বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালের ১ দশক: ৪১ মামলার রায় হলেও নেই সাক্ষী সুরক্ষা আইন

মার্চ ২৫, ২০২০ | ৮:৫২ পূর্বাহ্ণ

আব্দুল জাব্বার খান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে হত্যা, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার এক দশক আজ। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। এই ১০ বছরে ট্রাইব্যুনালের ৪১টি মামলার রায়ে ৭০ জনের মৃত্যুদণ্ড হলেও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়নি। তাদের জন্য নেই কোনো সাক্ষী সুরক্ষা আইন। ফলে সাক্ষীদের শঙ্কায় কাটছে দিন। কোনো আইন না থাকায় তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তদন্ত সংস্থাও। বার বার সরকারের কাছে সাক্ষী সুরক্ষা আইনের দাবি করেও তেমন সাড়া পাচ্ছে না তারা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার এক দশক উদযাপনের প্রাক্কালে এমন দাবির কথাই জানিয়েছেন তদন্ত সংস্থার প্রধান।

বিজ্ঞাপন

তবে ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার এক দশকে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল যে উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল তার অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। আরও বাস্তবায়নের পথে আছে।’ এই ১০ বছরে ট্রাইব্যুনালের সাফল্য আশানুরূপ বলেও তিনি জানান।

আপিল বিভাগের সাবেক এই বিচারপতি বলেন, ‘দেশের মানুষের যে ধরনের আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ট্রাইব্যুনালের দাবি করেছিলেন, সে ফলাফল তারা পেয়েছেন। এখনও যেসব মামলা বিচারাধীন আছে সেগুলো শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল আর পূর্ণতা পাবে। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধসহ অনেকের বিরুদ্ধে গণহত্যারও অভিযোগ ছিল, যা ট্রাইব্যুনালের রায়েও প্রমাণিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অপ্রতুল জনবল এবং অবকাঠামোগত সংকট নিয়ে এতো অল্প সময়ে এতোগুলোর মামলার রায়কে অবিস্মরণীয় সাফল্য হিসেবে দেখছেন তদন্ত সংস্থার প্রধান আব্দুল হান্নান খান। তবে সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকায় ভবিষ্যতে সাক্ষী রক্ষায় বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে বলেও তিনি জানান।

আব্দুল হান্নান খান বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত শতভাগ সক্ষমতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে তদন্ত সংস্থা। আমাদের দেওয়া প্রত্যেকটি মামলার প্রতিবেদন অনুযায়ী আসামিদের সাজা হয়েছে। শুধু তাই নয় শতভাগ সাজা হয়েছে। এটাই আমাদের তদন্ত সংস্থার অর্জন। জনবল সংকট নিয়েও আমরা ১০ বছরে বেশ সাফল্য অর্জন করেছি।  এই ১০ বছরে ট্রাইব্যুনাল থেকে ৪১টি মামলার রায় হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ছিল ৯৬ জন; যার মধ্যে ৭০ জনেরই মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে। তবে বর্তমানে আমরা সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে বেশি চিন্তিত।’

তিনি জানান, ১০ বছরে বিভিন্ন মামলায় চারশ’ সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আমাদের সাক্ষীরা অত্যন্ত গরিব। অনেক সময় দেখি আসামিরা দুতলা-তিনতলা বাড়িতে থাকে। অথচ সাক্ষীদের কুঁড়ে ঘরও নেই। অনেক সময় আমাদের সাক্ষীদের নিয়ে প্রশাসনের লোকেরাও টিটকারি দেয়। এই ক্ষেত্রে সাক্ষীদের সুরক্ষা জরুরি।

তদন্ত সংস্থার প্রধান বলেন, ‘বিত্তশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও এসব ভিকটিমের পরিবারের সাহায্যে এগিয়ে আসে না। তাদের প্রতিটি ক্ষণ কাটে আতঙ্কে। সাক্ষীরা ফোন দিয়ে না না অভিযোগ করেন। একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে অপরাধীর সাজা হয়। এ কারণে সাক্ষীদের ওপর সব সময় একটি বাড়তি চাপ থাকে। যে কারণে আমাদের সাক্ষী পেতে অনেক কষ্ট হয়। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য সাক্ষী সুরক্ষা আইনটি এখন সব থেকে বেশি জরুরি। অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে না হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জন্য এটি বড় প্রয়োজন।’

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের জ্যেষ্ঠ সদস্য প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘১০ বছরে ট্রাইব্যুনাল থেকে উল্লেখযোগ্য মামলার রায় এসেছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা অনেকটা এগিয়ে আছি। তাতে আমরা সন্তুষ্ট।’

তবে একাত্তরের পাকিস্তানি সৈন্যদের বিচার না করার একটা আক্ষেপ রয়েছে জানিয়ে এই প্রসিকিউটর বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল থেকে অনেকগুলো মামলার রায় হলেও পাকিস্তানি সৈন্যদের বিচারের বিষয়টি আনা যায়নি। আর সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচারের বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভির করছে।’

যুদ্ধাপরাধ বিচার শেষ করতে নতুন একটি পদ্ধতিকে বেছে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি উপজেলায় একটি মামলার মাধ্যমে ওই উপজেলার সব মানবতাবিরোধীদের সাজার আওতায় আনার জন্য নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। এতে মামলা সংখ্যা কমে আসবে, আসামির সংখ্যা বাড়বে এবং দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি হবে।’

আপিল বিভাগের মামলা জমে থাকা মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল যদি চান তাহলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা আপিলের মামলার ক্ষেত্রে সবধরনের সহযোগিতা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন।’

তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সদস্য সানাউল হক বলেন, ‘মুজিববর্ষ পালন এবং ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার ১০ বছর উপলক্ষে ঢাকাসহ সাতটি বিভাগীয় শহরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সংক্রান্ত বিষয়ে জনগণের মতামত নিতে গণশুনানির পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের অর্জন ও জনগণের প্রত্যাশা বিষয়ে মতামত গ্রহণ করা হবে।’

১০ বছরে ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার বিরাট অংশ পূরণ হয়েছে এমন দাবি করে তিনি বলেন, ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে উত্তরণ ঘটেছে। আমরা চেষ্টা করেছি, আমাদের শ্রম, মেধা, অভিজ্ঞতা দিয়ে যতদূর সম্ভব আশা পূরণ করার। এই ১০ বছরে আমরা যথেষ্ট কাজ করেছি। তবে আমাদের কাছে যে পরিমাণ অভিযোগ এসেছে জনবল সংকটের কারণে তা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা যায়নি। তারপরও যা হয়েছে, তা প্রধানমন্ত্রীর একনিষ্ঠ সমর্থনের কারণেই সম্ভব হয়েছে।’

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। প্রথমে একটি ট্রাইব্যুনাল থাকলেও বিচার কাজে গতি আনতে ২০১২ সালের ২২ মার্চ আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এরপর দুজন বিচারপতির নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ নাম নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু হয়। এরপর ট্রাইব্যুনালে মামলার সংখ্যা কমে এলে ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দুটি ট্রাইব্যুনালকে একীভূত করে আবার একটি করা হয়। এরপর থেকে একটি ট্রাইব্যুনালে বিচার কাজ চলছে।

বর্তমানে বিচারপতি শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চলছে। এদিকে প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এখন পর্যন্ত ৪১টি মামলায় ৯৬ জনের বিরুদ্ধে রায় হয়েছে। রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ আছে আরও একটি মামলা। বিচারাধীন মামলা রয়েছে ৩৫টি। আর এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ২২২ জন। এছাড়া আপিলে নিষ্পত্তি হয়েছে ১০টি মামলা। যার মধ্যে ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ড পেয়ে বর্তমানে আপিলে বিচারের অপেক্ষায় আছে ৩০ জন। তারা হলেন: জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম (এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে), জাতীয় পার্টির নেতা সৈয়দ মো. কায়সার, মোবারক হোসেন (আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা), অব্দুল জব্বার, মাহিদুর রহমান, সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টার, খান মো. আকরাম হোসেন, ফোরকান মল্লিক, ওবায়দুল হক (তাহের), আতাউর রহমান ননী, মজিবুর রহমান (আঙ্গুর মিয়া), মহিবুর রহমান ওরফে বড় মিয়া, সামসুদ্দিন আহম্মেদ, শামসুল হক, এস এম ইউসুফ আলী, মো. সাখাওয়াত হোসেন, বিল্লাল হোসেন, মো. মোসলেম প্রধান, মো. আব্দুল লতিফ, ইউনুছ আহমেদ, আমীর আহম্মেদ ওরফে আমীর আলী, মো. জয়নুল আবেীদন, মো. আব্দুল কুদ্দুস, হামিদুর রহমান আজাদ, এ গনি ওরফে এ গনি হাওলাদার, মো. রিয়াজ উদ্দিন ফকির, মো. আকমল আলী তালুকদার, মো. ইসহাক সিকদার, মো. আব্দুল কুদ্দুস ও মো. মাহবুবুর রহমান।

এর মধ্যে জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের আপিলটি গত ৩১ অক্টোবর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়। এখন রিভিউয়ের পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে তদন্ত সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, তদন্তাধীন আছে ২৮টি মামলা। যার আসামি সংখ্যা ৪০ জন। তদন্ত সংস্থার কাছে অভিযোগ জমা রয়েছে ৬৯০টি।

সারাবাংলা/এজেডকে/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন