array(4) {
  [0]=>
  string(74) "https://sarabangla.net/wp-content/uploads/2020/03/Dolonchapa-1-1-30x23.jpg"
  [1]=>
  int(30)
  [2]=>
  int(23)
  [3]=>
  bool(true)
}
array(4) {
  [0]=>
  string(74) "https://sarabangla.net/wp-content/uploads/2020/03/Dolonchapa-1-1-30x23.jpg"
  [1]=>
  int(30)
  [2]=>
  int(23)
  [3]=>
  bool(true)
}

বিজ্ঞাপন

অযাচিত স্পর্শের অভিজ্ঞতাগুলো মিলে যায়, স্বস্তি দেয় দোলনচাঁপা

মার্চ ৮, ২০২০ | ৩:৫০ অপরাহ্ণ

সিরাজুম মুনিরা, সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

ঢাকা: তখন ঘড়িতে সময় সকাল সোয়া ৭টা। আকাশে মেঘ, কেমন যেন ঘোলাটে সকাল। বেশিরভাগ মানুষেরই আয়েশ করে ঘুমাতে ইচ্ছা করে। কিন্তু যারা কর্মজীবী তাদের সামান্য আলসেমিটুকুও উপভোগের সুযোগ নেই। বিশেষ করে তিনি যদি হন কর্মজীবী নারী তাহলে তো আলসেমির ভাবনা মনে আনাও অন্যায়।

বিজ্ঞাপন

সারাদিনের সমস্ত কাজ গুছিয়ে, সন্তানের টিফিন, দুপুরের খাবার তৈরি করে, স্বামীসহ পরিবারের অন্যদের সব ভালোমন্দ দেখে তবেই বের হতে পারেন বাড়ি থেকে। ওদিকে অফিসেও পৌঁছতে হবে সময়মতো। তাই হাঁপাতে হাঁপাতে আসেন বাস ধরতে। সেখানেও কী ঝক্কি কম? সময়ের একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই বাসে আর উঠতে পারবেন না। চালকের সহকারী সাফ জানিয়ে দেবেন, মহিলা সিট নেই, মহিলা তোলা যাবে না। বাসের ভেতর থেকে যাত্রীরা হাঁক ছাড়বেন, ‘ওই, মহিলা তুলিস না।’

এমন নিষ্ঠুর সকালগুলোতে কর্মজীবী নারীদের কাছে আশার আলো হয়ে আসে মহিলা বাস সার্ভিস। যে বাসের চালক ছাড়া অন্যরা নারী। ফলে যত ভিড়ই হোক না কেন, একটু দাঁড়ানোর জায়গা হলেই খুশি তারা। অন্তত অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ তো পেতে হবে না।

বিজ্ঞাপন

রোববার (৮ মার্চ) নারী দিবসের সকালে এসব কথাই হচ্ছিলো রাজধানীর একটি মহিলা বাস সার্ভিসের যাত্রীদের সঙ্গে।

দুই একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে সবার কণ্ঠে একই সুর। সেই সাত সকালে উঠেছেন, বাচ্চা আর স্বামীর টিফিন তৈরি করে, কেউ কেউ বাচ্চাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে কোনোমতে বাসে উঠেছেন। বেশিরভাগই নিজে কিছু খাওয়ার সময় পাননি। কেউ হয়ত সঙ্গে নিয়েছেন, অফিসে গিয়ে খাবেন।

ফলে অফিসে গিয়ে যেমন তাকে অন্য সবার সমান কাজ করতে হচ্ছে, তেমনি বাড়িতেও করতে হচ্ছে বাড়তি কাজ। তাই একজন কর্মজীবী নারী যে ২৪ ঘণ্টায় কর্মজীবী পুরুষের চেয়ে বেশি কাজ করছেন তা জানতে কোনো জরিপের প্রয়োজন হয় না।

কথা হয় ব্যাংক কর্মকর্তা ইফফাত জাহানের সঙ্গে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, এই বাসে উঠে অন্তত এটুক শান্তি যে, কেউ গায়ে হাত দেবে না, খোঁচাবে না। তাই কষ্ট করে দাঁড়িয়ে যেতে হলেও এটাতেই নিরাপদ বোধ করেন তিনি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকসের শিক্ষার্থী তমা বললেন, সাধারণ বাসগুলোতে প্রচুর হয়রানীর শিকার হতে হয়। বাসে উঠতে দেবে কি না, কেউ শরীরে হাত দেবে কি না, হেলপার গায়ে হাত দিয়ে তুলবে কি না ইত্যাদি। এর চেয়ে মহিলা বাস সার্ভিস ভালো। এসব টেনশন করতে হয় না।

গোটা বিশ্ব জুড়ে যখন নারীর জন্য সমান অধিকারের কথা বলা হচ্ছে, তখন এই ঢাকা শহরের বুকে নিরাপদে চলাচলের জন্য নারীকে আলাদা বাস সার্ভিসের দারস্থ হতে হচ্ছে। অথচ আমরা বলছি, দেশ এগোচ্ছে, নারী এগোচ্ছে। এ কেমন এগিয়ে যাওয়া যেখানে নিরাপত্তার জন্য সেই বেগম রোকেয়ার যুগের মতো আলাদা পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হয়?

ঢাকায় বিআরটিসির কিছু মহিলা বাস সার্ভিস আছে। আর বেসরকারিভাবে এই সার্ভিস চালু করেছে র‌্যাংগস গ্রুপ। ঢাকার নারীদের রোজকার যুদ্ধে কিছুটা স্বস্তি দিতে ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করে এই সার্ভিস। দুটি রুটে চলে দোলনচাঁপা। একটি মিরপুর থেকে মতিঝিল, অন্যটি মিরপুর থেকে আজিমপুর।

নারী দিবসের সকালে আমি ছিলাম মিরপুর-মতিঝিল রুটের দোলনচাঁপার যাত্রী।

যেহেতু প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ছাড়ে বাসটি, তাই দেখা যায় যাত্রীদের মধ্যে চেনাপরিচয় হয়ে যায়। হয়তো বাস কাজীপাড়া পার হতেই একজন ফোন করলেন আরেকজনকে। বললেন, ‘আপা, আপনি কই? বাস কিন্তু কাজীপাড়া ছাড়িয়েছে।’

কিংবা বাস চালকের সহকারীই দূর থেকে দেখে অপেক্ষা করছেন নিয়মিত যাত্রীর জন্য। বয়স্ক কেউ উঠলে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী কেউ ছেড়ে দিচ্ছেন সিট। এভাবে ভাবে-ভালোবাসায় পথ চলে দোলনচাঁপা।

সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া মা, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী সব ধরনের মানুষ ওঠেন এতে। কে কত বড় চাকরি করেন সেইটা মুখ্য নয়, কেবল নারী পরিচয়েই এখানে সবাই সবার কাছের হয়ে যান।

কারণ, পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়া অন্য বাসগুলোতে প্রায় সবারই একই ধরনের অভিজ্ঞতা আছে।

ফার্মগেটের একটি কলেজে পড়েন মিতু। জানালেন, নিজের নিরাপত্তার জন্য সঙ্গে সেফটিপিন রাখেন। কেবল এই বাসে সেই সেফটিপিন ব্যবহার করতে হয় না। সেজন্যই বাসটি ভালো লাগে। চেষ্টা করেন এর সঙ্গে সময় মিলিয়ে যাতায়াত করতে।

এমন পরিস্থিতির উন্নতি কিভাবে সম্ভব, জানতে চাইলে একটি বেসরকারি এফএম রেডিওর প্রযোজক ফারহানা আহমেদ বলেন, এর কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন না হলে কিছুতেই কিছু হবে না। নারীকেও মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। তাকে অকারণ ছুঁয়ে দেওয়া, নিপীড়ন করা বন্ধ করতে হবে। তাহলে একদিন আর বিশেষ বাস বা সংরক্ষিত সিটেরও প্রয়োজন হবে না।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন সালমা শফিক। বললেন, এই বাস ধরার জন্য আগে আগে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন বাসস্ট্যান্ডে। অন্তত মহিলা সিট নেই বলে বাসটি সামনে দিয়ে দাম্ভিকের মতো চলে যায় না। এটাই তার স্বস্তি।

কথা বলতে বলতে বাস তখন কারওয়ান বাজার। কিছু যাত্রী নেমে গেলেন, উঠলেন আরও কয়েকজন। সবারই বক্তব্য, যেহেতু সরকার বাসে হয়রানি বন্ধ করতে পারছে না সেহেতু আরও বেশি কেরে নারীদের জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থা করুক। তাহলে রোজ সকালে পুরুষ সহযাত্রীদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে না।

একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলছিলেন তার গর্ভকালীন সময়ের বাস যাত্রার ভোগান্তির কথা। অজান্তে নিজের মন আর্দ্র হয়ে উঠলো। একই অভিজ্ঞতা কী আমার নেই? শুধু আমার কেন, এর ভেতর দিয়ে যান প্রতিটি মধ্যবিত্ত কর্মজীবী নারী। তাই দেখা গেল প্রায় সবারই আছে কাছাকাছি অভিজ্ঞতা।

পরিস্থিতির উন্নতি হবে এমন আশার কথা শোনাই আমি। কিন্তু তাতে সায় দেন না কেউ। প্রত্যেকের কণ্ঠে ঝরে পড়ে হতাশা। বলেন, কোনো আশা দেখতে পান না তারা। তাই নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেরাই করেন। কেউ সঙ্গে রাখেন সেফটিপিন, কেউ ছুরি আর কেউবা খুঁজে নেন মহিলা বাস সার্ভিস।

এখন ২০২০ সাল, যখন নারীরা প্রতিটি কাজ করছেন অকুতোভয়ে, তখন আমাদের দেশে সেই নারীদের জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। কারণ বেশিরভাগ গণপরিবহনে তারা অনিরাপদ বোধ করছেন। এই যে পরিস্থিতির বৈপরীত্য, সে সম্পর্কে জানতে চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীনের কাছে।

নৃবিজ্ঞানের এই শিক্ষক বলেন, বিভিন্ন উচ্চপদে নারীর সংখ্যা বেড়েছে এটা ঠিক, কিন্তু সেগুলো দিয়ে লিঙ্গ সমতা মাপা সম্ভব না। কারণ এখনো দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট স্পেস নারীর জন্য অনিরাপদ। সে কারণে সংসদে হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে হোক আর যাতায়াত ব্যবস্থায় সেখানে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন এখনো রয়েছে। বেশিরভাগ প্রতিযোগিতাতেই কিন্তু নারী-পুরুষ একই জায়গা থেকে দৌড়ানো শুরু করতে পারছে না। আমি বলছি না নারী পিছিয়ে পড়ছে, নারী নানা কারণে অসমতার শিকার হচ্ছে, বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এর পাশাপাশি নারী অনিরাপদ, সে কারণেই নারীরা বারবার আলাদা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চাচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ৬৭ শতাংশ নারী পাবলিক ট্রান্সপোর্টে কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

পাবলিক বাসগুলোতে কিছু নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন থাকে উল্লেখ করে জোবাইদা নাসরীন বলেন, আমাদের দেশে রিজার্ভেশনের অনুবাদ করা হয় এভাবে যে, নারীরা ওই সিটগুলো ছাড়া আর কোনো সিটে বসতে পারবেন না। কিন্তু বিষয়টা তো তা না। বাকি সিটগুলো সবার, আর নির্দিষ্ট কয়টি কেবল নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সংরক্ষিত থাকে।

এসব সমস্যার কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই নারীরা আলাদা পরিবহণ চাইছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জোবায়দা নাসরীন বলেন, বাঙ্গালী নারীর মধ্যে কিন্তু ধর্ম, শ্রেণিভেদে পার্থক্য আছে। একেক শ্রেণির নারীর নিরাপত্তাহীনতা একেক রকম। যেমন একজন দলিত নারী, তিনি দুইভাবে প্রান্তিক, এক ধর্মীয়ভাবে আরেক নারী হিসেবে। আবার একজন আদিবাসী নারী, তিনি জাতীয়তার দিক থেকে, ধর্মের দিক থেকে তো প্রান্তিক, আবার নারী হিসেবেও প্রান্তিক। ফলে তার নিরাপত্তাহীনতার ইস্যুটি একদম ভিন্ন। তাদের আর ১০জন শহুরে নারীর সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা যাবে না।

‘আবার নারীর অনিরাপত্তাকে নারীর ইস্যুকে দেখা হয়। আমরা পুরুষ আর পুরুষতান্ত্রিকতাকে এক চোখে দেখি। পুরুষ মানেই পুরুষতান্ত্রিক না, আবার নারীও পুরুষতান্ত্রিক হতে পারেন। আমরা একটা মেয়েকে গুড টাচ ব্যাড টাচ শেখাই, নারীকেই সচেতন হতে বলা হয়, জুডো কারাত শেখানো হয়।’

‘অথচ পুরুষ তান্ত্রিকতা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুরুষকে শেখানো হচ্ছে না যে গুড বিহেভিয়ার, ব্যাড বিয়েভিয়ার কোনটা, তাকে বলা হচ্ছে না যে তোকে পুরুষতান্ত্রিক আচরণ থেকে বের হতে হবে। এটা করা না গেলে এই সমাজে বা এই পৃথিবীতে পরিবর্তন আনা সম্ভব না’, যোগ করেন এই শিক্ষক।

আবার ফিরে যাই আবার দোলনচাঁপার যাত্রায়।

বেশ কয়েকজন যাত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তাদের নারী দিবস ভাবনা সম্পর্কে।

জবাব দিতে গিয়ে বেশ উত্তেজিতই হয়ে গেলেন কয়েকজন। বললেন, এতো বঞ্চণা, অসমতা আর নিপীড়নের ভিড়ে নারী দিবস নিয়ে আলাদা ভাববার সময় নেই তাদের। কয়জন পুরুষ সংসার সামলে কাজ করতে বের হন সেই প্রশ্নও তোলেন। বলেন, সকালবেলা যদি পুরুষরাও একটু কাজে হাত লাগান তাহলে নারীর সকালটা সহজ হয়ে যায়। এটুকুই যেখানে পাওয়া যায় না, সেখানে আর কিছু চাওয়া বাতুলতা মনে হয়।

কথায় কথায় বাস পৌঁছে যায় মতিঝিল। শেষ যাত্রী হিসেবে নামি আমি। পেছনে পড়ে থাকে সারি সারি খালি সিট।

একটুপরই দোলনচাঁপা আবার ভরপুর হয়ে ফিরবে। নানার স্বপ্নের, নানান বর্ণের, নানান রঙের নারীরা বসে কিংবা দাঁড়িয়ে যাবেন নিজ নিজ গন্তব্যে। তবে সবার এক জায়গাতেই মিল থাকবে। তারা সবাই নিরাপদে ঘরে ফিরতে চাইবেন। তারা চাইবেন না, অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো হাতের স্পর্শ তাদের গোটা দিন নষ্ট করে দিক। আর সে জায়গাটাই তৈরি করে দিয়েছে দোলনচাঁপা।

তাই দোলনচাঁপার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই যাত্রীদের। বাসের সংখ্যা, রুটের সংখ্যা আর ট্রিপের সংখ্যা বাড়াতে অনুরোধ করলেন তারা। তাদের এই অনুরোধ নিশ্চয়ই ভেবে দেখবেন কর্তৃপক্ষ। যেন আরও বেশি সংখ্যক নারী নিরাপতে পৌঁছতে পারে গন্তব্যে।

আপাতত, সেই আশাতেই রইলাম।

সারাবাংলা/এসএমএন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন