শুক্রবার ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

নারীর একা ভ্রমণ? নিষিদ্ধ! অসম্ভব!

ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৮ | ৩:২৬ অপরাহ্ণ

রাজনীন ফারজানা।।

বিজ্ঞাপন

চব্বিশ বছর বয়সে গ্রাজুয়েশন শেষ করে একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে যোগ দেন মিমি (ছদ্মনাম)। মাসছয়েক কাজ করার পরে রুটিন জীবন আর কাজের চাপে অস্থির বোধ করতে থাকেন তিনি। ভীষণ ইচ্ছে করে সব ছেড়ে অন্তত ক’দিনের জন্য দূরে কোথাও ঘুরতে যেতে। বিশেষত পাহাড় তাকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে। কিন্তু তার বাবা মা জানায় যে তারা ব্যস্ত তাই তাকে কোথাও নিয়ে যেতে পারবেন না। মিমি ভাবেন, কোন এক বান্ধবীকে সাথে নিয়ে দুজন মিলে যাবেন। কিন্তু পরিবার থেকে তাকে বলা হয়, দুজন মেয়ে একা কোথাও যাবার অনুমতি তারা পাবে না। গেলে তাকে তার দশছরের ছোট ভাইকে সাথে নিতে হবে। কারণ, আমাদের সমাজে পুরুষ অভিভাবক (বছরদশেকের ছোট হলেও) ছাড়া নারী বাইরে ঘুরতে যেতে পারেনা।

নারীদের একা ঘুরতে যাওয়া ব্যাপারটাকেও আমাদের সমাজে ট্যাবু বা অলঙ্ঘনীয় বিষয় করে রাখা হয়েছে। তা সে যে কোন বয়েসী নারীই হোক, হোক সে বিবাহিত কি অবিবাহিত, স্বাবলম্বী হোক কি পরনির্ভরশীল। যদি কেউ একা একা যায়ও, তাকে অবশ্যই সেইদিনই বাড়িতে ফিরে আসতে হবে। মেয়েরা কিছুতেই রাতে বাইরে থাকতে পারবে না। যদি তা না মানে, সমাজ সেটা স্বাভাবিকভাবে নেবে না। সেই মেয়েকে ও তার পরিবারকে শুনতে হবে নানা রকম নেতিবাচক কথা। ফলে ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ চিন্তা করে কোন পরিবারই তাদের মেয়েকে একা বাইরে যেতে দিতে চায়না।

 

বিজ্ঞাপন

 

অনেকের ক্ষেত্রে তো নিজ শহরের বাইরেই শুধু নয়, নিজ শহরেও নিজের ইচ্ছে মত কোন জায়গায় যাওয়ার অনুমতিও মেলে না। সাথী (ছদ্মনাম) তার জীবনের প্রথম পিকনিকে যায় যখন সে মাস্টার্সে পড়ে তখন। তাও নিজের টিউশনি করে জমানো টাকা থেকে চাঁদা দিয়ে। সামর্থ্যহীনতার জন্য যেতে পারেনি তা না, বাড়ি থেকে যেতে দেয়নি কখনো। এবারে সে শুধুমাত্র মাকে জানিয়ে তবে পিকনিকে যায়। কারণ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়- কোন সময়েই সাথীর বাড়ি থেকে পরিবারের সদস্য ছাড়া কারও সাথে বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পিকনিকেও না। এর কারণ কী- তা জিজ্ঞাসা করার সাহসও তার কখনো হয়নি। মা শুধু বলেছে, ‘লোকে কি বলবে তুই একা বাইরে গেলে? আর বাইরে যেতে হবে কেন? আমরাও তো কোনদিন যাইনি। তাতে কি আমাদের জীবন থেমে ছিল? বিয়ের পরে জামাইর সাথে যত ইচ্ছা ঘুরবা।’

আমাদের দেশে সাথীর মত অসংখ্য নারী আছে যারা এ কথা শুনে বড় হয়েছে যে ‘বিয়ের পরে জামাইর সাথে ঘুরবা। বিয়ের আগে অত ঘোরাঘুরি কিসের!’

এদিকে, রুমির (ছদ্মনাম) বিয়ে হয়েছে দু’বছর হল। কিছুদিনের জন্য একা একাই বাবার বাড়ি এসেছে বেড়াতে। বান্ধবীদের সাথে একদিনের জন্য ঢাকার অদূরে ঘুরতে যেতে চাওয়ায় তার বাবা রাজি হননা। কারণ হিসেবে বলেন, যেহেতু সে বাবার বাড়ি এসেছে তাই এখন মেয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব তার বাবার। বাইরে গেলে যদি কিছু হয়ে যায়, তখন জামাই বা মেয়ের শ্বশুরবাড়ির কাছে কী জবাব দেবেন তিনি! অনেকেই হয়ত ঘটনাটা বেশ কয়েকবছর আগের বলে ভাবছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এখনো বাবা মায়েরা মেয়ের দায়িত্ব তাদের উপর আর বিয়ের পর মেয়ে জামাইয়ের উপর ন্যস্ত বলে ভাবেন। একজন প্রাপ্তবয়স্ক স্বাবলম্বী নারীও কখনও নিজের দায়িত্ব নিজে নেবার স্বাধীনতা পায় না এই সমাজে।

 

 

নারীর নিরাপত্তার দায়িত্ব সবসময়ই কোন না কোন পুরুষের- সেই চিন্তা থেকেই নারীদের ঘোরাঘুরির উপর এত বাধা নিষেধ আরোপ করে সমাজ। এ নিয়ে কথা হয় স্থপতি, নাট্যকার, তথ্যচিত্র নির্মাতা, ও ভ্রমণসাহিত্যিক শাকুর মজিদের সাথে। দীর্ঘ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি ছাড়াও আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থা এখনো অতটা নারীবান্ধব নয়। সে কারণেই এদেশে নারীর একা ঘোরাঘুরির ক্ষেত্রে শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা একটা বড় বিষয়। ইউরোপ ও আমেরিকার নানা দেশে নারী স্বাধীনতা বিদ্যমান, তাই সেসব জায়গায় নারীরা স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়। এমনকি নারী পর্যটকরাও সেখানে একা যেতে স্বস্তি বোধ করেন। তিনি আরো বলেন, যে সমাজে ধর্মীয় অনুশাসন বেশি সে সমাজে নারী পর্যটক কম।

নারী পর্যটক কি শুধুই উন্নত বিশ্বে? আমাদের দেশেও কি নারী পর্যটক নাই? ভ্রমণ আয়োজন করে এমন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর সাথে কথা বলে জানা যায়, সংখ্যায় কম হলেও দিন দিন নারী পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। তবে তারা একা ভ্রমণ করলে দেশের বাইরেই ঘুরতে যান। বাংলাদেশের ভিতরে একা ঘুরছেন, এমন নারী পর্যটক নেই বললেই চলে।

 

 

সাবা বিনতে আমিন একজন পর্যটক ও একটিভিস্ট। পেশায় অনলাইন উদ্যোক্তা সাবা এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি দেশে একা ঘুরেছেন। দলগত ভ্রমণও পছন্দ করেন তিনি। তিনি কিছুটা নিরিবিলি থাকা পছন্দ করেন। তাই একা ঘোরার অন্যরকম আবেদন আছে তার কাছে। আবার ভিন্ন পরিবেশ দেখার ও জানার প্রতিও ভীষণ আগ্রহী তিনি। তাই সুযোগ পেলেই একা বেরিয়ে পড়েন। তবে কোথাও যাওয়ার আগে ভালোভাবে সে জায়গা সম্পর্কে খোঁজ নিতে ভোলেন না। আর মোবাইলের পাশাপাশি তার কাছে রাখা ডায়েরিতে পুলিশ, হাসপাতাল, সেদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের ঠিকানা আর যাবতীয় দরকারি ফোন নাম্বার লেখা থাকে। এতে করে মোবাইল হারিয়ে গেলেও বা হঠাত বিপদে পড়লে দ্রুত সাহায্য পাওয়া যাবে। তবে তিনি বাংলাদেশে কখনো একা ঘুরতে যাননি।

সাবা বলেন, নিরাপত্তা নারী পুরুষ উভয়ের জন্যই চিন্তার বিষয়। তাই বিদেশেও একা ভ্রমণে গেলে তিনি পারতপক্ষে রাতে বের হন না। আর সবসময় শহরের কেন্দ্রে থাকেন যেখান থেকে সবকিছু কাছে। আবার ট্যাক্সিতেও একটু দেখেশুনেই ওঠেন। তিনি মনে করেন, সাবধানতা অবলম্বন করলেই একা একা একটা আনন্দময় ভ্রমণ কোন ব্যাপারই না। আর বিদেশে ঘুরতে গেলে অন্যান্য পর্যটকদের সাথেও একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটাও ভীষণ উপভোগ করেন তিনি। ইউরোপ, আমেরিকা ছাড়াও এশিয়ার নানা দেশে সামাজিক নিরাপত্তা ও নারীদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তিনি সেসব দেশে একা গেলেও দেশে একা ঘোরার সাহস পান না।

দলগতভাবে অনেক নারীই দেশের ভেতরে পর্যটনে যান। এমনই দুজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জেনিফার আরেফীন তিলোত্তমা ও চিকিৎসক তুলি সঙ্গীতা। সঙ্গীতা আবার তিলোত্তমার স্বামীর বন্ধু। দুজনেরই দুটি করে শিশু সন্তান। বছর দুই আগে হঠাতই দুজন মিলে পরিকল্পনা করেন, বাচ্চাদের দায়িত্ব তাদের বাবাদের কাছে দিয়ে তারা একসাথে ‘বাকেট লিস্ট’ অনুযায়ী ভ্রমণ করবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। এখন পর্যন্ত সিলেট আর কক্সবাজার ভ্রমণ করেছেন তারা একসাথে। ভবিষ্যতে আরও অনেক জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা আছে তাদের। দুজনই বাচ্চাকাচ্চা, সংসার, দায়িত্ব থেকে কয়েকদিনের ছুটি কাটানোর বাসনা থেকে ঘুরতে বের হন।

এশা একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করেন। তাদের একটা ভ্রমনের দল আছে। এই দল চাঁদা তুলে বেরিয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে। পরিবার থেকেও তিনি সমর্থন পান সবসময়। কয়েকদিনের জন্য প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে আসা তাদের নতুন করে কাজের উদ্যম এনে দেয়।

এশার মতই সেতুও (ছদ্মনাম) একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করেন। ভ্রমণই তার জীবনের প্রধানতম শখ। এ ব্যাপারে পরিবার থেকেও তিনি পূর্ণ সমর্থন পান। ২০১৩ তে ইউকে ভ্রমণ দিয়ে সম্পূর্ণ একা ভ্রমণ শুরু করেন। সে সময় ব্রিস্টলে তিনদিনের ‘হট এয়ার বেলুন ফেস্টিভ্যাল’ চলছিল। পাঁচদিনের জন্য সেই ফেস্টিভ্যাল ও ব্রিস্টল শহর দেখতে যান তিনি। চারপাশে অনেককেই তাবুতে থাকতে দেখে তিনিও উৎসাহী হন। আর জীবনে প্রথমবারের মত একটা তাবু কিনে একরাত থাকেন। সেদিনের সেই অভিজ্ঞতা তার জীবনের অন্যতম আনন্দের স্মৃতি। তাই সুযোগ পেলেই আর টাকা পয়সা জমলেই বেরিয়ে পড়েন তিনি। এখন পর্যন্ত পাঁচটি দেশ একা একা ভ্রমণ করেছেন এবং ভবিষ্যতেও এই ভ্রমণ অব্যাহত রাখতে চান। আর সাবার মতই তিনিও কোন দেশে যাওয়ার আগে সে জায়গা সম্পর্কে সম্ভাব্য সব খোঁজখবর নিয়েই তবে যান।

 

 

এই নারীরা নিজেরাই নিজেদের ভ্রমণ পরিকল্পনা করেন। এদের কেউ কেউ ট্রাভেল এজেন্সি থেকে টিকেট সংগ্রহ করে নেন। তাছাড়া আগে পরিবারের সাথে ঘুরতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের কাজে লেগেছে।

ট্রাভেল এজেন্সি ছুটি ডট কমের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের পরিচালক এম এ মারুফ বলেন, দেশে নারী পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। অনেকেই নিয়মিত ভ্রমণ করছেন ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে। মারুফ আরো বলেন, নিরাপত্তা ও সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বেশিরভাগ নারীই বিদেশে যেতে চান। আর সেক্ষেত্রে তারা নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবেন এমন জায়গাতেই নারী পর্যটকদের পাঠান। আর দেশে নারীরা মূলত দলবেঁধে ঘুরতে যাচ্ছেন।

এম এ মারুফের মতে, ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুদিনের ছুটি সবার জন্যই খুব জরুরি। মেয়েরা এখন নিজেদের মত করে ছুটি কাটাতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। দিন দিন আরও অধিক সংখ্যক নারী সামাজিক বাঁধা বা ট্যাবু ভেঙে এই ছুটি কাটানোতে আগ্রহী হয়ে উঠবে বলে আশা করেন তিনি।

এদিকে,  নারীদের একা বাইরে যাওয়া, রাতে বাইরে থাকা বিষয়টা এখনো এদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে নিষিদ্ধি ব্যাপার হলেও শিক্ষিত তরুনদের অনেকেই এ ব্যপারে কোন সমস্যা দেখছেন না। তারা তাদের স্ত্রী, বোন বা বান্ধবীদের ঘুরতে যাওয়ার বিষয়টা স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীর জন্য নিরাপত্তাহীন সমাজব্যবস্থার কারণে পরিবারের উৎকণ্ঠা নারীর একা ভ্রমণে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। শাকুর মজিদ বলেন, অনেক সময় পরিবারবান্ধব সমাজব্যবস্থাই নারীর স্বাধীনতায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, পরিবারের উচিত নারীকে আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তোলা। পাশাপাশি ছেলে সন্তানকেও নারীর প্রতি সম্মান রাখতে শেখাতে হবে। আর নারী স্বাধীনতার জন্য চাই নারীর আত্মনির্ভরশীল মানসিকতা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন। সেই সাথে প্রয়োজন নারীদের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো। কারণ ভ্রমণে এটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি।

সাবা মনে করেন, জীবনের যে কোন পরিস্থিতিতে একা ঘুরে আসা টনিকের মত কাজে দেয়। তার প্রিয় ডায়লগ, ‘স্ট্রেস? আপসেট? স্যাড? লেটস ট্রাভেল’। অর্থাৎ মন খারাপ কি কাজের চাপে অতিষ্ঠ হলে ভ্রমণই পারে মনকে সতেজ করে তুলতে। তিনি বলেন, কে কী বলল তা না ভেবে যেকোন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারার মত আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে।

 

 

সারাবাংলা/আরএফ/এসএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন