বিজ্ঞাপন

আগুনে আহত নারীর সামাজিক অবস্থা

March 12, 2020 | 10:00 am

জান্নাতুল ফেরদৌস আইভী

কখনও কখনও কিছু কাকতালীয় ঘটনা আমাদের জীবনের অব্যক্ত অধ্যায় প্রকাশ্যে উচ্চারণের জন্য মনের শক্তি হয়ে একটা ভূমিকা পালন করে। সম্প্রতি এমন দুটো ঘটনা পরপর দুইদিন ঘটে গেল বলে আমার পুড়ে যাওয়া জীবনের অভিজ্ঞতার যে কথাগুলো এতদিন বলা হয়নি, সেগুলো ভাবার এবং বলার সাহস পেলাম। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আমি একটি জাতীয় পর্যায়ের কাজের একটা অংশের দায়িত্ব পালনের জন্য কিছুটা বেশি ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছি। এই কাজের অংশ হিসেবেে গতকাল আমি একটি উচ্চ র্পযায়ের আলোচনায় অংশ নিতে সচিবালয় এলাকায় যাচ্ছিলাম।

বিজ্ঞাপন

আমি রিকশায় চড়তে খুবই পছন্দ করি। যতটা দূরত্ব রিকশায় যাওয়া সম্ভব আমি তা রিকশা করইে যাই। সেদিনও রিকশা করে যাচ্ছিলাম। রিকশাটি শান্তিনগর এলাকায় ট্রাফিক সিগন্যালের জন্য অপক্ষো করছিল।  এমন সময় দু'জন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি আমার কাছে আসে। একজন ভিক্ষা চাইছিল আর অন্যজন আমাকে বলল, 'এই মুখপুড়ি, আমাদের কিছু দে।' বাংলা ভাষায় আসলে নারীদরেকে ভর্তসনা করার উদ্দেশ্যে অথবা অপমান করার জন্যে 'মুখপুড়ি' শব্দটা বলা হয়। গতকাল সেই মুর্হূতে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কোনও প্রতিক্রিয়া জানানোর ভাষাও আমার ছিল না তখন। সারাদিন আমার কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও গতকাল আমি খুব অনুপস্থিত মনে ছিলাম।

আর দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে এর পরদিন। সকালে একজন উচ্চ পর্যায়ের সাংস্কৃতিক ব্যক্তি আমার কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানার জন্যে ফোন করলেন। আলোচনার এক র্পযায়ে তিনি আমাকে বলছিলেন, 'আপনি আপনার পোড়া চেহারা মানুষকে দেখিয়ে তাদরে থেকে সহানুভূতি পাবার চষ্টো করেন'। এই আলাপ শেষ হবার পর অনকেটা সময় স্থবির হয়ে বসে ছিলাম।তারপর সম্বিত ফিরে পেয়ে আমার মন ভাবছিল, আজ প্রায় ২৩ বছর ধরে আমি নানাভাবে অপ্রীতিকর মন্তব্য শুনছি। তবে এমন অসহনীয় র্পযায়ের নিষ্ঠুর মন্তব্যদুটো আমাকে চুরমার করে দিয়েছে। চোখের পানিতে আমার সামনে সবকছিু ঝাপসা হয়ে গেলেও আমার মনের দৃষ্টি অনেক দূরের কিছু নিয়ে ভাবছিল। যেমন,  যে দুটো মন্তব্য আমি শুনলাম সেটা কি কেবল আমি শুনছি? আমি অনেক বছর ধরে ভাবছলিলাম। তবে আমার মত পুড়ে যাওয়া অন্যসব নারীরা প্রতদিনকার জীবনে কেমন অবস্থার মুখোমুখি হয় এটা জানা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

আমি প্রায় এক যুগ কয়কেটি মানবাধিকার সংস্থায় চাকরী করেছি। সেখানে আমি কর্মক্ষেত্রে সমান মর্যাদা পাইনি। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করওে কোনকিছুর প্রতিকার করতে পারবো না বুঝতে পেরে আমার নিজের সংস্থা ভয়েস এন্ড ভিউজ গড়ে তুলেছি। এই সংস্থা একদনি পুড়ে যাওয়া নারীদের অধিকারের কথা তুলে ধরবে এই সাধনায় আমরা কাজ শুরু করেছি। কিন্তু এই বিষয়টি একটি নতুন বিষয়। দাতা সংস্থাকে এর প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে হয় কোন উদাহরণ হাজরি করে। সেই উদাহরণ গড়তে প্রথমে এগিয়ে এসেছিল নাপোলের একটি মানবাধিকার সংস্থা, 'করুণা ফাউন্ডশেন, নাপোল'। পোড়ার প্রতিরোধের বিষয়ে সচতেনতা তৈরির জন্য এই সংস্থাটি সামান্য আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসে আমার সংস্থা ভয়সে অ্যান্ড ভিউজের দিকে।

মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে জানার আগ্রহ কম দেখে তখন আমরা বর্তমান সময়ে পুড়ে যাওয়া নারীদের জীবনের অবস্থা জানার চেষ্টা করি। আমরা দেখলাম দাতা সংস্থার ভেতরেও এই বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেই। কাজেই দুটো সংস্থা থেকে আমাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া হলে আমরা খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি সেসময়। সবশেষে বাংলাদেশেরই একটি জাতীয় র্পযায়ের সংস্থা হিউম্যান ডেভেলেপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এইচডিএফ) একটা ছোট মাত্রার অনুদান দিয়েছেে ভয়েজ এন্ড ভিউজকে যাতে আমরা আগুনে পুড়ে যাওয়ার দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বেঁচে থাকা নারীদের বর্তমান আর্থ-সামাজকি অবস্থা এবং তারা কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবনে মানসিক আঘাত সহ্য করছে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারি। এই গবষেণার তথ্য সংগ্রহ করার জন্য আরও দুটি মানবাধকিার সংস্থা “মুক্তি নারী ও শিশু উন্নয়ন সংস্থা” এবং “জাগরণ প্রতবন্ধী নারী উন্নয়ন সংস্থা”র সহযোগিতা করছে।

এই গবেষণা থেকে আমাদের জানার বিষয়গুলো ছিল মূলতঃ কত বছর বয়সে দুর্ঘটনা ঘটেছে, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বৈবাহিক অবস্থা, বিয়ের সময়ে পোড়ার কারণে কোনও বাড়তি ব্যয় কনের পরিবারকে বহন করতে হয়েছে কিনা। বিয়ের পরে পারিবারিক জীবনে কেমন জীবন কাটাচ্ছেন, প্রতিবেশিদের ব্যবহার কেমন, যানবাহনে চড়তে গেলে কেমন অভিজ্ঞতা হয়, তিনি কোন আয় বৃদ্ধমিূলক কাজ করনে কিনা, র্কমক্ষেত্রে সমান মজুরি এবং মর্যাদা পান কিনা, পরিবারে তার মতামতের গুরুত্ব দেওয়া হয় কিনা এবং উত্তরাধিকারসূত্রে কোন সম্পদ পেয়েছেন কিনা। আমাদের গবষেণায় আমরা মোট ১১৬ জন ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করেছি। এর মধ্যে ৫৫ জনের দুর্ঘটনা ঘটেছে ১০ বছর বয়সের আগেই, ২২ জনের দুর্ঘটনা ঘটেছিল ২০ বছর বয়সের আগে এবং বাকি ৩৯ জনের দুর্ঘটনা ঘটেছিল ২০ বছরের চেয়ে বেশি বয়সে।

এর থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে শিশুরাই আগুনে পোড়ার ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি রয়েছে। এরই সঙ্গে সম্পর্কিত যে বিষয়টি আসে তা হলো পুড়ে যাবার কারণ। আমরা খুঁজে পেয়েছি যে একশ ষোল জন নারীর মধ্যে একজন অ্যাসিড সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তিনজন পারিবারিক ষড়যন্ত্রের কারণে এবং একশ বারোজন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।

শিক্ষার হারের ক্ষেত্রে এই উত্তরদাতাদের মধ্যে স্বাক্ষরতার হার- ৫২ জন নারী নিরক্ষর, ৩৮ জন নারী প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত পড়েছেন এবং ১২ জন নারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছেন। বর্তমানে বারো জন মহিলা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। কাজেই এই বারোজন ছাড়া প্রায় সবাই আয় বৃদ্ধিমূলক কোন পেশায় জড়িত নেই। যদিও ২৫ জন নারী দিনমজুর এবং বাড়িতে সেলাই করে এবং হাঁস-মুরগী পালন করে কিছুটা আয় করেন। তবে দিনমজুর নারীদের প্রায় সবাই মজুরী বৈষম্যের শিকার হয়ে চলছেন এবং পোড়া অঙ্গের কারণে প্রতিনিয়ত অসহনীয় মানসকি নির্যাতনের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।

এবার আসা যাক পারিবারিক জীবনের তথ্যে। আমাদের উত্তরদাতাদের ১১৬ জনের ভেতরে ৯ জন শিশু এবং বর্তমানে পড়ালেখা করছেন এমন ৪ জন স্বাবলম্বী হবার পথে রয়েছেন। এই সংখ্যা বাদ দিয়ে যারা আছেন, তাদের মধ্যে ৩ জন বিয়ে করননি। আর ১০০ জন নারীর মধ্যে ২ জনের বিয়ে হয়েছে যৌতুক ছাড়া। তবে সেক্ষেত্রে ঐ নারীই আয় করে সংসার চালাচ্ছেন। বাকী ৯৮ জনের সবার বিয়ে হয়েছে অতরিক্তি মাত্রার যৌতুকের বিনিময়ে। কিন্তু বউয়ের পোড়া শরীরের কারণে স্বামী হয় দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন অথবা স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়েছেন। অথবা স্বামীর সংসারে থাকলেও স্বামী এবং শ্বাশুরবাড়ির সবাই অকথ্য মানসিক নির্যাতন করে। প্রতিবেশীদের ব্যবহার এবং যানবাহনে চড়ার অভজ্ঞিতা প্রায় সবার ক্ষেত্রেই ভয়াবহ কটুক্তিতে ভরা। সেই সঙ্গে রয়েছে চরম অসহযোগিতামূলক আচরণ।

বর্তমানে পোড়া রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় বাংলাদেশের উল্লখেযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। এছাড়া অ্যাসিড সহিংসতা বন্ধের জন্য অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে সন্ত্রাসী ঘটনায় হোক অথবা দুর্ঘটনাজনিত কারণে পোড়া ব্যক্তিকে আজীবন চিকিৎসার মধ্যে থাকতে হয় (পোড়ার মাত্রা বেশি হলে)। আবার অন্যদিকে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন প্রায় সব নারী। কারণ, তার চিকিৎসার ব্যয় পরিবারকেই বহন করতে হয়। আবার অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর কারণে পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হন পোড়ার শিকার অনেক নারী।

আমাদের এই গবেষণার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র পুড়ে যাওয়া নারীদের জীবনে যে ধরনের সামাজিক হয়রানি, বৈষম্য এবং অন্যায় ঘটছে সে সর্ম্পকে জানা। পরিবারের রান্নার দায়িত্ব নারীদের ওপরেই থাকে। এই কারণে যেমন পোড়ার দুর্ঘটনার শিকার নারীরা বেশি হন। আবার পারিবারিক সহিংসতার কারণে নারীরা পুড়ে যাওয়ার র্দুঘটনার শিকার বেশি হন, এটাও ঠিক। বলা যায় ‘সহিংসতার দুষ্টচক্র’। কারণ, যতই হোক, একজন পুড়ে যাওয়া নারী পোড়ার মুর্হূত থেকে বাকি জীবন এই সমাজের নানা অন্যায়, বৈষম্য আর মানসিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মধ্যে জীবন কাটান। পরিবারের একজন পোড়া নারীর প্রতি তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মনে সচতেনতা বোধ জন্ম নেবে কিনা আমি জানিনা। যারা আপনজনের দুর্বলতাকে পুঁজি করে জীবিত অবস্থায় পোড়া নারীদেরকে মানসিক নির্যাতন করেন তাদেরকে বদলাতে হলে কঠোর আইনী পদক্ষেপ ছাড়া বোধহয় বদল হবে না।

ঠিক একইভাবে কর্মপরিবেশ রক্ষায় দরকার কঠোর আইনি ব্যবস্থা। পোড়া নারীর সৌর্ন্দযকে অপমান করে অথবা তার ব্যক্তিগত জীবনকে আঘাত করে মন্তব্যকারী সহকর্মীদের নিয়ন্ত্রনের দায়িত্ব নিয়োগ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপরই বর্তায়। এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাবার সময় শেষ হোক যত দ্রুত সম্ভব।

দেখা যায় নারী দিবসে আমরা অনেক শোভন বাক্য শুনি। বিনোদন দুনিয়ার সব অনুষ্ঠানের স্পন্সর হিসেবে দেখা যায় প্রসাধনী, রান্নাঘরের তৈজসপত্র অথবা যন্ত্রের ব্যবহার অথবা পরিবারের সদস্যদের মেকি দায়ত্বিবান হবার বিজ্ঞাপন। সমাজে নারীর ভূমিকা উপস্থাপন করতে এগুলো বড্ড বেশি হাস্যকর বিজ্ঞাপন। কেবল ঘরেই নয়, ঘরের বাইরেও প্রতিবশির সঙ্গে, সহর্কমীর সঙ্গে এবং যানবাহনে বা রাস্তায় পোড়া নারীদেরও আছে সমান অধকিার। এই সম্মান এ সমাজের সবাইকে দেখাতেই হবে। এটি কোন দয়া দেখানোর বিষয় নয়। একজন পোড়া নারীরও রয়েছে এই পৃথিবীতে সমর্মযাদা নিয়ে বাঁচার অধিকার।

দিনের শেষে আমি এবং আমরা মনে করতে চাইনা, এই বিশ্বে আমরা দ্বিতীয়, তৃতীয় অথবা চর্তুথ শ্রেণীর নাগরিক। অন্যসব নাগরিকের সঙ্গে আমরা পোড়া নারীরাও সমমর্যাদার নাগরকি।

 

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন