বিজ্ঞাপন

বাতাসে বল ঘুরাতেই নাঈমের যত আনন্দ

April 1, 2020 | 8:50 pm

মহিবুর রহমান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

লাল সবুজের জার্সিতে মাঠে নেমেই করলেন বাজিমাত। দেশের সবচেয়ে তরুণ ক্রিকেটার হিসেবে নাঈম হাসান অভিষেক টেস্টে ৫ উইকেট তুলে নিয়ে নাম লেখালেন রেকর্ড বইয়ে। দেশের সবচেয়ে তরুণ বোলার হিসেবে রেকর্ডটি কেবলই তার একচ্ছত্র দখলে। হয়েছে বিশ্ব রেকর্ডও। তিনিই বিশ্বের চতুর্থ বোলার যিনি কিনা মাত্র ১৭ বছর ৩৫৫ দিনে ‌ এই রেকর্ডের গর্বিত মালিক বনে গেছেন। উচ্চতা ৬ ফুট ২ ইঞ্চি হওয়ায় বোলিংয়ে এক্সট্রা বাউন্স পেয়ে থাকেন, সঙ্গে থাকে বাতাসে স্পিনের বিষাক্ত মিশেল (স্পিন অন এয়ার)। এই দুইয়ের রসায়নে প্রায়শই ব্যাটসম্যানরা পরাস্ত হন। তবে শত্রু ঘায়েলে উচ্চতা বা বাউন্স তাকে যতটা না আনন্দ দেয়, তার চেয়েও বেশি আনন্দ পান বাতাসে বল ঘুরিয়ে।

বিজ্ঞাপন

আর এই দক্ষতাটাই তাকে দেশের অন্যান্য সব স্পিনারদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। হয়ে উঠেছেন সাদা পোশাকে লাল সবুজ ক্রিকেট টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসার মূর্ত প্রতীক। কেননা নিপুণ ফ্লাইটে বাতাসে বল ঘুরাতে নাঈম দারুণ দক্ষ।

যদিও অস্ত্রটি এদেশের ক্রিকেটে নতুন নয়। কিন্তু সাকিব, তাইজুল, মিরাজরা অহরহ বাতাসে বল ঘুরাতে চান না— এই যা। তবে এও সত্যি এই বিশেষত্বটি তাকে বাংলাদেশের টেস্ট দলে প্রায় স্থায়ী আসন গড়ে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নাঈম অবশ্য বিষয়টি এভাবে ভাবতে রাজি নন। টিম ম্যানেজমেন্ট যখন যাকে যোগ্য মনে করবেন তখনই দলে ডাকবেন। সেটা হতে পারেন মিরাজ, তিনি বা অন্য কেউ। তবে ম্যানেজমেন্টের আস্থার প্রতিদান দিতে তিনি দিতে সদা প্রস্তুত।

নাঈমের একটি অসাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও আছে। যতক্ষণ মাঠে থাকেন, স্মিত হাসি হাসেন। সেটা ম্যাচের যেকোন পরিস্থিতিতেই সত্য। কেন জানেন? কারণ তিনি খেলাটাকে ভীষণ উপভোগ করেন। ম্যাচের প্রতিটি মুহুর্ত তিনি শতভাগ উপভোগ করতে চান।

বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবালের মতে— নাঈম হাসান একজন অদম্য সাহসী বোলার। ম্যাচের যে কোন সময় যাকে বোলিংয়ে দিয়ে নির্ভার থাকা যায়। নিঃসন্দেহে এটা অনেক বড় দক্ষতা। কেননা অধিনায়ক তার সতীর্থের কাঁধে তখনই আস্থা রাখেন যখন তিনি সেই যোগ্যতার প্রমাণ দিতে সক্ষম হন। কোথায় পান তিনি এই সাহস? না, কোন জ্বিন, ভূত যোগান দেয় না। দিনের পর দিন কঠোর অনুশীলন তাকে দুর্বার করে তুলেছে।

অজি অফস্পিনার নাথান লায়ন তার আইকন। আবার সাকিব আল হাসানের মত অলরাউন্ডারও হতে চান।

নিজ শহর চট্টগ্রাম থেকে মুঠোফোনে সারাবাংলার সঙ্গে একান্তে আলাপকালে অজানা সেসব কথা জানালেন ১৯ বছর বয়সী এই তরুণ। কথা বলেছেন সমসাময়িক নানান বিষয় নিয়েও। সারাবাংলার পাঠকদের উদ্দেশ্যে তা তুলে ধরা হল। তার আগে নাঈমের পরিসংখ্যানটা একবার দেখে নেই।

২০১৮ সালের নভেম্বর সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অভিষিক্ত এই অফস্পিনার এ পর্যন্ত পাঁচ ম্যাচ খেলে উইকেট তুলে নিয়েছেন ১৯টি। সেরা বোলিং ইনিংস অভিষেক ম্যাচে জহুর আহমেদ স্টেডিয়ামে ১৪ ওভারে ৬১ রানের বিনিময়ে ৫ উইকেট। গড় ২০.৪৭ ও ওভার প্রতি দেয় রান ২.৯৯।

সাাারাবাংলা: করোনার সময়টা কিভাবে কাটছে?

নাঈম: খুব বাজেভাবে কাটছে। সারাদিন বাসায় বসে থাকতে হয়। বসে থাকতে ভাল লাগে না। ক্রিকেটারদের মজাটাই মাঠে।। ওখানেই কিন্তু আমরা উপভোগ করি।

সারাবাংলা: এ সময়ে এমন কোন কাজ শিখেছেন যা আগে জানতেন না? যেমন রান্না করা, ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এ জাতীয় কিছু।

নাঈম: না, তেমন কিছু শিখিনি। তবে বাসায় বসেই জিম করছি।

সারাবাংলা: বাংলাদেশের ক্রিকেটে আপনাকে বলা হয় আগামীর বড় ক্রিকেটার । কারণ আপনার যে উচ্চতা তা এদেশ তো বটেই এই মুহূর্তে বিশ্ব ক্রিকেটেও খুবই কম দেখা যায়। এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?

নাঈম: যে উচ্চতা পেয়েছি সেজন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে লাখো শুকরিয়া। একারণে বল এক্সট্রা বাউন্স করে। অবশ্যই বাড়তি সুবিধা পাই। চেষ্টা করব আরও উন্নতি করতে।

সারাবাংলা: আপনার আবির্ভাবেই টেস্ট ক্রিকেট থেকে হয়ত অন্য কেউ জায়গা হারিয়েছেন। এর ফলে আপনার প্রতি টিম ম্যানেজমেন্ট ও দেশের মানুষের প্রত্যাশার পারদ ওপরে উঠে গেছে। এটা ধরে রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় আপনার?

নাঈম: সত্যি বলতে আমি ক্রিকেট খেলি দেশের জন্য। এবং চেষ্টা থাকে দিন দিন কী করে আরও উন্নতি করতে পারব। সব সময় নিজেকে প্রস্তুত রাখার চেষ্টা করি। যখন সুযোগ পাব ভাল খেলার চেষ্টা করব। কারণ আমি জাতীয় দলে খেলছিই বছর দেড়েক হল। কয়েকটা সিরিজ এমন গিয়েছে দলের সঙ্গে গিয়েছি কিন্তু একাদশে ডাক পাইনি। কিন্তু আমি কখনো কষ্ট পাইনি। চিন্তা করেছি— আমার কাজ হল পরিশ্রম করা। সেটা করেছি। চেষ্টা করেছি সব সময় ফিট থাকতে। ভেবেছি যখনই সুযোগ পাব শতভাগ কাজে লাগাতে। কেন সুযোগ হয়নি এসব নিয়ে কিন্তু কখনোই ভাবিনি। অন্যান্য যারা আছেন তারা তো ভালই খেলছিলেন।

সারাবাংলা: কোচদের মতে আপনি হচ্ছেন একজন 'আনকম্পলিকেটেড মাইন্ডেড প্লেয়ার'। অর্থাৎ মুহূর্তেই বুঝে ফেলেন কোন স্ট্যাম্পে বল করতে হবে। এটা আপনার বোলিংয়ের ক্ষেত্রে কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন?

নাঈম: আমি সবসময় ব্যাটসম্যানকে পড়ার চেষ্টা করি আর অধিনায়ক যা বলে সেটা শোনার চেষ্টা করি। আর চিন্তা করি সবার থেকে কিছু নেওয়ার। সবকিছু তো আর নেওয়া যায় না। যেটা ভাল নয় সেটা নেওয়া যায় না।

সারাবাংলা: একটা সময় ছিল বাংলাদেশের স্পিনাররা পায়ের ওপরে জোরে বল করার চেষ্টা করত। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রান আটকে দেওয়া। এবং ব্যাটসম্যানরা রান তুলতে গিয়ে ভুল শটস খেললেই আউট হয়ে যেত। কিন্তু আপনি ফ্লাইট দিয়ে বাতাসে বল স্পিন করান। এটা কী করে সম্ভব করে তুললেন?

নাঈম: স্পিনারদের কাজই হল বল ঘুরানো। আমি বাতাসে বল ঘুরাতে খুব পছন্দ করি। একটি বল ডেলিভারি দিলাম পরের বল কী হবে এটাও আমাকে তাৎক্ষণিক ভাবতে হয়। তবে এটাকে আরও ভাল করতে আমি ড্রিল করি, অনুশীলন করি।

সারাবাংলা: তামিম ইকবালের মতে আপনি খুবই সাহসী স্পিনার। যেকোন পরিস্থিতিতে বল করতে পারেন। এই সাহসটা আপনি কোথায় থেকে পান?

নাঈম: সত্যি বলতে কী আমাদের সব সময় সবকিছুর জন্য প্রস্তত থাকতে হয়। আগে থেকে যদি অনুশীলন করেন, প্রস্তুত থাকেন ভাল। হঠাৎ করে কিন্তু এটা হয় না। আমি যদি আগে থেকেই প্রস্তুত থাকি তাহলে কিন্তু কাজটা সহজ যায়। তা না হলে আবার কঠিন। অনুশীলনেই যদি আপনাকে সব শেখানো হয় তবে সহজেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়। ভবিষ্যতে কী হবে সেটা আমি মাঠে ভাবি না। যেটা যখন দরকার করে ফেলি। আমি যত অনুশীলন করি তত বেশি আত্মবিশ্বাস পাই। প্রস্তুতি ভাল থাকলে আত্মবিশ্বাসও তখন ভাল থাকে।

সারাবাংলা: আপনার মুখে সবসময় একটা স্মিত হাসি লেগেই থাকে। এর রহস্য কী?

নাঈম: কিভাবে বলব (হাসি)। সবার সঙ্গে ভালভাবে মিশে থাকতে চেষ্টা করি। তাছাড়া যখন যে কাজটা করি উপভোগ করার চেষ্টা করি।

সারাবাংলা: আপনার বোলিংয়ের ধরণ অনেকটা নাথান লায়নের মত। লায়নকে অনুসরণ করেন?

নাঈম: আমি চেষ্টা করি ওর মত হতে। তবে চাইলেই তো আর হওয়া যাবে না। সেজন্য অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। ইচ্ছে আছে ওর মত হতে। সাকিব ভাইয়ের মত অলরাউন্ডার হওয়ারও ইচ্ছে আছে।

সারাবাংলা: অলরাউন্ডার হতে চান খুবই ভাল। কিন্তু সেজন্য নিজেকে কতটুকু প্রস্তুত করছেন?

নাঈম: হ্যাঁ, আমি ব্যাটিং নিয়ে কাজ করি। যখন ব্যাটিংয়ে নামি— নিজকে ব্যাটসম্যান মনে করি। মজাই লাগে ব্যাট করতে।

সারাবাংলা: আপনাকে ধন্যবাদ।

নাঈম: আপনাকেও।

আরো পড়ুন:

মিডল অর্ডারেই স্বাচ্ছন্দ্য মিঠুনের

নিজের জায়গা ধরে রাখতে আত্মবিশ্বাসী সাদমান

বাতাসে বল ঘুরাতেই নাঈমের যত আনন্দ

করোনা থামিয়ে দিয়েছে সৌম্য’র বিশ্বকাপ ভাবনা

পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটাই আমাদের টার্নিং পয়েন্ট ছিল: আকবর

বিশ্বকাপে আমাদের এক-দুইটা ম্যাচ জেতা সম্ভব ছিল: জেসি

‘এমনভাবে ফিরতে চাই যেন আর বের হতে না হয়’

সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে চান নাঈম

নেইমারের সঙ্গে নিজের মিল খুঁজে পান সাইফউদ্দিন

সারাবাংলা/এমআরএফ/আইই

বিজ্ঞাপন

Tags: ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন