বিজ্ঞাপন

ভোট ইন দ্য টাইম অব করোনা

মার্চ ২০, ২০২০ | ৯:৩৬ অপরাহ্ণ

তরিকুর রহমান সজীব

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং পড়ছে, তাতে করে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নেই কিছুই। আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ প্রায়। বেশ কয়েকটি দেশে চলছে জরুরি অবস্থা, বেশকিছু দেশ সম্পূর্ণ লকডাউন অবস্থায়। সৌদি আরবে দুইটি বাদে বাকি সব মসজিদে নামাজ বন্ধ। দেশেরও একটি উপজেলা কার্যত ‘লকডাউন’ অবস্থায় আছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকেও সর্বশেষ জানানো হলো, এ মুহূর্তে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা ঝুঁকির কারণ হতে পারে। অথচ প্রস্তুতি শেষ হওয়া আর অর্থ অপচয়ের ‘আশঙ্কা’য় ঠিক এই সময়েও রাজধানীর একটিসহ দেশের তিন তিনটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন চালিয়ে যাওয়াকে ‘যুক্তিসঙ্গত’ মনে করছে নির্বাচন কমিশন!

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য বলছে, দেশে করোভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ জন (শুক্রবারের তথ্য অনুযায়ী ২০ জন), মারা গেছেন একজন। আক্রান্তদের কয়েকজন বিদেশ ফেরত, বাকিরা তাদের সংস্পর্শে আক্রান্ত হয়েছেন এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে। আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, এখনো পর্যন্ত এই ভাইরাসের ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’ শুরু না হলেও ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অন্যদিকে, শুরু থেকেই করোনাভাইরাস সচেতনতায় যে বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা হলো ‘সোস্যাল ডিসটেন্স’। অর্থাৎ মানুষে মানুষে দূরত্ব। যে কারণে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ামাত্রই জনসমাগম এড়ানোর নির্দেশনা এসেছে সব দেশেই। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন শনিবারের (২১ মার্চ) তিন সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন নিয়ে অনড়।

বিজ্ঞাপন

গত ১৬ মার্চ প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বললেন, ‘করোনাভাইরাস নিয়ে আমরা অত্যন্ত শঙ্কিত। তারপরও এই নির্বাচনে আমরা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিতে পারবো না। আগামী ২১ মার্চ ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচন পেছাতে চাচ্ছি না। এর মধ্যেই আমাদের কাজ করতে হবে। আল্লাহর রহমতে সব ঠিক হয়ে যাবে হয়তো।’

পরদিন আরেক অনুষ্ঠানে সিইসি’র বক্তব্য, আরও দুয়েকদিন ‘পর্যবেক্ষণ’ করে মার্চের অনুষ্ঠেয় নির্বাচনগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তারা কী পর্যবেক্ষণ করেছেন, তা খোলাসা করেননি। তবে বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন সচিব মো. আলমগীর স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দিলেন, শনিবার অনুষ্ঠেয় ঢাকা-১০, বাগেরহাট-৪ ও গাইবান্ধা-৩ আসনের নির্বাচন হবেই। এর পেছনে কিছু ‘যুক্তি’ও তুলে ধরেন তিনি। দেখে নিই, কী কী যুক্তি দেখালেন ইসি সচিব।

প্রথমত, প্রার্থীদের পক্ষ থেকে নির্বাচন পেছানোর অনুরোধ নেই। নির্বাচনের পেছনে তাদের ‘যথেষ্ট’ শ্রম ও ‘অনেক’ টাকা-পয়সা ব্যয় করতে হয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচন বন্ধ করলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে মনে করছেন। তাই তাদের অনুরোধ, নির্বাচন যে পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই হয়।

দ্বিতীয়ত, তিন আসনের উপনির্বাচনের জন্যই প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর জন্য ‘অনেক’ অর্থ খরচ করতে হয়েছে। নির্বাচন স্থগিত হলে বা পরবর্তী কোনো সময়ে ভোটগ্রহণ হলে তাদের নতুন করে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এতে ‘অনেক’ অর্থ অপচয় হবে।

তৃতীয়ত, করোনা পরিস্থিতি এখনো দেশে মহামারি আকারে ছড়ায়নি। তিনি যখন ব্রিফিং করছেন, তখন থেকে নির্বাচনের মধ্যে ‘মাত্র’ একদিন বাকি আছে। ফলে কমিশন ভোটগ্রহণ অব্যাহত রাখাকেই ‘অধিকতর যুক্তিসঙ্গত’ মনে করছে।

প্রথম দুইটি বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট, প্রার্থী ও নির্বাচন কমিশনের টাকা-পয়সা খরচের বিষয়টি কমিশনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টাকা-পয়সা গুরুত্বপূর্ণ, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু যেখানে জনসমাগম করোনাভাইরাসের ‘লোকাল ট্রান্সমিশন’কে ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশনে’ রূপান্তর করার ঝুঁকি রাখে, সেখানে টাকা-পয়সার বিষয়টি কি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে সেই ঝুঁকি আমাদের নিতেই হবে? ভোট দিতে এসে যদি কেউ করোনভাইরাসে সংক্রমিত হয়, তার দায় কি নেবে নির্বাচন কমিশন?

এর জবাব অবশ্য ইসি সচিবই দিয়েছেন। জানিয়েছেন, ভোটকেন্দ্রে এসে যেন কেউ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত না হন, তার জন্য বুথগুলোতে ব্যানারে করণীয় লেখা থাকবে। ভোটকেন্দ্রগুলোতে হ্যান্ড স্যানিটাইজারও রাখা হবে। ভোটকেন্দ্রের মতো একটি স্থানে হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর ব্যানারে কতটুকু সুরক্ষা মিলবে? ভোট দিতে আসা মানুষগুলোকে লাইনে দাঁড়াতে হলে তারা কি একজন অন্যজনের থেকে ৩ ফুট দূরত্বে থাকবেন?

আবার ইসি সচিব বলছেন, করোনা মহামারি রূপ নেয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেখানে আরও এক সপ্তাহ আগে করোনাভাইরাসকে ‘প্যানডেমিক’ বা ‘বৈশ্বিক মহামারি’ ঘোষণা করেছে, তখন আমাদের এই ভাইরাসকে মহামারি আকারে ঘোষণার অপেক্ষা করতে হবে? যে ভাইরাস বিশ্বের আড়াই লাখেরও বেশি মানুষকে আক্রান্ত করেছে, কেড়ে নিয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণ, সেই ভাইরাস কবে ছড়িয়ে পড়বে, নির্বাচন পেছাতে হলে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে? তাছাড়া হাইকোর্টও তো করোনাকে মহামারি ঘোষণার নির্দেশ দিয়েছেন। তারপরও অপেক্ষা কীসের?

শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. নাসিমা সুলতানা জানিয়েছেন, নির্বাচন নিয়ে ঝুঁকি আছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমন একজন শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যের কি গুরুত্বই নেই নির্বাচন কমিশনের কাছে?

আরও একটি মজার কথা বলেছেন নির্বাচন কমিশন সচিব, গত কয়েকটি নির্বাচনেই দেখা গেছে ভোটার উপস্থিতি কম। করোনাভাইরাসের কারণেও ভোটার উপস্থিতি কম হতে পারে। সেটি তারা ধরেই নিয়েছেন! আর কম ভোটার উপস্থিতির কারণে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিও কম থাকবে!

প্রতিটি নির্বাচনের পরই যখন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়ানোকেই কমিশন নিজেদের চ্যালেঞ্জ হিসেবে ঘোষণা করেছে, ২ মার্চ মহাসমারোহে উদযাপন করা জাতীয় ভোটার দিবসেও সেই একই কথা প্রতিধ্বনিত হয়েছে, তখন কম ভোটারের উপস্থিতি আপনাআপনিই মেনে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন! নাকি ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর চ্যালেঞ্জে হার মানছেন তারা?

নির্বাচন কমিশন যখন ভোট নিতে এমন অনড় অবস্থানে, তখন একনজরে দেখে নিই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বাকি দেশগুলো কী করছে। ইতালি, ফ্রান্স, কানাডার মতো যেসব দেশে করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তারা লকডাউনেই চলে গেছে। কিন্তু বাকি কোনো দেশই প্রকৃতপক্ষে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। ইরানে মসজিদে জুমার নামাজ বাতিল হয়েছে অনেক আগেই। সৌদি আরবে মসজিদুল হারাম আর মসজিদে নববি ছাড়া বাকি সব মসজিদে নামাজ বন্ধ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজানের বাণী বদলে উচ্চারণ করা হচ্ছে, ‘ঘরে নামাজ পড়ুন।’ বেশিরভাগ দেশই অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যাতায়াতও যথাসম্ভব বন্ধ করেছে। করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থতার দায়ভার নিয়ে পদত্যাগ করেছে নেদারল্যান্ডসের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ব্রুনো ব্রুইস।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতে কোভিড-১৯ রোগী ২২৯ জন। দেশটিতে রোববার সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ‘জনতা কারফিউ’ ঘোষণা করা হয়েছে। ৬৬ জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে যে শ্রীলঙ্কায়, সেই দেশের এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।

করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারপরও জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান স্থগিত হয়েছে। অনেক দেশের সঙ্গেই আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়েছে। বন্ধ করা হয়েছে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজধানীসহ সারাদেশের পর্যটন স্পট। একটি উপজেলা তো কার্যত ‘লকডাউন’ই করে দেওয়া হয়েছে। মসজিদে নামাজ বন্ধ না করলেও জুমায় সুন্নত ও নফল নামাজটাও ঘরে পড়তে অনুরোধ জানিয়েছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন। আর সামাজিক-সাংস্কৃতিকসহ সব ধরনের জনসমাগম এড়ানোর পরামর্শ তো বারবারই দেওয়া হচ্ছে। তবু নির্বাচন হতেই হবে?

শ্রীলঙ্কা যদি একমাস পরের জাতীয় নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত এখনই নিতে পারে, আমরা একদিন পরের নির্বাচনকে দিব্যি হতে দেবো? বিষয়টা কি এমন যে একদিনে আর কয়জন সংক্রমিত হবে? বিশ্বকে ভয়াবহ দুর্যোগ এনে দেওয়া একটি ভাইরাস নিয়ে এমন ভাবনা মনে থাকলে তা কতটুকু সঙ্গত, সে প্রশ্ন তোলাই যায়। তারপরও সেই ভাবনাকেও যদি আমলে নিই, সেক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্টরা ভুলে যাচ্ছেন করোনাভাইরাসের প্রকৃতি। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, এই ভাইরাসে সংক্রমিত হলে ১৪ দিনে গিয়েও প্রথমবারের মতো লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তিও দিব্যি দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সুস্থ মানুষ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারেন। স্বাভাবিক চলাফেরা অব্যাহত থাকলে সংস্পর্শে আসা প্রত্যেককেই সংক্রমিত করার সক্ষমতাও রাখেন তিনি।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরেকটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। চলতি মার্চের শুরু থেকেই আমরা দেখছি, করোনায় আক্রান্ত দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের হোম কোয়ারেনটাইনে থাকতে বলা হলেও তাদের অনেকেই কোয়ারেনটাইনের শর্ত মানেননি। কেউ যোগ দিয়েছেন বিয়ের অনুষ্ঠানে, কেউ কেউ তো রীতিমতো নিজের বিয়ের আয়োজন করেছেন। দেশের বিভিন্ন জেলাতেই এমন শর্ত ভাঙা অনেক প্রবাসীকেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। শনিবারের তিন উপনির্বাচনে এমন প্রবাসীরা ভোট দিতে আসবেন না, সেই নিশ্চয়তা কি দিতে পারবেন ইসি সচিব কিংবা সিইসি?

স্পেন-ইতালির মতো দেশগুলো বলছে, শুরুর দিকে তারা করোনাভাইরাসকে গুরুত্ব দেয়নি। আর সপ্তাহখানেক আগেও যদি তারা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিত, তাহলে হয়তো তাদের করোনাভাইরাসের আক্রমণে এত ভুগতে হতো না। করোনাভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার আগেই বাংলাদেশ সময় পেয়েছে প্রায় দুই মাস। প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পরের ১০ দিনে নতুন সংক্রমণের পরিমাণ ১৪ জন। এখনো কি আমাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সময় আসেনি? নাকি আমরাও দক্ষিণ কোরিয়ার ‘থার্টি ফার্স্ট’ পেশেন্টের মতো কোনো একজনের অপেক্ষাতেই থাকব?

‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’ বা জাদু বাস্তবতার অন্যতম কারিগর গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ লিখেছিলেন ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’। বহুলপঠিত এই উপন্যাসের ‘নায়ক’ ফ্লোরেন্টিনো আরিজা প্রেমে পড়েছিলেন ফারমিনা দাজা’র। সে এমনই প্রেম, যেন কলেরার মহামারিকেও হার মানায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলে থাকেন, অনেকদিন থেকেই আমাদের সাংবিধানিকভাবে গণতান্ত্রিক দেশটিতেও গণতন্ত্র টিকেই রয়েছে নির্বাচনকে ঘিরে। গত বেশকিছু নির্বাচনের নানা ঘটন-অঘটনের মধ্যেও নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন নিয়ে যে ‘প্রেম’, করোনার যুগে এসে তা ফ্লোরেন্টিনোর প্রেমের মতোই ছাপিয়ে যাবে?

লেখক: জয়েন্ট নিউজ এডিটর, সারাবাংলা ডটনেট

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন