বিজ্ঞাপন

করোনার মধ্যেই ধীরে হানা দিচ্ছে ডেঙ্গু, বিপর্যয়ের শঙ্কা

May 29, 2020 | 2:03 pm

সাদ্দাম হোসাইন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত বাংলাদেশও। মহামারিতে এখন পর্যন্ত দেশে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, মারাও গেছেন সাড়ে ৫ শতাধিক। এ অবস্থায় ভাইরাস প্রতিরোধে যখন হিমশিম খাচ্ছে দেশ, ঠিক তখন করোনার মাঝে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ডেঙ্গু।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা বিপর্যয়ের মাঝে ডেঙ্গুর বিস্তার ভয়াবহ রূপ নেবে সারাদেশে। ইতোমধ্যে সারাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে তিন শতাধিক। তবে এডিস বা ডেঙ্গুর বেশি ঝুঁকি রাজধানীতে।

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, করোনার বিপর্যয়ের কারণে প্রায় দু’মাস আগেই রাজধানী ছেড়ে অনেকে গ্রামে চলে গেছে। যারা গ্রামে গেছে এবং যে সময়ে গেছে ঠিক সে সময় ডেঙ্গু নিয়ে এতো উৎকণ্ঠা ছিল না। যে কারণে যারা গেছেন তারাও ততটা সচেতনভাবে বাসা-বাড়ির জমে থাকা পানি কিংবা পানি জমতে পারে এমন উপযোগগুলো নষ্ট করেনি। এতে ডেঙ্গুর বিস্তারের ঝুঁকি অনেক বেশি।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার সারাবাংলাকে বলেন, ‘১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত সারাদেশে ৩০৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এখন পর্যন্ত ১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। বাকিরা সুস্থ হয়েছে। তার দাবি, করোনার পাশাপাশি এখন ডেঙ্গুও পরীক্ষা করা হয় কিন্তু ডেঙ্গুর তেমন রোগী নেই এখন।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ছিল সর্বোচ্চ সংখ্যক ১৯৯ জন, কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে সে সংখ্যা দেড় শতাধিক কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫ জনে। আবার মার্চেও আরও কমে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭ জন। এপ্রিলে আরও দুইজন কমে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২৫ জন। চলতি মে মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত এ সংখ্যা ৭ জন।

তবে আক্রান্তের সংখ্যা কমার বিষয়টিকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে সবার জন্য মঙ্গলজনক মনে হলেও এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কীট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ‘সারাবছরই এডিস মশার জন্মানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বছরের দুইটি সময়ে এর বিপর্যয় ঘটে। যা মার্চ থেকে জুন অথবা জুলাই থেকে নভেম্বর কিংবা ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ডেঙ্গুর মৌসুমে রোগীর সংখ্যা কম মানেই হচ্ছে কোথাও না কোথাও এ সংখ্যা নির্ণয়ের ঘাটতি রয়েছে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীট গবেষক ড. কবিরুল বাসার সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা মশা নিয়ে প্রতি মাসেই গবেষণা করি। কিন্তু এ মাসের সর্বশেষ গবেষণায় আমরা দেখলাম রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল ও নির্মানাধীন ভবনে এডিসের উপস্থিতি প্রায় ৫০ শতাংশ। এ সংখ্যা বাসাবাড়িতেও ২০-২৫ শতাংশ। এমতাবস্থায় এখনই যদি নিয়ন্ত্রণ করা না হয় তবে জুন কিংবা জুলাইতে এডিসের মাধ্যমে ডেঙ্গুর সংক্রমণে বিপর্যয় ঘটবে। কারণ সবে মাত্র এডিসের মৌসুম শুরু হচ্ছে। সবাই এটা জানে যে অতিবৃষ্টির ফলে এডিস জন্মানোর সুযোগ বেশি। সে হিসেবে বৃষ্টিপাতের মৌসুম সামনে এতে ডেঙ্গুর মৌসুমও ইশারা করছে আমাদের। সতর্ক বার্তা দিচ্ছে।’

ডেঙ্গু

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী রোগী তো কমছে— এমন তথ্যে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘পরিসংখ্যানটা আমিও দেখেছি। কিন্তু পরিসংখ্যানের দিকে তাকিয়ে থেকে ব্যবস্থা নিতে গেলে বিপর্যয় আরও বাড়বে।’

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘পরিসংখ্যানটা খেয়াল করলেই দেখবেন যে সময় এডিসের মৌসুম ছিল না সে জানুয়ারিতেই এডিসবাহী রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ছিল ১৯৯ জন। আর যখন এডিসের ভরা মৌসুম চলছে তখন আক্রান্ত ৭ থেকে ১০ জন। এটাকে কি আমলে নেওয়া যায়? বলছি না স্বাস্থ্য অধিদফতরের যারা পরিসংখ্যান তৈরি করেছেন তাদের দোষ। তারা কী করবে? তারা তো রোগী হাসপাতালে এলে পরীক্ষায় ধরা পড়লে তবেই পরিসংখ্যানে উল্লেখ করবে। কিন্তু রোগীই তো হাসপাতালে আসছে না।’

কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘করোনার প্রাথমিক উপসর্গ হল জ্বর, একই উপসর্গ ডেঙ্গুরও। কিন্তু এখন দেশে যেহেতু করোনার বিপর্যয় চলছে তাই কারো জ্বর হলেই ডেঙ্গুর সন্দেহ করে না, সন্দেহ করে করোনার। যে কারণে করোনার পরীক্ষায় করা হয়। আবার কারও জ্বর হলে ভয়ে সে বলেও না যে তার জ্বর আসছে। এতে ডেঙ্গু পরীক্ষাও হয় না, রোগীও চিহ্নিত হয় না। তাই অনুরোধ থাকবে যাদের করোনা পরীক্ষা করানো হচ্ছে তাদের যেন ডেঙ্গুটাও পরীক্ষা করানো হয়।’

এদিকে, রাজধানীতে ডেঙ্গুরোধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) গত ১০ মে থেকে বিশেষ চিরুনি অভিযান অব্যাহত রেখেছে। সংস্থাটি এর মধ্যে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা জরিমানা করেছে।

ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার আগ থেকেই মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছি। দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরু করেছি বিশেষ চিরুনি অভিযান। এ অভিযানে যাদের আগে সতর্ক করা হয়েছে তাদের এখন জরিমানা করা হচ্ছে এবং নতুনদের সতর্কতার নোটিশ দেয়া হচ্ছে। আশা করছি আমাদের নাগরিকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণে এটি মোকাবিলা করতে পারব আমরা।’

এদিকে ডিএনসিসির মতো ডিএসসিসিতে দেখা মেলেনি দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপের। ডিএসসিসির ধানমন্ডি, যাত্রাবাড়ী, হাজারীবাগ, বংশালসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত কয়েক মাসেও ডিএসসিসির মশা নিধন কার্যক্রম চোখে পড়েনি। যদিও সংস্থাটির দাবি তাদের নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শরীফ আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। সামনে আরও বেশ কিছু কার্যক্রম নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে।’

জানতে চাইলে ডিএনসিসি’র প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোমিনুর রহমান মামুন সারাবাংলাকে বলেন, যেহেতু জুন-জুলাই ডেঙ্গুর জন্য বড় চ্যালেঞ্জের সময়, তাই এবার একটু আগে থেকেই আমরা কিছু পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছি। আমরা এজন্য মে মাসেই ডিএনসিসির পাঁচটি অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ পাঁচটি ওয়ার্ড বেছে নিয়ে বিশেষ কর্মসূচি হিসেবে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করেছি। অভিযানে আমরা খুঁজে বের করতে চেয়েছি ডেঙ্গু পরিস্থিতি কেমন। এটি থেকেই আমরা পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণ করব। অর্থাৎ জুন মাসের শুরুতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে চিরুনি অভিযানটি আমাদের জন্য অনেক বেশি সহায়ক হবে।

সারাবাংলা/এসএইচ/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন