বিজ্ঞাপন

‘নিউ নরমাল’-এর জন্য কি প্রস্তুত আমরা?

May 25, 2020 | 8:58 pm

রফিকউল্লাহ রোমেল

এই কলাম মূলত সারাবাংলার সম্পাদকীয় মতামতের পুনঃবিশ্লেষণ এবং সম্প্রসারণ। সংবাদ হেডলাইন বা হোমপেজে আমরা প্রতিদিনের নানা ঘটনার হালচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করি নির্মোহভাবে। সেটা খবর হিসেবে যতই ভীতি, হতাশা, ক্রোধ বা ঘৃণার সঞ্চার করুক না কেন, সংবাদ বলে তা সংবাদই। সংবাদ নৈর্ব্যক্তিক। সংবাদ সিদ্ধান্ত নেয় না। পাঠক নেয়।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সংবাদ সম্প্রসারণে এসে আমরা চেষ্টা করি, কিভাবে মানুষের জন্য আশার আলো সঞ্চার করা যায়। এক ফোঁটা হলেও। আর সেই আশায় প্রোথিত থাকে বাস্তবতার নিরিখে চিন্তার খোরাক।

প্রায় মাস দেড়েক আগে এই কলামে যখন ‘কোনদিকে এগুচ্ছি আমরা’ আলোচনা করতাম, তখন উঠে এসেছিল লকডাউনের প্রসঙ্গ। অনেক আলোচনা-বিশ্লেষণের পর যেটা নিশ্চিতভাবে বোঝা গেছে, সেটা হলো— আমাদের দেশে লকডাউন ‘ফ্ল্যাটেন দ্য কার্ভ’ বা সংক্রমণ-মৃত্যু হার সমতল করার জন্য নয়; বরং আমাদের দেশে লকডাউন বা লকডাউনের মতো করে ‘সাধারণ ছুটি’ ঘোষণা করা হয়েছে অনেক বেশি সময় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বা সামগ্রিক সিস্টেমকে প্রস্তুত হওয়ার জন্য।

বিজ্ঞাপন

অবশ্য লকডাউন আমাদের এখানে কার্যক্ষেত্রে পুরোপুরি কখনোই প্রয়োগ করা হয়নি বা যায়নি। গণমানুষের ভূমিকার সমালোচনা করেও এক্ষেত্রে বলতেই হয়, ‘সাধারণ ছুটি’র নামে ‘লকডাউন’ নিয়ে প্রশাসনের এক অংশের সঙ্গে অন্য অংশের কিছুটা সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। শিথিলতা দেখা গেছে প্রয়োগেও। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে গার্মেন্টস আংশিক খুলে দেওয়া দিয়ে শুরু। পরে গার্মেন্টস আবার বন্ধ করা হয়েছে। এরপর বিভিন্ন উপসানলয়ে জনসমাগম বন্ধ করা কিংবা স্বাস্থ্যবিধি মেনে উপসানলয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দিতে আমাদের অনেক দেরি হয়েছে। ঈদের আগে আংশিক শপিং মল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তও রয়েছে। আর সব শেষে লাখো মানুষকে ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন কোণায় ছড়িয়ে পড়তে দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়েছে ‘ব্যক্তিগত গাড়ি’র মাধ্যমে। এসব পদক্ষেপ আমাদের বেশকিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে। অন্তত মধ্য মে মাস পর্যন্ত শক্ত একটা লকডাউন পালন করা গেলে আজ পরবর্তী অবস্থার জন্য আমরা অনেক বেশি প্রস্তুত থাকতাম। সেটা না হয়ে ৭৫ দিন পরে এসেও একদিকে বিশাল ঘরে আটকা থাকা জনগোষ্ঠীর এখনো ইমিউনিটি আসেনি, অন্যদিকে সংক্রমণ বেড়েই চলেছে, যেটা এখনো পিকে পৌঁছেনি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টরা। অর্থনীতির জন্য লকডাউন তুলে দিতেই হতো একসময়, সবাই সেটা করেছে। কিন্তু তার আগে ‘লকডাউন’ ঠিকঠাকভাবে প্রয়োগটা জরুরি ছিল। এ কারণে লকডাউনই শেষ কথা নয়। আবার এটাই হয়তো শেষ লকডাউন নয়।

এই পর্যন্ত যা ঘটেছে বা এখন ঘটছে তাতে আর এইটা বলার কোনো উপায়ই নেই যে আমাদের হাতে যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত নাই। বলার উপায় নেই যে এখনো আমরা যথেষ্ট অতি অসুস্থ রোগীদের টেস্ট করছি না। এটা বলারও আর জায়গা নেই যে আমাদের কোনো কোভিড-১৯ পরিস্থিতির ক্রমবিন্যাস বিশ্লেষণ (Trend Analysis) নাই। এই সবই আছে এখন আমাদের। যেটা প্রয়োজন সেটা হলো— এইগুলো থেকে পরবর্তী কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য যথার্থ কৌশল প্রণয়ণ করা।

তার আগে দেখি, এখন ৬০ থেকে ৬৫ দিন আগে বলা হয়েছিল, কোনো ব্যবস্থা না নিলে (with NO Intervention) আমাদের দেশে মে মাসের শেষ নাগাদ ৬০ থেকে ৮০ লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন এবং মারা যেতে পারেন ৫ লাখ পর্যন্ত মানুষ। আজ পর্যন্ত এসে আমাদের জ্ঞাত আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫ হাজার ৫৮৫ জন, মৃতের সংখ্যা ৫০১। সুস্থ হয়ে ওঠা কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা সংখ্যা সাত হাজারের বেশি।

আগে যখন এই সংখ্যাগুলো নিয়ে আলোচনা হতো, তখন আমরা সুস্থ হওয়ার সংখ্যা বলতে পারতাম না। করোনা সংক্রমণ শুরুর ষষ্ঠ সপ্তাহ শেষেও বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র দেশ ছিল যেখানে করোনায় মৃত ব্যক্তির সংখ্যা সুস্থ হয়ে যাওয়া ব্যক্তির চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো, সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের সংখ্যা আমরা ষষ্ঠ সপ্তাহ পর্যন্ত হিসাবই করতে পারিনি। এরপর হিসাব করতে শুরু করলেও এখনো পর্যন্ত এই সংখ্যাটি আপডেট নাই। যারা কোভিড -১৯ পজিটিভ হয়েছেন, তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ (বিশেষজ্ঞদের ধারণা এটি মোট আক্রান্তের ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে) বাসায় আইসোলেশনে থেকেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। এদের সম্পূর্ণ ডেটা এখনো আমাদের সিস্টেমে আপডেট হয়নি। নইলে সুস্থ হওয়ার সংখ্যা সাত হাজারে না থেকে হাজার দশেক ছাড়াত। ‘ইফ নো ইন্টারভেনশন মেড’-এর জায়গায় কিছু ইন্টারভেনশান হয়েছে বলেই সর্বোচ্চ খারাপ অবস্থায় গেলেও আমাদের মৃতের সংখ্যা যা অঙ্ক করে বলা হয়েছিল, তার ধারে-কাছেও যাবে না বলেই সমস্ত তথ্য উপাত্ত জানান দিচ্ছে।

সম্মানিত পাঠক, আমরা জানি, আমরা নানা ধরনের সামাজিক-মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে সময় অতিক্রান্ত করছি। কিন্ত যত নতুন নতুন চাপ এসেছে বা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, পৃথিবীর মানুষ কোনো না কোনোভাবে তাকে মোকাবিলাও করেছে এবং করবেও। বাংলাদেশ ও এর জনগণও সেই লড়াইয়ের বাইরে নয়। আমাদের সামাজিক-বৈজ্ঞানিক বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য সীমিত হতে পারে, কিন্তু লড়াই চালিয়ে যাওয়ার উদ্যমে আমরাও ভাটা দেইনি। কিন্তু সময়ে সময়ে আমাদের নিজেদেরই সেটা নিজেদের মনে করিয়ে দিতে হয়।

একটু ভেবে দেখুন, জানুয়ারি ১৭ তারিখ পর্যন্ত আপনি জানতেন করোনা হলে মৃত্যু হবেই, আর কোনো আশা নেই। এমনকি ব্লুমবার্গ বা হাফিংটন পোস্টে ও এমন কথা নিশ্চিতভাবে ছাপা হয়েছিল। আজ এসে আপনি জেনেছেন, করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যু হার পৃথিবীর কোথাও ৮ শতাংশের বেশি নেই।

মনে করতে পারছেন— আপনি জেনেছিলেন বাতাস, খাদ্য, এমনকি পানি দিয়েও করোনা ছড়িয়ে যাচ্ছে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়? আজ এসে আপনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানেন, বাতাসে-পানিতে এমনকি অর্গানিক খাদ্যদ্রব্যেও করোনা ছড়ায় না।

একটা সময় আমাদের মনে হয়েছিল, আমাদের একজন ডাক্তারও হয়তো আর বেঁচেই থাকবেন না। ডা. মইনউদ্দিন মারা যাওয়ার পর এমন আশঙ্কা এই কলামেই করা হয়েছিল। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের, চিকিৎসকদের সুরক্ষার জন্য কোনো পিপিই ছিল না। দলে দলে সবাই আক্রান্ত হয়েছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম আমাদের ফ্রন্টলাইন ধ্বংস হয়ে গেল। আর কোনো আশা নেই। সেই অবস্থার অবশ্যই উন্নতি হয়েছে। অবশ্যই আমাদের চিকিৎসকরা পূর্ণ উদ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন যুদ্ধ সরঞ্জাম নিয়েই। অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও, অনেক অক্সিজেন সিলিন্ডার, ভেন্টিলেশন না থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ চলছেই। চলেছে বলেই তো সাত হাজারের বেশি কোভিড-১৯ রোগী আজ সুস্থ হয়েছেন, কেউ কেউ ফিরে এসেছেন আইসিইউ থেকেও। মুনতাসির মামুন স্যারের মতো মানুষই শুধু সুস্থ হননি, তার মা-ও (যার বয়স নব্বইয়ের বেশি) সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরত গেছেন।

আমরা জেনেছিলাম, বিশ্বের যে প্রায় দুইশ দেশে কোভিড-১৯ আঘাত হেনেছে, তার মধ্যে আমাদের এখানে সব চেয়ে কম নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। ১৪-১৮-২৭-৩২ করতে করতে আমাদের টেস্ট ল্যাবের সংখ্যা এখন ৪৮। দিনে টেস্ট হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার। এই সংখ্যা আরও বাড়বে। সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে গাজী গ্রুপের ব্যবস্থপনায় নারায়াণগঞ্জে বায়োসেফটি-টু লেভেলের টেস্ট ল্যাব চলছে। একই ল্যাবের একটি শাখা মহাখালীতে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্টদের সঙ্গে পার্টনারশিপ করে প্রতিদিন ‘ক্রিটিক্যাল’ সাংবাদিকদের নমুনা সংগ্রহ করছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সঙ্গে পার্টনারশিপে ব্র্যাকও একই প্রয়াস নিয়েছে।

পার মিলিয়ন টেস্টে আমরা এখনো অনেক দেশের চেয়ে পিছিয়ে। কিন্তু এর মধ্যেই আমরা অন্যতম জনবহুল দেশ ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলেছি। মেক্সিকোর ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছি। র‌্যাপিড টেস্টের অ্যান্টিজেন আর অ্যান্টিবডি অ্যানালাইজেনের সঠিক মাত্রা নিরূপণে যদি এটি পিসিআর পরীক্ষার ৯৫ শতাংশ সঠিক মাপ দেয়, তবে এটি কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেতে পারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সিডিসি আর এফডিএ’র রেফারেলের মাধ্যমে। সেটি হলে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম ২০টি দেশের একটি হবে টেস্ট সংখ্যায়। আমাদের অতি অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রতি মিলিয়নে এই দেশে টেস্ট কম হয়েছে বলে আমরা নিজেদের এত সমালোচনা করছি। কিন্ত এখন পর্যন্ত আমরা প্রায় আড়াই লাখ লোকের টেস্ট করিয়েছি।

আড়াই লাখ। এই সংখ্যাটি এমনকি সিঙ্গাপুরের প্রায় কাছাকাছি। আমরা শুরুতেই পাকিস্তানের মত চীনের দেওয়া র‌্যাপিড টেস্ট প্রয়োগ করিনি বলেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জানাজা, ফেরিতে লাখ লাখ মানুষ বা শ’খানেক গার্মেন্টস খোলা থাকার পরও প্রতিটি জেলাতেই একই রকম মহামারির রূপ হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো বলছে, সময় আছে বাংলাদেশের। তারা পুরা বাংলাদেশকে এখনো অঞ্চলভিত্তিক সংক্রমিত এলাকা (ক্লাস্টার বেইজড অ্যাফেক্টেড এরিয়া)  হিসেবে দেখে। যদিও গণসংক্রমণ বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশিনের সব আলামত আমাদের আছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অনেকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে একমতও নন। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত আক্রান্ত লোকেদের কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের যুদ্ধটা চালানো যাবে, ততক্ষণ আশা আছে আমাদের।

সব শেষে কতগুলো জীবন আমরা বাঁচালাম, এই আলোচনাও আছে। এটি খুবই সত্য— প্রথম ১০, ২০, ৩০, ৭০, এমনকি ৮০ দিনেও সংক্রমণের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে একদম শীর্ষস্থানীয়। আমরা এ-ও বুঝতে পারছি, প্রথম থেকেই সঠিক মাত্রায় টেস্ট হলে শনাক্তের সংখ্যা এখন আরও অনেক বেশি হতো। অনেক সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তি অব দ্য রেকর্ডে এ-ও জানিয়েছেন, মোট আক্রান্ত এখন দেশে প্রায় ছয় লাখের মতো হতে পারে। আশঙ্কার সংবাদ। কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু একইসঙ্গে এটাও তো সত্য— সিএফআর বা মৃত্যুহার পৃথিবীর যে দেশগুলোতে সবচেয়ে কম, তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। অনেক নিয়ম বিচ্যুতি বা যান্ত্রিক সমস্যায় টেস্ট বা আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে গড়মিল মাঝে মাঝে হতে পারে। কিন্তু সোস্যাল ও ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে এসে মানুষের মৃত্যু সংখ্যা পরিবর্তন করে ফেলা একেবারেই অসম্ভব। স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিদিনের ব্রিফিংয়ের আগেই প্রতিদিন করোনার উপসর্গ নিয়ে কতজন মৃত্যুবরণ করছে, সেই খবর মিডিয়াতেই আসছে। আমরা চাইলে মিলিয়ে নিতে পারি। মারা যাওয়ার সবাই যে কোভিড পজিটিভ, এমন নয় ব্যাপারটা। তারপরও মৃত্যুর সংখ্যা যদি তর্কের খাতিরে দ্বিগুণও ধরে নিই, তাহলেও আমাদের মৃত্যুহার তিন শতাংশ ছাড়ায় না। ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরবের মতো যেসব দেশের উষ্ণতা, আর্দ্রতা, এমনকি জনসংখ্যা ঘনত্ব আমাদের কাছাকাছি— তাদের সবার চেয়েই কিন্তু এই হারটি কম। যদি সত্যই কোভিড পজিটিভ রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়, তাহলেও মৃত্যুহারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বনিম্ন দেশগুলোর একটি।

আমাদের আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই। আরও অনেক বাড়বে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই বলছেন, আমরা সংক্রমণে ‘পিক’-এর দিকে যাচ্ছি। অনেকের ধারণা, জুনের মাঝামাঝিতে সেই ‘পিক’ আসতে পারে। কিন্তু এই ট্রেন্ডেও আমাদের মৃত্যুহার এখনো অনেক কম। আমাদের হাসপাতালের বেডের সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি সব হাসপাতালের সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতাল, বসুন্ধরার হাসপাতাল এগুলো সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার নতুন আইসোলেশন বেড তৈরি হয়েছে। নতুন ডাক্তার-নার্স নিয়োগ হয়েছে আমাদের। বেসরকারি হাসপাতালে ধীরে ধীরে কোভিড-১৯ চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের জন্য টাকার বিনিময়ে টেস্টের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। আর এসবকিছুর সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বের অনেক দেশ কোভিডের মধ্য থেকে সাধারণ জীবন শুরু করেছে নিউ নরমাল ব্যবস্থা মেনে নিয়ে। তার অর্থ, বহির্বিশ্ব থেকে আমাদের সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে, যেটি এতদিন প্রায় পুরোটাই চীন নির্ভর ছিল। এতদূর সামলে এটুকু আসার মানে হলো— সঠিক ওষুধ আর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সময়ের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব ঘুচে আসছে এবং সেটা অল্প প্রাণক্ষয়ের মধ্য দিয়েই।

এ কারণেই লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছিল, সেটা জরুরিও ছিল। এখনো সামাজিক দূরত্ব ব্যাপকভাবেই বজায় রাখা উচিত। স্কুল-কলেজসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিনোদনকেন্দ্র, সব ধরনের বিলাসদ্রব্যের শপিং মল, সিনেমা হল— এগুলো সবই এখনো বন্ধ রাখা উচিত সম্পূর্ণভাবে, আরও অন্তত একমাস তো বটেই।

পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকার স্বার্থে গ্রামীণ অর্থনীতি চালু রাখার জন্য ক্রমান্বয়ে এবং ধাপে ধাপে (Step by Step) পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সেগুলোর জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা দরকার। ঠিক কত সময়ের মধ্যে কোন তারিখে পোশাক কারখানা খুলবে, কবে বাকি রফতানিমুখী শিল্প খুলবে, অন্য কারখানাগুলো কবে নাগাদ খুলতে পারে— এগুলোর স্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। সবকিছু একসঙ্গে খুলে দেওয়া বা একেকটি খাতকে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো খুলে দেওয়া বা বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ কড়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। শহরবাসী নাগরিকদেরও জানা থাকা উচিত, আগামী একমাসে সবকিছু কেমনভাবে চলবে। যে একটি জায়গায় বাংলাদেশ সরকার বিশ্বের অনেক সরকারের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে সেটা হলো— সুর্নিদিষ্ট পরিকল্পনামাফিক জন যোগাযোগ বা পাবলিক কমিউনিকেশন। এ কারণে অনেক কাজ সরকার ঠিকঠাকমতো করেও তার সুফল বাস্তবায়নের জন্য মানুষকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে পারেনি। বড় উদাহরণ— টেস্টের সুযোগ থাকার পরও শুরুর দিককার বিড়ম্বনার জন্য এখনো অনেক মানুষ টেস্ট করতে যায় না। আবার অনেকেই নন-কোভিড রোগীকে তার জরুরি প্রয়োজনে কোনো হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারেননি। এসব সেবার জন্য যে হটলাইনগুলো রয়েছে, তারা ঠিকমতো কাজও করছে না।

প্রাইভেট সেক্টর, বিশেষ করে মাল্টিন্যাশনালগুলোর বড় দায়িত্ব আছে। বাংলাদেশে ‘নিউ নরমাল’ বাস্তবায়নে তাদের এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে। ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’কে তাদের বাধ্যতামূলক নিয়মে পরিণত করতে হবে। অফিসের আয়তন বা প্রতি বর্গফুট হিসেব করে সর্বোচ্চ কর্মকর্তা আর কর্মচারীর সংখ্যা নির্দেশ করে দেওয়া উচিত, যেন সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার ব্যাপারটা সহজ হয়ে যায়।

নাগরিকদেরও অনেক লার্নিং হয়েছে এর মধ্যে। গণপরিবহন খুলে গেলে পণ্যের দাম স্বাভাবিক হয়ে যাবে। যদি সম্ভব হয় (এবং সম্ভব না হওয়ার কিছু নেই) বাজার-সদাই ও ব্যাংকিং পেমেন্টের বড় অংশটি অনলাইন বা ডিজিটালে সেরে ফেলুন। এটি জরুরি অবস্থার জন্য নয়, ধীরে ধীরে এতেই পূর্ণ অভ্যস্ততা গড়ে তুলুন। আগামীতে পুরো সময়ই এভাবে চলা যায় কেমন করে, সেটি নিয়ে ভাবুন। আমরা বলছি, ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শুক্র-শনিবার অফিস খোলা রাখতে হবে। এটা একইসঙ্গে মাথায় রাখা উচিত, অফিস খোলা রাখা মানেই অফিসে বাধ্যতামূলক উপস্থিতি নয়। মিটিংয়ের প্রয়োজনে শনিবার তো বটেই, প্রয়োজনে শুক্রবারও ব্যবহার করা যায়, যদি মিটিংটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে করা যায়। মিডিয়াগুলোকে তাদের টক শো’র স্টুডিও শো কমাতে হবে বাধ্যতামূলকভাবে। এটা সুস্পষ্টভাবে তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা গেছে, জুম বা অন্য কোনো ভার্চুয়াল স্টুডিওতে করা টক শোতে কোনো টিভি’র টিআরপি বা অনলাইনের ভিউ সংখ্যা তো কমেইনি, বরং বেড়েছে। এসবকিছু আমরা যা শিখেছি, সেগুলোকে আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে না দেখে দীর্ঘকালীন অভ্যস্ততাতে পরিণত করতে পারলেই আমরা বৈশ্বিক ‘নিউ নরমালে’ নিজেদের সামিল করতে পারব। যেই কাজ গুগল, ফেসবুক, সান আর হুইপ্রো এখন করছে, সেটা আমরা না করতে পারলে তার দায় আমাদেরই নিতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, মাত্র ৩৪ দিন আগেও ইতালির প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘এত মৃত্যু, জমিনে কোনো আশা নেই। এখন আকাশে তাকিয়ে থাকতে হবে।’ সেই ইতালি তাদের ফুটবল লিগ ‘সিরি এ’ শুরু করতে যাচ্ছে জুনের শেষে। অবশ্যই নির্দিষ্ট কিছু দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে, কিন্তু পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে। কোভিড জর্জরিত আরেক দেশ জার্মানির ফুটবল লিগ বুন্দেসলিগা এরই মধ্যে শুরুও হয়েছে একইভাবে। ফুটবল ঘরে বসে ভার্চুয়াল স্টুডিওতে খেলা যায় না। কিন্তু যেগুলো যায়, নিউ নরমালের আওতায় এরা সবকিছুই করছে।

আমরা যেমন শুরুতে অনেক কিছু ঠিক করিনি, দুই মাস সময় পেয়েও অনেক ব্যবস্থা নিতে না পারার জন্য প্রশাসনকে দায় দিয়েছি; ঠিক তেমনি এই দুই মাসে আমরা যা শিখেছি সেটা পরবর্তী দুই বছরে যদি কাজে না লাগাই, তবে সেই দায় আমরা কাকে চাপিয়ে নিজের কাছে লঘু হব?

আমরা সব হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে উঠেই এখন জানি, শুধু ঘরে থাকলেই নিজেকে নিশ্চিতভাবে রক্ষা করা সম্ভব। এই দুই মাসে সবাই নিশ্চিত করে জানেন, তারা কেন আক্রান্ত হননি বা কেন ও কিভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। কাজেই অবশ্যই নিজের সুরক্ষা নিজের কাছে। এখনো ঘরে থাকাই সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি, জরুরি প্রয়োজনে বাইরে গেলে বজায় রাখতে হবে কঠোর সামাজিক দূরত্ব।

কোভিড-১৯ আর কোনো ভাইরাস বা অসুখ বা দুর্যোগ নয়। এটি এখন নতুন বাস্তবতা। যেমন কয়েক লাখ বছর আগে পৃথিবীর পরিবর্তনের বাস্তবতায় ডাইনোসররা টিকে থাকেনি, কিন্তু তেলাপোকা থেকেছে— ঠিক একইভাবে আমাদের টিকে থাকতে হবে। মানিয়ে নিতে হবে। এরপর জয় করতে হবে।

দূরাশা বা ফলস হোপ বলে কিছু নেই। দেয়ার ইজ অনলি হোপ........ আশা আশাই। সেই আশাবাদ নিয়েই এই ঘোর করোনাকালেও সবাইকে জানাই ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা। ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন। এ বছরের ঈদুল ফিতরটা ঘরেই উদযাপন হোক। ঈদ মোবারক।

লেখক: ম্যানেজিং এডিটর, সারাবাংলা ডটনেট

আরও পড়ুন-

উই হ্যাভ আ ব্যাটল টু উইন…

লকডাউন দীর্ঘ সময়ের জন্য: মানসিক প্রস্তুতি নিন

লকডাউন যুগের প্রাসঙ্গিক ভাবনা: সরকারের কাছে জরুরি কী চাই?

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন