বিজ্ঞাপন

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস

May 3, 2020 | 4:10 pm

সন্দীপন বসু

সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ একটি দিন। জাতিসংঘ ঘোষিত দিবস। পোশাকি নাম— ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে’, বাংলায় ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’। ১৯৯১ সালে জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেসকো) ২৬তম সাধারণ অধিবেশনে সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় একটি দিবস পালনের সুপারিশ করা হয়। দুই বছর বাদে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায়  আজকের দিন, অর্থাৎ ৩ মে তারিখটিকে মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর থেকে বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকরা এ দিবসটি পালন করে আসছেন।

বিজ্ঞাপন

‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ কেন সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ একটি দিন? প্রশ্নের উত্তর জানতে দিবসটির প্রস্তাবক সংস্থা ইউনেসকোর ওয়েবসাইটে যাই। দিবসটির তাৎপর্য বোঝাতে ওয়েবসাইটে আজ নতুন ব্যানার। শুরুতেই লেখা এ বছরের মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের মূল প্রতিপাদ্য— ‘ভয় বা পক্ষপাতহীন সাংবাদিকতা’। নিচে গোটা গোটা হরফে লেখা, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি ও প্রয়োজনীয়তা সরকারগুলোকে মনে করিয়ে দিতেই এই বিশেষ দিন। একইসঙ্গে দিনটি প্রতিটি সংবাদকর্মীকে তার পেশাগত দায়িত্ব ও নৈতিকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করার শপথ গ্রহণ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ক্ষতিগ্রস্ত ও জীবনদানকারী সাংবাদিকদের স্মরণ ও তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয় দিবসটিতে।’

বিজ্ঞাপন

ইউনেসকোর বর্ণনায় সাংবাদিকেরা শুধু যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কাঙ্ক্ষিত উপকারভোগী তা-ই নয়, বরং তারা এর প্রতীকও বটে। একটি সমাজ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কতটা প্রসার চায় অথবা তা কতটা সহ্য করে, তার মাত্রা প্রতিফলিত হয় সাংবাদিকদের মাধ্যমে। এই দিবসটি নাগরিকদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনো প্রকাশনা নিয়ন্ত্রণ করা হয়, জরিমানা করা হয় এবং কখনো কখনো তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাংবাদিক, সম্পাদক ও প্রকাশকদের ওপর হামলা হয়, তাদের হয়রানি করা হয়, আটক করা হয়, এমনকি হত্যাও করা হয়। এটি সরকারগুলোকেও স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দিন যে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেওয়া তাদের দায়িত্ব।

এই যে গণমাধ্যমের ফ্রিডম বা স্বাধীনতা, এটা কার? সংবাদমাধ্যমের? গণমাধ্যমকর্মীর? নাকি গণমাধ্যম মালিকের? এই তিন শ্রেণিই যে এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট! এর জবাবও স্পষ্টভাবে দেওয়া আছে দিবসটি উপলক্ষ্যে ঘোষিত ইউনেসকোর নীতিমালায়। নীতিমালা অনুযায়ী, ‘আদর্শিকভাবে স্বাধীনতা থাকতে হবে সংবাদের ও সংবাদকর্মীর।’ স্পষ্ট করে বলতে গেলে, ‘যেকোনো সংবাদ পরিবেশনে কোনো চাপ, ভয়-ভীতি বা আনুকূল্যের শিকার না হয়ে অবিকৃতভাবে প্রকাশ ও প্রচারের স্বাধীনতাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা।’

কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে গেলে এই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অনেকটাই মালিকের পকেটে পুরে রাখা। সংবাদকর্মীরা এখানে কেবল ‘হুকুমের চাকর’। অন্যদিকে বিজ্ঞাপন ও করপোরেট স্বার্থের এই বিশ্বে গণমাধ্যমের মালিকের স্বাধীনতাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত হয় বিজ্ঞাপনদাতাদের ইচ্ছায়। আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সুরক্ষার বিষয়টি তো অনেকাংশেই সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু এই ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা’ শব্দগুচ্ছের ব্যপকতর অর্থ নিয়ে কথা বলি না অনেকেই। বিশেষ করে সাংবাদিকের কাজের নিশ্চয়তা, বেতন কাঠামো সংরক্ষণ বা ওয়েজ বোর্ড নীতি— এসব নিয়ে সাংবাদিক নেতারা জায়গামতো কথা বলতে বিশেষ আগ্রহী নন। এরপরও সংবাদকর্মীদের অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের পর সংবাদপত্রে ওয়েজ বোর্ড চালু হলেও হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কেবল তা মানে। এখনো কোনো টেলিভিশনে ওয়েজবোর্ড চালু হয়নি। প্রতিটি টেলিভিশন তাদের নিজস্ব কাঠামোতে চলে। আর এ আলোচনায় অনলাইন তো বাহুল্যপ্রায়!

বাংলাদেশের সাংবাদিকদের অন্যতম প্রধান দুই সংগঠন ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) প্রতিবছরই নানা কর্মসূচিতে দিনটি পালন করে। কিন্তু এবার করোনাভাইরাসের কারণে দেশব্যাপী ‘সাধারণ ছুটি’ থাকায় স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিক সংগঠন দু’টির দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি নেই। তবে সংবাদমাধ্যমে দিবসটি উপলক্ষে পাঠানো যৌথ বার্তায় বাংলাদেশে স্বাধীন, পক্ষপাতহীন ও ভীতিমুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠন দু’টি। করোনাকালেও সাংবাদিক নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে নির্যাতন নিপীড়ন বন্ধ করা এবং সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন সংগঠন দু’টির নেতারা। একইসঙ্গে করোনার মহাদুর্যোগের মধ্যে সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মী ছাটাই বন্ধ এবং বেতন-ভাতা পরিশোধ করার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।

দিবসটির তাৎপর্য উল্লেখ করে নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি ও জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও (টিআইবি)। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্নভাবে বাধা, হয়রানি ও নির্যাতন চলছে উল্লেখ করে টিআইবি বলেছে, ‘গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা হয়রানি নয় বরং দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করুন।’

বিশ্বজুড়ে চলমান কোভিড-১৯ মহামারির সংকটময় পরিস্থিতিতে সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার গুরুত্ব বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে। এর মধ্যেও সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা সংকট বাড়ছে নিয়তই। প্যারিসভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা রিপোটার্স স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স বা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের (আরএসএফ) সর্বশেষ বার্ষিক সূচকে টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে। সূচকে থাকা ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন ১৫১তম, যা আগের বছর ছিল ১৫০তম। ২০১৮ সালে ছিল ১৪৬তম স্থানে। তার আগের বছরে ১৪৪।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের বাংলাদেশ সম্পর্কিত পাতার শিরোনাম হচ্ছে, ‘কঠোর রাজনীতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার আরও লঙ্ঘণ’।

প্রায় একই কথা উঠে এসেছে অ্যমিনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও টিআইবির প্রতিবেদনেও। অ্যামিনেস্টি জানিয়েছে, বাংলাদেশে অধিকাংশ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানই রাজনৈতিক সমর্থকদের মালিকানাধীন অথবা নিয়ন্ত্রণে। গণমাধ্যমে বহুত্ব আছে, কিন্তু সেগুলোতে ভিন্নমতের কোনো স্থান নেই। আর এটিকেই বাংলাদেশে মুক্তমত বিকাশের পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

এদিকে টিআইবি সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কোভিড-১৯ সংকট শুরু হওয়ার পরে চলমান ত্রাণ বিতরণে জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একাংশের দুর্নীতির এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের দুর্নীতিসংশ্লিষ্টতার খবর সংগ্রহ ও প্রচার করতে গিয়ে আক্রমণের শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশে গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্নভাবে বাধা, হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। এছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যথেচ্ছ অপপ্রয়োগের মাধ্যমে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা, হুমকি-ধামকির মাধ্যমে সংবাদপ্রকাশ থেকে বিরত রাখা ও সাংবাদিকদের সেলফ-সেন্সরশিপে বাধ্য করার প্রয়াস চলছে। টিআইবির মতে, চলমান দুর্যোগের কার্যকর মোকাবিলার স্বার্থে এ আত্মঘাতী চর্চাগুলো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) এক প্রতিবেদনে জানা যায়, চলমান করোনা মহামারির মাঝে বাংলাদেশে অন্তত আট জন সংবাদকর্মী পুলিশ ও রাজনৈতিক কর্মীদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। বিভিন্ন আইনে মামলা হয়েছে অন্তত সাত জনের বিরুদ্ধে, আর ডিটেনশনে দেওয়া হয়েছে দুই জনকে।

এটা সর্বজনস্বীকৃত সত্য, কোভিড-১৯ মহামারিকে দুর্নীতির মহোৎসবে পরিণত করার পাঁয়তারায় যারা লিপ্ত, তাদের অশুভ তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম শক্তি হতে পারে মুক্ত গণমাধ্যম। শুধু স্থানীয় পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণকে কেন্দ্র করে অনিয়ম-দুর্নীতির সংবাদ নয়, এই দুর্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি ক্রয় ও বিতরণ কার্যক্রমে বিভিন্ন প্রকার যোগসাজশ ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের নিবৃত্ত করতে তথ্যের অবাধ প্রকাশের বিকল্প নেই। আর এক্ষেত্রে সংবাদকর্মীদের অবারিতভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করার ব্যর্থতা আত্মঘাতী হবে।

তবে এই চিত্র যে কেবল বাংলাদেশেরই তা কিন্তু নয়। বিশ্বজুড়েই গণমাধ্যমের ওপর চাপ অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি। ২০১৩ সাল থেকে মুক্ত গণমাধ্যমের পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করছে ফ্রিডম হাউস। তাদের প্রকাশনা ‘দ্য স্টেট অব প্রেস ফ্রিডম অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ থেকে জানা যায়, গত সাত বছরের মধ্যে চলতি বছরে বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সবচেয়ে ক্ষুন্ন হয়েছে। বিশ্বের ৪৬ শতাংশের বেশি মানুষ এমন পরিবেশে বাস করছে, যেখানে সংবাদমাধ্যম স্বাধীন নয়।

এতকিছুর পরও জনগণের আস্থা, ভরসার ঠিকানায় ওপরের দিকেই আছে গণমাধ্যম। গণতান্ত্রিক অনেক প্রতিষ্ঠানের অকার্যকারিতার বিতর্কের মাঝে গণমাধ্যম টিকে আছে মতপ্রকাশের সুযোগের কারণেই। এই সুযোগপ্রাপ্তির জন্য প্রাত্যহিক লড়াইয়ে সামনের সারির যোদ্ধা কিন্তু সাংবাদিকরাই। আর এই মত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাটা সাংবাদিকের মুল লড়াইয়ের জায়গা।

‘জার্নালিজম ইজ নট আ ক্রাইম’— এই এক আপ্তবাক্যকে পুঁজি করে সংবাদপ্রকাশ ও প্রচারের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকারের প্রশ্নে নিয়ত লড়াই সংবাদকর্মী, মালিক এবং সর্বোপরি গণমাধ্যমের।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে মুক্ত সাংবাদিকতার সংগ্রামে যুক্ত সবাইকে টুপিখোলা অভিবাদন জানাই।

লেখক: সংবাদকর্মী

সারাবাংলা/এসবিডিই/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন