বিজ্ঞাপন

জন্মদিনে একটাই চাওয়া— নৃত্যশিল্পীদের অধিকার: ওয়ার্দা রিহাব

March 5, 2020 | 9:00 am

আশীষ সেনগুপ্ত

ওয়ার্দা রিহাব। বাংলাদেশের নৃত্যাঙ্গনের একজন প্রিয়মুখ। যিনি আন্তর্জাতিক মানের একজন মূলধারার নৃত্যশিল্পী, নৃত্যশিক্ষক ও কোরিওগ্রাফার। বিশেষ করে মণিপুরী নৃত্যে যিনি একজন অন্যতম নৃত্যশিল্পী।

বিজ্ঞাপন

ওয়ার্দা রিহাবের শুরুটা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের শিক্ষার্থী হিসেবে। সেখানে গুরু হিসেবে পেয়েছেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী বেলায়েত হোসেন খান, শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়, তামান্না রহমানকে। তাই হয়তো ওয়ার্দা বেশ গর্ব করেই বলেন, ‘এই ছায়ানটই আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে একজন নৃত্যশিল্পী হতে হয়।’

মণিপুরি নৃত্যের টানে স্কলারশিপ নিয়ে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মণিপুরি নৃত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন ওয়ার্দা। লাভ করেছেন নৃত্য বিভাগে রবীন্দ্রভারতীর স্বর্ণপদক। মণিপুরী নৃত্যের কিংবদন্তি গুরু কলাবতী দেবীর কাছ থেকে পেয়েছেন উচ্চতর শিক্ষা। তার কাছে নাচ শিখেছেন ছয় বছর। এছাড়াও থৈবা সিং ও ওঝা রণজীতের কাছে মনিপুরি মার্শাল আর্ট ‘থান টা’ শিখেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

আজ (৫ মার্চ) এই গুণী শিল্পীর জন্মদিন। বিশেষ এই দিনটি নিয়ে তার একান্ত অনুভূতি জানালেন সারাবাংলা’র স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট আশীষ সেনগুপ্ত’র সঙ্গে …

• জন্মদিন উদযাপন

একটা সময় জন্মদিনটা বেশ আড়ম্বরভাবে পালন করা হলেও এখন আর সেটা তেমন ভাবে হয় না। তবে এই দিনটাতে তিন-চার বার সেলিব্রেশান করতেই হয়। প্রথমে আমরা তিন জন— আমি, আমার ছেলে অরণ্য ও আমার স্বামী অরুপ; এরপর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে, আরেকবার বন্ধুদের সঙ্গে এবং সবশেষে আমার ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে। তবে এবার সেলিব্রেশানটা আরেকটু বেশি হবে মনে হচ্ছে। এর কারণ, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে নাচ নিয়ে বিশাল এক আয়োজন করা হয়েছে, যেটার সঙ্গে আমিও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। আর সেটার রিহার্সাল চলছে প্রতিদিনই। যতদূর জানি এই রিহার্সালেও আমার জন্মদিন উদযাপনের পরিকল্পনা তারা করেছে। সবকিছু মিলিয়ে দিনটা বেশ আনন্দেই কাটবেই মনে হচ্ছে।

• প্রত্যাশা

প্রতিবছর জন্মদিন এলে আমার যেটা মনে হয়— অনেক কাজ করার ছিল, কিন্তু সময়ের অভাবে করতে পারিনি। সারাবছরের যে কর্মপরিকল্পনা, সেখানে অনেকগুলো বিষয় থাকে। এর অধিকাংশই নাচ নিয়ে। তার মধ্য থেকে অনেকগুলোই হয়তো করা সম্ভব হয় না। তাই জন্মদিন এলে আমার মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করে যে আরেকটা বছর চলে যাচ্ছে, কিন্তু আমার অনেকগুলো কাজই তো করা হলো না। হিসাব করে দেখি, আমার পরিকল্পনার শতকরা ৬০ ভাগই কাজ করা হয়নি। তাই একটা আফসোস আমার থেকেই যায়। এদিকে নতুন বছরে নতুন পরিকল্পনা নেওয়ার পর যেটা হয়, আগের বছরের না করতে পারা কাজগুলোসহ আমার জন্য বেশ বড় একটা চাপ তৈরি হয়ে যায়। তারপরও চেষ্টা করি প্রতিবছর নতুন কোনো কাজ করতে। যেহেতু আমি একজন নৃত্যশিল্পী, তাই আমার কাজের সিংহভাগই নাচকে ঘিরে।

• নাচ নিয়ে পরিকল্পনা

আগেই বলেছি, আমার কাজের সিংহভাগ নাচকে ঘিরেই। তাই নাচের নতুন প্রোডাকশন নিয়ে অনেক বেশি ভাবি। পাশাপাশি নৃত্যগুরুদের নিয়ে কাজ করতে চাই। প্রতিবছরই আমার একটা পরিকল্পনা থাকে যে আমি একটি নৃত্যোৎসব করব। এর মধ্যে তিনটি জন্মদিন পার করে দিলাম, কিন্তু সেই উৎসব এখনো হয়ে উঠল না। তাই এবার বেশ জোরালোভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী বছর আমার স্কুল ‘ধৃতি নর্তনালয়’ থেকে এই নৃত্যোৎসব অবশ্যই করব। তবে এ বছর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আমার নিজস্ব স্টুডিওটা আমি করতে পেরেছি। বড় একটা স্বপ্ন পূরণ হলো। এটা আমার জন্য অনেক বেশি আনন্দের। এখন স্বপ্ন দেখছি এই মার্চ থেকে আগামী মার্চের মধ্যেই নৃত্যোৎসবটা করব।

• সম্প্রতি দেশের বাইরে ফেস্টিভ্যালে

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও ক্যানবেরাতে বেশ বড় দুইটা অনুষ্ঠান করেছি। সেটা ছিল মূলত মাল্টিকালচারাল ফেস্টিভ্যাল। প্রায় ৭৫টি দেশের শিল্পী এই ফেস্টভ্যালে অংশ নেয়। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধরনের দর্শক সেখানে উপস্থিত ছিল। আমরা ‘বঙ্গবন্ধু অ্যান্ড বাংলাদেশ’ নামে একটি পরিবেশনা উপস্থাপন করেছি। আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের জাতির পিতাকে সারাবিশ্বের মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে। আমাদের পরিবেশনায় বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন তুলে ধরেছি, পুরোটাই বাংলাতে। কিন্তু আমরা খুব অবাক হয়েছি যে আমাদের অনুষ্ঠান শেষে ব্যাকস্টেজে বিভিন্ন দেশের দর্শক আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলো এবং তারা পুরো পরিবেশনাটার ভিডিও চাচ্ছিল। ওদের এতটাই পছন্দ হয়েছে যে ওরা এটা সংগ্রহে রাখতে চায়। এই পরিবেশনাটা করতে গিয়ে আমরা খুব টেনশনে ছিলাম। কারণ বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপন করা এত সহজ নয়। একজন মানুষের মনে তাকে বোধগম্য করে তোলা বেশ কঠিন একটা বিষয় ছিল। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে দেখলাম দর্শকরা সহজেই গ্রহণ করতে পেরেছে। বিষয়টিতে আমরা খুব অবাক হয়েছি এবং এটা আমাদের কাছে বড় একটা পাওয়া।

• সাম্প্রতিক ব্যস্ততা

এতোটাই ব্যস্ততা যে একদম দম ফেলারও সময় পাচ্ছি না। আমি অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছি— ছায়ানট, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি আমার নিজের সংগঠন ‘ধৃতি নর্তনালয়’ তো আছেই। সবদিকই সামলাতে হচ্ছে। এদিকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে প্যারেড গ্রাউন্ডে বিশাল করে এক নৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সেখানে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য কোরিওগ্রাফার এবং ভারতের দু’জন কোরিওগ্রাফারের তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নৃত্যালেখ্য উপস্থাপন করা হবে। ১৩ জন কোরিওগ্রাফারের ১৩টি কাজকে সমন্বয় করে একটি বড় নৃত্যালেখ্য করা হচ্ছে। এটি একটি বিশাল আয়োজন। প্রায় সাতশ থেকে আটশ নৃত্যশিল্পী এটার সঙ্গে জড়িত। শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটাকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের জন্য আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। এ মুহূর্তে এটাই আমাদের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান।

• আমাদের নাচের সামগ্রিকতা

সার্বিকভাবে আমাদের নাচের অবস্থা এখন প্রতিনিয়তই উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে। গত এক বছরে আমি খেয়াল করে দেখলাম, আমাদের দেশের অনেকগুলো ছেলে-মেয়ে দারুণভাবে কাজ করছে। ওদের কাজ দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে তারা খুবই ব্রিলিয়ান্ট। আমি এটার প্রমাণ হিসেবে বলব, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে এই যে আয়োজন, শিল্পকলা থেকে হচ্ছে, সেখানে অনেক নবীন ও তরুণ নৃত্যশিল্পী আমাদের সঙ্গে এমনকি আমাদেরও সিনিয়রদের সঙ্গে সমান তালে তাল মিলিয়ে পারফর্ম করছে, অসাধারণ কিছু কোরিওগ্রাফি করছে। নাচ নিয়ে তাদের যে চিন্তা এবং প্রয়োগ ভাবনা— এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তাদের কাজের মান যথেষ্ট ভালো। যদি নাচের সার্বিক উন্নতি না হতো, তাহলে এই ছেলে-মেয়েগুলো কখনোই উঠে আসত না। তাই আমি মনে করি, আমাদের নাচের অঙ্গন অবশ্যই ঊর্ধ্বগামী।

• আক্ষেপ

এটা আমার ঠিক আক্ষেপ নয়, দুঃখবোধ। তা হচ্ছে— আমাদের নৃত্যাঙ্গনের মান ঊর্ধ্বগামী ঠিকই, কিন্তু সেটা শুধুমাত্র শুদ্ধ চর্চায়, মিডিয়াতে নয়। এখনো মিডিয়াতে মূলধারার নাচ পুরোপুরি অবহেলিত। দিনের পর দিন সেটা নিম্নগামী হচ্ছে। খুবই হতাশ হই যখন দেখি কোনো অনুষ্ঠানে মূলধারার নৃত্যে দেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার কোনো চেষ্টাই নেই। মাঝে মধ্যে মনে হয় এটা আমাদেরই ব্যর্থতা। আমরাই পারিনি মিডিয়ার কাছ থেকে সেটা আদায় করে নিতে, পরিস্থিতি বদলে দিতে।

• সবশেষে

এটাই বলব, নৃত্যশিল্পীরা তাদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে এখনো অনেকখানি পিছিয়ে আছে। নবীন-প্রবীণ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে চাওয়াগুলো বা প্রাপ্যটুকু আদায় করে নেওয়াটা জরুরি। কারণ এখনো নৃত্যশিল্পীরা সবদিক থেকে নানাভাবে বঞ্চিত। এখন পর্যন্ত যা কিছু হচ্ছে, সেটা কেবল নৃত্যশিল্পীদের মনের জোর এবং শিল্পের প্রতি ভালোবাসা থেকে। বহির্বিশ্বে নৃত্যশিল্পীদের অবস্থান অনেক উন্নত পর্যায়ে। কেবল আমরাই পিছিয়ে আছি। এই উদাসীনতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। যতটা দ্রুত সম্ভব সবারই এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। নৃত্যশিল্পীরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধিকারটা বুঝে পাবেএর বেশি আর কিছু চাওয়া নেই আমার।

গুণি এই নৃত্যশিল্পীকে সারাবাংলার পক্ষ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

সারাবাংলা/এএসজি/টিআর

বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন