বিজ্ঞাপন

অভিনববর্ষ

April 14, 2020 | 5:55 pm

খায়রুল বাবুই

অভি তালুকদার। আমার কাছের এবং গাছের বন্ধু!

বিজ্ঞাপন

ছোটবেলায় আমরা এ-বাড়ি ও-বাড়ির গাছে-গাছে চড়িয়া বেড়াইতাম। ফল খাইতাম ভাগাভাগি করিয়া। কিন্তু ‘ধরা’ পড়িলে মাইর খাইতাম একাই। কারণ অভি আমার চাইতে দ্রুত দৌড়াইতো।

সরকারি বাংলা কলেজ হইতে ইংরেজিতে অনার্স অভি। তদুপরি বাংলা-প্রেম তাহার মধ্যে মারাত্মক। কিন্তু সে জানিতো নাÑ বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, জেলেও ঠেলিয়া দেয়!

বিজ্ঞাপন

হ্যাঁ, অতিরিক্ত বাংলা-প্রীতির কারণেই তাকে বিয়ের আগেই ‘শ্বশুরবাড়ি’ যাইতে হইয়াছিল।

ঘটনা চৈত্র মাসের শুরুতে। এক রাতে, অসৎ-সঙ্গে পড়িয়া অভি গিয়াছিল ‘বাংলা’ খাইতে। কিন্তু খাইয়াছে পুলিশের হাতে ধরা। ফলাফলÑ চৌদ্দশিকে চৌদ্দদিন। সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা।

তো, জেল-জরিমানার পর্ব শেষ হইবার পর অভির সহিত সাক্ষাৎ।

ততদিনে নতুন বাংলা বছর আসিয়া উপস্থিত।

অভি উদাস গলায় বলিল, ‘আচ্ছা দোস্ত, নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা কি শুধুই মঙ্গল লইয়া আসে?’’

আমি বলিলাম, ‘উঁহু, মঙ্গলের সঙ্গে বুধ-বৃহস্পতি-শুক্র-শনি-রবি আর সোমও লইয়া আসে!’

অভি চোট পিটপিট করিয়া আমার দিকে তাকাইলো। ইয়ার্কি করিতেছি কি না বোঝার চেষ্টা। কিন্তু আমার অভিব্যক্তিহীন চেহারা দেখিয়া অভি বলিল, ‘সোহেল, এই বছরটা তো আমার শেষ হইলো কারাগারে। এখন সিদ্ধান্ত লইয়াছিÑ বিবাহ করিব। নতুন বছরে নতুন মানুষের সহিত নতুন জীবন গড়িব!’

‘ওহে গর্দভ, চৌদ্দদিনের কারাগার হইতে মুক্ত হইয়া সারাজীবনের জন্য কারাবাস করিতে চাস? বুদ্ধি-শুদ্ধি লোপ পাইয়াছে?’ আমি অভিকে সতর্ক করি।

‘শোন, বুদ্ধি তো সেইদিনই লোপ পাইয়াছিল, যেদিন প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখিয়াছিলাম।’

‘মানে?’

‘মানে ভয়ঙ্কর সব মুখোশ পরিয়া মানুষ মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিয়াছে। শোভাযাত্রা শেষে মুখোশ খুলিয়া ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করিয়াছে। কিন্তু বছর জুড়ে যে অদৃশ্য মুখোশ পরিয়া থাকে, সেইগুলো কি খুলিয়াছে?’

অভি আধ্যাত্মিক লাইনে চলিয়া যাইতেছে টের পাইয়া বলিলাম, ‘আচ্ছা, আচ্ছা। তোর বিবাহের বন্দোবস্ত করিতেছি। সবুর কর।’

পরদিনই সবুর আংকেল মানে অভির বাবাকে বিস্তারিত বলিলাম। আংকেল সবুর করিলেন না। স্বীয় স্ত্রীকে নিকটে ডাকিয়া বলিলেন, ‘শোনো অভির মাতা, আমি সিদ্ধান্ত লইয়াছি, আমার ছোটবেলার বন্ধু, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক হায়দার আলীর একমাত্র কন্যা পুষ্পিতার সহিত অভির শুভবিবাহ দিব।’

আন্টি বলিল, ‘আলহামদুলিল্লাহ। পুষ্পিতার মতো ফুটফুটে মেয়ে আমার ছেলে-বউ হইয়া আসিলে তো ঘরে আলো ফুটিবে। কবুল। কবুল।’

আংকেল ধমকাইয়া উঠিলেন, ‘খামোশ! তুমি কবুল বলিলা কেন?’

আমি লক্ষ্য করিলাম, টেলিভিশনে বাংলা সিনেমা চলিতেছে। সিনেমার নাম : গরীবের বউ। বুঝিলাম, আংকেল-আন্টির চলমান সংলাপ আসলে বাংলা সিনেমারই সাইড ইফেক্ট।

সেইদিন সন্মানের সহিত অভিদের গৃহ হইতে প্রস্থান করিলাম।

তিন দিন পরই মহাসমারোহে অভি-পুষ্পিতার বিবাহ সম্পন্ন হইল।

এরই মধ্যে বাংলা নববর্ষ আসিল। অভির রুমে নতুন বউয়ের পাশাপাশি নতুন বর্ষপঞ্জিকাও স্থান পাইল।

কয়েকদিন পর।

এক সন্ধ্যায়, বৈশাখী ঝড় মাথায় লইয়া আমি অভির গৃহে উপস্থিত হইলাম।

‘দোস্ত, নতুন সংসার কেমন কাটিতেছে?’

‘কাটিতেছে তো পুষ্পিতা। রান্না করিতেছে রানু বুয়া। আমি শুধু খাইতেছি। তবে তোর ভাবীর পান্তা রান্নার হাত কিন্তু অসাধারণ।’

‘পান্তা রান্না?’ আমি কিঞ্চিৎ বিস্মিত।

‘হুঁ। আসলে নববর্ষের দিন সকালে দোকানে পান্তা খাইতে গিয়া যে অভিজ্ঞতা হইয়াছিল, তারপর তোর ভাবী বাসায় আসিয়া অ্যাত্তোগুলা পান্তা রান্না করিয়াছে।’

‘কী হইয়াছে, খুলিয়া বল।’

লুঙ্গির গিট্টু আরও শক্ত করিয়া অভি বলিল, ‘খুলিয়া বলিবার কিছু নাই। তোর ভাবীকে লইয়া গিয়াছিলাম রমনার বটমূলে। টইটই করিতে করিতে দুপুর। হোটেলে ভাত খাইতে বসিয়া ভাবিলাম আজ পয়লা বৈশাখ। পান্তা না খাইলে কি চলে? তাই বুদ্ধি করিয়া ভাতের মধ্যে পানি মিশাইয়া লইলাম। বিল দিতে গিয়া শুনি ৬০০ টাকা। আমি অবাক। দুই প্লেট ভাত ২০ টাকা করে ৪০ টাকা। আর মাছ ১০০ করে ২০০। মোট হইবে সর্বোচ্চ ২৪০ টাকা।’

ওয়েটার বলিল, ‘আপনার হিসাব ঠিকই আছে স্যার। গরম ভাত ২০ টাকা। কিন্তু আপনি তো ভাতে পানি মিশাইয়াছেন। তাই পান্তাভাত ২০০ টাকা প্লেট!’

আমি কোনোরকমে হাসি চাপিয়া রাখিয়া বলিলাম, ‘তারপর?’

‘তারপর আর কি,’ অভি নড়িয়া-চড়িয়া বসিল, ‘তুই তো জানিস, পুষ্পিতা জমিদার বংশের কন্যা। সে রাগে গজগজ করিতে করিতে বাসায় আসিল। ইউটিউবে রেখা ফেরদৌসির রেসিপি দেখিয়া পুরো এক ডেকচি পান্তা রান্না করিয়া ফেলিল।’

‘বাহ! সত্যিই গুণবতী স্ত্রী পাইয়াছিস।’

‘খাইবি নাকি? কোন ফ্লেভার? ভ্যানিলা না স্ট্রবেরি?’

আমি তব্দা খাইলাম, ‘পান্তার আবার ফ্লেভার?’

‘আরে, তোর ভাবী তো উচ্চবংশীয়। ফ্লেভার ছাড়া তার চলেই না। ও একটা অফারও দিয়াছেÑ পান্তা খাইলে ওরস্যালাইন ফ্রি!’

আমি জলদি প্রসঙ্গ পাল্টাইলাম, ‘আচ্ছা, পান্তা পরে খাইব। তা, বৈশাখী মেলায় কেমন মজা করলি সেইটা বল।’

‘বলিয়াছি না, তোর ভাবী অতি-উচ্চবংশীয়। নববর্ষের দিন পাড়া-মহল্লায় গান বাজিতেছিল, মেলায় যাইরে, মেলায় যাইরে...। আর পুষ্পিতা বলিতেছিল, মলে যাইরে, মলে যাইরে...।’

আমি নাক কুঁচকাইলাম, ‘এহ-হে...’

‘আরে, মলে মানে শপিংমলে...’

‘ওহ। তা গিয়াছিলি?

‘হুঁ। বৈকালে মলে গিয়া দ্রুত কেনাকাটা শেষ করিয়াই আমরা মলত্যাগ করিয়াছিলাম।’

‘কী-ই-ই? মলত্যাগ!’

‘তবে আর কী বলিতেছি? কেনাকাটা শেষে শপিংমল ত্যাগ করিয়া আবার বৈশাখী মেলায় গিয়াছিলাম। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করিবার পর তোর ভাবী বলিল, ওগো, আমার ভীষণ মাথা ঘুরাইতেছে। বমি-বমিও লাগিতেছে...।’

আমি বলিলাম, ‘এ তো খুশির খবর? তার মানে আমি চাচ্চু হইতে যাইতেছি। কিন্তু ইয়ে..., তোদের বিয়ের তো এক মাসও হয়নি। ক্যামনে কী?’

‘আরে, দুষ্টু ছেলে। তোর ভাবী আসলে নাগরদোলায় চড়িয়াছিল।’

‘ওহ!’ আমি হাপ ছাড়িলাম, ‘তারপর?’

‘তারপর আর কি? পার্কে একটা বৃক্ষের ছায়ায় গিয়া বসিলাম। আমার বুকে মাথা রাখিয়া সে বিশ্রাম লইতেছিল। হঠাৎ সিকিউরিটি গার্ড আসিয়া উপস্থিত। বলিল, পাবলিক প্লেসে এসব চলিবে না। এক হাজার করিয়া দুই হাজার টাকা জরিমানা। আমি বলিলাম, ইয়ে, আমরা স্বামী-স্ত্রী। গার্ড হাস্য করিয়া বলিল, খুউব ভালো। তাহলে আপনি একাই দু’হাজার বাইর করুন।’

‘বলিস কি? তারপর?’

‘পুষ্পিতা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলিয়াছিল, আসলে জানিতাম না যে গাছতলায় বসিলেও জরিমানা দিতে হইবে। যেহেতু প্রথমবারের মতো ভুল করিয়াছি, তাই ক্ষমা করিয়া দিন। নারীকণ্ঠের আবদারে গার্ডের মন গলিল। বলিল, ঠিক আছে আপা, যেহেতু এটা আপনার প্রথমবার, তাই আপনাকে ক্ষমা করা হইলো। কিন্তু ওনাকে ক্ষমা করা যাইবে না। এটা ওনার চতুর্থবার...।’

আমি চোখ বড়বড় করিয়া তাকাইলাম, ‘অভি? আসলেই কি?’

‘তুইও গার্ডের কথা বিশ্বাস করিলি?’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভি, ‘আফসোস! ১লা বৈশাখ একলা কাটানোই উত্তম ছিল। ক্যানো যে বিবাহ করিলাম।’

অভিকে স্বান্তনা দিয়া বলিলাম, ‘আফসোস করিস না। শুভবিবাহ সবসময় শুভ হইবেÑ এমন কথা কোনো শাস্ত্রে লেখা নাই।’

‘কিন্তু শাস্ত্রে লেখা আছে, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে।’ বলিতে বলিতে হঠাৎই পুষ্পিতা ভাবী আসিয়া উপস্থিত।

আমি ভ্যাবাচেকা খাইয়া বলিলাম, ‘অবশ্যই অবশ্যই। আপনার গুণে আমার বন্ধুর সংসারও সুখের হইতেছে নিশ্চিত।’

‘ধন্যবাদ সোহেল ভাই। আর ইয়ে, আপনার জন্য স্ট্রবেরি ফ্লেভারের পান্তা রাঁধিয়াছি। না খাইয়া কিন্তু যাইবেন না।’ এই বলিয়া পুষ্পিতা ভাবী রান্নাঘরে চলিয়া গেল।

আমি রীতিমতো আতঙ্ক বোধ করিতে লাগিলাম। এ কোন পান্তা-রাঁধুনির পাল্লায় পড়িয়াছি।

‘আচ্ছা অভি, পান্তা খাইলে ওরস্যালাইন ফ্রিÑ অফারটা কি এখনও চলমান?’

অভি কিছু না বলিয়া মুচকি হাসিতে লাগিল।

আমি প্রমাদ গুনিলাম। ঘরের ভেতর পান্তা-ঝড় আর বাইরে কালবৈশাখী ঝড়! অভির স্ত্রীর ‘রান্নাকৃত’ স্ট্রবেরি ফ্লেভারের পান্তা খাইলে আমার নববর্ষ কি অভিনববর্ষ হইবে?

কোন ঝড় কীভাবে সামলাইব?

সারাবাংলা/এসবিডিই

বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন