সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৯ জমাদিউস-সানি ১৪৪১

বিজ্ঞাপন

স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার শপথ

ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০ | ৫:২১ অপরাহ্ণ

ঢাবি করেসপন্ডেন্ট

ঢাবি: ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস, কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্য একটি কারণেও দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনটি পালন করা হয়ে থাকে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে। এই দিনে জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারের বিতর্কিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন, যা কালক্রমে গণআন্দোলনে রূপ নেয়।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর শিক্ষা ভবনের সামনে ১৯৬২ ও ১৯৮৩ সালের শিক্ষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনগুলো। এসময় তারা দেশে গণতান্ত্র ফিরিয়ে আনার শপথ গ্রহণ করেন।

স্মৃতিস্তম্ভে ৯০’র ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য, মধ্য ফেব্রুয়ারি ’৮৩ স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্য, বাংলাদেশ ছাত্র সমিতি, ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

স্মৃতিচারণ করে মধ্য ফেব্রুয়ারি ’৮৩ স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের নেতা আনোয়ারুল হক বলেন, ‘১৯৮৩ সালের এই দিনে বাংলাদেশের ছাত্র সমাজ এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলো। স্বৈরাচার এরশাদ যখন আমাদের ওপর সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর চাপিয়ে দিলো, আমাদের সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকার এমনকি শিক্ষার অধিকার কেড়ে নিলো, তখন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো একত্রে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলেন শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে। এই ১৪ ফেব্রুয়ারিই ছিলো মূলত এরশাদকে উৎখাতের সূচনাপর্ব। বর্তমান প্রজন্ম ও ছাত্রসমাজকে এই দিনটাকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন হিসেবে দেখতে হবে।’

তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা এম এ জলিল বলেন, ‘সেদিন আমরা গণতন্ত্রের জন্য, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য এবং অবরুদ্ধ গণতন্ত্রকে মুক্ত করার জন্য সমগ্র ছাত্রসমাজ ও জনগণ মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে সেই সূচনা থেকে নব্বইয়ের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন হয়েছিলো। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বলতে হয় যে, আজ গণতন্ত্র অবরুদ্ধ। আজকের দিনের তাই শপথ হোক, এই শৃঙ্খল আমাদের ভাঙতে হবে, গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে হবে।’

তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা সাম্প্রদায়িক ও পাকিস্তান ধারায় পরিবর্তিত হচ্ছে। যে শিক্ষানীতি আমরা দীর্ঘ সংগ্রামের পর আদায় করেছিলাম, সেই শিক্ষানীতি থেকে আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে সরিয়ে আনা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধেও আমাদের সংগ্রাম করার শপথ নিতে হবে।’

ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, ‘আমরা দেখেছি স্বৈরশাসকদের আঘাতে বিভিন্ন সময় এদেশের গণতন্ত্র অবরুদ্ধ হয়েছে। ছাত্রসমাজ সবসময়ই সেই গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারে এগিয়ে এসছে। যখনই অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থেকেছে, তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে মানুষের ওপর নানাভাবে, নানা কৌশলে নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়েছে, যে কারণে দেখা যায় মানুষ সবসময় রাজপথে আসতে পারে না, প্রতিবাদও করতে পারে না। তবে যখনই ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, মানুষের অধিকার আদায়ে রাজপথে নেমেছে, তখন সাধারণ মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রগহণ করেছে। ভবিষ্যতেও মানুষ ছাত্র আন্দোলনে সংহতি জানাবে। ’

তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ড. মজিদ খান ১৯৮২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর একটি নতুন শিক্ষানীতির প্রস্তাব করেন। সেখানে প্রথম শ্রেণি থেকেই আরবি ও দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য মাপকাঠি করা হয় মেধা অথবা পঞ্চাশ শতাংশ ব্যয়ভার বহনের ক্ষমতা। এই নীতি ঘোষণার পর থেকেই আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। ছাত্রসমাজের দাবি ছিল একটি অবৈতনিক বৈষম্যহীন শিক্ষানীতি। কিন্তু মজিদ খান যে নীতি ঘোষণা করেন, সেখানে বাণিজ্যিকীকরণ আর ধর্মীয় প্রতিফলন ঘটেছে বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন। তাই শুরু থেকেই ওই নীতির বিরোধিতা করতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

সে বছরই ওই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিষয়ে একমত হয় ছাত্র সংগঠনগুলো। এরই ধারাবাহিকতায় ১৪ ফেব্রুয়ারিতে স্মারকলিপি দিতে শিক্ষার্থীরা মিছিল করে সচিবালয়ের দিকে যাবার সময় পুলিশ গুলি চালায়। এতে জয়নাল, মোজাম্মেল, আইয়ুব, জাফর, দীপালি সাহাসহ নিহত হন অন্তত ১০জন। তবে হতাহতের এই সংখ্যার বিষয়ে তখন সরকারিভাবে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। বিকালে এবং পরের দিনও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলে। পুলিশ অনেক ছাত্র-ছাত্রীকে গ্রেফতার করে নির্যাতন করা হয়। এর কিছুদিন পরে ছাত্র আন্দোলনের জেরে সরকার ঘোষণা দিয়ে শিক্ষানীতিটি স্থগিত করে।

সারাবাংলা/এসটি/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন