বিজ্ঞাপন

রাহু মুক্তি

মার্চ ২৬, ২০২০ | ৩:৫১ অপরাহ্ণ

প্রতিবছর পঁচিশে মার্চ এলেই আমি যেন ফিরে যাই আমার ফেলে আসা কৈশোরের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে। কানে বাজে সেই ভয়ানক আর্তচিৎকার, ‘মিলিটারি আইছে’!

বিজ্ঞাপন

পঁচিশে মার্চ রাতে ঢাকায় পাক মিলিটারির অতর্কিত আক্রমণের পরে জেলাশহর বরিশালের জনজীবনও কাটছিল আতঙ্কের মধ্যে। সারাক্ষণই চাঁপা আতঙ্ক। আতঙ্কিত মানুষগুলোকে সামান্য একটা শব্দও দিশেহারা করে দিত। এতগুলো বছর চলে গেছে। তবুও চোখ বুজলেই সেই দৃশ্যগুলো আজও চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

প্রতিদিনই সময়-অসময়ে এমনি আর্তচিৎকার পাড়ার থম ধরা গুমোট বাতাসকে ভেঙে খানখান করে দিত। কেউ হয়তো বললো, ‘আমি এইমাত্রই দেইখ্যা আইলাম স্টিমার বোঝাই পাকিরা আইতাছে। দূর থাইক্যা দ্যাখলাম তাগোর বন্দুকের নলগুলা উঁচা কইরা ধইরা হেরা খাড়াই রইছে।’ এইধরনের খবরগুলো চাউর হতে সময় লাগে না। চারিদিকে হুড়োহুড়ি, দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যায়। যে যেদিকে পারে দৌড়ে লুকনোর চেষ্টা করে। আমরা বাসার ভেতরেই ঘরের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় লুকিয়ে পড়ি। আব্বার নিষেধ ছিল, মিলিটারি আসার খবরে বিভ্রান্ত হয়ে আমরা যেন বাইরে গিয়ে ছুটাছুটি না করি। আমরা সাত ভাইবোন। সবাই খুব ছোট। দাদা-দাদিও আছেন আমাদের সাথে। আব্বা বলতেন,‘মরতে হয় ঘরে বসে একসাথে মরব। রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করে পায়ের নিচে চাপা খেয়ে নয়।’

বিজ্ঞাপন

মানুষ পালিয়ে যাবে কোথায়? কোথাওতো নিরাপদ নয়। আমাদের লুকিয়ে থাকার জায়গাটা ছিল ডাইনিং রুমে। ছয় চেয়ারের ডাইনিং টেবিলটিকে ঘরের এক কোনায় নিয়ে বসানো হয়েছিল। মিলিটারি আসছে শুনলেই ঐ টেবিলের নিচটাকেই ছোটখাট দূর্গ মনে করে আমরা নিশ্চিন্তে ঝটপট লুকিয়ে পড়তাম। মিলিটারি ঘরে ঢুকলে যাতে আমাদের দেখতে না পায়। একটি মোটা লেপ সেখানেই রাখা থাকত। আমরা লেপের নিচে লুকাতাম। টেবিলের উপর বড় ঝুলের টেবিলক্লথ দিয়ে ঢাকা যাতে টেবিলের নিচের কিছু বাইরে থেকে চোখে না পড়ে। অনেকক্ষণ সেখানে অপেক্ষা করার পর, মিলিটারির কোন শব্দ না পেয়ে আমরা বের হয়ে আসতাম। দরজা-জানালার ফাঁকফোঁকর গলে বাইরে তাকালে চোখে পড়ত সামনের রাস্তাটিতে অসংখ্য নারী-পুরুষ-শিশুদের জুতা স্যান্ডেল বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। প্রাণ ভয়ে দৌড়ে পালাতে গিয়ে অনেকেই অন্যের পায়ের চাপা খেয়ে ক্ষতবিক্ষত হত।

এপ্রিলের ২৫ তারিখে শহরে মিলিটারি এলে আমরা আমাদের বাড়িওয়ালার গ্রামের বাড়ি ‘জাগুয়া’য় চলে এলাম। বাড়ির অন্যান্য শরীকরাও সবাই গ্রামে ফিরতে শুরু করল। নিভৃত গ্রামের বাড়িঘর অচিরেই লোকারণ্য হয়ে উঠল। বাড়ি ভর্তি লোকজনের জন্য সকাল থেকেই শুরু হত রান্নাবান্নার আয়োজন। উঠোনের এক কোণে দুটো মাটির চুলায় বড় বড় হাড়িতে ভাত-ডাল, আলুসিদ্ধ চড়িয়ে দেয়া হত। সেসব খাবারের স্বাদ ছিল অমৃতের মত। একবেলা খেয়ে আমরা পরের বেলার খাওয়ার অপেক্ষায় থাকতাম।
সেখানে অবশ্য আমাদের বেশি দিন থাকা হল না। আব্বা ছিলেন একটি সরকারি ব্যাংকের ম্যানেজার। আব্বা খবর পেলেন মিলিটারি এবং মুক্তিবাহিনী দু’দলই তাঁকে খুঁজছে। যুদ্ধব্যায় বহনের জন্য উভয় দলেরই প্রচুর টাকার প্রয়োজন। আব্বা বুঝতে পারলেন, এখন মুক্তিযোদ্ধাদের টাকা দিলে মিলিটারিরা এসে গুলি করে মারবে। আবার মিলিটারিদের দিলে দেশের সাথে বেঈমানি করা হবে। তাই যত দিন সম্ভব পালিয়ে থাকাই শ্রেয়।

এইসময় আমার আর ছোটবোনের জন্ডিস ধরা পড়ল। আব্বা-মা খুব বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। আমাদের জাগুয়ায় থাকাটাও আর নিরাপদ রইল না। আমরা জাগুয়া থেকে গেলাম ‘রায়ের কাঠি’ গ্রামে। ব্যাংকের পিয়ন আমাদেরকে তার বাড়িতে আশ্রয় দিলেন। একদিন পুকুরঘাটে গোসল করছি, হঠাৎ শুনতে পেলাম লোকজনের আতঙ্কিত চিৎকার। ভিজে শরীরেই দৌড়ে বাড়িতে এসে দেখি পুরো বাড়ি জনশূন্য। উঠোনে বিক্ষপ্তভাবে জিনিসপত্র পড়ে আছে। চুলার উপর কড়াইতে তখনো মাছ ভাজা হচ্ছে। বাড়ির বিড়ালটি ইলিশ ভাঁজার গন্ধে চুলার পাশেই লোভাতুর চোখে ভাঁজা মাছের দিকে তাকিয়ে আছে। খালি বাড়িতে আমি একা। আতঙ্কে কাঁদতে শুরু করলাম। আমাকে ফেলে গেছে বুঝতে পেরে কিছুক্ষণ পরেই মা ভাইবোনদের নিয়ে মিলিটারির ভয় তুচ্ছ করে ফিরে এলেন।

আমাদের দু’বোনের জন্ডিস আরও তীব্রতর হল। সাথে ডায়রিয়া। জমে-মানুষে টানাটানি চলছে। শরীর কংকালশার। চোখ কোটরাগত। এদিকে আশপাশে মিলিটারির আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। কোথাও কোন ডাক্তার নেই। মা দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে গেলেন। আব্বা যত দ্রুত সম্ভব বরিশাল শহরে যেয়ে ডাক্তার দেখানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। আমরা আবার শহরে ফিরলাম। ব্যাংকের ডাক্তার বাসায় এসে আমাদের দেখলেন। দু’বোনের জন্য ওষুধ আর স্যালাইনের ব্যবস্থা করলেন। আমাদের শরীরে প্রাণ ফিরে আসতে শুরু করল।

একদিন মিলিটারিরা হঠাৎ বাসায় এসে ব্যাংকের ভল্টের চাবিসহ আব্বাকে ধরে নিয়ে গেল। আমাদের বাসায় মরাকান্না শুরু হল। হেডক্যাশিয়ার সাহেবকেও ধরে আনা হয়েছিল। দুজনের দিকে বন্দুক ধরে ভল্ট খোলানো হল। টাকাপয়সা ও সোনাদানা যথাযথভাবে পাওয়ায় বন্দুক নামানো হল। আব্বা আবার বাসায় ফিরে এলে আনন্দে আমরা কাঁদতে লাগলাম।

আমাদের ঘরবন্দী জীবন চলছে। চারিদিকে মিলিটারি গিজগিজ করছে। নিজ দেশে আমাদের স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার নেই। দাদা প্রতিবার নামাজের পর ‘আয়াতুল কুরসি’ পড়ে আমাদের গায়ে ফুঁ দেন। যাতে আমাদের ধারে কাছে কোন বিপদ আসতে না পারে।

আব্বা ঘরে ফিরলে সবাই আব্বাকে ঘিরে বসি। দুরু দুরু বুকে আব্বার কাছে বাইরের জগতের ঘটনা শুনি। একসময় লোকজন গ্রাম থেকে আবার শহরে ফিরতে শুরু করল। মিলিটারিরা গ্রামে গ্রামে ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করেছে। চলছে লুটপাট, আগুন দেয়া। পুরুষদের ধরে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলছে। মেয়েদের ধরে নিয়ে ক্যাম্পে আটকে রেখে ধর্ষণ ও নির্যাতন করছে। গ্রামগুলো তছনছ হয়ে যাচ্ছে। সীমান্তের মানুষ প্রাণ বাঁচানোর জন্য বাড়িঘর সহায়সম্বল ছেড়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে। এই হিংস্র হায়েনাদের সারথি হচ্ছে আমাদেরই কিছু নেমকহারাম বাঙালি। তারা নিজের লোকদের ক্ষুধার্ত হায়েনার মুখে তুলে দিয়ে বাহবা নিচ্ছে।

আমরা প্রতি সন্ধ্যায় গোপনে ‘স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র’র খবর শুনতাম। ‘চরমপত্র' এবং ‘জল্লাদের-দরবার’ অনুষ্ঠান শোনার জন্য সবাই গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। দাদি রেডিওটির সাউন্ড খুব কমিয়ে হাতে নিয়ে বসতেন। যাতে বাড়ির বাইরে আওয়াজ যেতে না পারে। বাঙালিদেরই একটা গ্রুপ গোপনে খোঁজ-খবর নিয়ে স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের মিলিটারিদের কাছে ধরিয়ে দিত। উৎকণ্ঠায় আমাদের গলা দিয়ে খাবার নামতে চাইতো না। সন্ধ্যা হলেই কোনরকমে খাওয়াদাওয়া শেষ করে, বাতি নিভিয়ে চুপচাপ বসে থাকতাম। কথা বলতাম ফিসফিস করে। আব্বা বলতেন, ‘খুব সাবধান! দেয়ালেরও কান আছে। ওদের কানে গেলে বাড়িতে এসে ধরে নিয়ে যাবে।’

একদিকে মহাদূর্ভিক্ষ্য, অন্যদিকে প্রাণের ভয়। যোগাযোগ ব্যাবস্থাও ভঙ্গুর। চালের দাম বেশি বলে আমরা দু’বেলা রুটি খাই। দুপুরবেলা খেতে বসে দেখি বাড়ির সামনে ভিক্ষুকের লাইন। একমুঠো ভাত বা চালের জন্য সেকি আহাজারি। এসব দেখে গলা দিয়ে ভাত নামতো না। অগুণতি ঘরহারা, ক্ষুধার্ত মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে ভীড় করতে শুরু করেছে। একদিন শহরের মানুষগুলোও প্রাণভয়ে গ্রামে গিয়ে এমনি ভীড় করেছিল। আমরা দরজা বন্ধ করে খেতে বসতাম। দরজার ওপাশে সারাক্ষণ করাঘাত চলতে থাকতো। আব্বা বলতেন, ‘আমাদের জন্য রাতে তবুওতো দুটো রুটি হবে, কিন্তু এই বেচারিদেরতো সেই আশাও নেই।’ তারপর দরজা খুলে ওদের গামলায় খাবারটা ঢেলে দিতেন। মা অসহায় মুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন।

মা গ্রাম থেকে আসা মানুষদের খেতে দিয়ে চুপিচুপি গ্রামের অবস্থা জানতে চাইতেন। তাদের বর্ণনা এত লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক যে কানপেতে শোনাও কষ্টকর ছিল। অনেক বুড়ো মা-বাবা তাদের জোয়ান মেয়েদের সাথে নিয়ে আসত। বলতো, ‘গ্রামে এগোরে কই রাখমু মা? বাড়ি-গরতো আর নাই’। অনেক মহিলারা পরিচয় লুকাতে চাইতো। পরে কাঁদতে কাঁদতে বলত, ‘মাগো, আমি হিন্দু। এহন পরান বাঁচানের লাইগ্যা, মিলিটারির ডরে মুসলমান সাজছি।’ কেউবা মেয়ের ব্লাউজ খুলে দেখাতো সারা গায়ে কামড়ের চিন্হ। স্তনের বোঁটাসহ কোথাও কোথাও দগদগে ঘাঁয়ে পচন ধরেছে। তারা আহাজারি করে বলতো, ‘দেহেন মা, কুত্তাগুলায় ক্যামনে আমার মাইয়াডারে খুবলাইয়া খাইছে। তাও কালাকুলা হাড্ডিসার দেইখ্যা ওরে ফালাইয়্যা থুইয়া গ্যাছে। সুন্দর মাইয়্যাগুলিরেতো গাড়ি ভইরা লইয়া গ্যাছে। কী নরক যাতনা যে হ্যারা বোগ করতাছে মা হেইডা চিন্তায় আনা সম্ভেব না!’

এভাবেই কাটছিল আমাদের দিনরাত্রি। উপর দিয়ে সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। কিন্ত ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড চোরাস্রোত বয়ে যাচ্ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের সহায়তায় সুসংগঠিত হচ্ছিল। তারা চোরাগুপ্তা আক্রমণ চালাতো। এদিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা গ্রামের পর গ্রাম ম্যাসাকার করে দিচ্ছিল। সহযোগী দালালরাও বসে নেই। তারা প্রভূদের খুশি করার জন্য ‘মুক্তি হটাও’ শ্লোগান তুলে তলে-তলে প্রচুর মানুষকে আটক করে বিভৎস খেলায় মেতে উঠল। এর শেষ কবে, কীভাবে হবে কেউ জানতো না। তবুও ক্ষীণ আশা, হয়তো একদিন দেশ রাহুমুক্ত হবে। আমরা রঙিন পতাকা হাতে রাস্তায় নামবো।

স্কুল বন্ধ। দাদি পুরনো শাড়ি দিয়ে আমাদের কাঁথা সেলাই শেখাতেন। একদিন মা চওড়া লাল পাড়, লাল আঁচলের একটি সবুজ শাড়ি বের করল। দাদা শাড়িটি দেখে বললো, ‘বৌমা, এই শাড়িটা আমারে দেও। আমি এইটা দিয়া আমাগো দ্যাশের নতুন পতাকা বানামু। লাল সবুজ পতাকা!’

প্রবল উৎসাহ, উত্তেজনা নিয়ে আমাদের পতাকা তৈরি হল। আফসান দিয়ে সোনালি মানচিত্রও আঁকা হল। আব্বা পতাকা দেখে খুব খুশি হলেও বললেন, ‘এই পতাকা ঘরে রাখাতো বিপদজনক হবে। মিলিটারিরা জানতে পারলে বাসায় এসে সবাইকে গুলি করে মারবে’। কিন্তু সদ্য তৈরি পতাকাটি নষ্ট করতে কারুরই মন চাইল না। আমরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও পতাকাটি লুকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম।

ভাগ্যের হাতে জীবন সঁপে দিয়ে আমরা একেকটি দিন পার করছি। প্রতিটি সকাল যেন আমাদেরকে একটি নতুন জীবন উপহার দেয়। ওঁৎ পেতে থাকা বিভৎস মৃত্যুকে এড়িয়ে আমরা আরও একটি দিন বাঁচার আনন্দে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। যুদ্ধের বিভৎসতা ভুলে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখি। আব্বার করুন মুখে আমরা আমাদের পরাধীন জীবনের ছায়া দেখি। আব্বা ভীষন কষ্টে, অপমানে সংকুচিত হয়ে বলেন, ‘আমি কী করবো? আমার যে হাতপা বাঁধা, এতগুলো ছোট ছোট বাচ্চা, বুড়ো বাবা-মা, এদের ফেলে কোথায় পালাবো? তোমরাই আমার দেশ। তোমাদের বাঁচানোর চেষ্টাই আমার যুদ্ধ। দেশ একদিন নিশ্চয়ই স্বাধীন হবে, আমি পালাবো না। আমি পালিয়ে যুদ্ধে গেলে মিলিটারিরা আমার পুরো পরিবারকে মেরে ফেলবে।’

কিন্তু আব্বা সবাইকে বাঁচাতে পারলেন না। মৃত্যু এলো অত্যন্ত আকস্মিকভাবে। দাদা শখ করে
মাঝেমধ্যে নিজে বাজার করতে চাইতেন। সেদিনও সকালে বাজারে যাবার জন্য বাসা থেকে বের হলেন। হঠাৎ করেই গলির মুখে একটা গাড়ির প্রচন্ড গতিতে ব্রেককষা এবং মানুষের আহাজারির শোর উঠলো। আব্বা দৌড়ে সদর রাস্তায় গেলেন। গিয়ে দেখলেন তার পিতার রক্তাক্ত নিথর দেহ রাস্তায় পড়ে আছে। আব্বা রাস্তায় বসে পড়ে তার বাবার মাথাটি তুলে কোলে নিলেন। তারপর কারো সাহায্যে ধরাধরি করে দাদাকে একটি রিকশায় তুলে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলেন। রাস্তার পাশে তখনো ঘাতক গাড়িটি দাঁড়িয়েছিল। দ্রুতগামি গাড়ির চালক একজন পাকিস্তানি মেজর। দাদা রাস্তা পেরোতে গেলে দ্রুতগামী জীপটি দাদাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। রিকশায় আব্বার সারা শরীর তার বাবার রক্তে ভিজে যাচ্ছিল। তিনি দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তার দু’চোখ বন্ধ, মুখ থেকে শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে সাথে বুদবুদের মত রক্ত বের হচ্ছে। হাসপাতালে পৌঁছালে ডাক্তাররা জানালো, তিনি আর বেঁচে নেই। ছেলের কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন পিতা। দাদার আর স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা উড়ানো হল না। তবুও আমরা বেঁচে থাকলাম; নতুন স্বপ্ন দেখবো বলে!

৮ ডিসেম্বর সকাল থেকে কারফিউ শুরু হল। সারারাত সবাই প্রচন্ড উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করলাম। না জানি কী হবে! হয়তো ওরা বাড়ি বাড়ি ঢুকে মানুষ মারতে শুরু করবে। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা দরজা-জানালার ফাঁক-ফোকর দিয়ে বাইরের পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করলাম। দেখা গেল, শহরবাসীদের হতবাক করে দিয়ে পাকবাহিনী তাদের তল্পি-তল্পা গুঁটিয়ে সারিবদ্ধভাবে সদর রাস্তা ধরে লঞ্চঘাটের দিকে চলেছে। লোকজন উঁকি-ঝুঁকি মেরে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছে। কারফিউ থাকায় বের হতেও ভয় পাচ্ছে। তবে ওরা যে ফিরে যাচ্ছে তা জলের মত পরিস্কার হয়ে গেল।

আমরা জানালা খুলে ভালো করে বাইরে দেখার চেষ্টা করলাম। আশেপাশের দু’একটি বাসার ছাদে ধীরে ধীরে লোকজন জড় হচ্ছিল। তাদের কারও কারও হাতে তখন ছোট ছোট লালসবুজ পতাকা। কিছুক্ষণ যেতেই অনেক বাড়ির জানালায় বড় পতাকাও উড়তে শুরু করল। বেলা বারতেই লোকজন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে পতাকা হাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। আমরাও দৌড়ে গিয়ে আমাদের লুকিয়ে রাখা পতাকাটি বের করে জানালায় উড়িয়ে দিলাম। এমন একটি কাঙ্খিত আনন্দের দিনেও আমাদের কারও চোখ শুকনো রইলো না। আমরা স্বাধীনতা পাবার প্রবল আনন্দে, আর পতাকা-নির্মাতা মানুষটিকে হারানোর কষ্টে কাঁদতে লাগলাম।

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন