বিজ্ঞাপন

করোনায় ‘প্রণোদনা প্রস্তাবে’ই সীমাবদ্ধ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল

May 23, 2020 | 9:09 am

আসাদ জামান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বিশ্বমহামারি করোনাভাইরাসের মহাদুর্যোগে সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন ছাড়া অন্য দলগুলো প্রণোদনা প্রস্তাব ও সুপারিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও দৃশ্যমান কোনো কর্মকাণ্ডে নেই।

বিজ্ঞাপন

সূত্রমতে, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪২টি। এগুলো হলো—  জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ (মোজাফফর), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, গণফোরাম, জাতীয় গনফ্রন্ট, গণতন্ত্রী পার্টি, বাংলাদেশ কংগ্রেস, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল-পিডিপি, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় পার্টি (জাপা), জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), জাতীয় পার্টি (জেপি), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ও জাকের পার্টি।

তবে এই ৪২টি দলের মধ্যে সবগুলোর প্রতিনিধিত্ব অবশ্য নেই সংসদে। এই মুহূর্তে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো হলো— বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপি, বাংলাদেশ ওয়ার্কাস পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), গণফোরাম, জাতীয় পার্টি (জেপি), বিকল্প ধারা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন।

বিজ্ঞাপন

বিশ্লেষকরা বলছেন, যেকোনো জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় সবার আগে রাজনৈতিক দলগুলোকেই এগিয়ে আসতে হয়। বিশেষ করে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর এই দায়িত্ব একটু বেশিই বর্তায়।

তবে অন্য দলগুলোও জাতীয় দুর্যোগ একেবারে এড়িয়ে যেতে পারে না। নিজেদের সীমিত সামর্থ্য অনুযায়ী সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু করোনা মহামারি মোকাবিলায় সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি এবং ইসলামী আন্দোলন ছাড়া অন্যদের ভূমিকা জোরাল নয়— এমনটিই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

করোনা প্রাদুর্ভাব শুরুর পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক দল নাগরিক ঐক্য’র আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সরকারের কাছে কিছু প্রস্তবনা তুলে ধরেন। ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম প্রধান শরিক সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল গণফোরামও বিবৃতির মাধ্যমে কতকগুলো প্রস্তবনা তুলে ধরে। ফ্রন্টের আরেক শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) তাদের প্রণোদনা প্রস্তাব বিবৃতি আকারে পাঠিয়ে দেয় গণমাধ্যমে।

এর বাইরে এই তিন দলের প্রধান ড. কামাল হোসেন, আ স ম আব্দুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্নাকে অন্য কোনো কর্মকাণ্ডে দেখা যায়নি। এমনকি দলের ব্যানারে বড় কোনো ত্রাণ তৎপরতা, অসহায় ব্যক্তিদের জন্য সাহায্য-সহযোগিতা সংগ্রহ, ত্রাণের জন্য তহবিল গঠন অথবা কোনো তহবিলে অর্থ অনুদানও দিতে দেখা যায়নি। একটি সেমিনারে ফেসবুক লাইভে অংশগ্রহণ ছাড়া করোনা মোকাবিলায় সচেতনতামূলক কোনো প্রচারণায়ও তারা ছিলেন না। শুধু তাই নয়, সংসদে গণফোরামের দুই সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও মোকাব্বির খানকেও কোনো ধরনের কর্মসূচিতে দেখা যায়নি।

এদিকে ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোও করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় বিবৃতি প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। জোটের অন্যতম শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটি পার্টির (এলডিপি) একাংশের চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বিভিন্ন পরামর্শ, উপদেশ, দাবি ও আহ্বান সম্বলিত বিবৃতি মাঝে মধ্যেই গণমাধ্যমে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু করোনা সংকটকালে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কোনো নজির তিনি স্থাপন করতে পারেননি। অবশ্য এলডিপি’র আরেক অংশের মহাসচিব শাহাদাত সেলিম নিজের নির্বাচনি এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা অব্যহত রেখেছেন।

নৌকার টিকিটে সংসদে যাওয়া বিকল্পধারাকেও করোনা দুর্যোগে তেমন কোনো ভূমিকায় দেখা যায়নি। দলটির দুই সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান ও মাহি বি. চৌধুরীর কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। দলটির প্রেসিডেন্ট ডা. অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকেও করোনাকালে সক্রিয় কোনো ভূমিকায় দেখা যায়নি।

তবে করোনা সংকটে ব্যতিক্রমধর্মী নজির স্থাপন করেছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। চরমোনাই পীর সৈয়দ রেজাউল করীম নেতৃত্বাধীন দলটি করোনা সংকটের শুরু থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ঢাকায় ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা চালিয়েছে তারা। স্থানীয় নেতাদের উদ্যোগে মহানগরের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে দলটির শীর্ষ নেতারা ত্রাণ কার্যক্রশে শরিক হচ্ছেন।

দলটির আমীর সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করীম নিজ এলাকা বরিশালের চরমোনাইয়ে ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা চালিয়েছেন। নিজে হাতে হতদরিদ্র মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসার পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান জানিয়েছেন।

রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও করোনা সংকট মোকাবিলায় নিজেদের সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। করোনা প্রাদুর্ভাব শুরুর দিকে সচেতনতামূলক প্রচারণা, লিফলেট বিতরণ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, গ্লাভস বিতরণ কার্যক্রম চালিয়েছে দলটি।

পুরো দেশ লকডাউনে যাওয়ার পর  সম্ভব্য ‘খাদ্যসংকট’ মোকাবিলায় ত্রাণ তৎপরতা শুরু করে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঢাকা এবং ঢাকার আশপাশের জেলায় ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছে। দলের তৃণমূল ইউনিটগুলোও নিজেদের সাধ্যমতো ত্রাণ বিতরণ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় এরই মধ্যে তিন দফা সংবাদ সম্মেলন ডেকে দলের পক্ষ থেকে বেশ কিছু পরামর্শ, প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

অর্থাৎ সরকারের পর রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ করোনা মোকাবিলায় সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাকি দলগুলোর ভূমিকা এতটা চোখে পড়ার মতো নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘যেকোনো সংকটে রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা আশা করে জনগণ। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে, মূল কাজটা করতে হয় সরকারকেই। কারণ, সরকারের কাছেই রাষ্ট্রীয় কোষাগারের চাবি থাকে। থাকে সব ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট।’

জানতে চাইলে জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের মূল দায়িত্ব সরকারকে সঠিক পথ দেখানো, পরামর্শ দেওয়া। সেটা আমরা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সরকার আমাদের কথা শোনে না। আমরা যে সম্মিলিত উদ্যোগের কথা বলেছিলাম, সেটাও শোনেনি। এ ছাড়া আমাদের আর কী করার আছে? তাছাড়া সীমিত সামর্থের মধ্যে আমরা অসহায় মানুষদের সহযোগিতা করে যাচ্ছি।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের যেটুকু ভূমিকা পালন করার কথা, সেটা আমরা পালন করেছি, করছি। দলের পক্ষ থেকে সারাদেশে ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সরকারকে আমরা যেসব পরামর্শ দিয়েছিলাম, সেগুলো মানলে সংকট সমাধান আরও সহজ হতো।’

সারাবাংলা/এজেড/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন