বিজ্ঞাপন

দলের নেতাই ‘বিভীষণ’

March 10, 2020 | 7:04 pm

পলাশ মাহবুব, উপসম্পাদক

অনেকেই বলছেন, রাহুল কোথায়?
কংগ্রেসের অন্দরে এতকিছু ঘটে যাচ্ছে, অথচ রাহুল গান্ধী কোথাও নেই। এমনকি অন্তত যে টুইটারে তিনি কিছুটা হলেও সক্রিয়, সেখানেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

ওদিকে দলের প্রভাবশালী সদস্য, যিনি কি না রাহুল ব্রিগেডের অন্যতম সদস্য হিসেবে পরিচিত, সেই জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। শুধু সিন্ধিয়া একা পদত্যাগ করলে না হয় কথা ছিল। সিন্ধিয়ার পথ অনুসরণ করেছেন তার অনুসারী অন্তত ২০ কংগ্রেস বিধায়ক (এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে)।

একযোগে ২০ বিধায়ক (যার মধ্যে অন্তত ছয় জন রাজ্যের মন্ত্রী) দল ছাড়ায় টালমাটাল মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সরকার। পরিস্থিতি যেদিকে এগুচ্ছে, তাতে মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেস তার সরকার টিকিয়ে রাখতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে কর্ণাটকের মতো একই নাটক মঞ্চস্থ হবে মধ্যপ্রদেশেও। তবে কর্ণাটকে কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল আঞ্চলিক দল জেডিএস-এর সঙ্গে জোট করে। এমনকি মুখ্যমন্ত্রীও ছিল জেডিএস-এর। অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশে বলতে গেলে এককভাবে ক্ষমতায় এসেছিল কংগ্রেস। সে হিসাবে মধ্যপ্রদেশের ক্ষমতা হারানো কংগ্রেসের জন্য বড়সড় ধাক্কাই হবে।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু মধ্যপ্রদেশ না, একই অবস্থা ঘটতে পারে কংগ্রেস শাসনাধীন রাজ্য রাজস্থান, এমনকি ছত্তিশগড়েও। কারণ মধ্যপ্রদেশে যে সংকট ছিল, একই সংকট আছে রাজস্থানেও। মধ্যপ্রদেশে যেমন কমলনাথ-দ্বিগবিজয় সিং-জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া— এই তিন বড় নেতার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছিল, তেমনি রাজস্থানে আছে মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলত আর উপমুখ্যমন্ত্রী শচীন পাইলটের দ্বন্দ্ব। একই অবস্থা ছত্তিশগড়েও। ফলে সমস্যা যতটা না বাইরের, তার চেয়ে অনেক বেশি কংগ্রেসের নিজের ঘরের। আর সে সুযোগটাই নেওয়ার চেষ্টা করছে বিজেপি।

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি’র নানারকম তৎপরতার (কংগ্রেসের ভাষায় অপতৎপরতা) পাশাপাশি কংগ্রেস সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জের মুখে তা হচ্ছে, দলটির মধ্যে প্রবীণ আর নবীনের প্রবল দ্বন্দ্ব। রাহুল গান্ধীকে আকড়ে ধরে দলের নবীন অংশ প্রভাবশালী হওয়ার চেষ্টা করেছিল একসময়। কিন্তু  সর্বশেষ লোকসভা ভোটে দলের ভরাডুবির দায় মাথায় নিয়ে রাহুল গান্ধী দলের সভাপতির পথ থেকে সরে দাঁড়ান। সেসময় তিনি প্রবীণ নেতাদের কঠোর সমালোচনা করেন বলেন, দলের প্রবীণ নেতারা নিজেদের পদ-পদবি নিয়ে যতটা ভাবেন, দল নিয়ে ততটা ভাবেন না।

রাহুল গান্ধী সভাপতির পদ ছাড়ার পর দলের নবীন অংশ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। গেল কয়েক মাসে রাহুল ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় তরুণ নেতা কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া তাতে সর্বশেষ নাম এবং সবচেয়ে ভারি নাম। কিন্তু এত বড় ঘটনা ঘটে যাওয়র পরও দলের হাইকমান্ড তথা রাহুল-সোনিয়ার পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই! রাহুল ঘনিষ্ঠ একটি অংশ মনে করে, নিজের মতো করে দল চালাতে পারছেন না বলে রাহুল গান্ধী যারপরনাই বিরক্ত। পারলে তিনি নিজেই কংগ্রেস ছেড়ে দেন। কিন্তু সে তো আর সম্ভব না।

অন্যদিকে রাহুল গান্ধীকে ঠিক আপন করে নিতে পারছেন না কংগ্রেসের প্রবীণ অংশ। দলের প্রভাবশালী এই অংশটি বরাবরই রাহুল গান্ধীর কাছ থেকে দূরে অবস্থান করে আসছে। তারা সোনিয়া গান্ধীর ওপর আস্থাশীল অথবা তাকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। অন্যদিকে সোনিয়া গান্ধী চান রাহুল গান্ধীই আবার দলের সভাপতি পদে ফিরে আসুক। কিন্তু তিনিও প্রবীণ বলয়ের বাইরে যেতে পারছেন না। আর এসব কারণেই কোনো বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না দলটি।

জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া হুট করে দল ছাড়লেন— বিষয়টা তেমন না। অনেক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল এমন গুঞ্জন। কারণ মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু সিন্ধিয়ার বদলে কমলনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করে কংগ্রেস হাইকমান্ড। মুখ্যমন্ত্রিত্ব না পেয়ে সিন্ধিয়া আশা করেছিলেন, অন্তত মধ্যপ্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব পাবেন তিনি। সেটিও হয়নি। যে কংগ্রেসে এক নেতার এক পদ চালু, সেখানেই কমলনাথ একইসঙ্গে মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এবং মধ্যপ্রদেশ প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতির পদ আঁকড়ে ছিলেন। এভাবে প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে যায়, কিন্তু কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব কোনো সুরাহা করতে পারেনি। একসময় আশা হারিয়ে ফেলেন সিন্ধিয়া। যার ফল এই পদত্যাগ। আর সিন্ধিয়ার পদত্যাগের ফলে মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেস সরকারের পতন।

কংগ্রেসের বর্তমান অবস্থা অনেকটা ‘এ শিপ উইদআউট ক্যাপ্টেনে’র মতো। সোনিয়া গান্ধী দলটির অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। যদিও দায়িত্ব নেওয়ার সময়ই তিনি শর্ত দিয়েছেন, বেশি দিন থাকবেন না। অন্যদিকে রাহুল গান্ধী সভাপতির পদ ছাড়লেও অভিমান ছাড়েননি। তিনি দলে ইচ্ছামাফিক সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় হন।

সব মিলিয়ে সাধারণ কংগ্রেস কর্মীরাও দিকভ্রান্ত। জোরালো নেতৃত্বের অভাবে বিজেপি’র করা নানা ভুলকে কাজে লাগাতে পারছে না দলটি। অথচ সঠিক নেতৃত্ব আর দলের নেতাদের মধ্যে ঐক্য থাকলে বিজেপিকে অনেকটাই কোণঠাসা করা সম্ভব হতো বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। তাদের মতে, ভারতজুড়ে বিজেপিবিরোধী ঢেউ আছে। কিন্তু ভেতরগত সংকটের কারণে কংগ্রেস সেই ঢেউকে জোয়ারে পরিণত করতে পারছে না।

পলাশ মাহবুব: কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার। উপসম্পাদক, সারাবাংলা 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন