বিজ্ঞাপন

‘এমনভাবে ফিরতে চাই যেন আর বের হতে না হয়’

মার্চ ২৪, ২০২০ | ১১:৫৮ অপরাহ্ণ

মহিবুর রহমান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

মাঠের বাইরের ঘটনাপঞ্জিতে গায়ে তার ‘ব্যাড বয়’-এর তকমা কিন্তু নন্দিত অজি অফ স্পিনার নাথান লায়নের চোখে সাব্বির রহমানের ব্যাটিং আগ্রাসন বিরাট কোহলির মতোই। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে নাথান স্পিন ঘূর্ণিতে প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া বাংলাদেশের ত্রাতা হিসেবে সাব্বিরের ৬৬ রানের ইনিংসটি দেখে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি তাকে নিয়ে এই মন্তব্যটি করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

আর ‘ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক’ মাশরাফি বিন মোর্ত্তজার চোখে তিনি দেশসেরা আগ্রাসী ব্যাটসম্যান। তাতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন লাল সবুজরে সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের ক্রিকেটের নিয়মিত মুখ।

কিন্তু লম্বা একটি সময় সেই সাব্বিরকে দেখা যায়নি। জাতীয় দলের নিয়মিত হওয়া সত্বেও ব্যাটিং আগ্রাসনে ছোটাতে পারেননি রানের ফল্গুধারা। চওড়া হাসি দূরে থাক স্মিত হাস্যেও তার ব্যাটে হাসেনি। কখনো সখনো হেসেছে সত্যি কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। পরিনামে যা হবার তাই হয়েছে। গেল বছরের জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কা সিরিজ খেলে এসে সেই যে ওয়ানডে দল থেকে বাদ পড়লেন, আজও ফিরতে পারেননি। টি-টোয়েন্টিতেও সব শেষ খেলেছেন গেল বছর (সেপ্টেম্বর ২০১৯, ট্রাইনেশন)। তবে হাল ছাড়তে চাইছেন না, ইম্পাতসম দৃঢ় মানসিকতার এই লোয়ার মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। এবার এমনভাবে জাতীয় দলে ফিরতে চান যেন আর কখনোই বাদ পড়তে না হয়।

বিজ্ঞাপন

সেই লক্ষ্যে তিনি এখন নিজের পুনর্গঠন নিয়ে ব্যস্ত। ব্যাটিং টেকনিকে কোথায় ভুল ছিল এবং কি করলে সেই ভুলগুলো শুধরে আবার আগের ছন্দে ফেরা যাবে সেসব নিয়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। ভুলে যাননি ফিটনেসের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেওয়ায় আপাতত দেশেরই সব খেলাই বন্ধ। সাব্বির তাই ফিরে গেছেন নিজ শহর রাজশাহীতে। সেখানে নিজেকে ঘরবন্দী করে রেখেছেন। নেহায়াৎ প্রয়োজন না হলে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। করোনা প্রতিরোধে দেশের প্রতিটি মানুষকে ঘর থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ তার।

করোনা প্রভাবমুক্ত হয়ে দেশে ক্রিকেট ফিরলে সাব্বিরও খেলায় ফিরবেন। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের চলতি মৌসুমে খেলছেন লিজেন্ডস অব রুপগঞ্জের হয়ে। ইচ্ছে আছে এবারের মৌসুমের সেরা রান সংগ্রাহক হবেন।

রাজশাহী থেকে মুঠোফোনে সারাবাংলাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সেসব কথাই জানালেন জাতীয় দলে স্থায়ী হয়ে ফিরতে চাওয়া এই ড্যাশিং ব্যাটসম্যান। জানিয়েছেন আরও অনেক কিছু। পাঠকদের উদ্দেশ্যে তা তুলে ধরা হলো।

সারাবাংলা: করোনার সময়টা কেমন কাটছে?

সাব্বির: এটি এমন একটা ছোঁয়াচে রোগ যে আমাদের বাসায় থাকা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। কেননা বাইরে গেলে বন্ধুদের অনেকেই কাছে এসে কথা বলতে চাইবে, হ্যান্ডশেক করতে চাইবে তাদের মানা করা যাবে না। কিন্তু কার ভেতরে করোনা থাকবে সেটা তো আর বলা যায় না। বাসা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। নিজেদের জন্য হোক অথবা দেশের মানুষের জন্যই হোক, এই মুহুর্তে বাসায় থাকাটাই ভালো।

সারাবাংলা: মোটামুটি লম্বা একটি সময় জাতীয় দলে নিয়িমিত খেলেছেন। এখন বাইরে। কেমন লাগে?

সাব্বির: খুবই খারাপ লাগে। কেউ চাইবে না, জাতীয় দলের বাইরে থাকতে। এটা আমার জন্য একটা শিক্ষা বলতে পারেন। প্রতিটি মানুষই জীবনের একটি সময়ে শেখে বলতে পারেন আমার তেমনই সময় যাচ্ছে। তার মানে তো এই না আমার সুযোগ নেই। আমার তো সুযোগ আছে অবশ্যই। এটা একটা বিরতি বলতে পারেন। যে সময়টা একজন অনেক কিছু শিখতে পারে এবং তারপরে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরতে পারে। চেষ্টা করছি সেই শিক্ষাটা নিয়েই তাড়াতাড়ি জাতীয় দলে ফিরতে। এবং এবার ফিরলে আর যেন বের হতে না হয়, সেই ভাবনাও আছে। এবং সেভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করছি।

সারাবাংলা: সেই প্রস্তুতিটা কেমন। মানে আরও মোটামুটি স্থায়ীভাবে ফিরতে কি কি করছেন?

সাব্বির: আমি নিজের টেকনিক্যাল দিকগুলো আগে ঠিক করছি। মানে যেখানে সমস্যা হত। ফিটনেসটা ধরে রাখার চেষ্টা করছি। যেসব কারণে আমি দল থেকে বাদ পড়েছি, যেসব কারণে ছোট রানকে বড় করতে পারিনি সেগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি।

সারাবাংলা: বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ৮টি ম্যাচ খেলেছে। কিন্তু আপনি দুটি ম্যাচের একাদশে জায়গা পেয়েছেন। কি মনে হয় সেজন্যই পারফরম্যান্স ভালো হয়নি? মানে বেশি ম্যাচে সুযোগ পেলে পারফরম্যান্স দেখানো যেত?

সাব্বির: দেখেন, একজন ক্রিকেটার তখনই পারফর্ম করতে পারবে যখন তার সুযোগ থাকবে। পর্যপ্ত সুযোগ না হলে পারফরম্যান্সটাও সীমিত হয়ে আসে। আমার জায়গায় যে খেলেছে (মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত) সে হয়তবা ভালো অপশন ছিল। বোলিং করেছে, ব্যাটিংও ব্যাটিংও করেছে। আমি যদি বোলিং পারতাম হয়তবা আরও বেশি ম্যাচ খেলতে পারতাম। তাই এখন চেষ্টা করছি বোলিংয়ের উন্নতি করা যায় কিনা। লংগার ভার্সন হোক বা লিমিটেড ভার্সন। আপনার হয়ত মনে আছে আমি অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ০ রানে প্লেড অন হয়েছি। খুবই দুর্ভাগা বলতে পারেন। । আর ভারতের সাথে ৩৬ রান করেছি। এই ম্যাচটাতে যেভাবে খেলছিলাম আউট না হলে ম্যাচটা জেতাতে পারতাম। ইচ্ছে ছিল বিশ্বকাপে সবগুলো ম্যাচ খেলার কিন্তু ভাগ্যক্রমে হয়নি। তবে এটা বলতে পারি, আমি আমার চেষ্টার ত্রুটি করিনি। অনেক সময় হয়, অনেক সময় হয় না। বলতে পারেন বিশ্বকাপে হয়নি।

সারাবাংলা: বিশ্বকাপের পরে শ্রীলঙ্কায় গেলেন। কিন্তু সেখানেও নিজেকে মেলে ধরতে পারলেন না। সবার সাথে আপনিও ব্যর্থ। কেন?

সাব্বির: শ্রীলঙ্কা সিরিজে আমি একটা ম্যাচে ৬৫ রান করেছি, একটা ম্যাচে ১২ রান করার পরে মুশফিক ভাই রান আউট করেছেন কিছু করার ছিল না। আর একটা ম্যাচে ভালো করিনি। তো আপনি চিন্তা করেন, ওই ম্যাচটায় যদি আউট না হতাম বড় রান হতে পারত। যেটায় ৬৫ করলাম সেটায় ১০০ কিংবা ১৫০ ও হতে পারত। কিন্তু হয়নি। কি আর করা। সময়টা ভালো যাচ্ছে না বলেই। ক্রিকেটে গুড টাইম ব্যাড টাইম দুটিই থাকে। আমার হয়ত ব্যাড টাইম যাচ্ছে।

সারাবাংলা: মাশরাফির চোখে আপনি বাংলাদেশের সেরা স্ট্রোক মেকার ব্যাটসম্যান এবং আপনার হাতে প্রচুর শটস। উনি আপনাকে দারুণ পছন্দ করেন। কি মনে হয় তার পছন্দের প্রতিদান দিতে পেরেছেন?

সাব্বির: দেখেন, প্রমাণ করতে পেরেছি বলেই উনি আমাকে দলে রাখতেন। যেক্ষেত্রে করতে পারিনি তখন আমার সময় খারাপ গিয়েছে। সব সময়ই তো ব্যাটসম্যানের পক্ষে ছয় চার মারা সম্ভব না। কিছু সময় আক্রমনাত্মক থাকতে হয় আবার কিছু সময় রক্ষণাত্মক। আমি হয়ত কিছু ম্যাচে রক্ষাণাত্মক হতে গিয়ে আউট হয়েছি। ওই যে বললাম, সময়টা আমার সাঙ্গে নেই। তার মানে কিন্তু এই না আমার সময় ভালো আসবে না। যেহেতু জাতীয় দলে ফিরতে উঠে পেড়ে লেগেছি, অবশ্যই ভালো সময় ফেরাতে পারব।

সারাবাংলা: ২০১৭ সালে চট্টগ্রামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আপনি ৬৬ রান করার পর নাথান লায়ন সংবাদ সম্মেলনে এসে বলেছিলেন, তিনি আপনার মধ্যে বিরাট কোহলির আগ্রাসন দেখেন। আপনার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে? খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। সেই সাব্বিরকে আবার দেখা যাবে?

সাব্বির: অবশ্যই দেখা যাবে। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ আছে যারা আপনাকে বদলে দিতে চেয়েছে। সমস্যাটা হয় তখনই। তারা যখন আপনাকে বদলে দিতে চাইবে তখন আপনার নিজস্বতা হারিয়ে যাবে। আপনি স্বাধীন মতো কাজ করতে পারবেন না। আপনি একজন সাংবাদিক। লেখালেখি আপনার কাজ। আজ আপনার বস বলল এভাবে লেখ, আবার কাল বলল এভাবে লেখ। কিন্তু তার মনে রাখা উচিত আপনার লেখার একটা নিজম্ব স্টাইল আছে। সেটা যখন তারা বদলে দিতে চাইবে তখন আপনাকে দিয়ে কিছুই হবে না। যা আমার ক্ষেত্রে হয়েছে। স্বাধীনতা নিয়ে খেলতে পারিনি। কেউ বলেছে এভাবে খেল আবার কেউ বলেছে ওভাবে। ফলে আমি সবকিছু গুলিয়ে ফেলেছি। কিছু মানুষকে ন্যাচারাল ট্যালেন্ট হিসেবে ছেড়ে দেওয়া উচিত। আমাকে কিন্তু হাথুরুসিংহে দলে নিয়েছিলেন। এবং ও আমাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছিল। কিন্তু সব কোচ তো স্বাধীনতা দেবে না। মাশরাফি ভাই আমাকে যেমন বোঝে অন্য কেউ তো তেমন বোঝে না। সে কারণেই হ-য-ব-র-ল হয়ে গেছে। বাকিটা আপনি বুঝে নেন।

সারাবাংলা: তিন ফরম্যাট মিলে ১২১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন কিন্তু সেঞ্চুরি মাত্র ১টা। সংখ্যাটি কিন্তু বেশ কম!

সাব্বির: জ্বি, অবশ্যই অনেক কম। আশাকরি সংখ্যাটি বাড়বে।

সারাবাংলা: আপনার অসংখ্যা ভক্ত আছে। তারা আপনাকে অনেক মিস করছে। তাদের জন্য কি বার্তা দেবেন?

সাব্বির: আপনারা ধৈর্য্য হারাবেন না। আপনাদের দোয়ায় খুব শিগগিরই জাতীয় দলে ফিরব।

সারাবাংলা: ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে কি লক্ষ্য নিয়ে খেলছেন?

সাব্বির: সেভাবে টার্গেট করিনি। তাছাড়া জাতীয় দলে ফেরার লক্ষ্য নিয়ে খেলাও উচিত না। তবে ইচ্ছে আছে এই মৌসুমের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হব।

বাংলাদেশ দলের হয়ে এখন পর্যন্ত টেস্টে ১১টি ম্যাচ খেলেছেন সাব্বির। ২২ ইনিংসে ব্যাট হাতে ৪টি অর্ধশতকে রান সংখ্যা ৪৮১। সাদা পোশাকে খুব বেশি নিজেকে মেলে ধরতে না পারলেও রঙিন পোশাকে বেশ ভালো ছিল আগ্রাসী এই ব্যাটসম্যানের। ওয়ানডেতে ৬৬ ম্যাচে ১টি শতক এবং ৬টি অর্ধশতকে রান সংখ্যা ১ হাজার ৩শ ৩৩। আর ক্রিকেটের স্বল্প দৈর্ঘ্যের ফরম্যাট টি-টোয়েন্টিতে ৪৪ ম্যাচে প্রায় ১২১ স্ট্রাইক রেটে রান সংখ্যা ৯৪৬, সঙ্গে আছে ৪টি অর্ধশতকও।

সারাবাংলা/এমআরএফ/এসএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন