বিজ্ঞাপন

বকেয়া টানছে বিআরটিসি, করোনায় আরও বেশি সংকটের আশঙ্কা

April 23, 2020 | 10:07 am

সাব্বির আহমেদ, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সারাদেশের ২২টি বাস ডিপোতে দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে চালকদের বেতন দিতে ব্যর্থ হচ্ছিল সরকারি পরিবহন প্রতিষ্ঠান বিআরটিসি। এমন অবস্থায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আসেন মো. এহছানে এলাহী। তার সময়ে নতুন করে কোনো বেতন বকেয়া পড়েনি দাবি করে তিনি জানান, সবচেয়ে বেশি বেতন বকেয়া থাকা জোয়ারসাহারা ডিপোতে প্রতি মাসের বেতনের পাশাপাশি আগের চেয়ারম্যানের আমলে ফেলে রাখা দুটো বকেয়া বেতনও দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

তবে করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে চালক-শ্রমিকদের বেতন দিতে নতুন করে সংকটে পড়েছে বিআরটিসি।

বিআরটিসির সবচেয়ে বেশি বকেয়া বেতন ছিল বিমানবন্দর সড়কের জোয়ারসাহারা ডিপোতে। এখনো সেখানে বকেয়া রয়েছে আট মাসের বেতন। এ ছাড়া চলতি এপ্রিল মাস শেষ হতে গেলেও এখনো পরিশোধ করা হয়নি মার্চের বেতন।

বিজ্ঞাপন

এ অবস্থায় কয়েকজন চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, দেড়-দুইমাস পর পর একবার বেতন হয়। কিন্তু বকেয়া রয়েছে এখনও আট মাস। নতুন চেয়ারম্যান গত সেপ্টেম্বর মাসে যোগদান করেই বলেছিলেন প্রত্যেক মাসের বেতনের সঙ্গে বকেয়া আরেক মাসের বেতনও তিনি দেবেন, সেটাও হয়নি।

বিআরটিসি চেয়ারম্যান এহছানে এলাহী তার গত সাত মাসে ৯টি বেতন দিয়েছেন। নভেম্বর ও জানুয়ারি মাসে চলতি বেতনের সঙ্গে দুই মাসের বকেয়া বেতন দিতে পেরেছেন। তবে এখনো মার্চের বেতন দিতে পারেননি। ঋণ করে হলেও দুয়েকদিনের মধ্যে মার্চের বেতন পরিশোধ করবেন বলে সারাবাংলাকে জানান চেয়ারম্যান।

বিজ্ঞাপন

তিনি এও উল্লেখ বলেন, তার যোগাদানের পর কোন বেতন বকেয়া পড়েনি। যা বকেয়া সেটা আগের। বিআরটিসির ২২টি ডিপোর বেশির ভাগে বেতন বকেয়া ছিল। যেখান থেকে ১১টি ডিপোকে বকেয়ামুক্ত করেছেন। জোয়ারসাহারা ডিপো সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল। এখানে দুর্নীতি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি অডিটে সেই দুর্নীতি ধরা পড়েছে। এখন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবেন তিনি। আর কোনো সিন্ডিকেট থাকলে সেটিও ভেঙে দেবেন বলে জানান।

সরেজমিনে বিআরটিসির জোয়ারসাহারা ডিপো ঘুরে দেখা গেছে, ডিপোতে গত বছরের এপ্রিলে ১৬টি এসি গাড়ি এবং ২০টি ডাবল ডেকারসহ ৩৬টি গাড়ি দেওয়া হয়। কিন্তু ডিপোতে আয়ের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। নতুন বাস দেওয়ার আগেও গত বছরের মার্চ পর্যন্ত ডিপো ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন নূর আলম। তার সময়েও প্রতি মাসের নিয়মিত বেতন পেয়েছেন শ্রমিকরা।

বিজ্ঞাপন

এপ্রিলে নতুন বাস নতুন ম্যানেজার এসেও পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারেননি। নতুন ৩৬টি বাসের আয় যোগ করে যেখানে প্রতি মাসের বেতনের সঙ্গে বকেয়া আরেকটি বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল সেটি চালিয়ে যেতে পারেননি। ডিপোতে প্রতি মাসে প্রায় ৪২ লাখ টাকার বেতন দিতে হয় বলে ডিপো সূত্র জানায়।

এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেছে, ডিপোতে নতুন বাস চালানো শুরু হলে আগের বাসগুলো বসিয়ে রাখা হয়। এতে ডিপোতে কাঙিক্ষত আয় থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। চালক সংকট ও মেরামতহীন অবস্থায় পুরাতন বাসগুলো একের পর বিকল হয়ে ডিপোর ভেতরে পড়ে থাকে। আর যা আয় হয় তার থেকে ভাগ বসিয়ে সিন্ডিকেট হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা।

বিজ্ঞাপন

এই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ বিআরটিসির প্রধান কার্যালয় পর্যন্ত যায়। সম্প্রতি এ নিয়ে একটি অডিট করা হয়। সেই অডিটে দুর্নীতি ধরা পড়ে।

বিআরটিসি চেয়ারম্যান এহছানে এলাহীও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ডিপো ম্যানেজার পরিবতনসহ আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে যারাই জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন তিনি।

বিআরটিসি সূত্র জানিয়েছে, সিন্ডিকেট শুধু ডিপোতে নয় প্রধান কার্যালয়েও আছে। চেয়ারম্যান ছাড়া উচ্চপদস্ত কয়েকজন এই সিন্ডিকোটের হোতা।

নাম প্রকাশ না করে বিআরটিসির কয়েকজন ডিপো ম্যানেজার জানিয়েছেন, সাবেক চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদ ভূইয়াকে প্রতি মাসে টাকা দিতে হতো। কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যান তাকে কোনো টাকা দিতে গেলে কঠোর পরিণতির হুশিয়ারী শুরু থেকে দিয়ে রেখেছেন। তবে প্রধান কার্যালয়ে টাকা যাওয়া বন্ধ হয়নি। আগের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যারা সিন্ডিকেট গড়েছিলেন তারা এখনো বহাল তবিয়তে প্রধান কার্যালয়ে।

চেয়ারম্যান এহছানে এলাহী জানান, তিনি তার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন বিআরটিসিকে বকেয়া থেকে বের করতে। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার জিরো টলারেন্স।

প্রধান কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ৯০০টির বেশি নতুন বাস যুক্ত হওয়ার পর বকেয়া মুক্ত হতে শুরু করেছে বিআরটিসি। আর চেয়ারম্যান একা সৎ থেকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটি কাঙ্খিত লাভে যেতে পারছে না। যার বড় উদাহরণ জোয়ারসাহারা ডিপো। ডিপোতে পরিকল্পহীন বাস চলাচল ও বেসরকারি খাতে মৌখিক লিজ দেওয়াও এর জন্য দায়ি মনে করে হচ্ছে। এই ডিপোর বাস কিছুদিন এক রুটে পরে অন্য রুটে জোড়াতালি দিয়ে চলতে দেখা যায়।

সারাবাংলা/এসএ/এমআই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন