বিজ্ঞাপন

কোভিড-১৯: হ্যান্ডশেকের বিকল্প কী?

May 12, 2020 | 10:30 am

লাইফস্টাইল ডেস্ক।।

শুরুটা পশ্চিমা দেশগুলোতে হলেও সারা পৃথিবীতে এখন পরষ্পরকে সম্ভাষণ জানানোর একটি মাধ্যম হলো হ্যান্ডশেক বা করমর্দন। শুধু পরিচিত নয়, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গেও সাক্ষাতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে হ্যান্ডশেক স্বীকৃত।

বিজ্ঞাপন

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে মানুষ এখন অন্যকে স্পর্শ করতেই ভয় পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ থেকে দূরে থাকতে হাত জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে। স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে, হ্যান্ডশেক কি উঠে যাবে? যদি তাই হয় তাহলে হ্যান্ডশেকের বিকল্প কী হবে?

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ সংক্রান্ত নানা তথ্য। আসুন জেনে নিই, হ্যান্ডশেকের বিকল্প নিয়ে কী ভাবছে আজকের দুনিয়া-

বিজ্ঞাপন

হ্যান্ডশেকের উৎপত্তি

ধারণা করা হয়, প্রাচীন গ্রীসে হ্যান্ডশেকের উৎপত্তি হয়েছে। তখন একজন আরেকজনের হাত ধরার সময় হাতে অস্ত্র রাখতো না। ফলে তাদের কাছে হাত ধরার অর্থ ছিল ‘শান্তি ও সৌহার্দ্য’।

আরেকদল গবেষক মনে করেন, মধ্যযুগে ইউরোপে শুরু হয়েছিল হ্যান্ডশেকের প্রচলন। সামরিক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা পরষ্পরকে শুভেচ্ছা জানাতে হাত ধরে নাড়তেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, হাতে যেন অস্ত্র লুকিয়ে রাখতে না পারে।

টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ক্রিস্টিন লিগার বলেন, আন্তঃসম্পর্ক তৈরি হওয়ার একটি মাধ্যম হলো হ্যান্ডশেক। মানুষকে বন্য থেকে ধীরে ধীরে সামাজিক জীব হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে এই হ্যান্ডশেক।

শুধু মানুষ নয়, ভালোবাসা বোঝাতে শারীরিক স্পর্শ প্রাণী জগতের মধ্যেও দেখা যায়। ১৯৬০ এর দশকে আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী হ্যারি হারলোর গবেষণায় বেরিয়ে আসে, লিসাস প্রজাতির বানর শারীরিক স্পর্শের মাধ্যমে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায়। শিম্পাঞ্জীরাও হাতের তালু স্পর্শ করে নিজেদের ভালোবাসার কথা জানায়। জিরাফ লম্বা গলা উঁচু করে আরেকটি জিরাফের গলা স্পর্শ করে ভালোবাসা প্রকাশ করে।

স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী হ্যান্ডশেক কতটা ঠিক?

১৯২০ সালে আমেরিকার জার্নাল অব নার্সিংয়ের কিছু নিবন্ধে উঠে এসেছিল, মানুষের হাত ব্যাকটেরিয়ার বাহক। সেসব নিবন্ধে মানুষকে সতর্ক করে হ্যান্ডশেক না করার ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল।

কোভিড-১৯ ছাড়াও চীন থেকে অনেক রোগ এর আগেও ছড়িয়ে পড়েছিল সারাবিশ্বে। যার কারণে চীনের নাগরিকরা নানারকম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন। এর মধ্যে একটি হলো- তারা নিজের দুই হাত একসঙ্গে মিলিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। হ্যান্ডশেক করে না।

শিশুদের আদর করতে গেলে অনেকেই চুমু দেয়। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই অনেক বিজ্ঞানী এ ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, শিশুদের এভাবে আদর করার ফলে রোগের জীবাণু শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলেন, বড়রা শুভেচ্ছা বিনিময়ের কৌশল হিসেবে হ্যান্ডশেক করেন- যা শারীরিক ঝুঁকির অন্যতম কারণ। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের একজন বিজ্ঞানীর লেখা একটি বই ‘ডোন্ট লুক, ডোন্ট টাচ’ এতে বলা হয়েছে, হ্যান্ডশেক ও চুম্বন ভালোবাসা জানানোর মাধ্যম হলেও এসবের মাধ্যমেই সহজে একজন থেকে আরেকজনের কাছে রোগের জীবাণু সংক্রমিত হতে পারে।

হ্যান্ডশেকের ভবিষ্যত

কিছু দেশে ইতোমধ্যেই করোনাভাইরাসের প্রভাব কমেছে। লকডাউন খুলে দেয়া হয়েছে। জীবনযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিকের দিকে যাচ্ছে। তবে তার মানে এই নয় যে, সামাজিক দূরত্ব আর থাকবে না। করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী এবং লকডাউন না থাকলেও বাড়তি সুরক্ষার জন্য এ রীতি মেনে চলতে হবে।

তাহলে প্রশ্ন আসে, তাহলে কি হ্যান্ডশেক উঠে যাবে?

যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজের করোনাভাইরাস টাস্কফোর্সের সদস্য ড. অ্যান্থনি ফাউচি হ্যান্ডশেক সম্পর্কে গত এপ্রিলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আর কখনই আগের মতো নিশ্চিন্তে হ্যান্ডশেক করতে পারবো না। আমার মনে হয়, শুধু করোনাভাইরাস নয়, হ্যান্ডশেক করা বাদ দিলে সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও কমে যাবে।’

তবে ব্যাপারটি কী এতটাই সহজ? মানুষের ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসেবে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই রেওয়াজ বাদ দিলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে— এই প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষক স্টুয়ার্ট উল্ফ বলেন, ‘মানুষের মস্তিষ্কের কিছু অংশকে সক্রিয় করতে হ্যান্ডশেকের ভূমিকা আছে। ফলে এটি বাদ দিলে প্রথমদিকে কিছুটা সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন- মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা বাড়তে পারে। কারো কারো মানসিক সমস্যাও তৈরি হতে পারে।’

হ্যান্ডশেকের বিকল্প

অন্যকে স্পর্শ না করে সম্ভাষণ জানানোর উপায় সারাবিশ্বেই কমবেশি চালু আছে। যেমন- থাইল্যান্ডে সামনের দিকে শরীর সামান্য ঝুঁকিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। কোভিড-১৯ এর সংক্রমণে থাইল্যান্ডে মৃত্যুর হার কম থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে এই রীতির ভূমিকা আছে বলে অনেকে মনে করেন।

এছাড়া হাত নেড়ে, মাথা ঝাঁকিয়ে, হাসি দিয়ে- এরকম আরও অনেক রীতিতেই সম্ভাষণ জানানো যায়। নিজের দুই হাত একসঙ্গে মিলিয়েও শুভেচ্ছা জানানো যায়।

করোনাভাইরাস পরবর্তী পৃথিবীতে হয়তো স্পর্শ ছাড়াই ভালোবাসার চর্চা হবে- এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সারাবাংলা/টিসি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন