বিজ্ঞাপন

বিশ্বের সেরা ১০ বইয়ের শহর (২য় পর্ব)

February 27, 2020 | 11:05 am

আমাদের এই প্রিয় শহরে অগুণতি বইয়ের দোকান। কয়েকবছর আগেও বড়সড় বইয়ের বাজার বলতে নীলক্ষেত বা বাংলাবাজারের কথা মনে আসত সবার আগে। কিন্তু বিশাল বইয়ের দোকান যেখানে চাইলেই ইচ্ছামত বই খুঁজে পাওয়া যায়, পছন্দমতো জায়গা খুঁজে নিয়ে বই পড়তে পড়তে উপভোগ করা যায় গরম কফি, এরকম বইয়ের দোকানের অভাব নেই। কিন্তু তারপরেও জনসংখ্যার ভারে নুয়ে পড়া এই নগরকে বইয়ের নগর বলা যায় কী! আমাদের এই নগরকে বইয়ের নগরী বলা না গেলেও বিশ্বে এমন কতগুলো শহর আছে; যাদের অনায়াসে বইয়ের শহর বলা যায়। আসুন অমর একুশে বইমেলার মাসে আমরা বিশ্বের সেরা ১০টি বুকসিটি বা বইয়ের শহর সম্পর্কে জেনে নিই। দ্বিতীয় পর্বে রইল— অন্য পাঁচ সেরা বইয়ের শহরের কথা।

বিজ্ঞাপন

কাগজে লেখা শব্দবন্ধ নিয়ে উদযাপনের জন্য পরিচিত সংগঠন হে-অন-ওয়াই বুক টাউন বা বইয়ের শহরের সূচনা করে। আসুন জেনে নেই কোন কোন শহরকে বলা হচ্ছে বুকসিটি বা বইয়ের নগর। দ্য গার্ডিয়ান অনুযায়ী লিখেছেন রাজনীন ফারজানা

বিশ্বের সেরা ১০ বইয়ের শহর (১ম পর্ব)

বিজ্ঞাপন

৬. মনতেরিজিও, ইতালি

ইতালির তাসকানির মনতেরিজিওর বই বিক্রির হাজার বছরের ইতিহাস রয়েছে। জ্যাকোপো দ্য ফিভিজ্জ্যানো ১৪৭১ সালে প্রথম ছাপাখানা বানান এখানে। আর ১৮৯০ সালে প্রথম বইয়ের দোকান চালু হয় মনতেরিজিওতে। এরপর পরবর্তী একশ বছরে স্থানীয় অধিবাসীদের অনেকেই বই বিক্রি শুরু করেন।

ক্ষেত্রবিশেষে পরিবারের সবাই বড় বড় ঝুড়িতে করে মেলা ও বাজরাগুলোতে বই বিক্রি শুরু করে। মাত্র পঞ্চাশজন বাসিন্দার এই শহরে প্রতিবছর আগস্টে একটি বইমেলা আয়োজন করা হয়। এই মেলায় একটা সম্মানিত বুক অ্যাওয়ার্ডও দেওয়া হয়।

৭. ওবিদস, পর্তুগাল

পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত দেয়ালঘেরা এই ঐতিহাসিক শহরটিতে এখনো মধ্যযুগীয় আবহ বিদ্যমান। অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে সে যুগের খোয়ায় মোড়ানো রাস্তা আর ঐতিহ্যবাহী ঘরবাড়ি। শহরটি পর্তগালের রাজধানী লিসবন থেকে এক ঘণ্টার পথ। শহরটি আগে বাৎসরিক চকলেট উৎসবের জন্য পরিচিত ছিল। এখানেই চেরি থেকে জিনজিনহা নামক এক ধরনের পানীয়ের জন্যও বিখ্যাত এই শহর। হোসে পিনহো নামের এক বইয়ের দোকানের মালিক প্রথমবারের মতো এই শহরকে একটি বুকসিটি বা বইয়ের শহরে রূপান্তরর চিন্তা করেন।

ওবিদস বুক সিটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এখানে নতুন কোনো বইয়ের শহর গড়ে ওঠেনি। বরং অন্যান্য দোকানে বই বিক্রি শুরু করেছে। যেমন স্থানীয় আর্ট গ্যালারিতে আর্টের বই, অর্গানিক মার্কেটে স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে তৈরি খাবারের রেসিপি, জাদুঘরে ইতিহাসের বই, ইন্টেরিয়র শপে ডিজাইন ও ঐতিহ্যবাহী টাইলসের ওপর বই ইত্যাদি পাওয়া যায়।

বইয়ের শহর

এখানে অবস্থিত লিটারেরি ম্যান হোটেলে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি পর্তুগিজ ও ইংরেজি বই রয়েছে। ওবিদস প্রাসাদের পাশে অবস্থিত ১৩ শতাব্দীতে তৈরি চার্চেও চমৎকার কিছু বইয়ের দোকান রয়েছে। এখানে ফোলিও নামের আন্তর্জাতিক উৎসব অনুষ্ঠিত হয় যেখানে দেশ বিদেশ থেকে নামি-দামি লেখকরা অংশগ্রহণ করেন। উৎসব চলাকালীন খালি বাড়িগুলোতে লেখক, শিল্পি ও অন্যান্য সৃষ্টিশীল মানুষদের জন্য নিভৃতে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়।

৮. পাজু, দক্ষিণ কোরিয়া

উত্তর কোরিয়ার সীমান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থিত এই শহরে অসংখ্য বইয়ের দোকান, বুক ক্যাফে ও প্রাকশনা সংস্থা রয়েছে। এখানের প্রতিটি বাড়িতেই বই প্রকাশনা, বিক্রি ও কোরিয়ান বইয়ের প্রচারণার কিছু না কিছু কাজ চলে। আড়াইশরও বেশি প্রকাশক রয়েছে এখানে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করছে এই শহর।

১৯৮৯ সাল থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার নামকরা সব আর্কিটেক্ট এবং ডিজাইনাররা এই শহরকে ব্যতিক্রমীভাবে গড়ে তোলার কাজ করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় শহরের কেন্দ্রে কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী হ্যানক হাউজ গড়ে তোলা হয়েছে। পথের দুপাশে গাছের সারি, গাড়ির ভিড়বিহীন রাস্তা, রাস্তার দুপাশে কাঠের বেঞ্চ, বাচ্চাদের বইয়ের দোকান অ্যালিস হাউজের চারপাশে ঘোরানো ছোট আকারের রেলপথ- সব মিলিয়ে পাজু নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।

বইয়ের শহর

তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত এই শহর- পাবলিশিং ডিস্ট্রিক্ট, প্রিন্টিং ডিস্ট্রিক্ট ও সাপোর্ট ডিস্ট্রিক্ট। এখানে আয়োজিত দেড় সপ্তাহের বাৎসরিক উৎসব ‘বুকসরি বুক ফেস্টিভ্যাল’এ প্রায় ৫ লাখ মানুষ অংশ নেন। আঞ্চলিক শিল্প ও সাহিত্যকে উৎসাহ দিতে এই উৎসব থেকেই প্রতিবছর এশিয়ান সাহিত্যিক, সম্পাদক ও ডিজাইনারদের পাজু বুক অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়।

৯. টোরাপ, ডেনমার্ক

ঠিক তথাকথিত বইয়ের শহর নয় এটি। শহরের পুরনো অংশে তিনশ’র মত বাসিন্দা যারা খ্রিস্টপূর্ব এগার শতাব্দি থেকে এখানে পুরুষানুক্রমিকে বাস করছেন। অন্যদিকে ১৯৯০ সালে শহরের অন্য অংশটিকে ইকো-ফ্রেন্ডলি বা পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে যার নাম Økosamfundet Dyssekilde।

পরিবেশবান্ধব এই বুক টাউনকে ভেজিটারিয়ান, আধ্যাত্মিক ও মানবিক গ্রাম হিসেবে গড়া হয়েছে। আধা-স্বশাসিত ছয়টি গোষ্ঠি এই শহরের ছয়টি অংশ পরিচালনা করে। তারা নিজেরাই নিজেদের অর্থ ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা সামলায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও টোরাপের অধিবাসী পিটার প্ল্যান্ট এই বুক শহরটির চেয়রাম্যান। ২০০৬ সালে একটি রেডিও প্রোগ্রামে নরওয়ের একটি বুক টাউনের কথা জেনেছিলেন। সেটা শুনেই তিনি টোরাপকে বুক সিটি হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। সেসময় দুই হাজার লোকের অংশগ্রহণে একটি ছোটখাটো উৎসব আয়োজন করেন। পরে ২০০৭ সালে রাস্তার পাশ দিয়ে পাঁচটি বুক ওয়াগন দিয়ে শুরু করে একবছরের মধ্যে এই শহরে উঠতি লেখকদের জন্য ওয়ার্কশপ আয়োজন করা হয়। শহরজুড়ে এখন ডজন ডজন বুক কার্ট ও বুক ক্যাফে রয়েছে।

বইয়ের শহর

২০১০ সালে বুক টাউনের আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে এবিং ১৯১৬ সালে স্থাপিত রেলওয়ে স্টেশনকে পুননির্মাণ করে সেটিকে তাদের প্রধান কার্যালয় বানায়। এখানে বর্তমানে নীচের তলায় একটি বইয়ের দোকান, স্থানীয় খাবারের দোকান ও সাইকেল ভাড়া দেওয়ার কেন্দ্র আছে।

ভ্রমণকারীরা এখানে গ্যারেজ থেকে শুরু করে শ্রমিকের কুঁড়ে, অব্যবহৃত আস্তাবল, খামারের প্রবেশপথ, চার্চের সম্মুখভাগ ও সুপারমার্কেটের প্রবেশপথে সবজায়গায়ই ছোট ছোট বইয়ের দোকান খুঁজে পাবেন। বইগুলো দুধের ক্রেট ও পাউরুটির বাক্সে সাজিয়া রাখা হয়েছে। এখানে কোন কোন দোকানে বিক্রেতা পাবেন না। ক্রেতাকে নিজ দায়িত্বে বই নিয়ে দাম রেখে যেতে হবে।
প্রতিবছর এখানে নরডিক উৎসব অনুষ্ঠিত হয় যেখানে প্রতিষ্ঠিত লেখকদের বই নিয়ে আলোচনা হয়। থাকে সরাসরি গানের অনুষ্ঠান।

১০. ব্রেডেফোর্ট, নেদারল্যান্ডস

জার্মানির সীমান্তে নেদারল্যান্ডসের অলটেন অঞ্চলে অবস্থিত ব্রেডেফোর্ট ২০০৩ সালে একটি বুক টাউন বা বইয়ের শহর হিসেবে গড়ে ওঠে। এখানে প্রায় ৩০ টি বইয়ের দোকান ও বই-সংক্রান্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। বুক টাউন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একটি ব্রেডেফোর্ট বুক টাউন।

ব্রেডেফোর্টের মধ্যযুগীয় কেন্দ্রকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও শিক্ষক হেংক রুসিংক প্রথমবারের মতো এই বুক সিটি প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। হে-অন-উয়াই ফেস্টিভ্যালে ভ্রমণের মাধ্যমে তিনি এমন কিছু করতে উদ্বুদ্ধ হন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাহায্যে তিনি জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের শতাধিক বই বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন ও বই বিক্রির জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন বেছে নেন।

বইয়ের শহর

এই শহরের মজার ব্যাপার হলো এখানকার বইয়ের দোকানগুলোতে বিশেষায়িত বই বিক্রি হয়। যেমন, ইংরেজি বইয়ের মধ্যে পাওয়া যায় ইতিহাস, সাহিত্য ও সচিত্র বই, গ্রিক ও ল্যাটিন বই, কার ও ট্রাক্টর নিয়ে পুরনো সব বই, গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং জীববিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ক বইয়ের আলাদা আলাদা দোকান।

এখানেও বেশ কতগুলো সততার বইয়ের দোকান রয়েছে যেখান থেকে পাঠকরা দাম রেখে নিজেরাই বই নিয়ে যাবেন। এখানে নেদারল্যান্ডসের সবচেয়ে ছোট থিয়েটার রয়েছে যেখানে মাত্র ১৪ জন দর্শক একসঙ্গে বসে শো উপভোগ করতে পারে। এই থিয়েটারে গল্পকথক, কবি ও সংগীতজ্ঞদের পরিবেশনা চলে।

এছাড়া এই শহরে পাবেন বইয়ের নানা রকম সার্ভিস যেমন বই পুনরুদ্ধার, বাঁধাই ও হাঁতে তৈরি সুদৃশ্য কাগজ প্রস্তুত করার কাজও হয় প্রতিমাসের তৃতীয় শনিবার। তাছাড়া প্রতিবছর মে ও আগস্ট মাসে এখানে ঐতিহ্যাবাহী বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় যেখানে জার্মানি, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস থেকে বইবিক্রেতা ও ডিলাররা আসেন ও হ্রাসকৃত মূল্যে বই বিক্রি করেন।

কলেজ স্ট্রিট, কলকাতা

আঠারো শতকের শেষের দিকে কলকাতা হয়ে ওঠে প্রকাশনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় নিতান্ত ব্যবসায়িক স্বার্থে এই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে। কলেজ স্ত্রিটে এখনো বংশ পরম্পরায় ব্যবসায়ীরা রয়েছেন এবং বর্তমানে কলকাতায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলা আয়োজিত হয় যা ১৯৭৬ সাল থেকে চালু হয়েছে।

কলেজ স্ট্রিট কিন্তু আসলে কোনো শহর না, এটি উত্তর কলকাতার অতি পুরাতন একটি সড়ক যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বইয় কেনাবেচার স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে বইপাড়া নামে পরিচিত এই জায়গাটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেকেন্ডহ্যান্ড বইয়ের বাজার। মহাত্মা গান্ধী রোড থেকে শুরু করে গণেশ চন্দ্র অ্যাভিন্যু পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা ধরে এটি বিস্তৃত। প্রথাগত বইয়ের দোকানের পাশাপাশি এখানে আছে বইয়ের ছোট ছোট স্ট্রিট শপ, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

এখানকার কিছু কিছু বইবিক্রেতারা পারিবারিকভাবে শতবছরেরও বেশি সময় ধরে বই বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এখানে নানারকম বই পাওয়া যায়। তবে বড় একটি অংশেই মেলে পাঠ্যবই। এছাড়া ফিকশন, নন-ফিকশন, প্যামফ্লেটসহ বাংলা ও ইংরেজিতে নানারকম পরিচিতিমূলক ছবির বই মেলে।

বইয়ের শহর

প্রচণ্ড ব্যস্ত এই রাস্তায় ভিড়ভাট্টা থাকলেও এখানে ঘোরার অন্যরকম আনন্দ আছে। এখানকার বেশ কিছু বইয়ের দোকান দারুণ নামকরা। যেমন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরপাশে অবস্থিত ন্যাশনাল বুকস্টোর, ১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজ স্ট্রিটের প্রথম বইয়ের দোকান দাসগুপ্তা অ্যান্ড কোম্পানি, পাঁচ দশক ধরে চালু থাকা বাণী লাইব্রেরি। তবে কলেজ স্ট্রিটের সবচেয়ে বিখ্যাত দোকান কিন্তু কোনো বইয়ের দোকান নয়, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরপাশে অবস্থিত ইন্ডিয়ান কফি হাউজ। এখানকার কফির চেয়েও যুগের পর যুগ ধরে এটি বিখ্যাত সব বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় ছাত্রদের মিলনস্থল হিসেবে বেশি বিখ্যাত।

সারাবাংলা/আরএফ/এমআই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন