বিজ্ঞাপন

সুন্দর সুরে গাইবে পৃথিবী

May 15, 2020 | 4:16 pm

ঝর্ণার গান, নদীর ঢেউ, পাখির ডাক, ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ, বাতাসের আনন্দধ্বণি, এমনকি ঝড়ের আর্তনাদেরও একটা সুর আছে, একটা মায়া আছে। পৃথিবীতে যত রকমের প্রাকৃতিক শব্দ আছে কোনো শব্দই বেসুরা নয়, কোনো শব্দই তোমার কানে গিয়ে আঘাত তৈরি করে করে না।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু দেখ আমরা কত রকমের ভয়াবহ শব্দ তৈরি করেছি। গাড়ি ঘোড়া যন্ত্র কল-কারখানা বাদেও লক্ষ লক্ষ বাজে শব্দের মহড়া দেই প্রতি মুহূর্তে। এমনকি যখন রাত, পৃথিবীর যখন ঘুমানোর কথা তখনও আমরা তার কানের কাছে বাজিয়ে তুলি হরেক রকম বিভ্যৎস্য শব্দের করাত।

মানুষ সৃষ্ট সঙ্গীতের কথাই বলিনা কেন! ভেবে দেখেন বিশ্বজুড়ে আধুনিক সঙ্গীতের নামে বিশেষত পশ্চিমা বিশ্ব কত সব কুৎসিত শব্দযন্ত্র তৈরি করেছে। সেখানে যে ভালো নেই তা কিন্ত নয়, কিন্ত সমস্যা হলো উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে দিয়ে বসে থাকি। যন্ত্র একটা বাজাই বটে কিন্তু তার সঙ্গে সঠিক শব্দ যন্ত্রের ব্যবহার করি না। আর বিপত্তি ঘটে সেখানেই। অন্যকে নকল করতে আমাদের সমতুল্য আর কেউ নয়।

সেসব দেশের দু’একটা ঘরোয়া কনসার্ট দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। কই নাতো; কোনা দূষণ ছিল না সেখানে। বরঞ্চ তুমুল আনন্দের মাঝে বেজে চলেছিল সুরোলা তক্তপোষ, একবিন্দুও অযাচিত মনে হয়নি। না হওয়ার সেই একই কারণ, সেটা হলো সঠিক শব্দযন্ত্রের ব্যবহার, আত্মা থেকে উৎসারিত সুরের দোলনায় ভাসিয়ে দেয়া মুহূর্ত, ডেউয়ের গায়ে গা লাগিয়ে ঢলাঢলি। কিন্তু আমরা যে ঢোল পেলেই বাজাতে শুরু করি, ঢুলির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি না করেই।

বিজ্ঞাপন

সে যাই হোক ইদানিং একটা রীতি চালু হয়েছে, বাড়িতে বাড়িতে ছাদ কনসার্ট। আমার ছেলের জন্মদিন, মেয়ের বিয়ে বা গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান। তো সেখানে আমার যথাসাধ্য অর্থলগ্নির সামর্থ্য নিশ্চয়ই দেখাবো মানুষকে, কিন্ত তার মানে এই নয় যে আমি তারস্বরে ভয়ানক বেসুরা গান আর বাজনা বাজাবো রাতভর। আশপাশের দালানে এলাকায় তো হাজার মানুষের ঠাসাঠাসি বসবাস; কেউ হয়ত রাত জেগে প্রার্থনায়, কেউ পরীক্ষার পড়া, কেউ ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছেন, কেউ বা রাত জেগে অফিসের কাজ করছেন এমনকি কেউ হয়তো পঞ্চমবারের মতোন খুলে দিয়েছেন চোখের পাতা শিশুর আবদারে অথবা কেউ ভেবেছেন উপন্যাসের শেষ অধ্যায়টা আজ শেষ করতেই হবে, ফেব্রুয়ারি আসতে খুব বেশি মাস বাকি নেই আর।

তো? আমার কি? আমার আনন্দ হলেই হলো। সেসব অনুষ্ঠানে যারা গান গাইতে আসেন, তারা অবশ্য নিজেরা গান গেয়েই খুব তৃপ্তি পান। কেউ গান শুনল কি, না শুনল তা খুব একটা বুঝতে পারেন না। আর তারা কয়েক লক্ষ বাংলা গানের ভান্ডার থেকে ঠিক যেন যথাযথ কোনো গানই খুঁজে পান না। কারণ ওগুলো আবার ছাদ কনসার্টের বিপুল দর্শকরা ‘খাবে না’।

অন্যদিকে আয়োজনে আসে পনের বিশজন দর্শকের খাবার জন্য যাদের আবার অধিকাংশই নিজের মেকাপের যথার্থতা, খাবারের দোষগুণ আর সেলফি কর্মকাণ্ডে ব্যতিব্যস্ত; তাদের খাবার জন্য কিছু সস্তা জনপ্রিয় হিন্দি গান গাইতে থাকেন। নিজেই হাত তালি দেন, নিজেই বলেন, থ্যাংকিউ। সেই থ্যাংকিউ বলার মধ্যে এক ধরনের হিরোইজম থাকে।

বিজ্ঞাপন

সেই সব বিশাল অনুষ্ঠানের ছবিতে লাইক শেয়ারের হিড়িক। ঘৃণা জানাতে পারেননা কেউ । কারণ আমাদের ভেতর থেকে টেনে বের করে নেওয়া হয়েছে সত্য বলার সাহস, আমাদের ভেতরে থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে সুন্দরের সংজ্ঞা কি।

আচ্ছা সুন্দরের সংজ্ঞা কি? সুন্দর মানে ভালো, সুন্দর মানে দৃষ্টিনন্দন। আচ্ছা সেটাই বা কি? কারো কাছে টাঙ্গাইল শাড়ির স্নিগ্ধতা ভালো কেননা একখানা টাঙ্গাইল শাড়ি তো শুধু একটা শাড়ি নয়; একখানা টাঙ্গাইল শাড়ি মানে একটি তাঁতি বাড়ি, তাতীর স্বপ্ন তাঁতী বউয়ের ঘরকন্যা, সুতোর মায়া, নিজের দেশ, বাঙালিয়ানা আরো কতো কি! একখানা টাঙ্গাইল শাড়ি মানে রুবী রহমানের একটি কবিতা। তো সেই শাড়িখানা যখন কোনা রমনীর গায়ে জড়িয়ে পেঁচিয়ে ওঠে আহ কি অপূর্ব তার বাহার।

আচ্ছা তাহলে ইন্ডিয়ান বা পাকি পাতলা জর্জেট জড়িয়ে শরীরের বাঁকগুলোকে সামান্য ছড়িয়ে দেয়া কি সুন্দর নয়! কি একটা অবস্থা। সেও তো সুন্দর। কি যে সুন্দর আর কি যে সুন্দর নয়, কোনটাকে সুন্দর বলব আর কোনটাকে নয়, কেন তা সুন্দর, অথবা কেন তা অসুন্দর, কোনটা নন্দিত আর কোনটা কামুক; তার হিসেব মেলা। কিন্তু যা কামুক তাও ত সুন্দর, তাই নয় কি?
দেখুন পাঠক, এটা সৌন্দর্যতত্ত্বের ক্লাস তো নয়। ওর কথা ভাবলে আমার হাত পা আড়ষ্ঠ হয়ে ওঠে এখনো।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অধ্যাপক লুৎফর রহমান স্যারের নন্দনতত্ত্ব ক্লাস। হা ঈশ্বর! এক বছর ধরে প্রায় শ’দুয়েক ক্লাস। বিনিময়ে মাত্র পঞ্চাশটি নাম্বার। রেফারেন্স বইয়ের তালিকার কথা ভাবলে এখনো মাথায় গন্ডগোল লাগে। কিন্ত কথা হলো কি শিখলাম সেই সৌন্দর্যত্ত্বের ব্যাখ্যায়। তখন কিছুই শিখতে পারিনি পরীক্ষার খাতায় পাশ নাম্বার তোলা ছাড়া।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু শিখেছি। মগজের কোষে কোষে বীজ বুনে দিয়েছেন সেই বিজ্ঞ অধ্যাপক। আর তাইতো হবার কথা। তিনি শিখিয়েছেন নিজের স্বকীয়তার মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে সকল সৌন্দর্য। তুমি যা তুমি তাই। তুমি তোমাকে ছাপিয়ে যেও না। ফুল নিশ্চয়ই গাছকে ছাপিয়ে যায় না, কখনও যায় বৈকি তবে পোশাক যদি তোমাকে ছাপিয়ে যায় তাহলে সেখানে তোমর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। কিন্তু কথা হলো ধান ভাঙতে শিবের গীত কেন গাইছি।

যে কথা বলছিলাম শব্দের কথা সুরের কথা প্রকৃতির সাথে পৃথিবীর সাথে আমাদের বৈরি আচরনের কথা। কারণ ছাড়া ত কথা বলি না আমরা। তবে চলো ফিরে যাই সেই প্রকৃতির কাছে, সুরের কাছে, সামঞ্জস্যের কাছে, পরিমিতির কাছে; যা তোমাকে ছাপিয়ে না যায়, তার কাছে। আর ছাপিয়ে গেলে তা যেন মহাশুন্যের মহাজনের কাছে বিলীন হয়ে হয়ে যায় নিমগ্নতম ধ্যানে উপাসনায়।

ভেবে দেখ একবার সুরযন্ত্রগুলো ক্রমাগত হারাতে বসেছে তাদের মাধুর্য কৌলিন্য ও অবস্থান।
“একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল, জীবন মরণ মাঝে তোর সুর যেন বাজে…” একটি মাত্র তারের যন্ত্র তার আবেদনময়তা নিয়ে তার শক্তি নিয়ে এমন করেই ত লিখেছেন শিল্পীরা, মন আর মননের মন্দিরে হাতে একতারা আর বুক ভর্তি ধূ ধূ শুণ্য বাতাস নিয়ে গেয়ে উঠেছে বাউল। এইতো ছিল আমার দেশ।

আচ্ছা বলতো, ঢোল, খোল, তবলা, বাঁশি, দোতারা, জারি সারি ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, পুঁথিপাঠ আপনার কর্ণকূহরে কোনো অস্বস্তি তৈরি করত কিনা। করতো না, বরঞ্চ সুরে মায়াজালে মন্ত্রমুগ্ধ মানুষ ভেসে যেতো অজানা এক মায়াবী হাওয়ায়। বাউল অথবা কীর্তনের শেষে অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়তো মানুষ; যেন শরীর-মন থেকে নেমে যেত অযাচিত বিষ, শুদ্ধ হত ফুসফুস।
নদীর কথা ভেবেছেন কখনো! নদীর ছলাৎ ছলাৎ ডেউয়ের সাথে দাঁড় টানছেন মাঝি আর তার ক্লান্তি ভোলাতে গাইছেন, ‘‘নদীর এক কূল ভাঙিয়া গ্যালে কি আর এম যায় আসে, হাসিতে হাসিতে নদীর আর এক কূল ভাসে’’ অথবা শচীন কর্তার গানটার কথা মনে আছে?; “কে যাস রে ভাটির গান গাইয়া, আমার ভাই ধনরে কইও নাইওর নিতে বইলা, তোরা কে যাস কে যাস…”

অথচ সভ্যতার অসভ্যতায় নিদারুন হুড়োহুড়ি আর দৌড়ের কবলে পড়ে মানুষ প্রতিটি নদীর বুকে ভাসিয়ে দিয়েছে ইঞ্জিনের নৌকা, ভয়ানক ভটভটভটভট শব্দ আর দূষিত ইঞ্জিনের ধোঁয়ায় বিলীন হয় নদীর রুপ, নদী কান্দে কত যে কান্দে তার খবর কে রাখে! কোনো মাঝি আর গান গায় না নদীর বুকে, পথের বাঁকে বাঁকে বাঁশি বাজায় না কোনো ক্লান্ত রাখাল।

চলো একবার ফিরে তাকাই নিজের দিকে নিজেদের ভুলগুলোর দিকে। চলো আর একবার ফিরে যাই মাটির কাছে, মমতার কাছে। চলো আর একবার ফিরে যাই কৃষকের কাছে, শ্রমিকের কাছে। চলো আর একবার ফিরে যাই গাছেদের কাছে, ফুলেদের কাছে, নদীদের কাছে। চলো আর একবার ফিরে যাই সংযমের কাছে, লোভহীনতার কাছে। চলো আর একবার ফিকে মারি পুঁজি সভ্যতার কফিন চিরতরে পৃথিবীর থেকে।

চলো সমস্বরে বলি, “ডাল ভাতে দিন চলবে, আমাদের চাই না অঢেল’’, চলো বলি, ‘‘ এখনো বুকের কাছে একটা ফুল, বকুলের দানা/ পুঁতে দাও প্রাণভরে বৃক্ষবীজ, সকালে বিকেলে বৃক্ষবন্দনা’’ ……. এখনো আমাকে রাখ চাষাবাদে/ মৌসুমি বায়ু, পাড়ায় মহামারি লাগলে/ আমি আছি নিমফুল আয়ু।”
চলো আর একবার বলি, “সভ্যতা বিষয়টি আমাকে বুঝতে দিও না ,/ মূর্খ মুল্লুক জুড়ে আমি হব মাটির কান্না।”

কিন্তু কেন এতসব কথা? ‘‘কি কথা তাহার সাথে, তার সাথে’’ আসলে বলতে চাইছি পৃথিবীর একটি প্রাণ আছে। আর সে অনিন্দ্যসুন্দর পৃথিবীর বুকে আমরা ঢেলে দিয়েছি সহস্র রকম বিষের পেয়ালা। ধরে নেই সেই সহস্র পেয়ালার একটি হলো শব্দ।
হ্যাঁ প্রতিনিয়ত সমস্ত পৃথিবীর বুকের ওপর মুখের ওপর চোখের ওপর কানের ওপর আমরা ঢেলে দিয়েছি লক্ষ রকমের অযাচিত শব্দের বিক্ষুব্ধতা। আর পৃথিবী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠার অন্যতম বড় কারণ শব্দদূষণ।

আর হ্যাঁ যদি আমরা তাকে ফিরিয়ে দিতে পারি নৈঃশব্দের গান, যদি আমরা তাকে ফিরিয়ে দিতে পারি কোকিলের কুহুতান, যদি আমরা তাকে ফিরিয়ে দিতে পারি ঢেউয়ের সিম্ফনি…যদি আমরা তাকে ফিরিয়ে দিতে পারি নিদেনপক্ষে ভোরের ভৈরবী, সাতটি না হোক চারটি কমপক্ষে চারটি (রা গা ধা না) কোমল স্বরের আলাপ বিস্তার; তাহলেও দেখবে ব্যথিত পৃথিবীর মুদ্রিত চোখের পক্ষ্ম জুড়ে চিকচিক করে উঠছে কার্তিকের সকাল আর সোনালী শিশিরের স্মিত পয়ার।”

লেখক: কবি, চলচ্চিত্র শিক্ষক

সারাবাংলা/এসবিডিই/আরএফ

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন