বিজ্ঞাপন

পঙ্গপাল কী ও এর থেকে মুক্তির সম্ভাব্য উপায়

June 3, 2020 | 1:53 pm

রেহমান মোস্তাফিজ

যদি প্রশ্ন করা হয় মানব ইতিহাসে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক পশু, পাখি বা কিট-পতঙ্গ কোনটা? জবাবটা সবসময় হবে পঙ্গপাল যাকে ইংরেজিতে আমরা লোকাস্ট নামে চিনি। যে পঙ্গপালের হামলায় নাস্তানুবাদ বর্তমান ভারত এবং পাকিস্তান। পাকিস্তানে এখন পর্যন্ত পঙ্গপালের হামলায় ক্ষতি হয়েছে ৬ বিলিয়ন ইউ.এস ডলার এবং ভারতের শুধু মাত্র মধ্য ও উত্তর প্রদেশে ধারণা করা হচ্ছে আট হাজার কোটি রুপির ফসলের ক্ষতি করবে এই পঙ্গপাল।

বিজ্ঞাপন

পঙ্গপাল নতুন কোন কিছু নয়। হাজার হাজার বছর ধরেই মানব সভ্যতা পঙ্গপালের হামলার শিকার হচ্ছে। যার কারণে প্রায় প্রতিটা ধর্মের ধর্মগ্রন্থেই এই পঙ্গপালের হামলার কথা উঠে এসেছে। শুধু ধর্মগ্রন্থেই নয়, ৬ হাজার বছর পূর্বের মিশরীয় সভ্যতায়ও পঙ্গপালের হামলার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকরা ধারণা করেন, সে হামলা ছিল ২৪০০ খ্রিষ্টপূর্ব সময়ে। এমনকি এমনও ধারণা করা হয়, বাইবেলে যে পঙ্গপাল হামলার কথা বলা হয়ে থাকে মিশর সত্যি সত্যিই সে হামলার শিকার হয়েছে।

কী এই পঙ্গপাল
সব পশুপাখির মধ্যে পঙ্গপাল অনেকটাই ইউনিক। সাধারণত এরা ঘাসফড়িঙ এবং ঝিঁঝিঁপোকা পরিবারেরই একজন। কিন্তু পঙ্গপালদের বেশিরভাগ সময় পাওয়া যায় যেখানে মরুভূমি রয়েছে সেখানে। পঙ্গপালের অন্যরকম এক ব্যতিক্রমি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এদের জীবনকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একটাকে বলা হয় সলিট্রি ফেজ এবং অন্যটাকে বলা হয় গ্রেগেরিয়ান ফেজ। তো সলেট্রি ফেজে এরা ঘাসফড়িঙ বা ঝিঁঝিঁপোকার মতই ক্ষতিকারক নয়। কিন্তু গ্রেগেরিয়ান ফেজে এরা মানুষের জন্য হয়ে ওঠে ক্ষতিকারক। আর অবাক করা ব্যপার হচ্ছে সলেট্রি ফেজ থেকে গ্রেগেরিয়ান ফেজে এরা জীবনের যে কোন সময়ই যেতে পারে। সলেট্রি ফেজে এদের গায়ের রঙ হয়ে থাকে সবুজ এবং গ্রেগেরিয়ান ফেজে হলুদ এবং কালো। সলেট্রি ফেজ এবং গ্রেগেরিয়ান ফেজে এদের ব্যবহার বা খাদ্যাভ্যাস সবই সম্পূর্ন রকম বদলে যায়। বৃদ্ধি পায় মস্তিষ্কের আকারও। গ্রেগেরিয়ান ফেজে এরা যে কোন কিছুই খেতে পারে এবং আগের তুলনায় অনেক বেশি খেতে পারে। যার ফলে এরা যে অঞ্চল দিয়েই যায় সে অঞ্চলের ফসল সম্পূর্ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিজ্ঞাপন

ধরুন একজন মানুষের ওজন যদি ৭০ কেজি হয় তাহলে নিশ্চয় সে একদিনে ৭০ কেজি পরিমান খাবার খেতে পারবে না কিন্তু গ্রেগেরিয়ান ফেজের পঙ্গপাল নিজেদের ওজনের চেয়েও বেশি খেতে পারে। আর এরা সবসময় নিজেদের গ্রেগেরিয়ান ফেজে কনভার্টও করে না। যখন প্রকৃতি, পরিবেশ নিজেদের অনুকূলে থাকে, বৃষ্টি হয়, মাটি নরম থাকে এবং চারপাশে সবুজ ঘাস বা ফসল থাকে তখনই নিজেকে বদলে নেয় গ্রেগেরিয়ান ফেজে। আরেকটা অবাক করা তথ্য হচ্ছে সলেট্রি ফেজে এরা অনেকটাই একা থাকে কিন্তু গ্রেগেরিয়ান ফেজে এরা একটা বিশাল দলে পরিণত হয়। বর্তমানে সৃষ্টি হওয়া এই পঙ্গপালের আকার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কেনিয়া থেকে উৎপত্তি এই দলটার দৈর্ঘ ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটারে বিস্তৃতি লাভ করেছে। সহজে বোঝার জন্য বলে রাখি পঙ্গপাল পার স্কয়ার কিলোমিটারে ছিল প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজারের মতো। এ থেকেই ধারণা করতে পারেন কত ভয়ঙ্কর এটা মানুষের জন্য।

কীভাবে এই সাম্প্রতিক পঙ্গপাল সমস্যার সৃষ্টি
বর্তমানে সৃষ্টি হওয়া এই পঙ্গপাল হামলার জন্য অনেকাংশে আমরা নিজেরাই দায়ি। কয়েক মাস পেছনে ফিরলে দেখা যায় মনুষ্যসৃষ্ট কারণে দিনদিন আবহাওয়ার বদল ঘটছে যার কারণে ২০১৯ সালের নভেম্বরের শেষদিকে ভারত মহাসাগরের পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে পূর্ব আফ্রিকায় প্রচুর বৃষ্টি এবং সেখান থেকে বন্যার সৃষ্টি হয়। আর ফেব্রুয়ারি, ২০২০ আসতে আসতে কেনিয়া, ইথিওপিয়াসহ পূর্ব আফ্রিকার কিছু দেশে পঙ্গপাল নিজেদের গ্রেগেরিয়ান ফেজে বদল করে হামলা শুরু করে দেয়। সেখানের ফসলের ক্ষতি করে এরা আরও পূর্ব দিকে যায় যা পরে ইরান, ইয়ামেন এবং পাকিস্তানের কিছু অংশে এসে পৌছায়।

এ পর্যন্ত আসতে আসতে অনেকটাই এপ্রিল মাসের শেষ দিক চলে আসে। ততদিনে আমাদের এই দিক অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়াতে আসার অত সম্ভাবনাও ছিল না তেমন। কিন্তু তখনই সৃষ্টি হয় সাইক্লোন আম্পানের। যার ফলে এই পঙ্গপাল নিজেদের অনুকূল পরিবেশ পেয়ে যায় এবং রাজস্থান হয়ে ইন্ডিয়ার বর্তমানে উত্তর এবং মধ্য প্রদেশ পর্যন্ত চলে এসেছে। আমাদের দেশে বর্তমানে বৃষ্টি চলছে। ধারণা করা হচ্ছে এদের একটা গ্রুপ চলে আসতে পারে এই দিকটাতেও।

আমাদের ভয়টা তাই একটু বেশিই। ধারণা করা হয় ইন্ডিয়াতে বর্তমানে পঙ্গপালের সংখ্যা প্রায় ৮০০ মিলিয়ন এবং পাকিস্তান থেকে আরও প্রায় ৪০০ মিলিয়ন পঙ্গপাল এসে এদের সঙ্গে মিলে বিশাল একটা দলে পরিণত হবে। উল্লেখ্য, পঙ্গপালের ছোট একটা পাল প্রায় আড়াই থেকে তিজ হাজার মানুষের খাবারের সমান খাবার খেতে পারে। আর ইন্ডিয়াতে যে দলটা রয়েছে সেটা প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের খাবার খাচ্ছে। কোভিড-১৯, লকডাউন সব মিলিয়ে আমাদের অবস্থা যখন খুবই ভলনারেবল তখন এই পঙ্গপালের হামলা আমাদের আরও খারাপ দিকে ঠেলে দেবে সেটা বলে দেওয়াই যায়।

প্রতিহত করার উপায়
১. পাখি
প্রকৃতি থেকে সৃষ্টি হওয়া যে কোন সমস্যার সমাধান প্রকৃতির মধ্যেই আছে। পঙ্গপালের প্রাকৃতিক শত্রু বলা হয় ফিঙ্গে পাখিকে। ফিঙ্গে পাখির খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয় পঙ্গপাল। কিন্তু কথা বলতে শেখানো যায় তাই নিজেদের সৌখিনতা প্রমাণে বা শিকারের বুনো উল্লাস পেতে আমরা এই পাখিকে মেরে মেরে একদমই কমিয়ে দিয়েছি আর নাহয় খাঁচায় বন্দী করে রেখেছি। এছাড়া চড়ুই পাখিও এদের নিজেদের খাবার হিসেবে ব্যবহার করে।

২. কীটনাশক
বর্তমান সময়ে প্রায় প্রতিটা দেশই পঙ্গপালের হামলা থেকে বাঁচতে কীটনাশক ব্যবহার করে। কিন্তু এতেও সমস্যা দেখা যায়। যেহেতু এদের দল বিশাল তাই বিপুল পরিমানের কীটনাশক ফেলতে হয় উপর থেকে এদের ওপর। যা আবার আমাদের নিজেদের স্বাস্থ্য এবং খাদ্যকেও বিষাক্ত করে। অপরদিকে এর পরিবেশবান্ধব কীটনাশকও রয়েছে। কিন্তু সেটা কাজ করে অনেক ধীর গতিতে যার ফলে আমাদের স্বাস্থ্য বা খাদ্যে এর প্রভাব না পড়লেও পঙ্গপালের উপরও খুব বেশি কার্যকরি হয় না।

৩. শব্দ দূষণ
পঙ্গপাল থেকে মুক্তির অন্য একটা উপায় হচ্ছে শব্দ দূষণ। পঙ্গপাল যে কোন শব্দ থেকেই পালিয়ে বেড়ায়। সেটা যে কোন শব্দই হতে পারে। এমনকি আপনার মুখের চিৎকারেও এরা পালিয়ে যায়। কিন্তু এটা কার্যকরী সমাধান হয় না। কারণন এটা ছোট জায়গায় কার্যকরি হয়। আর পুরোপুরি রোধে যে পরিমান শব্দের প্রয়োজন তাতে আবারো ক্ষতিগ্রস্ত হবে মানব দেহই। আর এক জায়গা থেকে তাড়িয়ে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেয়াও কোন সমাধান নয়।

৪. মুরগীর খাবার এবং কৃষকের আয়
এই পদ্ধতিটা কিছুটা ব্যতিক্রম। অবশ্য এর উৎপত্তি পাকিস্তান থেকে। পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তা খিরশিদ আলম পাকিস্তানের কিছু গ্রামের কৃষকদের বলেন যপদি তারা সরকারকে পঙ্গপাল ব্যাগে করে ধরে এনে দিতে পারে তাহলে কেজি প্রতি তাদের ২০ পাকিস্তানি রুপি দেওয়া হবে। এর পেছনের উদ্দেশ্য হচ্ছে পঙ্গপালের দেহের ৭০ শতাংশ প্রোটিন যা মুরগির জন্য আদর্শ খাবার। পাকিস্তানসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই মুরগির খাবারের জন্য সয়াবিন ব্যবহার করা হয় যার প্রোটিনের পরিমাণ ৫০ শতাংশ। কিন্তু পঙ্গপালে প্রোটিন ৭০ শতাংশ বলেই এই উদ্যোগ নেওয়া। খুরশিদ আলম বলেন, অনেক কৃষকই একদিনে প্রায় ২০ হাজার পাকিস্তানি রুপির পঙ্গপাল ধরে এনেছে। তাছাড়া যেহেতু পঙ্গপাল রাতে উড়তে পারে না তাই তাদের ধরাটাও সহজ হয়ে যায়। বর্তমানে পাকিস্তান মুরগির খামারিদের জন্য প্রতিবছর প্রচুর সয়াবিন অন্য দেশ থেকে আমদানি করে থাকে। তাই পঙ্গপাল ধরার ফলে এবার বেঁচে যাবে তাদের কিছু বৈদেশিক মুদ্রা। সেখানে ইতোমধ্যে কিছু গ্রামে এর সুফলও দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ভারতও এরকম কিছু করার কথাই ভাবছে।

মানুষের খাবার
শুরুতেই বলেছিলাম হাজার হাজার বছর ধরেই মানুষ এই পঙ্গপালের হামলার শিকার হয়েছে। এদের হামলায় অনেক শহরই পড়েছিল দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে। আর তা থেকে বাঁচতে সেই পুরনো যুগ থেকেই মানুষ পঙ্গপাল খেয়ে এসেছে। আর তাই ইসলাম ধর্মে পঙ্গপালকে হালাল বলা হয়েছে, ইহুদি ধর্মে বলা হয় কোশের (এটাও অনেকটা মুসলমানদের হালাল এর মতই)। ইজরাইলের অনেক রেস্টুরেন্টেই পঙ্গপালের অনেক খাবার বেশ জনপ্রিয়।

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন