজন প্রেমিকার প্রতি নিশ্ছিদ্র প্রেম, একাগ্রতা হালের সমাজ-রাজনীতি করোনা-প্যারাসাইট পেছন সারির ইস্যু। যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় এই শিক্ষকের একাগ্র প্রেমের জয়গাঁথা বলতে নেই। ‘দেখা হবে’ বলে ঠোঁটের কোণায় স্মিত হাসি হেসে যে সিতারা দূর দেশে গেল, তাকে কেন আর শোনা যায় না। দেখা যায় না...?

এ নিয়েই তারাটির সাথে তারাটির কথোপকথন যেন সাজে না প্রায় প্রৌঢ়ত্বে পড়া একজন শিক্ষকের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগের ২৭, ২৫, ২০, ১৫, ৫ বছর আগের ছাত্র-ছাত্রীদের একজন প্রিয় ফিলোসোফারের। যিনি বার বার, বহুবার শেখান—

‘ভালোবাসার কথা দু’বার বলা যায় না।
প্রেম তুমি বারবার করতে পারো,
কিন্তু ভালোবাসার প্রথম স্তবকিত ঘ্রাণ
আর ফিরে আসে না,
অলৌকিক পাখির অচিন সুরের মতো
মিলায়ে যায় অসীম কালসাগরে,
গোধূলিতে বিলীয়মান ছায়ার মতো মিশে যায় দূর থেকে দূরে।’

বইয়ের প্রকাশনার আনুষ্ঠানিকতার ধারাবাহিকতায় সাদাপাকা চুল দাড়ির ঋষিতুল্য আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলীর ক্লাসরুমসুলভ বক্তৃতা শুনতে শুনতে কখনো হাসি, কখনো পুরোনা দিনে পাড়ি দেই। কখনো বা বাঁ দিকে মিথিলা ফারজানাকে চিমটি কাটি, সামনের সারির ড. কাবেরী গায়েনের সঙ্গে চোখোচোখিতে কুশল বিনিময় করি। বইয়ে নেই— এমন একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন ‘নক্ষত্র নিভে যায়’-এর কবি।

বাংলাদেশের প্রায় সব মানুষের কানেই অভিনেতা, নাট্যজন, রাজনীতিবিদ আসাদুজ্জামান নূরের কণ্ঠের আওয়াজের টাটকা রেকর্ড আছে। মনে মনে সেটুকু তারই ছোট ভাই আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলীর কবিতাপাঠের বর্ণনার সাথে কপি পেস্ট করে নিতে পারলে ঠিক ঠিক অনুভবটা পাওয়া যেতে পারে, কেমন লাগছিল মাইক্রোফোনের সামনে খোদ কবিকে শুনতে…।

শেষ কবিতা পড়ব ‘দূর আলাপনের ব্যবস্থা নেই’— বললেন আহাদ স্যার। ‘তার আগে অনুরোধের কবিতাটি পড়ছি’ বলে শুরু করলেন। ‘নক্ষত্র নিভে যায়’-এর প্রথম কবিতায় ততক্ষণে আমাদের সবারই চোখ বোলানো হয়ে গেছে। অকাল প্রয়াত প্রেমিকা ড. সিতারা পারভীনের সাথে আহাদ স্যারের প্রতিমুহূর্তের যোগাযোগের ভাষারূপ সে কবিতা—

‘তুমি স্বল্পভাষী ছিলে
কিন্তু এতটা না
এই দূরটা একটু বেশি দূর
ধারে কাছে কোথাও
দূর আলাপনের ব্যবস্থা হয়তো নেই’

আহাদ স্যার অনুরোধের কবিতা শেষ করে আবার বললেন মাইক্রোফোনে, এবার পড়ছি ‘দূর আলাপনের ব্যবস্থা নেই।’

অনেকক্ষণ নীরবতা। মাথা নিচু করে দাঁড়ানো মাইক্রোফোনটা হাতে ধরে আমাদের শিক্ষক আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী। চুলে শুভ্রতার ছড়াছড়ি, পরিমিত জীবন চর্চায় আলো ঠিকড়ানো এক বুড়ো। হঠাৎ ‘গিক্ গিক্’ আওয়াজটা আমাদের অনেকেরই কানে এলো। মিথিলার হাতটা চেপে ধরে বললাম, ‘স্যার কি পড়ে যাবেন নাকি?’

গলার কাছে প্রাণটা এসে আটকে গেছে। বাঁ হাতে কবিতাটি। সিতারার সঙ্গে কথোপকথন। হৃদযন্ত্রের বিহ্বলতার শব্দটা মাইকে শোনা যাচ্ছিল বলে বিব্রত আহাদুজ্জামান, প্রাণ আটকে যাওয়া ধরা গলায় বললেন, ‘আজ থাক, আমি আর পারব না।’

আমরা যারা শিক্ষকের কাছে জীবন শিখি, তাদের অনেকেই চোখে মুখে মিলিয়ে নিলাম। যদি সম্ভব হয়, যদি সুযোগ থাকে পরমের কাছে প্রার্থনা থাকল, ‘মানব-মানবীর নিচ্ছিদ্র ভালোবাসা দেওয়া এবং নেওয়ার স্বাদ যেন পাই।’

জয়তু- ‘তারা-সিতারা’।
হ্যাপি ভ্যালেনটাইন্স।

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন