বিজ্ঞাপন

কারাগার নয়, হাসপাতালের কেবিনে জি কে শামীম!

May 23, 2020 | 11:08 am

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: অস্ত্র ও মাদক মামলায় গ্রেফতার হওয়া বিতর্কিত ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের দিন কাটছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের প্রিজন কেবিনে শুয়ে-বসে। গুরুতর রোগী না হলেও আদালত-কারাগার-হাসপাতাল ‘ম্যানেজ করে’ ৪৮ দিন ধরে আরামে দিন কাটছে অভিযুক্ত এ আসামির।

বিজ্ঞাপন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে চালানো ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় বিতর্কিত এই ঠিকাদার জি কে শামীম আলোচনায় আসেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) পরিস্থিতিতে গত ৫ এপ্রিল দুপুর ১টা ২০ মিনিটে বিএসএমএমইউতে ভর্তি হন ৫৫ বছর বয়সী মো. শামীম (জি কে শামীম)। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ও ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. হাসান ইমামের স্বাক্ষরিত রোগীর ব্যবস্থাপনাপত্রে জি কে শামীমকে ভর্তি করা হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বিএসএমএমইউ’র PC-2D বেডে স্থান দেওয়া হয় জি কে শামীমকে। ব্যবস্থাপনাপত্রে কোনো রোগের নাম উল্লেখ করা না থাকলেও জি কে শামীমকে অর্থোপেডিক্স বিভাগের অধীনে ভর্তি করা হয়।

বিজ্ঞাপন

জি কে শামীমের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে গেলে বিএসএমএমইউ’র এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার ডায়াবেটিস আছে। প্রতিনিয়ত তিনি ডায়াবেটিসের ওষুধ নিয়ে থাকেন। প্রেশারের ওষুধও খান তিনি। আরও কিছু বিদেশি ওষুধ তিনি নিয়ে থাকেন আর সেক্ষেত্রে দেখা যায় সেগুলো বেশিরভাগই সিঙ্গাপুরের ওষুধ। এক্ষেত্রে কিছু ক্যালসিয়ামের ওষুধও খেয়ে থাকেন। তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে অর্থোপেডিক্স বিভাগের অধীনে।

এই চিকিৎসক আরও জানান, জি কে শামীমের পুরনো একটা ফ্র্যাকচার আছে হাতের ডান পাশের হিউমেরাসে, যেটাকে মেডিকেল টার্মে ফ্র্যাকচার নন ইউনিয়ন বলা হয়ে থাকে। এই সমস্যা উনার আগেও ছিল। তবে এটার জন্য এখন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তেমন দরকার নেই। যদি অপারেশনই করতে হয় তবে তা আরও মাসখানেক পরেও করা যায়। এর জন্য এই করোনা পরিস্থিতিতে হাসপাতালের প্রিজন কেবিনে ভর্তি থাকতে হবে এমন কিছু হয়নি তার। এখনই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা করতে হবে এমন কোনো রোগ নেই তার। এমনিতেই কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে বিএসএমএমইউতে ইমার্জেন্সি বাদে অন্য কোনো অপারেশন কম হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে জি কে শামীমের এমন কোনো ইমার্জেন্সী নেই।

এ চিকিৎসক আরও বলেন, ‘যে অজুহাতে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, সেই বিষয়ে আগেই একটা অপারেশন করা আছে। সেক্ষেত্রে একটা প্লেটও লাগানো আছে। এখন যেভাবে আছে তাতে তার আপাতত অপারেশন দরকারই নাই। বর্তমান অবস্থায় যদি তিনি আসামী হিসেবে জেলখানায় থেকেও থাকেন তবে সেখানেও এখন যে চিকিৎসা চলছে তা চালানো যেতে পারে। সে জন্য ৪৮ দিন প্রিজন কেবিনে থাকার প্রয়োজন নেই।’

এ বিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ও ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. হাসান ইমামের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

অর্থোপেডিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আবু জাফর চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে আসলে হাসপাতালের অনেক রুটিন ওয়ার্ক করা যায়নি। সে কারণেও অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসায় দেরি হতে পারে।’

জি কে শামীমের নাম উল্লেখ করার পরে অধ্যাপক ডা. আবু জাফর চৌধুরী বলেন, ‘উনি ভর্তি হওয়ার পরেও করোনা সংক্রান্ত সমস্যা শুরু হয়ে যায়। বর্তমান অবস্থায় উনার ডায়াবেটিস আনকন্ট্রোলড অবস্থায় আছে। তার পরেও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে। এই সময়ে আসলে আমরা রুটিন কেইস তেমন করছি না। ঈদের পর আমরা শুরু করব। তখন প্রথম তারিখেই আমরা তাকে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেব। তিনি মূলত এসেছেন অপারেশনের জন্য। এই সময়ে রোগীকে অপারেশন না করে তো চলে যেতে বলা যায় না। আবার তিনি যদি অপারেশন করে দেওয়ার কথা বলে তখন তো আসলে আমাদের তা করতেও হবে। নতুবা দেখা যাবে তিনি আবার ক্লেইম করবেন। এ জন্যেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। ঈদের পরে রুটিন কেস শুরু হলে সবার আগেই তার বিষয়টা দেখা হবে।’

আদালতের নির্দেশে হাসপাতালের পরিচালকের অনুমতিক্রমে জি কে শামীমকে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলেও জানান অধ্যাপক আবু জাফর চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে আমাদের হাতে আসলে কিছুই নেই। আদালতের নির্দেশের কারণে হাসপাতালের পরিচালক উনাকে ভর্তি করেছেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে তো আসলে আমাদের চিকিৎসা দিয়ে যেতে হবে।’

এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুলফিকার আহমেদ আমিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি সম্প্রতি এই হাসপাতালে যোগদান করেছি। তাই এ বিষয়ে আমার খোঁজ নিয়ে জানাতে হবে।’

এ দিকে জি কে শামীমের আইনজীবী শওকত ওসমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘জজ কোট থেকে জিকে শামীমকে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার একটা অনুমতি নেওয়া আছে।’ তবে এর বাইরে আর কোনো বিস্তারিত মন্তব্য করেননি তিনি।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জি কে শামীমের বাসা ও অফিসে অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় তার সঙ্গে থাকা সাত সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযানে শামীমের অফিস থেকে ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর চেকসহ নগদ প্রায় দুই কোটি টাকা জব্দ করা হয়। এ সময় শামীমের কাছে একটি অস্ত্রও পাওয়া যায়। পরবর্তীতে একাধিক মামলা দায়ের করা হয় তার বিরুদ্ধে। ক্যাসিনোকাণ্ডে আলোচিত এই ব্যক্তির নাম আবার আলোচনায় আসে নাম হাইকোর্টে পরিচয় গোপন করে জামিন নেওয়ার পর।

সারাবাংলা/এসবি/জেআইএল/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন