বিজ্ঞাপন

পিতার কাছে পাঠকের ঋণ

February 14, 2020 | 7:47 pm

সুমন জাহিদ

বলা যায় বাংলা গদ্যের ইতিহাস আধুনিকতার সমবয়সী। জন্ম তার ঔপনিবেশিকতার ঔরসে, কিন্তু বাংলা গদ্যই ‘বঙ্গীয় রেনেসাঁ’ বা পুনর্জাগরণের প্রধান অনুষঙ্গ। তবে পুঁথি সাহিত্যের মত বাংলা গদ্য সাহিত্য প্রান্তিকতায় জনপ্রিয় হতে সময় নিয়েছে প্রায় একশো বছর।

বিজ্ঞাপন

বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও প্রধান গণপাঠকগোষ্ঠী বোধকরি আমাদের মা'দের প্রজন্ম। দেশভাগোত্তর সময়ে বিভিন্ন স্টেশনে ঝাঁপি বা বুক স্টল থেকে কেনা বঙ্কিম, শরৎ, নিহার বাবুদের জনপ্রিয় উপন্যাস হাতে নিয়ে যাত্রা শুরু বাঙালি মধ্যবিত্তের। ধ্রুপদী সাহিত্য ভিন্ন বিষয়, জাতীয় মনন গঠনে পরোক্ষ ভূমিকা, সরাসরি নয়। রবীন্দ্র-নজরুল যুগ, কল্লোল যুগ ছাপিয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যই বিশাল মধ্যবিত্ত পাঠক শ্রেণি তৈরি করেছে। কিন্তু প্রথম সংকট সৃষ্টি হলো ৪৭ এ। দেশভাগোত্তর সময়ে জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্যিকরা পশ্চিমবাংলায় থেকে গেলো, চলে গেলো। কলকাতাকেন্দ্রিকতার বিপরীতে জনপ্রিয় সাহিত্যে পিছিয়ে পড়লো পূর্ববাংলা। ৫২ এসে নতুন মাত্রা যোগ করলো পূর্ববাংলার সাহিত্যে।

"যে ভাষার জন্যে সালাম বরকতেরা রক্ত দিলো; ৫২’সালের লড়াই, আমার আমি জন্ম নিলো; সে ভাষা আমার গানে তোমার পানে আমার অঙ্গীকার।" (কবীর সুমন)

বিজ্ঞাপন

- এই অঙ্গীকারে দীপ্ত হয়ে ঢাকা কেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার পালে হাওয়া লাগলো। কন্ঠস্বরযুগ বা বিউটিবোডিং কেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চায় বাংলার মাটি ও মানুষের গন্ধ ধারণ করলো সত্য কিন্তু গণপাঠক তৈরিতে তেমন ভূমিকা রাখতে পারলো না।। ৫২’র পথ ধরে '৭১ এলো, পেলাম বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠতম অর্জন স্বাধীনতা। যাত্রা শুরু হলো নতুন জাতিরাষ্ট্রের। এই প্রজন্মটি (আমাদের পিতৃপ্রজন্ম) বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, গৌরবময় প্রধান প্রজন্ম। তাদের হাত ধরেই যাত্রা শুরু হয়েছে বাঙালি মধ্যবিত্তের, তাদের হাত ধরেই বিকশিত হয়েছে জাতীয়তাবাদ, তাদের রক্তেই পেয়েছি ভাষার অধিকার, আমাদের আবহমান দাসত্বমুক্তি তাদের হাত ধরেই, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন এই জাতিরাষ্ট্রে সঙ্গতভাবে আমাদের নিজস্বতা নিয়ে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু হলো। নব উদ্যমে নতুন রাষ্ট্রের সাহিত্যচর্চায় আমাদের যাপিত জীবনের সঙ্গে যুক্ত হলো ৫২, ৭১ কিংবা বঙ্গবন্ধু। কলকাতাকেন্দ্রিকতার বিপরীতে আমাদের এই নিজস্বতা সাহিত্যে নতুনত্ব কিংবা বিশিষ্টতা এনে দিল ঠিকই, কিন্তু গণপাঠক এবারও তৈরি হলো না।

আমাদের মহান পিতৃপ্রজন্মের ঔরসে আমারা ভূমিষ্ঠ হলাম নতুন বৈশিষ্ট্য নিয়ে। স্বাধীন দেশের প্রথম প্রজন্ম। নতুন রাষ্ট্রে ধ্রুপদী বা আধুনিক (!) সাহিত্য আমাদের বইমুখী করতে পারলো না। বাংলাদেশের প্রথম পাঠক প্রজন্ম হিসেবে আমাদের জন্ম হলো রোমানা আফাজ-কাজী আনোয়ার হোসেনের সেবা’র হাত ধরে, একটা ‘থ্রিলার প্রজন্ম’। কিন্তু পূর্ব প্রজন্মের মত নারী পাঠক এবার তৈরি হলো না। এই মন্দা কাটিয়ে উঠতে আমাদের অপেক্ষা করতে হলো হুমায়ূন অবধি। ৮০/৯০’র দশকে তৈরি হলো বিশাল গণপাঠকগোষ্ঠী ‘হুমায়ূন প্রজন্ম’। বাংলা প্রকাশনার সৃজনশীল ধারাটি পুষ্ট হতে শুরু করলো। অবস্থা এমন দাঁড়ালো বাংলা সৃজনশীল ধারার সব লেখা জোড়া দিয়ে জনপ্রিয়তায় হুমায়ূনের সমান হতে পারলো না। বাংলা সাহিত্যের নবীন লেখক ও লেখা বিকাশের পথে হুমায়ূনই যেন প্রধান অন্তরায়! কিন্তু হুমায়ূনের মৃত্যুতে কিছুই বিকশিত হয়নি, কাসেম বিন আবু বকরের মত হিজাব সাহিত্য ছাড়া।

আবার দিকভ্রষ্ট বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা। পাঠকের এই অকালপর্ব বিনির্মাণে হুমায়ূন শূণ্যতার সঙ্গে যোগ হলো গ্লোবাল ডিজিটালাইজেশন। সর্বগ্রাসী সোশ্যাল মিডিয়া রুদ্ধ করলো নবীন পাঠক নির্মাণের পথ, অন্তর্জালে সমর্পিত হলো পুরনো পাঠক থেকে বর্তমানের শৈশব। পেপারশূণ্য, বই বিদ্বেষী নয়া প্রজন্মকে এবার আর ফিরাবে কে?

সকল পথই যখন অবরুদ্ধ, তখন মৃত পিতাকেই দায়িত্ব নিতে হলো পথভ্রষ্ট সন্তানের, মৃত্যুর ৪৫ বছর পরও যে সমান শক্তিশালী। পিতার অবিনশ্বর আদর্শ পথ হারাতে দেয় না সন্তানের। অন্তর্জালের শক্তিমত্তা ও হুমায়ূন শূণ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করে জেগে উঠলো মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় প্রজন্ম, মৃত পিতার স্মৃতি পাঠে আবার জোয়ার এলো সৃজনশীল পাঠক সৃষ্টিতে।

দীর্ঘসময় একুশের বইমেলায় মোট বিক্রির সিংহভাগই ছিল হুমায়ূন। যেখানে হাজার কপি বিক্রি হলেই সন্তুষ্ট প্রকাশক, সেখানে সাহিত্যের বরপুত্র হুমায়ূন আহমেদের বই এক মেলাতেই শেষ হয়ে যায় ২০ হাজার কপি। তার মৃত্যুতে দিকহারা যখন সৃজনশীল প্রকাশনা তখনই যেন আলাদীনের চেরাগের মত আমরা পেয়ে গেলাম ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ যার প্রচার সংখ্যা মিথের মত অভাবনীয়। প্রকাশক ইউপিএলও জানেনা সংখ্যাটা কত? ২ লাখ, ১০ লাখ না ৫০ লাখ! সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির মত, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে জনপ্রিয়তার মানদণ্ডে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত, বেশি জনপ্রিয়, বেশি পঠিত এবং সবচেয়ে বেশি পাইরেটেড বইয়ের নাম ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’।

মুজিববর্ষের প্রাক্কালে এবারের বইমেলা উদ্বোধনের সাথেই মোড়ক উম্মোচন হল জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীমূলক ট্রিলোজির সর্বশেষ বই ‘আমার দেখা নয়াচীন’। প্রথম সংস্করণের ২০ হাজার কপি কয়েকদিনের মধ্যেই 'সোল্ড আউট', ২য় বইটি ‘কারাগারের রোজনামচা’ যেমন প্রকাশের ২ দিন পর আমারই কিনতে হয়েছিল দ্বিগুন দামে। যদিও শেষোক্ত দুটিরই প্রকাশক বাংলা একাডেমি।

বাঙালির সকল সংকটে বঙ্গবন্ধুই পথ দেখান শেষ বাতিঘর হয়ে, পাঠকের এই অকালে বঙ্গবন্ধুই ভরসা হলো মুজিববর্ষের প্রাক্কালে। কবীর সুমনের গানের ভাষায়

"যে ভাষার জন্যে এমন এমন হন্যে, এমন আকুল হলাম সে ভাষায় আমার অধিকার, এ ভাষার বুকের কাছে মগ্ন আছে আমার অঙ্গীকার"

- আমাদের এই অঙ্গীকার পূরণে আবারও ঋণী হলাম পিতার কাছে, মৃত্যুর শক্তি নেই যেখানে বাধা দেয়ার, কেননা আমারাতো জানি, পিতা-মৃত্যু তোমার চিরপদানত।

লেখক: সুমন জাহিদ, সাবেক ছাত্রনেতা ও সংস্কৃতি কর্মী

সারাবাংলা/আইই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন