বিজ্ঞাপন

‘শিল্পীর পাশে শিল্পী’, দুঃসময়ে শিল্পীদের জন্য দুই বন্ধুর উদ্যোগ

May 13, 2020 | 6:36 pm

রাজনীন ফারজানা

‘প্রতিদিন অফিস থেকে আসা যাওয়ার পথে শুটিং ইউনিটগুলোতে প্রচুর ব্যস্ততা চোখে পড়তো। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধে লকডাউন শুরু হতেই সেসব বন্ধ। সেই থেকেই ভাবছিলাম, এই শুটিং ইউনিটের সঙ্গে কত কত মানুষের জীবন ও জীবিকা জড়িত যা পুরোটাই থেমে আছে। তাদের জন্য যদি কিছু করার ভাবনা থেকেই ‘আর্টিস্টস ফর আর্টিস্টস’ উদ্যোগের সূচনা’, বলছিলেন উন্নয়ন কর্মী অনির্বাণ ভৌমিক।

বিজ্ঞাপন

‘শিল্পীর পাশে শিল্পী, পুরান গল্প নতুন করে’ স্লোগান নিয়ে এগিয়ে এসেছে দুই বন্ধুর সম্পূর্ণ নতুন এই উদ্যোগ। শিল্প, চলচ্চিত্র, সঙ্গিত, নাটক, থিয়েটারসহ বিনোদনের নানা মাধ্যমের কাজ করছেন এমন স্বল্প আয়ের শিল্পীদের জন্য এই আয়োজন। দেশের স্বনামধন্য পেইন্টার, ডিজাইনার, ফটোগ্রাফার, উদ্যোক্তাসহ অনেকেই তাদের নিজেদের আঁকা ছবি ও ডিজাইনকৃত পণ্য সামগ্রী দিয়েছেন বিক্রির জন্য। এর পুরো টাকাটাই খরচ হবে দৈনিক আয়ের ভিত্তিতে কাজ করতেন এমন শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য।


আয়োজনের উদ্যোক্তা দুই উন্নয়নকর্মী অনির্বাণ ভৌমিক ও কিযি তাহনিন। তাদের ডিজিটাল সহযোগী জাস্ট স্টোরিজ। এই উদ্যোগের আহ্বানে এগিয়ে এসেছেন দেশের বরেণ্য ও গুণী চিত্রশিল্পী, আলোকচিত্রী, ফ্যাশন ডিজাইনার ও রূপচর্চাশিল্পী। খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী কনক চাঁপা চাকমা, প্রিমা নাজিয়া আন্দালিব, তারেক আমিন, উদ্যোক্তা টুটলি রহমান, রূপচর্চা বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তা কানিজ আলমাস খান, ডিজাইনার এমদাদ হক, লিপি খন্দকার, আলোকচিত্রকর ডেভিড বারিকদার, প্রীত রেজাসহ অনেকেই।

বিজ্ঞাপন

শিল্পীদের জন্য শিল্পীদের এগিয়ে আসার চিন্তা কিভাবে আসলো জানতে চাইলে লেখক কিযি তাহনিন বলেন, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, স্বাধীন দেশ দেখেছি। শিল্প উপভোগ করি ঠিকই, কিন্তু শিল্পীদের সংগ্রামের গল্প ও জেনেছি। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আমার, আমার বন্ধুর একটি মানবিক উদ্যোগ ‘শিল্পীদের পাশে শিল্পী, পুরোনো গল্প নতুন করে’। প্রতিদিনের কাজের ফাঁকে আমার সমাজ আর শিল্পকে ফিরিয়ে দেওয়া ঋণ, যতটুকু পারা যায়। Artists For Artists এ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মানুষ এবং প্রতিষ্ঠান অব্যবসায়িক, মানবিক বোধ এবং শিল্পীদের প্রতি ভালোবাসা থেকে এ কাজে জড়িত হয়েছি।’

আরেক উদ্যোক্তা অনির্বাণ ভৌমিক বললেন, ‘কোভিড-১৯-এর ফলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে আগে থেকেই কথা হচ্ছিল। রাষ্ট্রীয়ভাবে নানাজনের জন্য ধরণের প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হলেও সেখান থেকে বাদ পড়ে গেছে ‘ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি’। এই শিল্পটি ধীরে ধীরে পেশাদারিত্বের পথে যাত্রা শুরু করলেও হঠাত এই ধাক্কায় থেমে যেতে পারে তা। বিনোদন বা শিল্প মানেই সামনের সারিতে থাকা মানুষগুলো নয়। এর পেছনে রয়েছেন অনেক পারফরম্যান্স আর্টিস্ট ও কলাকুশলী। শুটিং, প্রদর্শনী ইত্যাদি বন্ধ থাকায় তাদের আয় বন্ধ হয়ে আছে। দৈনিক আয়ের ভিত্তিতে কাজ করায় এইসব মানুষের কাছে সঞ্চিত অর্থ না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। সেই ভাবনা থেকেই এগিয়ে আসা। কারণ এই শিল্পীরা না থাকলে বিনোদনের দরজাটাই বন্ধ হয়ে যাবে।

অনির্বাণ বলেন, অতীতেও দেখা গেছে এদেশে যত ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিয়েছে, শিল্পীরা এগিয়ে এসেছেন। কনসার্ট, আবৃত্তি, চলচ্চিত্র উৎসব, নৃত্য উৎসবের মাধ্যমে টাকা তোলা হয়েছে ও দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণ হয়েছে। একজন শিল্পপ্রেমী মানুষ হিসেবে নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকেই তাদের এই উদ্যোগ নেওয়া।

আয়োজনটির ডিজিটাল পার্টনার জাস্ট স্টোরিজ। কথা হল এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বৃতি সাবরিনের সঙ্গে। বৃতি জানালেন, জাস্ট স্টোরিজ মূলত ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে কন্টেন্ট মেকিংয়ের কাজ করে। এক বছর আগে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটির ‘আহারে জীবন’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ আছে। করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা কাজ করছিলেন। কিযি তাহনিন এবং অনির্বাণ ভৌমিকের শিল্পীদের জন্য শিল্পীদের এগিয়ে আসার এই ভাবনার কথা জানতে পেরে তিনি এগিয়ে আসেন। ফেসবুকে পেইজ ও গ্রুপের মাধ্যমে প্রচারণার পুরো কার্যক্রমটা তারাই পরিচালনা করছেন।


বৃতি বলেন, আর্ট বোঝে এমন মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন তারা। এখন পর্যন্ত দারুণ সাড়া পেয়েছেন। শিল্পীরা যেমন স্বতস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসছে, তেমনি এগিয়ে এসছেন শিল্প ভালোবাসে এমন মানুষ। এত মানুষের সাড়া পাওয়ায় তারা ভাবছেন, এই প্ল্যাটফর্মটা রেখে দেবেন যাতে ভবিষ্যতে কখনো এমন প্রয়োজনে এটিকে কাজে লাগানো যায়।

উদ্যোগের সঙ্গে প্রথম থেকেই আছে খ্যাতনামা ফ্যাশন ডিজাইনার এমদাদ হক। তিনি বলেন, তার ভাইয়ের মাধ্যমে এই উদ্যোগের কথা জানতে পারেন। তার ভাই জানতে পারেন কিযির কাছ থেকে। শিল্পীদের জন্য কিছু করার এই আয়োজনটা তার ভালো লাগে তাই এগিয়ে এসেছেন। সব শিল্পীর কাছে অত আয় থাকে না বা জমানো টাকাও থাকে না। তাই তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পেরে তিনি আনন্দিত। শুধু নিজের ডিজাইন করা পোশাকই দেননি, একটি পেইন্টিং কিনেও এই উদ্যোগের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়েছেন এমদাদ হক। এছাড়া অনেক শিল্পীকে এই আয়োজনের কথা জানিয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি।

আর্টিস্টস ফর আর্টিস্টস উদ্যোগে দুটো ছবি দিয়েছেন কনক চাঁপা চাকমা। একটি ছবি ২৫ হাজার টাকায় ইতোমধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে। কথা হল তার সঙ্গে। কনক চাঁপা বলেন, ‘এদেশের শিল্পীরা সবসময় মানুষের পাশে এগিয়ে এসেছে। এখন আমরা একটি দুঃসময় পার করছি। সামনে দেখা দেওয়া অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। অনেক শ্রেণি ও পেশার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিল্পীদের অনেকের হাতে কাজ নাই। তাই তিনি তাদের পাশে দাঁড়াতে চান। সংগঠকদের মাধ্যমে এই উদ্যোগের বিষয়ে জানতে পারেন ও খুব ভালো লাগে তাই এগিয়ে এসেছেন।’

তার ছবিসহ অন্যান্য শিল্প সামগ্রী যারা কিনছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান গুণী এই শিল্পী। এমন উদারমনা মানুষের এই দেশের খুব প্রয়োজন। সবাই মিলে এভাবে হাতে হাত ধরে এগিয়ে যাওয়ার আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

অনন্য এই উদ্যোগের সঙ্গি হয়েছেন গুণী ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা টুটলি রহমান। তার নিজের ডিজাইন করা কিছু স্কার্ফ দিয়েছেন বিক্রির জন্য। এমদাদ হকের মাধ্যমে এই আয়োজন সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে অনেক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে জানালেন টুটলি রহমান। একজন শিল্পী হিসেবে শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করে এগিয়ে এসেছেন শিল্পীদের জন্য শিল্পীদের এই আয়োজনে। তিনি বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে ও নিজ উদ্যোগে যেসব সাহায্য দিচ্ছেন, সেগুলো সম্পর্কে ভালো করে খোঁজ নিচ্ছেন যাতে সত্যিকারের অভাবির কাছেই সেটি পৌঁছে। তিনি চান না এদেশে কেউ না খেয়ে মারা যাক। তাই ধাপে ধাপে সাহায্য করছেন। একদম শুরুর দিকে দিয়েছেন ও দিচ্ছেন, ঈদের পর আর তার পর আরও এক ধাপে সাহায্য করবেন।

আর্টিস্টস ফর আর্টিস্টস আয়োজনে নিজের ডিজাইনের স্কার্ফ দেওয়া প্রসঙ্গে বলেন, তার আসলে শাড়ি বা সালোয়ার কামিজ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সংগ্রহে না থাকায় লক ডাউনের কারণে নতুন করে করতে না পারায় সেটা সম্ভব হয়নি। শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ থেকে তাই তার নিজের ডিজাইন করা প্রিয় স্ক্রার্ফগুলো দিয়েছেন। মানুষের দুর্দশা দূর করতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

সপ্তাহ দুই আগে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে আটটি পেইন্টিং বিক্রি হয়েছে বলে জানান, অনির্বাণ ভৌমিক। পাওয়া গেছে নব্বই হাজার টাকা। তবে যে পরিমাণ আশা করেছিলেন সেটা হয়নি। দেশের মধ্যেই বিক্রি হচ্ছে মূলত। এছাড়া আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসি বাংলাদেশিরাও কিনেছেন কিছু কিছু সামগ্রী।


অনির্বাণ বলেন, লক ডাউনের কারণে এসব পণ্যের কোনটাই ক্রেতার কাছে পৌঁছানো হচ্ছে না। তবুও মানুষ বিশ্বাস করে টাকাটা দিচ্ছে, এটি তাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি চেয়েছেন, বাংলাদেশের শিল্পীদের সৃষ্টি বাংলাদেশি ক্রেতার কাছেই থাকুক, এমন একটি ভাবনা থেকেই শুরু করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসি একজন শিল্পী এগিয়ে এসেছেন যিনি সেদেশে বিক্রি হওয়া শিল্প ক্রেতার হাতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন।

ইতোমধ্যে তাদের হাতে তালিকা পৌঁছে গিয়েছে এবং আগামী সপ্তাহ থেকেই সরবরাহ শুরু করবে বলে জানান, জাস্ট স্টোরিজের বৃতি সাবরিন। ঈদের আগেই অনেকের হাতে সাহায্য পৌঁছে দেবেন তারা।

একটা সুন্দর চলচ্চিত্র, মঞ্চ নাটক, টেলিভিশন নাটক, মিউজিক ভিডিও ইত্যাদি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের একত্র উদ্যোগ। কেউ আলোকসজ্জাশিল্পী, মঞ্চসজ্জা শিল্পী, ক্যামেরা সহযোগী, শুটিংয়ের সহকারী, মেকআপ আর্টিস্টসহ প্রচুর ক্যারেক্টার আর্টস্ট থাকেন যাদের আয় সীমাবদ্ধ। তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসা দুই তরুণের এই উদ্যোগের প্রতি তাই সকলের শুভ কামনা। এগিয়ে আসতে পারেন আপনিও।

আর্টিস্টস ফর আর্টিস্টস গ্রুপের লিংক- https://www.facebook.com/groups/2524509574454762/?_rdc=1&_rdr

সারাবাংলা/আরএফ/এমআই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন