বিজ্ঞাপন

ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ভ্রমণে ‘ট্রাম’

May 14, 2020 | 9:42 pm

সুস্মিতা বড়ুয়া

কলকাতা— যাকে পুরোপুরি যাদুর শহর বললেও যেন কম কম বলা হয়। যার অঙ্গে রয়েছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, হাওড়া ব্রিজ, স্যান্টপল ক্যাথাড্রাল, জাদুঘর , বিদ্যাসাগর সেতু, গঙ্গার ঘাট, রবীন্দ্রনাথের পুন্য স্মৃতি আর ঐতিহ্যে ও বিস্ময়ে ভরা ‘ট্রাম’।

বিজ্ঞাপন

১৯শে আগস্ট ২০১৮ তে কলকাতার ট্রামের সঙ্গে বাড়তি কিছু সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছি। ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ছোঁয়া পেতে ‘আই.সি.সি.আর’ সেই সুযোগটি আমাদের করে দিয়েছিল। আমরা যারা স্কলারশিপ নিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে কলকাতায় পড়তে এসেছি, ট্রাম দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য একেবারেই নতুন।

শুরুটা এস্প্ল্যানেড’র ট্রাম টার্মিনাল থেকে লেনিন সরনী, কলেজ স্ট্রীট হয়ে…..ঘটাং ঘটাং শব্দ, বৃষ্টির আমেজ, আড্ডা, গান আর সঙ্গে ছিল কয়েকজন নতুন বন্ধুর মাধ্যমে চট্টগ্রামের আঞ্চলিকতা। আর সব কিছু ছাপিয়ে যোগ হলো বৃষ্টি ভেজা কলকাতা সৌন্দর্য্যের বিভোরতা।

বিজ্ঞাপন

কলকাতার ট্রামে’র রয়েছে সুবিশাল একটি ইতিহাস। যা না বললে লেখাটা অপূর্ণ থেকে যায়।

ক্যালকাটা ট্রামওয়েস কোম্পানীর পরিচালনায় ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ট্রাম চালু হয় ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৩ সালে আর্মেনিয়া ঘাট থেকে শিয়াল-দাহ পর্যন্ত। যা কিনা দেশের প্রথম এবং একমাত্র পরিষেবা প্রদানকারী ট্রাম এবং এটিই এশিয়ার প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম পরিবহন ব্যবস্থা। প্রথমে ঘোড়ার সাহায্যে চালানো হত। পরবর্তীতে ট্রামে বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হয়।

উল্লেখ্য যে, ব্রিটিশ আমলে ভারতের বেশ কয়েকটি শহরে এই ট্রাম পরিষেবা চালু হলেও বর্তমানে শুধুমাত্র কলকাতাতেই এই ব্যবস্থা চালু আছে। ১৮৭৩ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি, কলকাতার ২.৪ কি.মি. পথে এই পরিষেবা চালু হলেও সঠিক পরিচালনার অভাবে একই বছরের ২০ই নভেম্বর এটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সেই বছরের ১ই ডিসেম্বর বউবাজার  স্ট্রীট, ডালহৌসি স্কয়ার ও স্ট্র্যান্ড রোড হয়ে শিয়াল-দাহ ও আর্মেনিয়া ঘাটের মধ্যে ঘোড়ায় টানা মিটারগেজ ট্র্যাক বসানো হয়।

১৮৮০ সালের ১লা নভেম্বর কলকাতা ট্রামের যাত্রাপথ উদ্বোধন করেন লর্ড রিপন (ভাইসরয়)। পরবর্তীতে ১৮৮২ সালে পরীক্ষামূলক স্টীম ইঞ্জিন চালু করা হয়। ১৯০০ সালে শুরু হয় বিদ্যুতিকরনের কাজ। আবার কোথাও কোথাও ১৯০৫ সালে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে । পরবর্তীতে ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাওড়া ব্রিজ’র মাধ্যমে কলকাতার ট্রাম পরিষেবা হাওড়ার ট্রাম পরিসেবার সঙ্গে যুক্ত হয়।

১ম এবং ২য় এই দুই শ্রেণীতে ট্রাম বিভক্ত। আগে প্রতি কামরাতে দুইটি দরজা ছিল। এখন প্রতিটি কামরার মাঝে ১টি করে দরজা আছে। যাত্রীদের সুরক্ষার জন্য মাথার ওপর ফ্যান জালি দিয়ে ঘেরা। ট্রাম দৈর্ঘ্যে ১৭.৫ মিটার আর প্রস্থে ২.১ মিটার। খালি অবস্থায় ওজন ২০-২২ টন। গতিবেগ ঘন্টায় ২০-৩০ কি.মি. (সর্বোচ্চ ৪০কি.মি.) । বর্তমানে কলকাতায় চালু রয়েছে ১২৫টি ট্রাম (ছিল ৭৫টি) । লাইনের সংখ্যা প্রায় ৩২টি । কলকাতায় মোট ৭টি ট্রাম ডিপো এবং ৯টি টার্মিনাল রয়েছে। ১ গাড়ির বহন ক্ষমতা প্রায় ২০০ যাত্রী আর সিট সংখ্যা ৬০টি । বেশিরভাগ ট্রাম তৈরি করেছে কলকাতার বিখ্যাত বার্ন স্ট্যান্ডার্ড কোম্পানি। ট্রামের ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে আমরা কিছু ট্রামের ভেতর রেস্তোরাঁ দেখতে পাই। কলকাতার ইতিহাসকে তুলে ধরার জন্য ২০১৪ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর ট্রামের ভেতর যাদুঘর চালু করা হয়। এই ট্রামের বর্তমান মালিক পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

দেশি-বিদেশী পর্যটকদের কাছে ট্রাম বিশেষ জনপ্রিয়। পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে ভালো হওয়ার কারণে কলকাতায় ট্রামের বেশ সুখ্যাতি আছে। তাছাড়া দূষণমুক্ত যান হিসেবে ট্রামের কথা আসে সবার আগে। কিন্তু এখন অনেকগুলো যানবাহন হওয়ায় ট্রামের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে ১৯৫৪ সালের ১৪ই অক্টোবর দিনটিকে ট্রামের ইতিহাসের একটি শোকবহ দিন হিসেবে মনে করা হয় । কেননা, সেই দিন বালিগঞ্জে ট্রাম দূর্ঘটনায় আহত হন কবি জীবনানন্দ দাশ ।  ট্রামের ক্যাচারে পিষে যায় শরীর, ভেঙে যায় কণ্ঠা, উরু আর পাজরের হাঁড়। ২২শে অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

বাঙালির সাথে ট্রামের একাত্মবোধ অনস্বীকার্য। এর ঐতিহ্যগত মূল্যও ব্যাপক। কলকাতার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই ট্রাম। কলকাতার মানুষের ঐতিহ্যের প্রতি যে আবেগ আর নস্টালজিয়া— এগুলো সঙ্গে নিয়েই ট্রাম চলতে থাকুক কলকাতার বুকে।

লেখক- শিক্ষার্থী, শিল্প ইতিহাস বিভাগ, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

সারাবাংলা/টিসি

বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন