বিজ্ঞাপন

নামফলকে বাংলার ব্যবহারে উপেক্ষিত আদালতের আদেশ

February 21, 2020 | 10:44 pm

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বাঙালি জাতিসত্তা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের উন্মেষ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। পৃথিবীতে একমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে মাতৃভাষার জন্য সংগ্রামের গৌরবও একমাত্র বাংলাদেশের বাঙালিদের। মাতৃভাষার জন্য বাঙালির আন্দোলন ও আত্মত্যাগ আজ বিশ্ব স্বীকৃত। ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের পথ ধরেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। মাতৃভাষা রক্ষার জন্য বাংলার সূর্য সন্তানদের আত্মত্যাগ কালক্রমে বাংলাদেশের সীমা অতিক্রম করে বিশ্বের সব ভাষাভাষীর জন্য পরিণত হয়েছে মাতৃভাষা রক্ষার অনুপ্রেরণায়। দিবসটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ইউনেসকোর ঘোষণা দেওয়া ছিল সেই আত্মত্যাগের অসামান্য স্বীকৃতি।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু শহিদদের আত্মত্যাগের ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশে এখনও নিশ্চিত করা যায়নি সর্বত্র বাংলার ব্যবহার। ২০২১ সালেই বাংলাদেশ পালন করতে যাচ্ছে স্বাধীনতা লাভের সুবর্ণ জয়ন্তী। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও এখনও বাংলাদেশের অফিস-আদালতের কার্যক্রম থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামফলকেও নিশ্চিত করা যায়নি বাংলার ব্যবহার। ফেব্রুয়ারি মাস এলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামফলকে ইংরেজির পরিবর্তে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিতকরণে কিছু অভিযান দৃশ্যমান হলেও এখনও এ বিষয়ে রয়েছে কর্তৃপক্ষের উদাসিনতা।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় পাশাপাশি দুইটি শপিং মল নর্থ টাওয়ার ও মাসকট প্লাজা। দীর্ঘসময় ধরে এই দুইটি ভবনের নাম ইংরেজিতেই। শপিং মলে থাকা বিভিন্ন দোকানে কথা বলে জানা যায় তারা আসলে এতে ভুলের কিছু দেখেন না। একই অবস্থা এলাকার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামফলকেও। বিশেষ করে বিভিন্ন রেঁস্তোরার নামকরণ এখনও ইংরেজিতে। প্রতিষ্ঠানের নামফলকে ইংরেজি ব্যবহারের চিত্র রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে প্রায় একই রকম।

বিজ্ঞাপন

দেশের সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করতে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দেওয়া এক আদেশে বলা হয়, ‘সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বর প্লেট, সব দফতরের নামফলক এবং ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।’ তবে দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান এ নির্দেশের বাইরে থাকবে বলেও জানানো হয় আদেশে। ১৬৯৬/২০১৪ নম্বর রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন হাইকোর্ট। ওই বছরের ২৯ এপ্রিল হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে আদেশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের নেতৃত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলো এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজ করবে।

এদিকে সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এছাড়া বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭-এর ৩ ধারায়ও সরকারি অফিস, আদালত, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্য কাজে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সংবিধানের ধারা ও ভাষা প্রচলন আইন অনুযায়ী সর্বত্র বাংলার ব্যবহারে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

বিভিন্ন দোকানপাট, স্কুল-কলেজ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দিয়ে থাকে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা। ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার সময় দোকান বা প্রতিষ্ঠানের নামে সাইনবোর্ড বা নামফলক স্থাপনের জন্য একটি শর্ত দেওয়া হয়। অনুমতি নেওয়ার সময়ই নামফলকে বাংলা ব্যবহারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। অতিরিক্ত একটি সিল দিয়ে ট্রেড লাইসেন্সে লেখা থাকে, ‘সাইনবোর্ড/ব্যানার বাংলায় লিখতে হবে।’ তবে বাস্তবে এসব আদেশ কতটুকু বাস্তবায়ন হয় তা ঘর থেকে বের হলেই দেখা যায়। এখনও রাজধানীর অধিকাংশ দোকান, শপিং মল, অফিস-আদালতের সাইনবোর্ড, রেঁস্তোরাসহ নানা প্রতিষ্ঠানের নামফলক, ব্যানার-ফেস্টুন এখনও ইংরেজিতে লেখা হচ্ছে।

আদালতের রায় বাস্তবায়নের জন্য রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানেই ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করে। এর আগে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিতে ঘোষণা দিয়েই মাঠে নামে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ওই সময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ বিষয়ে অভিযানের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু ওই অভিযান কার্যত জরিমানাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। বাস্তবতা হলো, এখনও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ আইনটির বিষয়ে অবগত নন।

কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানান যায়, ট্রেড লাইসেন্সে বাংলা লেখা বাধ্যতামূলক হলেও সাইনবোর্ডটি কোন ভাষায় লেখা হবে সে বিষয়ে কোনো দিক নির্দেশনা থাকে না। ২০১৯ সালে কিছু অভিযান দৃশ্যমান হলেও ২০২০ সালে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে ভিন্ন কথা। প্রতিদিন অভিযান চালানো হচ্ছে দাবি করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ভারপ্রাপ্ত মেয়র জামাল মোস্তফা সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছে। আমরা শিগগিরই সব নামফলক বাংলায় রূপান্তরের চেষ্টা করব। আদালতের রায়ের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’ উত্তরায় দুটি শপিং মলে দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজিতে নাম থাকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নেব।’

এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায় সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রতিনিয়ত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি সুচারুরূপে তদারকির জন্য যে পরিমাণ জনবল প্রয়োজন সেখানে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আমাদের আন্তরিকতার অভাব নেই।’

এদিকে আদালতসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন কার্যকর চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইউনুস আলী আকন্দ সারাবাংলাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনেও এ রায় বাস্তবায়ন না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। যে ভাষার জন্য এই দেশের সন্তানেরা শহীদ হয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন, যে আন্দোলন স্বাধীনতার বীজ বপন করেছে সেই ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতেই রায়টি বাস্তবায়ন করা উচিত।’

রায়টি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা না হলে বিবাদীদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করবেন বলেও জানান তিনি।

সারাবাংলা/এসবি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন