বিজ্ঞাপন

উই হ্যাভ আ ব্যাটল টু উইন…

March 31, 2020 | 12:59 am

রফিকউল্লাহ রোমেল

যেকোনো বাস্তবসম্মত স্ট্যাটিসক্যাল ডেটা স্পষ্টভাবে বলছে, আমাদের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর দুই সপ্তাহ আসলে শুরু হয়ে গেছে একদিন আগেই। সরকারি কোনো তথ্যকে চ্যালেঞ্জ জানানোর কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। অন্য প্রায় সব দেশের মতো এবং আমাদের দেশের মানুষগুলোর মতো আমাদের সরকারও কিছু ভুল নিশ্চয়ই করেছে। বা এখনো হয়তো করছে। কিন্তু দেয়ার ইজ অলওয়েজ হোপ।

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালে প্রতিটি ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ে সংযুক্ত হবেন। এর আগে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রীর সঙ্গেও তার বসার কথা আছে। সেই বৈঠক বা ভিডিও কনফারেন্স থেকে নিশ্চয় কোনো নির্দেশনা উঠে আসবে। সবার জন্য না হলেও অন্তত প্রশাসনের জন্য তো বটেই। সে নির্দেশনা যাই আসুন, আমাদের একটাই এবং একটাই অনুরোধ— সারাদেশের মানুষ আরও ১০টা দিন যেন কোনোভাবেই ঘরের বাইরে না যায় এবং একশ’র ওপর দেড়শ ভাগ গাইডলাইন অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন।

পর পর দু’দিন কোনো সংক্রমিত রোগী পাওয়া যায়নি বা এরও পরদিন ‘মাত্র’ একজন রোগী শনাক্ত হয়েছে— এ তথ্যে খুশি হওয়ার মতো কিছু নেই। সেটা যারা ফেসবুকে বসে হাতিঘোড়া মারেন, তারা সবাই জানেন। তারা পরিবার-পরিজনসহ লকডাউনে নেটফ্লিক্স, ‘আপনি আমারে কেমনে চিনতেন’ টাইপ ফেসবুক গেম, হোয়াটসঅ্যাপে আন্তঃমহাদেশীয় চ্যাটিংসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভালোই আছেন। যেহেতু তারা ট্যাক্স দেন এবং বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে সচেতন নাগরিক, সেই কারণেই নাগরিক দায়িত্ববোধ থেকেই সরকারের টানা সমালোচনা করে যাচ্ছেন। সেটাও ঠিক আছে। প্রায় সব দেশেই ব্যাপার এমনই। সরকার সমর্থকদেরও এসব নিয়ে রাগ বা দুঃখ করার কিছু নেই। কিন্ত এতে করে যেন আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে ফ্রন্টে যারা যুদ্ধ করছেন, তাদের প্রোপার স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

মূল কাজটি শুরু হতে পারে সকালে প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরেই। ঢাকার বাইরে এক্স্যাক্টলি কত লোক চলে গিয়েছে, তার তথ্য আছে। নিজের সরাসরি সম্পৃক্ততা থেকেও বলছি, বাংলাদেশ হলেও ‘বিগ ডেটা’ সিংকে আমরা পিছিয়ে নই। মোবাইল কোম্পানি, এটুআই এবং বিভিন্ন ‘বলতে পারছি না’ এজেন্সিগুলো সর্বোচ্চ সতর্কতায় এবং খুব দ্রুত সময়ে বিগ ডেটা ফেচ করছে। কাজেই কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ে আমরা হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকার মতো কোনো অবস্থানে নেই। আর সে তথ্যটি বের করে ঢাকার বাইরে কতটা ‘ভালনারেবল’ জনগোষ্ঠী আছে, তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ঠিকঠাক যাওয়া উচিত।

মনে রাখতে হবে, এই ‘ভালনারেবল’ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ কোনোভাবেই ফেসবুক বা অন্য সোস্যাল মিডিয়ার গ্রাহক নন। কিন্তু তারাও মূলধারার খবর থেকে জানেন, ‘যথেষ্ট পরিমাণে’ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হননি। সেক্ষেত্রে ‘আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কোনো রোগই ছড়ায় না’, ‘গরম বাড়লে করোনা আর বাঁচে না’, কিংবা ‘যে রোগী দুই দিনে বাড়েনি, তা আর বাড়বে না’— এরকম বিষয়গুলো আবার সামনে চলে আসতে পারেব। তখন মানুষকে আটকানো প্রচণ্ড কঠিন হয়ে যাবে। আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া রোগ ছড়াবে না বুঝলাম। কিন্তু আল্লাহ যে নির্দেশ দেননি, সেটার নিশ্চয়তা কে দিচ্ছে? এই প্রশ্নটিও তো অনেকের মাথায় আসবে না! কাজেই ডিসিদের সঙ্গে বৈঠক থেকে প্রধানমন্ত্রীকেই নির্দেশ দিতে হবে। সুস্পষ্ট, কঠোর ও ও নির্দেশনামূলক।

বিজ্ঞাপন

এই সপ্তাহটি যেহেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কোনোভাবেই এবং কোনোভাবেই যেন সারাদেশে মানুষ ঘর থেকে বের না হয়। সেজন্য সেনাবাহিনীর সহায়তা নিয়ে জেলা প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এর সঙ্গে  সাথে অন্য কাজগুলো তো আছেই।

পাবলিক হেলথের ম্যানেজমেন্ট এগুচ্ছে, কিন্তু ধীরে। সেখানে কিছু ডিনায়াল দেখি। সবকিছু প্রধানমন্ত্রী একা দেখতে পারবেন না, সম্ভবও না। এ জন্য যারা চেয়ারে আছেন, তাদের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন বাস্তবসম্মত হতে হবে। ডাক্তারদের কাছে পিপিই (পারসোনাল প্রটেকশন ইক্যুইপমেন্ট) পৌঁছাতে শুরু করেছে। কিন্তু হাসপাতালের আইসিইউ আর হসপিটাল গ্রেড পিপিই-ই সব না। রেজিস্টার্ড এক লাখ ২০ হাজার ডাক্তারকে জেনুইন গ্রেড পিপিই দেওয়া প্রয়োজন। যেগুলো বিজিএমই বা লোকাল কারখানাগুলো তৈরি করছে কিংবা জ্যাক মা প্লেনে করে পাঠিয়েছে, সেসব পিপিই নয়, একেবারে জেনুইন গ্রেড পিপিই দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

আর ‘টেস্ট টেস্ট টেস্ট’ তো আছেই। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এটারই। ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। আইইডিসিআর তার প্রসিডিউরে ভুল করেনি, প্রসিডিউর ক্লিয়ার। কাজেই মিথ্যা বলছে বা বানিয় বলছে— এরকম ভাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আইইডিসিআর-ই যখন বলছে, তাদের প্রতিদিন হাজার টেস্ট করার সক্ষমতা রয়েছে, তাহলে কেন প্রতিদিন আরও বেশি টেস্ট করা হচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার আমাদের আছে। জানানোর কাজটা যারা করবেন, তাদের আরও হোমওয়ার্কের প্রয়োজন আছে। আমরা বিশ্বাস হারাইনি। কিন্তু যুদ্ধাবস্থায় প্রতিদিন নিজেদের চ্যালেঞ্জ করতে হবে।

ভেন্টিলেশনসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতায় বড় ধরনের পুশ লাগবে। এই জায়গাটিতে নিজেদের সব প্রচেষ্টা কাজে লাগানো উচিত। আইসিডিডিআর,বি দেশীয় প্রযুক্তিতে যে ভেন্টিলেশনের কাজ করছে, সেখানে অর্থায়নসহ অগ্রাধিকারের বিষয়টিতেও গতি আনতে হবে।

বিজ্ঞাপন

অনেক বেসরকারি জায়ান্ট চীনের মতো মেকশিফট হাসপাতাল বানানোর কথা বলছেন। কিন্তু বানানোর কথা হচ্ছে ঢাকায়। ঢাকা সচেতন মানুষে ভর্তি। নিজেরাই নিজেদের লকডাউন করে রেখেছেন প্রায় সবাই। কিন্তু ঢাকার বাইরে কী হবে? করোনায় আক্রান্ত রোগীকে কি টেকনাফ থেকে তেজগাঁও বা বসুন্ধরায় এনে চিকিৎসা দেওয়া হবে? পাঁচ-দশ হাজার শয্যার হাসপাতাল যদি বানাতেই হয়, কনটাক্ট ট্রেসিং আর বিদেশ ফেরতদের বিগ ডেটা দেখেই তার অবস্থান নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অঞ্চলকে ভিত্তি করে অগ্রাধিকার দেওয়া হোক। প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত বলছে, সেই অগ্রাধিকার ঢাকার বাইরেই হওয়া উচিত।

আর স্বল্প আয় ও দরিদ্র বা অতি দরিদ্রদের নিয়ে অনেক পরিকল্পনার কথা এরই মধ্যে বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকেও নির্দেশনা রয়েছে। সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক, মনিটর করা হোক।

আর আমজনতা যারা ফেসবুকে আছেন, আপনাদের রাগ-ক্ষোভ, ভয়-আতঙ্ক সবই থাকা স্বাভাবিক। সরকারের ওপর হতাশা ঝেড়ে ফেলাটাও স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে অবাস্তব, অবৈজ্ঞানিক, অপ্রমাণিত জিনিসের আশ্রয় নেওয়াটা এই মুহূর্তে কেবল ভুল নয়, অন্যায়ও বটে। এই সরকার বা প্রশাসন যদি ইতিহাসের জঘন্যতম সরকারও হয়ে থাকে, তবু এই যুদ্ধে সেটাই আপনার সরকার। তাকে সহযোগিতা করুন। ভুল-ভ্রান্তি থাকলে সেগুলো নিয়ে ফোকাস পয়েন্টে কথা বলুন। সরকারকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে পরে ঝগড়া-বিবাদ করা যাবে। কিন্তু ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বা সিলেকটিভ জাজমেন্ট নিয়ে কথা বলার সময় এটি নয়। যেমন— চিকিৎসকরা যখন তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনিয়মগুলো পাবলিকলি পোস্ট করেন, তখন চিকিৎসক নন— এমন সবাই ভেবে বসেন, সবকিছুতেই লেজে-গোবরে অবস্থা। নিজেদের সমস্যাগুলো নিজেদের নির্দিষ্ট পেজ বা গ্রুপে বলুন। প্রয়োজনে সরকারকে প্রত্যক্ষভাবে চাপ প্রয়োগ করুন। কিন্তু পাবলিক প্রোফাইলে আপনার ক্ষোভ অন্য দশটা মানুষকে আতঙ্কিত করে। এর মধ্যে আপনার পরিবারের সদস্য যারা প্রশাসনের অংশ, তারাও রয়েছেন। তাদের মধ্যে যেমন প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের ব্যক্তিরা আছেন, তেমনি আছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কিংবা গণমাধ্যমকর্মীরাও। এরা সবাই আপনার-আমাদের মতোই মানুষ। তারাও আতঙ্কিত হবেন, সেটাই স্বাভাবিক।

সারাক্ষণ নেতিবাচক প্রচারের মধ্যে থাকলে সংশ্লিষ্ট এসব মানুষদের মধ্যে ভীতিও কাজ করে বেশি। তখন ইন্সটিংক্টটিভলি তারাও ভুল করে বসেন। এই যে ডিসি অফিসের লোকজন নিজেরা ডাক্তারদের পিপিই পড়ে বসেছিলেন, সেটা কিন্তু সেলফি তোলার জন্য নয়। তারা আতঙ্কিত হয়ে সেটা করেছেন। হয়তো নিয়ম ভেঙে করেছেন। হয়তো ডাক্তারদের বরাদ্দ থেকেই দুর্নীতি করে নিয়ে গিয়ে নিজেরা ব্যবহার করেছেন। কারণ যেটাই হোক, চিকিৎসকদের সুরক্ষিত না থাকার যে আতঙ্ক জনস্মুখে প্রচার হয়েছে, সেটিই কিন্তু তাদের আতঙ্কিত করেছে ভয়াবহভাবে। তারা নিজেদের ক্ষমতা বিবেচনায় নিজেদেরকে সুরক্ষিত করছেন।

এই যে পুরো সিস্টেম আতঙ্কিত হয়ে ধ্বসে পড়ছে, এতে আপনার-আমারও দায় আছে। সেটা স্বীকার করে ক কোথায় কিভাবে কমিউনিকেট করতে হবে সেটা নিয়ে ভাবুন। আমরা যুদ্ধ পুরোদস্তুর শুরুর আগেই যে হতাশাগ্রস্ত, আতঙ্কিত ও সমন্বয়হীনতা দেখছি, এটি আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। কোভিড-১৯ ভাইরাসটি নয়।

শেষ কথা হলো— অবস্থা এখনো নাজুক। বিপদ অবশ্যই মাথার ওপরে ক্রিয়াশীল। একটু পা পিছলালে ভয়ংকরতম বিপদ অনিবার্য। কিন্ত এটি এমন কোনো যুদ্ধ এখনো নয়, যাতে আমরা হেরে গেছি। আমাদের সামনে বিশাল যুদ্ধ আছে। যুদ্ধটা করতে হবে। বিশ্বের সব দেশেই করোনার সঙ্গে মানুষের যুদ্ধ চলছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে বলা যায়, বাংলাদেশের মানুষ আজ পর্যন্তও করোনার পক্ষেই আছে!

তবে ইটস নেভার টু লেইট। সঠিক পক্ষে আসুন। সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। উই হ্যাভ আ ব্যাটল টু উইন।

লেখক: ম্যানেজিং এডিটর, সারাবাংলা ডটনেট

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন