বিজ্ঞাপন

এমনও প্রেম হয়

May 27, 2020 | 8:01 pm

মনি হায়দার

ক.

বিজ্ঞাপন

তুমি কখন আসবে?

এইতো সন্ধ্যার আগে আগে চলে আসবো। তোমার একা একা খারাপ লাগছে বুঝি...

বিজ্ঞাপন

সন্ধ্যার একটু আগে বিকেলে চলে এসো না!

তুমি জানো না, অফিসে আমার কতো কাজ? চাইলেই কী আসতে পারি? খুব নরম গলায় বলে শুভ, তুমি কী করছো তিতলী সোনা?

বিজ্ঞাপন

তোমার জন্য রান্না করছি।

কি রান্না করছো?

বিজ্ঞাপন

ছোট মাছের চচ্চরি আর ঘন করে ডাল।

মাছ কুটেছো তুমি? তোমাকে না নিষেধ করেছি, তুমি ছোট মাছ রাখবে না, তুমি মাছই কাটতে পারো না। হাত কাটে নাইতো... উদ্বেগ কণ্ঠে শুভর, কী হলো কথা বলছো না কেনো?

বিজ্ঞাপন

ইকটু কেটেছে... না, মাত্র তিন ফোটা রক্ত পড়েছে। মাছ কুটতে কুটতে কেমন করে একটা কাঁটা ঢুকে পড়লো ডান হাতের অনামিকার মাথায় বুঝতেই পারিনি।

তুমি ফিটকারী দিতে বলেছিলে, সঙ্গে সঙ্গে দিয়েছি। কোনো ব্যথা নেই।

কিন্তু তুমি ছোট মাছ রাঁধতে গেলে কেনো?

তুমি যে পছন্দ কর শুভ!

শুভ’র গলায় কান্নার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে। অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিতলীর সঙ্গে আলাপ করছে মোবাইলে। তিতলীর হাত কেটেছে! রক্ত পড়েছে! মেয়েটিকে নিয়ে বড় বিপদে শুভ। নিজের কোনো ভালোলাগার ঘটনা বললে, মেয়েটি সেই ভালোলাগার ঘটনা ঘটাবেই।

তুমি ফোনে নেই শুভ? অভিমানী প্রশ্ন তিতলীর।

নিজেকে সামলে উত্তর দেয় শুভ, আছিতো। আজকে বাসায় এসে তোমাকে অনেক মারবো।

বেশতো মারবে, মার খাবো তোমার হাতে।

তুমি কাঁদবে না?

তুমি মারবে আর আমি কাঁদবো না, তাও কী হয়? খুব কাঁদবো তোমার বুকে মাথা রেখে।

হাসে শুভ, পাগলী! এখন রাখি। বস এদিকে আসছেন। তুমি বাইরে কোথাও যেও না ।

আমি সময় পেলে আমার তোমায় ফোন দেবো, কেমন লক্ষীসোনা চাঁদের কনা!

ঠিকাছে...অস্ফুট কণ্ঠে খানিকটা অভিমানের সঙ্গে লাইন কেটে দেয় তিতলী। ফোন বন্ধ করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে শুভ। ভেতর থেকে প্রবলবেগে কান্না আসছে। আবার প্রবলবেগে চেষ্টা করছে কান্না প্রতিরোধের। চোখের কোণ চেপে জল নামছে। নিজেকে প্রবোধ দিতে পারছে না শুভ, কেনো আমি মেয়েটিকে বিয়ে করলাম? কেনো ওর সর্বনাশ করলাম?

দেয়ালের সঙ্গে পিঠ রেখে সিগারেটে আগুন ধরায় ও, আমার দুই রুমের ছিন্নভিন্ন বাসায় এসে যদি ওর বাবা-মা-আত্মীয়স্বজন দেখতে পায় তিতলী ছোট মাছ কাটছে, ডাল রান্না করছে, নিজের হাতে ঝাড়– নিয়ে বাসা ঝাড়– দিচ্ছে, বিছানা ঠিক করছে... ওরা আমাকে ঠিক মেরে ফেলবে। মেয়েটাকে নিয়ে আমি কী করবো? স্বর্গ থেকে মাটিতে নেমে এসেছে মেয়েটি। কিভাবে পারলো বা
পারছে হিসাব মেলাতে পারি না আমি.. তিনটে সিগারেট টানার পর ফোন বাজে। হাতে নিয়ে দেখে বসের হেড অব ডিজাইনারের ফোন।

স্যার!

কোথায় আপনি শুভ?

আসছি স্যার, হাতের সিগারেট ফেলে দ্রুত ছোটে রুমের মধ্যে।

বছর দুয়েক আগে গিয়েছিল বন্ধু হিমাংশুর বাসায়। হিমাংশু রায়ের ছোট বোনের বিয়ে অনুষ্ঠানের সাজ-সজ্জার দায় ছিল শুভ আহসানের। হিমাংশু আর শুভ’র একই গ্রাম, উজানগাও। হিমাংশুরা বংশ পরম্পরায় বনেদী আর প্রভাবশালী। শুভর বাবা বদরুল আহসান ছিলেন বাউল ঘরানার মানুষ। সংসারে থেকেও সংসারে থাকতেন না। বছরের অধিকাংশ সময় নানা আখড়ায় থাকতেন। মাঝে-মধ্যে বাড়ি ফিরতেন। শুভ’র বড় দুই বোনকে মা কিভাবে কেমন করে লালন পালন করে বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন, আজও বিস্ময় শুভর কাছে। মা সর্বংসহা একজন মানুষ। কোনো দিন মুখে হাসির কমতি ছিল না। শুভ গ্রাম থেকে মেট্রিক পাশ করে খুলনায় মামার বাসায় থেকে অহস্য নারকীয় জীবন যাপনের মধ্যে ইন্টারমিডিয়েড পাশ করে ঢাকায় এসে চারুকলায় ভর্তি হয়। ধীরে ধীরে বিক্ষিপ্ত বিড়ম্বিত জীবনের পালে লাগে নাগরিক জীবনের বিদঘুটে বিষাক্ত হাওয়া।

থার্ড ইয়ারে থাকার সময়ে অনেক বছর পর হিমাংশুর সঙ্গে দেখা শুভর সদরঘাটে। শুভ গিয়েছিল সদরঘাটের ছবি আঁকতে। সদরঘাটে এলে শুভকে নষ্টালজিয়ায় পেয়ে বসে। প্রায় চার বছর আগে বাড়ি থেকে লঞ্চে উঠে সারারাত পার করে খুব সকালে নেমেছিল রঙওঠা একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে। ব্যাগে ছিল পুরনো দুটি শার্ট একটা প্যান্ট কয়েকটা বই ..। সেই থেকে ঢাকায়, মানুষের শহরে মিশে গেছে মানুষের পায়ে পায়ে...। সেই সদরঘাটে এলে মানুষের ভীড়ে নতুন নতুন মানুষের আসা এবং যাওয়ার স্রোতে নিজেকে হারিয়ে নতুন করে আবিষ্কার করে শুভ। বিরাট পল্টনের এক কোনে ক্যানভাস খুলে বসলে অনেক যাত্রী অবাক তাকায়। অনেকে পিছনে দাঁড়িয়ে ওর আঁকা দেখে। মানুষের তুমুল পদযাত্রা ওকে মুগ্ধ করে। তাকায়, দেখে প্রতিটি পদক্ষেপ, গ্রহণ করে হৃদয়ের সকল সুন্দরের সঙ্গে। সদরঘাট এলেই শুভ বিকশিত হয় শত শাখায়...।

এক সকালে ছবি এঁকে সদরঘাট থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল দ্রুতবেগে, পিছন থেকে কেউ টেনে ধরে জামা। ফিরে তাকায়, মুখোমুখি হিমাংশু রায় আর শুভ আহমেদ। হিমাংশুর দিকে অবাক তাকায় শুভ। হাসে হিমাংশু, কিরে আমাকে চিনতে পারছিস না?

তুই সদরঘাটে কোত্থেকে? বিস্মিত কণ্ঠ শুভর। এখানে তোকে দেখবো, ভাবিনি।

আমি বাড়ি থেকে এসেছি। সঙ্গে বাবা মা বাবলী আছে.. কই? কাকীমা কই, আংকেল কই?

সবাই গাড়ির দিকে গেছে। দূর থেকে ভিড়ের মধ্যে তোর পেছনটা দেখেই ওদের রেখে দৌড়ে এসেছি। চল...

চল।

গাড়িতে উঠে ওরা অপেক্ষা করছে, সামনে এসে দাঁড়ায় দুজনে মানুষের ভীড় ঠেলে।

শুভকে দেখে জলধর রায় অবাক, শুভকে কোথায় পেলি?

শুভ কেমন আছো? মিসেস রায়ের প্রশ্নের মধ্যে বাবলীর চিৎকার, শুভ দা এতোদিন কোথায় ছিলে তুমি? তিন জনার প্রশ্নের উত্তরে হাসে শুভ।

মা, ও ঢাকার চারুকলায় পড়ে। আমার ধারণা এখান ও এসছিলো সদরঘাটে ছবি আঁকতে, শুভর হয়ে উত্তর দেয় হিমাংশু, দূর থেকে দেখে ওকে ধরে নিয়ে এসেছি।

গাড়ির মধ্যে সরে বসেন মিসেস রায়, এসো এসো শুভ। গাড়িতে বসো।

শুভ উঠে বসে গাড়িতে। চলতে শুরু করে গাড়ি। চলতে চলতেই মিসেস রায়ের কাছ থেকে শুভ জানতে পারে, আগামী মাসে বাবলীর বিয়ে। পাত্র অবনী আহমেদ।

কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। দেশের বড় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। হাসে শুভ, তাহলে তুইও বড় হয়ে গেলি বাবলী? ছোট আর থাকতে পারলি না? গাড়ির মধ্যে সবাই হাসে। বাবলী মুখ ভেংচায়, তুমি সেই আগের মতোই মুখপোড়া রয়ে গেলে!

নানা স্মৃতি আর গল্পের মধ্যে গাড়ি সদরঘাট থেকে ধানমন্ডির এগারো নম্বর বাড়ির সামনে থামে। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর পারিবারিক সিদ্ধান্ত হয়, যেহেতু শুভ শিল্পী, ওর উপরই ভার দেয় রায় পরিবার বাড়ির আলপনা আঁকার ও সাজানোর। শুভও মেনে নেয় আনন্দচিত্তে। বিয়ের কারণে সকালে বিকেলে আসতেই হয় ওকে রায় বাড়িতে, বারবার প্রয়োজনে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কথা বলতে হয় বাবলী, জলধর রায়, মাসীমা, হিমাংশু সহ বাড়ির আরও অনেকের সঙ্গে...।

দুুপুরের গনগনে রোদে বাড়ির ছাদে আলপনা আঁকছে শুভ বসে বসে। পিছনে এসে দাঁড়ায় বাবলী, শুভ দা?

নীচের দিকে তাকিয়ে আলপনা আঁকতে আঁকতে জবাব দেয়, কীরে পাগলী?

তোমাকে আমি ছাদ থেকে এক ধাক্কায় ফেলে দেবো কিন্তু... বাবলীর গলায় কৃত্রিম রাগ। আমার নাম বাবলী, পাগলী না।

ও, তুই পাগলী না? বাবলী? বল কি জন্য এসেছিস?

তুমি দয়া করে একটু তাকাও...

আমার সময় নেই পাগলী, সরি বাবলী। আর তিন দিন পরে তোর বিয়ে। অনেক কাজ বাকি আছে..আমার একদম সময় নেই। আবার যদি আলপনা সঠিকভাবে না হয়, তুই আমাকে গালি দিবি। তোকে তো আমি চিনি।

হ্যাঁ চিনে তুমি আমাকে উদ্ধার করেছো, এখন দয়া করে একটু তাকাও আমার দিকে।

তোর দিকে তাকাবার সময় নেই রে..

না তাকালে তোমার উপর পানি ঢেলে দিচ্ছি..

আরে না, তুই যে ডাকাত মেয়ে, আলপনা আঁকা রেখে দাঁড়ায়। পারিসও.. থেমে যায় শুভ। দাঁড়িয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখে বাবলীর সঙ্গে একটি মেয়েও দাঁড়িয়ে আছে। হালকা পাতলা গড়নের মেয়েটির মুখ এমনভাবে চিত্রিত যে, চোখ ফেরানো যায় না, একবার তাকালে। গাল নাক মুখ অতিক্রম করে মেয়েটির ডাগর দুটি চোখ বিস্ময়করভাবে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের ভেতরের মণিদুটো ঠিকরে ওকে আলিঙ্গন করতে চাইছে। এমন মায়াবী অন্তমুখী চোখ, চোখের নীলাভ আয়াত দৃষ্টি কখনো দেখেনি।

মেয়েটিকে দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে নিস্পন তাকিয়ে রইলো শুভ। মেয়েটি শিল্পীর চোখের এমন মায়ামাখা দৃষ্টির সামনে কাতর হয়ে অন্যদিকে তাকায়।

শুভ দা, আমার বন্ধু তিতলী।

তিতলীকে কী বলবে বা পরিচয়ের সময়টা গ্রহণ করবে বুঝাতে পারছিল না শুভ।

তিতলীও কেমন আড়ষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।

তুই শুভ’দার সামনে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে রইলি কেনো? ধমক লাগায় লাবনী, তোকে না বলেছি শুভ দা আমার ভাই। এখন কথা বলছিস না কেনো?

ঘটনা কী? নিজেকে সামলে নিয়ে প্রশ্ন করে শুভ।

তিতলীর ইচ্ছে, ওর একটা পোট্রেট আঁকাবে। বেশ কয়েকজন শিল্পীকে দিয়ে আঁকিয়েছেও। কিন্তু ওকে ঠিকভাবে আঁকতে পারেনি। সারা বাড়িতে তোমার আলপনা দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, এইসব কে এঁকেছে? আমি তোমার নাম বলেছি। তখন বলেছে, ওর একটা প্রোর্টেট আঁকতে পারবে কি না! আমার বন্ধুতো, তোমার কাছে নিয়ে এসেছি..। এখন তুমি তিতলীর একটা ছবি বা পোট্রেট এঁকে আমাকে উদ্ধার কর, বাবলী থামে একটানা ঘটনা বলার পর।

আলপনা আঁকা রেখে কাছে আসে শুভ, শিল্পীরাও তো মানুষ। আর মানুষের সীমাবদ্ধতাও আছে। তোর বন্ধু তিতলীর মুখের গড়নটা এতো সুন্দর যে, শিল্পীর রঙ আর অংকন প্রক্রিয়া পিছলে যায়..। ফলে শিল্পীরা আঁকতে পারে না।

ওই সব বক্তৃতা বাদ দাও, প্রায় ধমকে ওঠে বাবলী, আমার বন্ধুর ছবি আঁকতে পারবে কি না,. বলো।

পারবো না কেনো? শুভ ঝাকড়া চুলের বাবরী দোলায় সুঠাম শরীরে কিন্তু তোর বন্ধুকে আমার সঙ্গে গল্প করতে হবে।

বেশতো, গল্প করো তোমরা। আমি যাই, মা ডাকছে। তুই থাক তিতলী... আচমকা চলে যায় বাবলী।

তিতলী ঢাকা শহরের মেয়ে। খুব সাহসী। রাতে বিরাতে বন্ধুদের সঙ্গে হোটেলে যায় খেতে, আড্ডা দিতে। নিজে শিখেছে কংফুৃ কারাত। শিল্পপতি পিতা আজগার লস্করের একমাত্র কন্যা তিতলী। তিতলীর জন্য পারে না এমন কাজ দুনিয়ায় নেই লস্করের। লস্করের এক মেয়ে দুই পুত্র। বড় পুত্র আয়নাল লস্কর অস্ট্রেলিয়ার ডিসনী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সমুদ্র বিজ্ঞানের। ছোট ছেলে খাইবার লস্কর পিতার সঙ্গে থেকে ব্যবসার দেখাশুনা করছে। ভবিষতে লস্কর গ্র্রপের নির্ধারিত এমডি খাইবার লস্কর। দুই ভাইয়ের আদরের বোন আর পিতার একমাত্র কন্যা তিতলী গ্রাম্য এক শিল্পীর সামনে কাঁপছে।

আপনার কোনো বড় সাইজের ছবি আছে? বাবলী চলে যাবার পর প্রশ্ন করে শুভ। মাথা নাড়ায় তিতলী, নাহ।

বলেন কী? বিশ্বাস করতে পারে না শুভ। আপনাদের তো আনুষ্ঠানিক বা অনুষ্ঠানিক নানা পর্যায়ের ছবি থাকাই স্বাভাবিক।

তোলা হয় নি..

ঠিক আছে, গান গাইতে পারেন?

মাথা নীচু করে থাকে তিতলী। গান? জীবনে গানের কোনো অনুষ্ঠানেই যাওয়া হয়েছি কি না, মনে করতে পারে না ও। এই শালার শিল্পী কী আমাকে ডুবাবে নাকি?

আর আমার পোট্রেট আঁকার সঙ্গে গানের সম্পর্ক কী? লোকটা আমার ছবি আঁকবে না গানের ছবি আঁকবে? শিল্পীরা পাগল হয় অনেকটা... আমি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং নিয়ে সময় পার করেছি। বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে গেছি। দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়িয়েছি...। বাঙালির এইসব ছোদো কথার আকুপাকু গান শোনার সময় ছিল কখনো? গাওয়া তো অনেক পরের ঘটনা। অবশ্য বাবা চাইতেন, আমি গান গাই। বাড়িতে তিন তিনবার ওস্তাদ এসেছিল, দুই একবার সামনে গিয়েছিলাম কিন্তু গান আর হয়নি... সামনে হারমোনিয়াম নিয়ে গলা ছেড়ে হাহাহা করা আমার পক্ষে সম্ভব? কখনোই না...। আর শিল্পী জানতে চাইছে.. চুপ করে আছেন কেনো?

আমি কখনো গান গাইনি...

হা হা হা হাসে দুপুরের গনগনে ছাদ ফাটিয়ে শুভ, আমি কখনো আমার মাকে গান গাইতে শুনিনি.. কবি শামসুর রাহমানের কবিতার লাইন, আমার ভীষণ প্রিয় এই কবিতাটি। কারণ আমিও কখনো গান গাইনি। অথচ খুব ইচ্ছে করে। চলুন, গাছের নীচে বসি। এখানে মাথার উপর রোদ লাঠি খেলছে।

ছাদের ডান দিকে বিশাল একটা আম গাছের ছায়া ঝুলে পড়েছে। ছায়ার নীচে দাড়াবার পরই হালকা বাতাসের ছোঁয়াও অনুভব করে। ছায়ার নীচে দাঁড়িয়ে মিটি মিটি হাসে তিতলী। তাকায় গভীর আয়াত চোখে তিতলীর দিকে, হাসছেন কেনো?

রোদ লাঠি খেলে কেমন করে? ও... হাসিতে ফেটে পড়ে শুভ। শিল্পীর মনে কতো রঙের খেলা যে খেলে বোঝানো যাবে না। কেবল রোদ লাঠি খেলে না শিল্পীর মনে রোদ জ্যোছনা হয়ে যায়।

তাই?

হ্যাঁ। আপনি কোন বিষয়ে পড়ালেখা করছেন?

আমি?

মাথা নাড়ায় শুভ, হ্যাঁ আপনি।

আমি পড়ালেখা করি বটে, কিন্তু ইয়ে মানে... মনোযোগ দিয়ে নয়। আসলে পড়ালেখা আমার একদম ভালো লাগে না। আমি শুধু ঘুমুতে, খেতে আর ঘুরতে ভালোবাসি। আর লং ড্রাইভে যেতে পছন্দ করি।

ছটফটে তিতলী ক্রমশ বের হয়ে আসে মুখোশের আড়াল থেকে। জানেন, আমি কবিতা লিখতে চাই। আবার হাসে, কিন্ত দুই তিন লাইন লেখার আর বসে থাকতে পারি না। কবিরা যে কিভাবে এতো এতো কবিতা লেখে, বুঝি না। অনেক ধৈর্য্যর দরকার। আমার একদম নেই.. আপনার মোবাইলতো অনেক দামী। মোবাইলের মধ্যে আপনার ছবি আছে না?

আছে, আছে, অনেক ছবি আছে। দেখবেন?

নীচতলা থেকে বাবলী কাজের লোকের হাতে চা আর গরম সিঙ্গারা পাঠায়। দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায় শুভ, বাহ বাবলী নামক পাগলী মেয়েটাকে এই জন্য ভালো লাগে। ও বোঝে কখন কোথায় কী লাগবে, নিজে একটা সিঙ্গারা হাতে নিয়ে আর একটা বাড়িয়ে ধরে তিতলীর দিকে, সিঙ্গারা খাওয়ার অভ্যাস আছে? ঘাড় নাড়ায় তিতলী, আছে। হাত বাড়িয়ে সিঙ্গারা নিয়ে কামড় বসায়। সিঙ্গারা চা খেতে খেতে গল্প করতে করতে অনেকটা সময় পার করে দুজনে।

আপনি আঁকুন আলপনা, আমি দেখি।

ঠিকাছে, তিতলীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে শুভ আবার আলপনায় মগ্ন হয়ে যায়। তিতলী অবাক, শুকনো জমিনের উপর কী করে হাতের অংকনে তুলিতে আর রঙে এমন রঙিন করে তোলে শিল্পী? কোনো কুল কিনারা পায় না ও। বিকেলের দিকে বাড়ির নীচতলায় ডাইনিং রুমে তিতলী, বাবলী, হিমাংশু আর শুভ একসঙ্গে খেয়ে, আরও কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে চলে যায়। যাবার আগে জানতে চায় তিতলী, আমার পোর্টেট হবে না তাহলে?

কে বললো হবে না? পাল্টা প্রশ্ন শুভর।

আপনি তো আমার ছবিতো দেখেন নি... এখন দেখুন- মোবাইল এগিয়ে দেয়। মোবাইল লাগবে না। আপনি মোবাইল নাম্বারটা দিন আমাকে...

নিন, জিরো, ওয়ান....।

নাম্বার নিয়ে দুজনে চলে যায়। তিন দিন পরে সন্ধ্যায় ফোন দেয় শুভ। তিতলী বাসায় নিজের রুমে মোবাইল হাতে বসে ভাবছিলো, শুভকে ফোন দিবে কি না? দিলে শিল্পী কিছু মনে করবে কি না...। দ্বিধার ধারে কাটছিল ও।

সাধারণত এইসব দ্বিধা বা সংকোচ তিতলীর মধ্যে কাজ করে না। মনে যা ইচ্ছে ধুমধাম করে কোনোকিছু পরোয়া না করে। কিন্তু শুভ’র সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে নিজেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে নিয়েছে, নইলে গত তিন দিনে অন্তত বারো তোরো বার ফোন দিয়ে জানতে চাইতো, আমার ছবি হলো? না হলে কবে পাবো? এতো দেরী করছেন কেনো? কিন্তু যখনই মোবাইল হাতে নিয়ে শুভকে ফোন করতে যায়, এক ধরনের সংকোচমাখা দ্বিধা এসে জাপটে ধরে তিতলীকে।

দ্বিধার ধারে কাটতে থাকার মুহুর্তেই শুভর ফোন, হ্যালো?

তিতলীর সঙ্গে কথা বলছি তো?

হ্যাঁ আমিই তিতলী।

আগামীকাল যাবেনতো বাবলীদের বাড়িতে?

নিশ্চয়ই যাবো। আর একদিন পরে ওর বিয়ে। না গেলে ও খুব মাইন্ড করবে। গতকালই ফোন দিয়ে আমাকে বকাঝকা করেছে। সুতরাং...

আপনার সঙ্গে দেখা হবে, বাই। লাইন কেটে দেয় শুভ। অবাক তাকিয়ে থাকে তিতলী মোবইলের স্ক্রিনে, লাইনটা কেটে দেলো শালা! আমার মতো একটা মেয়েকে বুঝতে পারছে না লোকটা? কিসের শিল্পী? শিল্প বোঝে মন বোঝে না? রঙ বোঝে রঙিন মানুষ বোঝে না! এই খবিসটাকে দিয়ে কিসসু হবে না... ফিকফিক হাসে একলা একলা নিজের রুমে তিতলী।

তুমি এখানে কেনো? তিতলীকে মেসে দেখে হতবম্ভ। শুয়ে ছিল বিছানায় শুভ। শুয়ে শুয়ে ভাবছে তিতলীকেই। মেয়েটি যা করছে, বলছে- মেনে নেয়া কঠিন, অন্তত আমার জন্য। আমি সামান্য একজন আর্টিস্ট। এই শহরে পরিচয়হীন একটা  মানুষ  মেয়েটিকে যতো বোঝাই, কিছুই বোঝে না। ও একটা শুন্যতার মধ্যে পড়ে গেছে। গোটা ঘটনা বললাম হিমাংশুকে। শালা একটা উজবুক।

ঘটনা শুনে উল্টো ওকে জড়িয়ে ধরে হিমাংশু রায়, তোর প্রেমে ওই টকবগে মেয়েটা পড়ে জলচুবানী খাচ্ছে।

বলিস কী? জীবনে কতো মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে চাইলাম, পারলামই না। আমার ভেতরটা জ্বলে যায়রে। আর তোর কাছে এসে প্রেম কেঁদে মরে, তুই পাত্তা দিচ্ছিস না! গাধা আর কাকে বলে?

তুই বুঝতে পারছিস না কেনো? নিজের যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করে শুভ, আমি সাধারণ পরিবারের গ্রাম্য একটা ছেলে। আর তিতলীরা?

তুই তো বাংলা সিনেমার গল্প নিয়ে এলি রে! শ্লেষ হিমাংশুর গলায়, আরে বাবা একটা লা জবাব সুন্দরী মেয়ে তোমাকে ভালোবাসে, কোন পরিবারের মেয়ে দেখার কী দরকার? প্রেমে পড়ো, সাড়া দাও এবং মোহমন্ধ সময় কাটাও...।

এ প্রসঙ্গে আর একটা কথা বললে একেবারে তেথলে দেবো তোকে।

হিমাংশুর হুমকিতে শক্তি পায় বটে কিন্তু নিজের ভেতরের মনোজগতের জলে কোনো তরঙ্গ সৃষ্টি হয় না। ভালোও যে বাসে না তেমনও নয়। বাসে, খুব ভালোবাসে তিতলীকে। প্রতিদিন ওর শত শত ছবি আঁকে নিজের খাতায়। আঁকে আর দেখে, আঁকা ও দেখা ফুরোয় না। এই ছবি আঁকতে গিয়ে মেয়েটি প্রেম অসুখের গাড্ডায় পরেছে। ওকে বোঝানো দরকার, মেয়ে তুমি বড্ড খভুল করছো।

হিমাংশুদের বাড়ির ছাদে বাবলীর বিয়ের অনুষ্ঠানে আগের বিকেলে শুভ আঁকা এগারো প্রকারের ছবি দেয় তিতলীর হাতে। প্রতিটি ছবি দেখে আর মুগ্ধতায় চোখে বিস্ময়ের তীর ফোটে। সব  ক’টা ছবি দেখার পর প্রশ্ন করে, আমার ছবি ছাড়া এই ছবি আঁকলেন কেমন করে?

সেদিন গল্পের ছলে আপনার ছবি মনে এবং চোখের দৃষ্টিতে এঁকে নিয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে তিতলী দুহাতে জড়িয়ে ধরে মুখে গালে একের পর এক চুমু খেতে থাকে। একের পর এক চুমু খেয়ে ওকে ছেড়ে দিয়ে স্থির দাঁড়ায় কয়েক মুহুর্ত। হতম্বব শুভ, কী করবে বুঝতে পারছে না। তাকায় এদিকে ওদিকে, কেউ কী দেখলো?

না, ছাদে এই মুহূর্তে কেউ নেই।

এটা কী হলো?

ভালোবাসা...

দৌড়ে সামনে থেকে চলে যায় তিতলী।

গোটা ঘটনা ছাদে দাঁড়িয়ে ভাবে আর ঘামতে থাকে। ছবি এঁকে দিয়ে সর্বনাশের কী জালে পরলাম? মেয়েটি তো আমাকে ডুবাবে। না, কোনোভাবে তিতলীকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। এখনও আমার ফাইনাল পরীক্ষার তিন চার মাস বাকি। আমাকে অনেক সামনে যেতে হবে, প্রেমের জটিল জালে আটকে পড়ার ইচ্ছে আমার নেই। বিশেষ করে তিতলীর সঙ্গে। ওরা প্রভাবশালী আর বনেদী পরিবারের মানুষ। ওদের সামনে আমি খড় কুটোর মতো উড়ে যাবো, নিজেকে শাসন করে শুভ আহমেদ বিয়ের বাড়িতে না থেকে গোপনে কেটে পড়ে।

দুই দিন চুপচাপই ছিল। ক্লাসের পড়া আর কয়েকটি বইয়ের কভার করে সময় কাটিয়েছে শুভ মেসের রুমে। রুমটা নিজের মতো সাজিয়ে নিয়েছে। তিনতলা বাড়ির দোতলায়, পূর্ব কোনার রুমে থাকে শুভ। রুমে ঢুকলেই শিল্পালয়ের রঙ ও গন্ধের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে যেতে হয়। অসল সময় কাটাচ্ছিল রুমে শুভ। মোবাইল বাজে। তাকায়। নামটা জ্বলে উঠছে... তিতলী!

হ্যালো? দ্বিধামাখা গলা শুভর।

তুমি কেমন আছো? তিতলীর তুমি উচ্চারণে ভেতরে ভেতরে উতলে যায়, কেটে টুকরো টুকরো হয়ে যায়, স্রোতের উজানে নৌকার ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ শুনতে পায়।

আদুরে গলা তিতলীর, চুপ করে আছো কেনো? কথা বলো।

আমি তিতলী। যে তিতলীর ছবি মন আর দৃষ্টির সীমানায় এঁকে রেখেছো, আমি সেই তিতলী। সেই তিতলী তোমাকে ভালোবাসে... অনেক ভালোবাসে। তিতলীকে অনেক মহাপুরুষ ভালোবাসতে চেয়েছে, পিছনে বুভুক্ষ ক্ষুধায় মিছিল করে যাচ্ছে, আমি কাউকে স্বীকার করিনি। কারণ, ওদের ভালোবাসায় আমি ভোগ দেখেছি। আমার উচ্ছল জীবনধারায় ওরা ভেবে নিয়েছে, আমাকে নিয়ে যা ইচ্ছে করিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু ওরা জানে না, আমি ওদের সব সময়ে ন্যাংটো জানোয়ার হিসেবেই বিবেচনা করেছি। একমাত্র তোমার চোখে আমি ভোগের কোনো বেলুন দেখিনি। দেখেছি প্রেমের মমতার নিবিড় জলের চুম্বন। তাই, আমার জীবনের সবটুকু দিয়ে তোমাকে ভালোবাসি। জানি তোমার সীমাবদ্ধতা। আমি আমার সকল প্রেম দিয়ে তোমার সীমাবদ্ধতা মুছে দেবো। কিন্তু আমাকে...।

তুমি ভুল করছো তিতলী.. নিজেকে সামলে নিয়ে বলে শুভ।

হাসে তিতলী, আমি জানি তো আমি ভুল করছি। কিন্তু এই ভুল আমি করতে চাই। ভুলের মধ্যে বাস করতে চাই। ভুলের বনে তোমাকে নিয়ে থাকতে চাই, আর কিছু বলার আছে?

তুমি আমার সম্পর্কে কিছুই জানো না।

আমি সব জানি।

কীভাবে?

বাবলী আর হিমাংশু দা’র কাছে। এমন কী মাসীমার কাছেও জেনেছি তোমার সর্ম্পকে। সুতরাং একটাও নেগেটিভ কথা নয়। কাল বিকেলে আমি তোমার ক্যাম্পাাসে আসবো, তুমি থাকবে লিচু তলায়, জয়নুলের কাছে ঠিক আছে?

আমার কাজ আছে।

যদি না থাকো, তোমাকে খুঁজে বের করে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে এক লক্ষ চুমু খাবো। এখন সিদ্ধান্ত তোমার, থাকবে কি থাকবে না!

লাইন কেটে দেয় তিতলী। রুমের মধ্যে কিংকর্তব্যবিমূঢ় বসে থাকে শুভ আহমেদ। করাতে কাটতে থাকে হৃদপিন্ড। একি জালে আটকা পড়ে যাচ্ছি! অস্বস্তি লাগলেও খারাপ লাগছে না। এক ধরনের সরল হিংসা মনের দেয়ালে যৌবন উন্মাদনার ছবি আঁকে ও।

রাতটা কাটে বিচিত্র ভাবনায় আর চিত্রকল্পের পরের দিন চারুকলার লিচুতলায় অপেক্ষা না করে উপায় থাকে না শুভর। কারো জন্য বিশেষত প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করাও যে মধুর, প্রথম অনুভব করে শুভ সমস্ত সত্তায়। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, নির্দিষ্ট সময়ের তিন মিনিট পরই তিতলী রিকশা থেকে নামে। শুভ ভেবেছিল, ও গাড়িতে আসবে। কিন্তু রিকশায় আসায় খুব ভালো লাগে ওর। রিকশা ভাড়া দিয়ে এগিয়ে আসে তিতলী। শুভ লিচু তলার বিশাল পাকা চত্তরের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে তিতলীকে।

এই প্রথম পূর্ণ চোখে দ্যাখে তিতলীকে, মেয়ে এতো সুন্দর? মেয়ে তো সাজানো বাগান।

রিকশা ভাড়া দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। হাত ধরে শুভ’র, থ্যাঙ্কস।

প্রথম স্পর্শ তিতলীর, শরীরের বনে আগুন লাগে উষ্ণতার, থ্যাঙ্কস কেনো?

কষ্ট করে তোমাকে খুঁজে বের করতে হয় নি, তুমি অপেক্ষা করছো..। এখানে থাকবে? চলো অন্য কোথাও..।

চলো।

দুজনে এলেবেলে অনেকক্ষণ হাটে জড়াজড়ি করে, হাত ধরে। হাঁটতে হাঁটতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকে বসে শিখা চিরন্তনের কাছে। দুপুর, হালকা গরম। লোকজন কম। তিতলী পাশ থেকে নেমে বসে শুভর মুখোমুখি, দুই পায়ের উপর ভর। ওর দুটি হাত শুভর কোলের উপর। মুখ চলে এসেছে খুব কাছে। জীবনে কোনো নারীর এমন নিবিড় সান্নিধ্যে এসে ভেতরে ভেতরে টগবগ করলেও দ্বিধার পীড়ন ওকে আক্রান্ত করেই চলেছে। আবার তিতলীর এই থৈথৈ মুহুর্ত, শুভ ঘামে, তাকায় চারদিকে।

এভাবে বসছো কেনো? পাশে বসো।

না, পাশে বসলে তোমার মুখ দেখতে পারি না আমি। সারাক্ষণ তোমার মুখ দেখতে চাই।

লোকে কী বলবে?

লোক আমি থোরাই পরোয়া করি। শুভ? বিনম্র কণ্ঠে ডাকে।

বলো।

শুভর বুকের মধ্যে ডান হাত ঢুকিয়ে আদর করতে করতে বলে, আমি ভীষণ বিপদে আছি। একমাত্র তুমিই পারো আমাকে উদ্ধার করতে।

কী রকম বিপদ?

আমার বিয়ে!

বিয়ে? তোমার? কবে?

বুকের ভেতর থেকে হাতটা বের করে তিতলী ডান হাত নিয়ে খেলা করে, যত গন্ডগোল বাজিয়েছে ওই বাবলী। ওর বিয়ে দেখে বাবা মা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমার বিয়ে দেবেন। পড়াশুনা করি না, খালি খাই ঘুমাই আর ঘুরি, এমন মেয়েকে সংসারে রেখে কী কাজ? ছেলেও ঠিক করে ফেলেছে। কিন্তু আমি সাদা শয়তানকে বিয়ে করবো না। কারণ, ওকেতো ভালোবাসি না। আমি বাসি তোমাকে।

তোমাকে ছাড়া আমিতো অন্যকাউকে ভাবতে পারি না। চলো, আমরা বিয়ে করি!

শরীরের মধ্যে যে যৌবনের বান প্রবাহিত হচ্ছিল হঠাৎ সেই বান বাঁধ ভেঙ্গে বিকটা শব্দে ধ্বসে যায়। বলে কি মেয়ে, ডেটিংয়ের প্রথম দিনেই বিয়ের প্রস্তাব? অবশ্য এই মেয়ের পক্ষে সবই সম্ভব। কিন্তু আমি কী করবো? চাকরির একটা ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছি বটে, কিন্তু চাকরি হবে নিশ্চয়তা নেই। বইয়ের কভার আর ইলাস্টিশন করে নিজের চলে যায় ভালোভাবে। একটু আধটু ফুটানি করা যায়। মাঝে মধ্যে বারে গিয়ে পানীয় পান করে শুভ। কিছু টাকা ব্যাংকেও জমা হয়েছে। অথচ এই মেয়ে..

কথা বলছো না কোনো ঘুড্ডু? হাত ছেড়ে দিয়ে দু হাতে মুখ তুলে ধরে ওর, তুমি আমার ঘুড্ডু, যেভাবে রাখবে আমি সেইভাবে থাকবো। একটুও কষ্ট দেবো না। আমি তোমার ভালো বউ হবো। তুৃমি বাড়িতে ছবি আঁকবে, আমি বসে বসে দেখবো। যখন বলবে তখন চা বানিয়ে দেবো। অবশ্য চা আমি কখনোই ...

দুঃখের মধ্যে হাসে শুভ, তুমি কী বলছো বুঝতে পারছো? পারছো না। আমি বেকার। চাকরি নেই। বিয়ে করে তোমাকে রাখবো কোথায়? খাওয়াবো কী? আমার তো গাড়ি নেই..।

আমার গাড়ি লাগবে না। আমি শুধু তোমার সঙ্গে, তোমার পাশে থাকতে চাই..।

তিতলী!

গলাটা কঠিন করে শুভ, বাস্তব আর কল্পনার মধ্যে অনেক ফারাক। তুমি কল্পনা করছো। আমার পক্ষে বিয়ে করার কোনো যুক্তিসংগত কোনো কারণ নেই। তুমি আমাকে মার্জনা কর তিতলী...। জোর করে দাঁড়ায় শুভ। ওর দাঁড়ানোর কারণে ইটের উপর
হুমড়ি খেয়ে পরে। তিতলীর মুখের রক্ত সরে যায়, জীবনে এমন আত্মঅপমানের মুখোমুখি হয় নি। কেউ সামনে দাঁড়াতেই সাহস পায়নি। বরং অনুরক্ত থাকতে চেয়েছে পরম ভালোবাসায়। সেখানে শুভ...

পিছনে ফিরে তাকায়। শুভ চলে যায়.. যাচ্ছে। ও দেখে। বসে শানের উপর। চোখ ফেটে কান্নার জল নয়, রক্তের ধারা নেমে আসে। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর বাসায় চলে যায়। পরের দিন আসে শুভর মেসে। মেসে তিতলীকে দেখে অবাক।

জড়িয়ে ধরে দুহাতে শুভকে, তোমাকে আমি চাই। আমার পৃথিবী শূন্য তুমি ছাড়া। আমার সকল কিছু তোমার জন্য। আমাকে গ্রহণ করো..। ঝরঝর কাঁদতে শুরু করে। সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে, বিয়ের। বিয়ের পর আমাকে অস্ট্রেলিয়া যেতে হবে। বিশ্বাস কর, তোমার সঙ্গে পরিচয়ের আগে বিয়ে হলে আমি চলে যেতাম। কিন্তু তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার মনে হচ্ছে, তোমাকে ছাড়া, তোমার ছবি ছাড়া আর এই দেশটার সুনীল আকাশ ছাড়া আমি বাঁচবো না।

নিজের অজান্তেই শুভও জড়িয়ে ধরে তিতলীকে। এবং শরীরের কোষে কোষে বাঘের শক্তির নির্ভরতা আবিস্কার করে। মনটা আবেগে প্রেমে দুলতে থাকে...। ভেতরের সত্তা বলে, ঠিকাছে আমিও তোমার সঙ্গে বাঁধবো আমার মন, আমার যাবতীয় সুখ ও সর্বনাশ।

বসো তিতলী।

দুজনে বসে মুখোমুখি। হাতে রাখে হাত। বিয়েটা হয়ে যায় সেই সন্ধ্যায়। বন্ধুরা উৎসব করে নিজেদের মতো। মেসের ঘরটাই বাসর ঘর। কয়েক দিন পরে একটা বাসা ভাড়া করে উঠে যায় ওরা। ছোট দুই রুমের বাসা। উপহার এক টুকরো ব্যালকনী। দুজনে মিলে বাজার করে। রান্না করে। দুজনে খায়। সন্ধ্যায় শিল্পকলায় নাটক দেখে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে শীতের পিঠা ধনে পাতার ভর্তা মেখে খায়। তিতলীর জগৎটা পাল্টে যায়... আসমান থেকে মাটিতে নেমে এসে ও অনাবিল সুখের সমুদ্রে প্রবেশ করে। দুজনে ব্যালকনীতে বসে বিকেলে চা আর মুড়ি খায়।

প্রাচুর্য্যরে হেরেম থেকে অতি সামান্য এসে অপার্থিব সুখের পৃথিবীতে প্রবেশ করে তিতলী। তিতলীর এই সুখের মধ্যে আরও সুখ হয়ে আসে শুভর চাকরি। শুভ নিযুক্তির চিঠি পেয়ে জড়িয়ে ধরে তিতলীকে, তোমাকে আজ এক লক্ষ চুমু দেবো।

একলক্ষ?

হ্যাঁ। তুমি এসেছো আমার জীবনে আর তোমার সঙ্গে চাকরিটা এলো। তুমি আমার মহারানী।

হাসে তিতলী, তুমি আমার সম্রাট।

চাকরির শুরুতে তিতলীর একলা থাকতে কষ্ট হতো। ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে কথা বলতো দুজনে। প্রথম মাসের বেতন পেয়েই একটা টিভি কেনে দুজনে মিলে। রাতে দুজনে রান্না করে, তরকারি কাটে। এক সঙ্গে খায়। জীবন এমন রঙিন..।

বিকেলে সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরে তিতলীকে পায় না। অগোছালো বিছানা দেখে বুঝতে পারে, তিতলী নেই। পাশের বাসার মহিলা জানায়, তিতলীর ভাই বেশ কয়েকজন লোক নিয়ে এসছিলো এবং জোর করে তিতলীকে নিয়ে গেছে।

বাড়িতে নিয়ে আসার পর তিতলী অসম্ভব চেঁচামেচি করে। বাবা আর ভাই মিলে তিনতলার রুমে আটকে রাখে। কয়েকদিন পর বাবা ও পিতা দেখতে পায়, তিতলী অনেকটা নিশ্চুপ হয়ে গেছে। শরীরের সেই রঙ নেই। চোখে কোনের ঝিলিক নেই।

চঞ্চল মেয়েটি পাথর বনে গেছে। পারিবারিক ডাক্তার শওকতকে ডেকে আনলে, সব দেখে শুনে জানায়, তিতলীকে বাঁচাতে চাইলে সেই ছেলেটির কাছে ফিরিয়ে দিন।

ও ছেলেটিকে ভালোবাসারও অধিক ভালোবাসে..।

তিতলীকে কেন্দ্র করে পিতা ও পুত্রের মধ্যে তুমুল ঝগড়া। ঝগড়ার মধ্যে ছেলে খাইবার লস্কর হার মানে। যায় শুভর বাসায়। শুভ বিছনায় লম্বা শুয়ে। দাঁড়ি গজিয়েছে। খাওয়া দাওয়া নেই। খাইবার লষ্কর নিয়ে আসে বাসায়। ক্ষমা চেয়ে তিতলীকে তুলে দিলে, শুভ
স্ত্রীকে নিয়ে বাসায় আসে।

সকালে বিছানায় শুভকে মৃত পাওয়া যায়। তিতলী অনেকটা নির্বিকার। খবর পেয়ে খাইবার লস্কর তিতলীর বাবা এবং ডাক্তার আসে। আসে পুলিশও। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে পাওয়া যায়, শুভকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। এবং হত্যাকারীর হাতের সঙ্গে তিতলীর হাতের মিল পাওয়া গেছে।

সাত দিন পর্যবেক্ষণ ও কথা বলে ডাক্তার শওকত, তিতলী প্রচুর প্রাচুর্যের মধ্যে বড় হলেও ওর মধ্যে একটা আবেগী এবং প্রবলভাবে সংবেদী মন ছিল। সেই মন দিয়ে সবকিছুর উর্দ্ধে শিল্পী শুভকে ভালোবেসেছিল। আপনারা জানিয়েছেন, শৈশবে ওর ছবি আঁকার ঝোঁক ছিল। কিন্তু আপনারা চাননি ও ছবি আঁকুক। বাধ্য হয়ে আপনাদের বেঁধে দেয়া পড়াশুনা করেছে কিন্তু শুভকে দেখার পর ওর ভেতরের মনটা পরম তৃষ্ণায় জেগে ওঠে এবং ওকে ভালোবেসে বিয়ে করে। বিয়ের পর পাঁচ থেকে ছয় মাস যে দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছে, সেই দাম্পত্য জীবন ছিল ওর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। নিরাভরন বা সাধারণের মধ্যে জীবনের সংসারের যে সুখ ও পেয়েছিল শুভর কাছে, সেটাই ওর মনোজগতে বিস্তার করে আছে, ছিল। পুনঃর্বার যখন শুভর কাছে আপনারা ফিরিয়ে
দিলেন, ততদিনে সর্বনাশ যা হবার হয়ে গেছে। তিতলী আত্মমগ্ন হয়ে ওই ছয় মাসের ডুবে ছিল, আছে। যখন শুভ আবার স্বামীর ভালোবাসা চেয়েছে, তিতলীর মনে হয়েছে এই লোকটাকে চেনে না। জোর করে স্বামীর অধিকার ফলাতে চায়।

ও সহ্য করতে পারেনি, গলা টিপে ঘুমের মধ্যে হত্যা করেছে নিজের প্রিয়তম স্বামীকে। দুঃখ নিজের হাতে স্বামীকে গলা টিপে হত্যা করেছে, এই নির্মম অনুভূতিটুকুও নেই তিতলীর মধ্যে। ও আছে শুভর সঙ্গে সংসারের ছয়মাসের গভীর প্রেম আর মনোরম স্মৃতি নিয়ে। তিতলী ওই ছয় মাসের মধ্যে ডুবে আছে... থাকবে....

সারাবাংলা/এসবিডিই/টিসি

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন