বিজ্ঞাপন

হাজার পৃষ্ঠার রায়ে লাখ টাকার খরচ, বিপাকে বিচারপ্রার্থীরা

February 29, 2020 | 11:04 pm

আব্দুল জাব্বার খান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: পিলখানা হত্যা মামলার আপিলের খরচ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা। লাখ লাখ টাকা খরচ করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা অনেকের পক্ষে সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। এ অবস্থায় প্রধান বিচারপতির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন বিচারপ্রার্থীরা স্বজনেরা। অন্যদিকে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে জানা গেছে, সব চেয়ে কম খরচে রায়ের নকলের কপি দেওয়া যায় কিনা তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

বিজ্ঞাপন

দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পিলখানা হত্যা মামলা। হাইকোর্টের রায়ে যার পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৯ হাজার ৫৯। জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পযুক্ত এ রায়ের এক সেট ফটোকপি নিতে খরচ হবে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫৪ টাকা। এর সঙ্গে বিচারিক আদালতের ৩৬ হাজার পৃষ্ঠার ডেথ রেফারেন্স তো আছেই। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামির জন্য পৃথক আপিল করতে চাইলে শুধু মাত্র আবেদন প্রস্তুত করতেই খরচ পড়বে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা। যা অনেক আসামির পক্ষেই সম্ভব হবে না।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ল্যান্স নায়েক হাবিবুল্লাহ বাহারের মামা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘৫০ হাজার টাকা খরচ করে আপিল করার মতো আর্থিক ক্ষমতাও আমাদের নাই। লাখ লাখ টাকা তো পরের কথা। আমরা আইনজীবীকে বলেছি, ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা হলেও আমাদের জন্য কষ্ট হবে।’

বিজ্ঞাপন


আসামিপক্ষের আইনজীবী এসএম শাজাহান সারাবাংলাকে বলেন, ‘হাইকোর্টের রায় ২৯ হাজার পৃষ্ঠা। এ রায়ের সার্টিফাইট কপি তুলতে কম করে হলেও তিন থেকে চার লাখ টাকা লাগবে। এরপর আপিল ফাইল করতে যে বই বানাতে হবে তাতেও যে ডেথ রেফারেন্স, তার পৃষ্ঠা ছিলো ৩৬ হাজার। মোট করলে তাতে দাঁড়ায় ৬৫ হাজার পৃষ্ঠা। এতসব পৃষ্ঠা দিয়ে ১৪টির মত বই বানাতে হবে। সব মিলিয়ে খচর হবে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যা একজন দরিদ্র আসামির পক্ষে বহন করা অসম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘এটি প্রধান বিচারপতির নজরে যদি আনা হয়, আর প্রধান বিচারপতি যদি নির্দেশ দেন সার্টিফাইট কপি ফলিওর উপরে না দিয়ে, সাদা কাগজের উপরে শুধুমাত্র আদেশের অংশটুকু দিয়ে আপিলের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে সহজ হবে।’

এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘আসামিদের মধ্যে অধিকাংশই তখনকার বিডিআরের নায়েক, সৈনিক, সিপাহী পদে চাকরি করতেন তাদের পক্ষে এ ব্যয় বহন করা সম্ভব হবে না।’

আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম খরচের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ‘ফলিও কাগজে (রায়ের অনুলিপি দেওয়ার বিশেষ কাগজ) স্ট্যাম্পসহ যদি এর প্রত্যায়িত অনুলিপি দিতে হয়, তাহলে রায়ের পৃষ্ঠা বেড়ে দাঁড়াবে ৬০ হাজার পৃষ্ঠাতে। আর একটা ফলিও কাগজে তুলতে প্রতি পৃষ্ঠায় ১৪ টাকা করে লাগে। সে হিসাবে ৬০ হাজার পৃষ্ঠা তুলতে গেলে ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা লাগবে। এটা হলো একটা খরচ, আরেকটা খরচ হবে আপিল করতে গেলে। হাইকোর্ট বিভাগে যে পেপারবুকটা হয়েছে, সেখানে নিম্ন আদালতের রায়ের অনুলিপি ও সাক্ষিদের সাক্ষ্যের অনুলিপি রয়েছে। সেগুলোও সংযুক্ত করতে হবে। সবগুলো মিলিয়ে প্রতিটা আপিলের ১৪টা করে অনুলিপি (কপি) করতে হবে। যার খরচ অনেক বেশি।’

গরীব আসামিদের জন্য এই প্রক্রিয়া ‘অসম্ভব’ মন্তব্য করে এর বিকল্পও তুলে ধরেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘আসামিরদের জেল থেকে একটা আপিল করার বিধান রয়েছে, যেটাকে জেল আপিল বলে। সেক্ষেত্রে রায়ের অনুলিপি জেলখানায় যেতে হয়। আসামিরা জেলার বরাবর আপিলটা ফাইল করবেন এবং জেলার সেটা আদালতে পাঠাবেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়েও আসবে। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় সেগুলো বাঁধাই করে ভলিউম আকারে আদালতে উপস্থাপন করবে।’ কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় আসামিরা ‘জেল আপিল’ করার মতো সুযোগ পাবেন কিনা, তা নিয়ে আশংকাও প্রকাশ করেন তিনি।


আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বাস্তবতায় তারা (আসামিরা) এরকম সুযোগ-সুবিধা পাবেন কিনা! এতগুলো কাজ সরকার, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে করা হবে কিনা, তা আমরা জানি না। তবুও আমরা তাদের পরামর্শ দিয়ে রেখেছি যে, আসামিরা যেন জেল থেকে আপিলটা করেন।’ পাশাপাশি নিয়মিত আপিল ক্ষেত্রে খরচ কমাতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে একটি আবেদন করা হয়েছে বলে জানান আইনজীবী আমিনুল ইসলাম।

সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিশেষ কর্মকর্তা সাইফুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সব চেয়ে কম খরচে সহজ উপায়ে কিভাবে রায়ের নকল দেওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিধি মোতাবেক তার সব ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। ’ শিগগিরই বিষয়টি জানানো হবে বলেও তিনি জানান।

পিলখানায় অর্ধ শতাধিক সেনা কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ড মামলায় ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেন। এর দুই বছর পর গত ৮ জানুয়ারি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়। বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার রায় দিয়েছিলেন।

২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের মধ্যে ১১ হাজার ৪০৭ পৃষ্ঠার রায় লিখেছেন বিচারপতি মো. শওকত হোসেন। ১৬ হাজার ৫৫২ পৃষ্ঠার রায় লিখেছেন বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী। আর বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার লিখেছেন ১ হাজার ১০০ পৃষ্ঠার রায়।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারিতে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিডিআরে ‘বিদ্রোহ’ দেখা দেয়। সে সময় পিলখানায় বিদ্রোহী জওয়ানদের হাতে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। ৫৭টি বিদ্রোহের মামলার বিচার হয় বাহিনীর নিজস্ব আদালতে। সেখানে ছয় হাজার জওয়ানের কারাদণ্ড হয়।


রক্তাক্ত সেই বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর নাম বদলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হয়। বিদ্রোহের বিচারের পর পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের মামলার বিচার শুরু হয় সাধারণ আদালতে। ঢাকার জজ আদালত ২০১৩ সালে রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

এছাড়া ২৫৬ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেয়। এরপর হাইকোর্ট ২০১৭ সালে দেওয়া রায়ে ১৩৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন এবং তিন থেকে ১০ বছরের সাজা দেয় ২২৮ জনকে। সব মিলিয়ে হাই কোর্টের রায়ে অভিযোগ থেকে খালাস পায় মোট ২৮৮ আসামি। অভিযুক্ত ৮৪৬ জন আসামির মধ্যে বাকি ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।

সারাবাংলা/এজেডকে/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন