বিজ্ঞাপন

দৌড়ানো কিংবা পাহাড়ে ওঠা- শাড়িই যার সঙ্গী

May 13, 2020 | 10:30 am

তিথি চক্রবর্তী।।

বিশ্বব্যাপী চলছে করোনা মহামারি। আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে সবার। এসময় সবচেয়ে জরুরী হলো, মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা। শারীরিক সুস্থতার জন্য যেমন সঠিক জীবনযাপন পদ্ধতি মেনে চলা দরকার, তেমনি মানসিক যত্নও নিতে হবে ঠিকঠাক। প্রতিদিন করোনা সংক্রান্ত সংবাদ দেখে দেখে আমরা যখন ভারাক্রান্ত, তখন একটু অন্যদিকে মনোযোগ দেয়াই যায়! চলুন, করোনাকালে একটু ভিন্নরকম গল্পে চোখ রাখি-

বিজ্ঞাপন

মেয়েটির নাম অনসূয়া চক্রবর্তী। শাড়ি পরে ২১ কিলোমিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার অভাবনীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন তিনি। চলতি বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘ঢাকা হাফ ম্যারাথন- ২০২০’ এর একজন প্রতিযোগী ছিলেন অনসূয়া। শাড়ি পরে ২ ঘন্টা ৫০ মিনিটে ২১ কিলোমিটার দৌড়ে সবাইকে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেন। এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বন্ধু ও পরিচিতদের কাছে সমাদৃত হন অনসূয়া।

সম্প্রতি সারাবাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন অনসূয়া চক্রবর্তী। সারাবাংলার পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো-

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: শাড়ি পরে ২১ কিলোমিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া- গল্পটি শুনতে চাই।

অনসূয়া: আমি ‘রমনা রানার্স’ নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছি। সেখানে শারীরিক শিক্ষা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রতিদিনই নতুন নতুন বিষয় শেখানো হয়। পরেরদিন কী শেখানো হবে তা আগের রাতেই জানিয়ে দেয়া হয়। তো, সেরকমই একটি প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা ছিল- সমতলে ৪০ মিনিটে ৫ কিলোমিটার দৌড়াতে হবে। সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবলাম শাড়ি পরে দৌড়ালে কেমন হয়? একটু চেষ্টা করেই দেখি না! তারপর আর দেরি নয়। শাড়ি পরেই চলে গেলাম প্রশিক্ষণে। শুরুটা এভাবেই। তারপর ধীরে ধীরে আরও বেশি পথ শাড়ি পরে পাড়ি দিয়েছি। সর্বশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২১ কিলোমিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি শাড়ি পরেই।

সারাবাংলা: শাড়ি পরে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা জাগল কেন?

অনসূয়া: শাড়ি পরে সবকাজ করতেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করি। শাড়ি পরার ইচ্ছা তৈরি হওয়ার পেছনে ছায়ানটের একটা ভূমিকা আছে। ছায়ানটে গান শিখতে যেতাম। ওখানে যেহেতু শাড়ি পরা বাধ্যতামূলক, ফলে অভ্যাসটা তখন থেকেই হয়ে গেছে। এরপর মনের আনন্দেই শাড়ি পরি।

তবে দৌড় প্রতিযোগিতায় শাড়ি পরার পেছনে মূলত দুটি কারণ আছে।

সকালবেলা রমনায় দৌড়াতে গেলে দেখতাম অল্প সংখ্যক নারী শাড়ি পরে হাঁটছেন। তাদেরকে কখনও দৌড়াতে দেখিনি। অথচ ৩০ মিনিট হেঁটে যে ফল পাওয়া যায়, তা কিন্তু ১৫ মিনিট দৌড়ানোর সমান। ফলে সময়ও কিছুটা বাঁচে। কিন্তু  শাড়ি পরে দৌড়ালে সমাজ ভালো চোখে দেখে না। তাই মেয়েরা শাড়ি পরে সাধারণত দৌড়ান না। তবে আমি এই চিন্তার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। কেবল লেগিংস বা ইয়োগা প্যান্ট পরেই দৌড়াতে হবে— সমাজ নির্ধারিত এমন চিন্তার সঙ্গে আমি একমত না।

আরেকটি হলো, বিভিন্ন সময় দেশের বাইরে একাডেমিক কাজে গিয়েছি। দেখেছি মেয়েরা নিজের দেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে সব কাজ করেন। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কায় গিয়ে বেশ উৎসাহিত হয়েছি। তখন ভাবলাম, অন্যান্য দেশের মেয়েরা যদি তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারে তাহলে আমি বা আমরা কেন পারবো না?

মূলত এই দুটি ভাবনা থেকেই শাড়ি পরে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম।

সারাবাংলা: শাড়ি পরে কঠিন কাজগুলো করার তালিকায় আরও কিছু আছে?

অনসূয়া: আমি সবকাজ শাড়ি পরে করতেই ভালোবাসি। বান্দরবানে গিয়ে পাহাড় ট্র্যাকিং করেছিলাম শাড়ি পরেই। আমি মনে করি, আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক- সব পরিবেশের সঙ্গেই শাড়ি মানিয়ে যায়। বাঙালি নারীর ঐতিহ্যবাহী এই পোশাক ধরে রাখতে চাই।

সারাবাংলা: দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার শুরুটা হলো কীভাবে?

অনসূয়া: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাউন্টেনিয়ারিং ও অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবে (ডিইউএমএসি) যোগ দেই। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ঘোষণা দেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এভারেস্ট সামিটের জন্য যেন নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে এজন্য আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এভারেস্ট সামিটের ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহ ছিল আমার। ফলে প্রশিক্ষণে নাম দিলাম। ওই প্রশিক্ষণের শুরুতে নারী-পুরুষ মিলে প্রায় ৯৬ জন ছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত মেয়ে বলতে ছিলাম আমি-ই। প্রশিক্ষণের কঠিন পর্যায়গুলো অতিক্রম করতে না পেরে একে একে সব মেয়েই চলে গিয়েছিল।

সারাবাংলা: দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়াকে পরিবার কীভাবে দেখে?

অনসূয়া: পরিবারের অনেক সহযোগিতা পেয়েছি। নারী হওয়ার কারণে যেসব কাজে অংশগ্রহণ করলে অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়, তা আমাকে করতে হয়নি। ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে জগিংয়ে যেতাম। বাবা চাইতেন আমি যেন সেনাবাহিনীতে কাজ করি। মেয়ে বলে আলাদা ধরনের পেশা নির্বাচন করার পক্ষপাতি ছিলেন না। মাও সবসময় আমার পাশেই থেকেছেন। ধরুন, অনেক বাবা-মা ছোটবেলায় তাদের সন্তানদের গল্পের বই পড়তে দেন না। তারা চান, বাচ্চা যেন শুধু পড়ার বই পড়ে। কিন্তু আমার মা একেবারেই আলাদা। নিজে ভীষণ পড়ুয়া হওয়ার কারণে গল্পের বই পড়া নিয়ে কখনও অনুৎসাহিত করতেন না। ফলে আগাগোড়াই পরিবার আমাকে সহযোগিতা করেছে, ভালো রেখেছে।

সারাবাংলা: একাডেমিক পড়াশুনা শেষ?

অনসূয়া: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে গ্রাজুয়েশন করেছি। এখন এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিভাগে আরেকটি গ্রাজুয়েশন করছি।

সারাবাংলা: দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে মেয়ে হিসেবে কখনও বাধার মুখে পড়তে হয় না?

অনসূয়া: মেয়েরা দৌড় প্র্যাকটিস করবে, প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে— এগুলো আমাদের সমাজ একেবারেই ভালোভাবে নেয় না। ফলে বাধা তো পেতেই হয়। ধরুন, ভোর ৫.৩০ টায় প্র্যাকটিস করতে বের হই। শীতকালে সেই সময় আলোও ফোটে না। অন্ধকারের মধ্যেই বের হতে হয়। তখন আশেপাশের লোকজন খারাপভাবে দেখে। কেউ কেউ খারাপ ভাষায় মন্তব্যও করে বসে।

কিন্তু তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কারণ আমার শারীরিক সুস্থতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনার পেছনে আমার শ্রম আর পরিবারের সহযোগিতা আছে। কে কী বললো তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কোথায়!

শাড়ি শুধু ভূষণই নয়, শাড়িতে ফুটে ওঠে ব্যক্তিত্বও। এ কারণে অনেক নারী শাড়ি পরেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে আর্থিক অবস্থা, সামাজিক প্রতিপত্তি ও ব্যক্তিগত রুচিবোধের ওপর ভিত্তি করে পালটে গেছে নারীর শাড়ি পরার ধরন ও মানে।

সারাবাংলা/টিসি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন