শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬, ৩ রজব ১৪৪১

বিজ্ঞাপন

টাকার বিপরীতে শক্তি বাড়ছে ডলারের: কী বার্তা দিচ্ছে

ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০ | ৯:১৮ অপরাহ্ণ

তুহিন সাইফুল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার দাম আরও কমেছে। এতে রফতানিকারকেরা খুশি হলেও আমদানিকারকদের মাথায় হাত। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, ডলারের বিপরীতে টাকার দাম এভাবে কমতে থাকলে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতি— দু’টোই বেড়ে যেতে পারে। তবে এই প্রভাব সার্বিকভাবে অর্থনীতিকে খুব বেশি বেকায়দায় ফেলবে না বলেও  মনে করছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে টাকার দামকে ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) খোলাবাজারে মার্কিন ডলারের দাম ছিল ৮৮ টাকা। টাকার বিপরীতে ডলারের দামের এটিই রেকর্ড। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, টাকার হিসাবে গেল একবছরে কমপক্ষে ১ টাকা বেড়েছে ডলারের দাম। আর গত ১০ বছরে দাম বেড়েছে ১৯ টাকা।

খোলাবাজারে ডলার কেনাবেচা করেন— এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জানুয়ারির শেষ দিকেও ডলারের দাম ছিল ৮৬ থেকে ৮৭ টাকা। ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে সেটি ৮৮ টাকায় পৌঁছে গেছে। টাকার বীপরীতে ডলারের দাম কেন বাড়ছে— সে বিষয়ে কোনো ধারণা নেই বলেও জানিয়েছেন খোলাবাজারের ক্রেতা-বিক্রেতারা।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- ‘টালমাটাল’ অর্থনীতি প্রভাব ফেলবে জনজীবনে

এদিকে, এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বৃহস্পতিবার ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ৯৫ পয়সা। আর একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, এদিন ৮৭ থেকে ৮৮ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হয়েছে ডলার। আর ব্যাংকগুলো ডলার কিনেছে ৮৬ টাকায়।

টাকার বিপরীতে ডলার শক্তিশালী হতে থাকলে কী প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে— এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক খালেদা খানম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা আমদানি ও রফতানি করি টাকায়। তুলনা করা হলে আমাদেরকে রফতানি চেয়ে আমদানিই করতে হয়ে বেশি। এখন টাকার মান যদি কমে যায়, তাহলে আমাদের যেকোনো পণ্য বেশি টাকা দিয়ে আমদানি করতে হবে। এতে উৎপাদন ব্যায় বাড়বে। পণ্যও বেশি দামে বিক্রি করতে হবে। এর প্রভাবে সাধারণ ভোক্তাদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে।’

তবে ডলারের মূল্য বাড়লেও অর্থনীতিতে তেমন প্রভাব পড়বে না বলে মত দিয়েছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এস এম মাহফুজুর রহমান। সারাবাংলাকে তিনি বলেছেন, দেশে এখন উদ্যোক্তা বাড়ছে। ফলে উৎপাদন বেড়েছে এবং রফতানিও বেড়েছে অনেক বেশি। ফলে ডলারের মূল্যের তারতম্য খুব একটা বেকায়দায় ফেলবে না দেশকে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অবশ্য অধ্যাপক মাহফুজুরের আশাবাদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কেননা ইপিবি বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি) রফতানি আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ শতাংশ কম, একইসঙ্গে গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়েও ৫ দশমিক ২১ শতাংশ কম।

এদিকে, ডলার শক্তিশালী হলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও মূল্যস্ফীতির হ্রাস-বৃদ্ধিতে আরও কিছু বিষয় নিয়ামক রয়েছে বলে উল্লেখ করলেন ড. মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, প্রবাসীরা বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছে। যে পরিবারগুলো আগে অস্বচ্ছল ছিল সেগুলো স্বচ্ছল হচ্ছে। এখন গ্রামে বা মফস্বলে পাঁচ টাকার মাছ যদি আট টাকায় কেউ কিনতে শুরু করে, তাহলে মূল্যস্ফীতি হবে— এটাই স্বাভাবিক। তারপরও যদি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করা হয়, দেখা যাবে ভারতে মূলস্ফীতি সাত শতাংশ ছাড়িয়েছে। নেপালের অবস্থা টালামাটাল। সেখানে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখনো পাঁচের (৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ) ঘরে।

তবে সেই প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও অবশ্য ডলারের প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন মুদ্রা ব্যবসায়ী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের একজন সারাবাংলাকে বলেন, ব্যাংক ও খোলাবাজারে ডলারের দামে চার টাকারও বেশি ব্যবধান হয়ে যাওয়ায় প্রবাসীদের অনেকেই এখন বেশি লাভের আশায় ব্যাংকের বদলে হুন্ডি করে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে।

ড. মাহফুজুর রহমান অবশ্য এটিকেও কোনো সমস্যা হিসেবে দেখছেন না। তার মতে, হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর প্রবণতা অত্যন্ত পুরনো। তাছাড়া হুন্ডিতে শুধু টাকা আসছে না, টাকা যাচ্ছেও। তবে হুন্ডির দৌরাত্ম্য যেকোনো উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত বলেও মত দিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা হুন্ডিতে টাকা লেনদেনের তথ্য মানতে নারাজ। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক কাজী সাইদুর রহমান বলেন, প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলেই রেমিট্যান্স পাঠান বেশি। কারণ এখানে টাকা মার যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এজন্য রেমিটেন্সের প্রবাহ বাড়ছে। এই অর্থবছরে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ১ হাজার ১০৪ কোটি ১৪ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে।

টাকাকে ডলারের মতো মুদ্রার বিপরীতে শক্তিশালী করতে কেবল রেমিট্যান্সে জোর দিতে নিরুৎসাহিত করলেন ফাইন্যান্সের অধ্যাপক খালেদা খাতুন। উৎপাদন বৈচিত্র্য ও রফতানি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য-নির্ভর না হয়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় কর্মী পাঠাতে হবে। বাড়াতে হবে শিল্পায়নও। দেশে উৎপাদন ও রফতানি বাড়ানো গেলে মুদ্রার দাম নিয়ে চিন্তিত হতে হবে না।

গত ১০ বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মানের তুলনামূলক চিত্র পাওয়া গেল বাংলাদেশ ব্যাংকে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতি ডলারের বিনিময়ে পাওয়া যেত ৬৯ টাকা। আর এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ৮৫ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৯ সালের শুরুতেও আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দর ছিল ৮৩ টাকা ৯০ পয়সা। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর প্রতি ডলারের মূল্য ছিল ৮৪ টাকা ৯০ পয়সা।

এর আগে, টাকাকে রূপান্তরযোগ্য ঘোষণা করা হয় ১৯৯৪ সালের ২৪ মার্চ। আর ২০০৩ সালে এই বিনিময় হারকে করা হয় ফ্লোটিং বা ভাসমান। ১৯৯৪ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে ডলার ও টাকার বিনিময় হার সরকার নির্ধারণ করে দিত। এখন বিনিময় হার ভাসমান হলেও টাকার দামে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

সারাবাংলা/টিএস/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন