বিজ্ঞাপন

করোনা দুর্যোগের মধ্যে এলো আত্মশুদ্ধির মাহে রমজান

April 24, 2020 | 9:52 pm

আসাদ জামান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বিকেলে বাংলাদেশের আকাশে পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে। শনিবার (২৫ এপ্রিল) প্রথম রোজা। শুরু হলো মাহে রমজান। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সারা পৃথিবীকে যখন তছনছ করে দিয়েছে, স্তব্ধ করে দিয়েছে সবকিছু, তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর সকল ধর্মের উপাসনালয়ে, ঠিক সেই সময় মুসলিম উম্মার জন্য রমজানের চাঁদ নিয়ে এসেছে রহমত-মাগফিরাত-নাজাত হাসিলের অবারিত সুযোগ।

বিজ্ঞাপন

এবারের রমজানে মুসলিম উম্মার প্রধানতম চাওয়া হবে করোনা থেকে মুক্তি। বাংলাদেশের আকাশে যখন রমজানের চাঁদ দেখা গেছে তখন এই জনপদে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪ হাজার ৬৮৯ জন। এরইমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩১ জন। সারাপৃথিবীর অবস্থা তো আরও ভয়ঙ্কর! আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ। মৃতের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ!

এমন বাস্তবতায় এবারের রমজানে নৈতিক ও চারিত্র্যিক উন্নয়ন, সামাজিক শিষ্টাচার, পারস্পরিক সহনশীলতা, সাম্য, মৈত্রী, তাকওয়া-খোদাভীতি, ধৈর্য, ত্যাগ, সাধনা, দয়া, দানশীলতা, মানবপ্রেমসহ নৈতিক গুণাবলির চর্চা অনেকগুণ বাড়াতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ধর্মীয় রীতি পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ মানাটা সবার জন্য অবশ্যকর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রকর্তৃক বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট সংখ্যক মুসল্লি ছাড়া জামাতের সঙ্গে তারাবিহ আদায় না করা, সমবেতভাবে ইফতার গ্রহণ বা ইফতার মাহফিল আয়োজন থেকে বিরত থাকা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঘরে আদায় করা, জুম্মার নামাজে না গিয়ে ঘরে নামাজ পড়া।

বিজ্ঞাপন

ভয়ঙ্কর ছোঁয়াচে রোগ করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে সমবেত ইবাদতের পরিবর্তে নিজ নিজ স্থানে একা একা ইবাদত এবারের রমজানের অন্যতম অনুষঙ্গ। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে এ বছর মসজিদে জামাতে তারাবির নামাজ আদায় নিষেধ করা হয়েছে। মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব, খাদেম ও দুই জন হাফেজসহ কেবল ১২ জন জামাতে তারাবিহ আদায় করতে পারবেন।

কেবল বাংলাদেশ নয়, করোনাভাইরাসের কারণে তারাবিহর নামাজসহ ধর্মীয় আচারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে মুসলিম বিশ্বের অন্য দেশগুলোও। সৌদি আরব মক্কা ও মদিনার দুই মসজিদে এতদিন নামাজ বন্ধ থাকলেও রমজানে ১০ রাকাত করে তারাবিহ আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে সাধারণ মুসল্লিদের জন্য মসজিদ দুইটি উন্মুক্ত থাকবে না।

বিজ্ঞাপন

অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, প্রত্যেক রমজানেই ইফতার পার্টিতে বড় ধরনের জনসমাগম হয়। সাধারণত রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ইফতার পার্টি আয়োজন করে থাকে। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ-বিএনপি প্রথম রোজায় এতিম ও ওলামা মাশায়েখদের সঙ্গে ইফতার করে। এরপর একে একে রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, বিশিষ্টজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য আলাদা আলাদা ইফতার মাহফিল আয়োজন করে।

এবার কোরোনা দুর্যোগে ভিন্ন পরিস্থিতি হওয়াতে আগামী ৫ মে পর্যন্ত সারাদেশে সাধারণ ছুটি চলছে। এই সময়ে সাধারণ মানুষকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঘরে থাকতে বলা হচ্ছে। জুমার নামাজ বা তারাবিহ নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে গণ জমায়েত হতে নিষেধ করা হয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই আগামী ৫ মে পর্যন্ত ইফতার পার্টির আয়োজন নিষিদ্ধ।

বিজ্ঞাপন

অবশ্য রোজা বা সিয়াম সাধনার সঙ্গে ইফতার পার্টি আয়োজনের খুব একটা সম্পর্ক আছে বলে মনে করেন না ইসলামি চিন্তাবিদরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যাবতীয় পানাহার ও স্ত্রী-সংশ্রব থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম। এ সময় ক্ষুধা-পিপাসার অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করে রোজাদার আল্লাহর ভয়ে পানাহার থেকে বিরত থাকে। এভাবে কাম, ক্রোধ, লোভস সব রকম মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকে আল্লাহ’র প্রিয় বান্দারা।

যাবতীয় পাপাচারের বিরুদ্ধে রোজাদারের সংগ্রাম চলে পুরো মাসব্যাপী। এই এক মাসের কৃচ্ছসাধনা ও নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের মাধ্যমে মানুষ নিজের নফস বা প্রবৃত্তিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। দেহ পরিচালিত হয় নৈতিক চরিত্র ও বিবেকের নির্দেশ মতো। এভাবেই মানবদেহের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বিবেকের শাসন ও আল্লাহর রাজত্ব। ফলে মাটির মানুষ পরিণত হয় সোনার মানুষে।

বিজ্ঞাপন

রমজানের আরেকটি শিক্ষা হলো, যারা সমাজের ওপর তলার বাসিন্দা তারাও রমজানে উপোস থেকে উপলব্ধি করতে পারবেন অনাহার-উপবাসের কী ভয়াল যন্ত্রণা। তাই তারা নিজের সঞ্চিত অর্থের একটি অংশ জাকাত হিসেবে বিতরণ করেন গরিবদের মাঝে। রমজান শেষ হতেই তারা ফিতরা দিয়ে দেন অভাবী লোকদের হাতে। আর সে জাকাত-ফিতরায় গরিবদের সংসারে ফিরে আসে সচ্ছলতা। দান করে ধনীরাও পায় অনাবিল তৃপ্তি ও কল্যাণ। এমনি করে মাহে রমজানে ধনী ও গরিবের মাঝে মমত্ব, ভ্রাতৃত্ব ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার অনুশীলন হয়। করোনা পরিস্থিতিতে মাহে রমজানের এই অনুশীলন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে এবার।

সারাবাংলা/এজেড/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন