বিজ্ঞাপন

কিটের পেছনে চার কোটি টাকা খরচ করে বসে আছে গণস্বাস্থ্য!

May 23, 2020 | 3:12 pm

আসাদ জামান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সম্পূর্ণ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র এরইমধ্যে চার কোটি টাকা খরচ করে ফেলেছে ‘জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লোট’ প্রকল্পে। কিন্তু প্রকল্পের আওতায় উৎপাদিত কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ কিটের রেজিস্ট্রেশন এখনও পায়নি তারা। ফলে আবিষ্কারের স্বীকৃতি না পাওয়ার হতাশার সঙ্গে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও সামনে চলে আসছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব মহামারি করোনাভাইরাস বাংলাদেশে আসার আগেই গত ফেব্রুয়ারি মাসে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র-আরএনএ বায়োটেক লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজীব বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. বিজন কুমার শীলের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে সৃষ্ট কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ কিট আবিষ্কার করেন। অন্য গবেষকরা হলেন ড. ফিরোজ আহমেদ, ড. নিহাদ আদনান, ড. মো. রাইদ জমিরুদ্দিন ও ডা. মুহিব উল্লাহ খোন্দকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এই গবেষণা কর্মের শুরু থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) এক্সটার্নাল ভ্যালিডেশন ফি-সহ কিটের স্যাম্পল জমা দেওয়া পর্যন্ত গত তিনমাসে ‘জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লোট’ প্রকল্পে প্রায় চার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এ টাকার পুরোটাই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ফান্ড থেকে ব্যয় করা হয়েছে। এই ব্যয়ভার বহন করা গণস্বাস্থ্যে কেন্দ্রের মতো একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের কাছে খুব কষ্টসাধ্য বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে পদ্ধতি আবিষ্কারের প্রথম ধাপেই বিশাল অংকের একটি অ্যামাউন্ট খরচ করতে হয়েছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে। এরপর রিএজেন্ট আমদানির অনুমোদন পাওয়ার পর এলসি খোলা থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আরেক দফা অর্থ ব্যয় করতে হয় প্রতিষ্ঠানটিকে।

কিন্তু নানা জটিলতায় ইংল্যান্ডের দ্য এন্টিজেন কোম্পানি থেকে রিএজেন্ট আসতে বিলম্ব হওয়ায় বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে চীন থেকে রিএজেন্ট আনতে হয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে। ফলে আরেক দফা খরচ বেড়ে যায় প্রতিষ্ঠানটির। এপ্রিলের সাত তারিখে চীন থেকে আসা ১০ কেজি রিএজেন্ট দিয়ে ১০ হাজারের মতো কিট তৈরি করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। সেই কিট হস্তান্তর ও অনুমোদন জটিলতার মধ্যেই ইংল্যন্ড থেকে ১০০ কেজি রিজএজেন্ট ঢাকায় আসে। ফলে সেগুলোর পুরো অর্থ পরিশোধ করতে হয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে চীন ও ইংল্যান্ড থেকে আসা প্রথম ধাপের রিএজেন্ট দিয়ে কিট তৈরি বা বাজারজাত করার সুযোগ না পেলেও সম্প্রতি চীন থেকে ঢাকায় পৌঁছেছে রিএজেন্টের দ্বিতীয় চালান। এ চালানে আরও ১০০ কেজি রিএজেন্ট হাতে পেয়েছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। এগুলোর দামও পরিশোধ করতে হয়েছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে।

শুধু রিএজেন্ট আমদানি নয়, কিট উৎপদানের জন্য কারখানা স্থাপন, অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে কাঁচামাল ক্রয়, শ্রমিকের বেতন, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি, ল্যাবরেটরি চার্জ সর্বোপরি বিজ্ঞানীদের সম্মানী বাবদ মোটা অংকের টাকা খরচ করতে হয়েছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া কিট ব্যবহারের জন্য দেশীয় প্রযু্ক্তিতে প্রতিটা কিটের জন্য একটা করে ডিভাইস তৈরি, প্যাকেজিং, লোগো, এন্টিজেন, এন্টিবডির জন্য পৃথক পাত্র তৈরিতেও মোটা অংকের টাকা খরচ হয়েছে ‘জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লোট’ প্রকল্পে। পাশাপাশি কিট ইন্ট্রুডিউস করতে গিয়ে সভা-সেমিনার, বিজ্ঞাপন তৈরি, সংবাদ সম্মেলন, সরকারি দফতের চিঠি চালাচালি, এক দফর থেকে আরেক দফতরে দৌড়াদৌড়ি, সর্বোপরি এক্সটার্নাল ভ্যালিডেশন ফি— সব মিলে এখন পর্যন্ত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মোট খরচ প্রায় চার কোটি টাকা।

এত অর্থ, সময় এবং শ্রম ব্যয় করার পরও আমলা তান্ত্রিক জটিলতার কারণে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। টানা তিন মাস পরিশ্রমের পর সাফল্য বলতে দশ হাজার কিট উৎপাদন এবং সেগুলোর ভ্যালিডেশনের জন্য বিএসএমএমইউ পর্যন্ত পৌঁছানো। অবশ্য অনুমোদন পাওয়ার পর কিট উৎপাদনে যাওয়ার জন্য যে রিএজেন্ট প্রয়োজন সেটা এখন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের হাতে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ প্রসঙ্গে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত দশ হাজারের মতো কিট তৈরি করেছি। যে রিএজেন্ট আমাদের হাতে আছে, সেটা দিয়ে আর এক লাখ কিট উৎপাদন করতে পারব। সরকার যদি আজ আমাদের অনুমোদন দেয়, কালকেই আমরা উৎপাদনে যেতে পারব।’

‘এই সব যোগাড়-গোছাল করতে আমাদের চার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। অথচ এখন পর্যন্ত কিট ব্যবহারের অনুমোদনই আমরা পেলাম না’— বলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অবস্থাটা এমন এক পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে সরাসরি কাউকে দোষারোপও করতে পারছে না গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। কারণ, ওষুধ প্রশান বলছে- ভ্যালিডেশনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সেটির রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত আমাদের করার কিছু নেই। অন্যদিকে ভ্যালিডেশনের দায়িত্ব গ্রহণ করা বিএসএমএমইউ নিজেদের গতিতে এগোচ্ছে। গণস্বাস্থ্যের কিটের জন্য তারা ঈদের ছুটিতে কাজ করতে যাবে কেন?

অবশ্য বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কাউকে দায়ি করছে না গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা। বরং ধৈর্য’র সঙ্গে অপেক্ষা করছেন চূড়ান্ত পরিণতি দেখার জন্য। আস্থা রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। তাদের বিশ্বাস দেরিতে হলেও বাংলাদেশেই কিটের রেজিস্ট্রেশন হবে।

এ প্রসঙ্গে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা এখনই কারও সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক কথা বলব না। যে দেশ ইমারজেন্সি বোঝে না, ঈদের ছুটিতে হাসপাতাল বন্ধ থাকে, বছরের পাঁচ মাস কোর্ট বন্ধ থাকে, সে দেশে কথা বলে আর কী হবে? আমরা ধৈর্য ধরছি, আরও ধৈর্য ধরব। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমাদের আস্থা আছে। তিনি নিশ্চয় বিষয়টি দেখবেন।’

সারাবাংলা/এজেড/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন