বিজ্ঞাপন

‘রাজনৈতিক দলে ৩৩% নারী নেতৃত্বের বিধি তুলে দেওয়া হবে আত্মঘাতী’

June 3, 2020 | 6:09 pm

গোলাম সামদানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ২০২০ সালের মধ্যে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সব স্তরে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব রাখার বিধান থেকে সরে আসতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে একটি খসড়া প্রস্তবনাও তৈরি হয়েছে। সেটি সিইসি দফতর থেকে পাঠানো হয়েছে ইসি সচিবালয়ে।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা। তাদের মতে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সব কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী রাখার আইন সংশোধন করা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এটি সংশোধন করা হলে সমাজে নারীরা আরও পিছিয়ে পড়বে এবং সমাজে নারী ক্ষমতায়ন ও সমতায়ন নষ্ট হবে।

আরও পড়ুন- রাজনৈতিক দলে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব রাখার বিধান থাকছে না!

বিজ্ঞাপন

ইসি সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংশোধিত আরপিও‘তে বলা হয়, ‘রাজনৈতিক দলগুলোকে ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সব পর্যায়ের কমিটিতে নারী নেতৃত্ব ৩৩ শতাংশ নিশ্চিত করতে হবে।’ আরপিও সংশোধনের ১১ বছর পার হলেও কোনো রাজনৈতিক দল ইসির বেঁধে দেওয়া শর্ত পূরণ করতে পারেনি। এ অবস্থায় ইসি আরপিওটি সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন সংশোধনীতে রাজনৈতিক দলের সব কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব রাখার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছে ইসি। আর সেটি সম্ভব না হলে ৩৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের শর্ত পূরণ করতে না পারে, সেক্ষেত্রে দলগুলো নির্বাচন কমিশনের কাছে আইন বাতিল বা শিথিল করার আহ্বান জানাবে। কারণ আইন না মানলে তারা নিবন্ধন বাতিলের হুমকিতে থাকবে। এরকম বিধানের কারণেই এর আগে যেভাবেই রাজনৈতিক দলগুলোকে গঠনতন্ত্র হালনাগাদ করে ইসিতে জমা দিতে হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো শর্ত পূরণ করতে পারছে না বলে নির্বাচন কমিশনের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনো বিধান শিথিল বা বাতিল করবে— এটি নজিরবিহীন।

নারী নেতৃত্বের শর্তটি থাকা বা না থাকা বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিইসি এটি নিয়ে কাজ করেছেন। এ সংক্রান্ত খসড়া নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে আমাদের কাছে এলে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’

আইনটি সংশোধনের প্রয়োজন কেন হচ্ছে— এমন প্রশ্নের জবাবে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘এই পদক্ষেপ সিইসি নিয়েছেন। কারণ এই আর্টিকেলটি কোনো রাজনৈতিক দল পরিপালন করছে না। আবার অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের আলাদা মহিলা দলও রয়েছে। এখন প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে যদি ৩৩ শতাংশ নারী রাখা হয়, তাহলে মহিলা দলে কি ৩০ শতাংশ পুরুষ রাখা হবে? তাই এই আইনটি নিয়ে কী করা যায়, আমরা তা নিয়ে ভাবছি।’

নির্বাচন কমিশনের এমন উদ্যোগকে ‘অবান্তর’ ও ‘অবিশ্বাস্য’ অভিহিত করছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতি দলগুলোর সব স্তরের নেতৃত্বে ৩৩ শতাংশ নারী রাখার বিষয়ে একটি আইন করা হয়েছে। সে আইনটি পরিপালন করা কমিশনের দায়িত্ব। কোনো রাজনৈতিক দল সে আইন না মানলে তার নিবন্ধন বাতিল করা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব রাখার শর্ত পরিপালন করছে না— এই যুক্তিতে এটি বাদ দেওয়া কিংবা সংশোধনী আনা কোনো যুক্তিসঙ্গত কথা নয়। বরং এটি অবান্তর, অবাস্তব ও অকল্পনীয় কথাবার্তা। এই নির্বাচন কমিশন কখনো জনস্বার্থে কোনো কাজ করেনি। তাদের অবস্থান জনস্বার্থের পরিপন্থী এটি আরেকটি দৃষ্টান্ত হতে যাচ্ছে। এটি একটি অবিশ্বাস্য পদক্ষেপ।’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো এই শর্ত বাস্তবায়ন করতে না পারলে তা বাড়িয়ে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময় দিতে পারে। তখনো না পারলে ২০২৫ সাল থেকে বাড়িয়ে ২০৩০ সাল করতে পারে। কিন্তু তা না করে এত বছর পর এটা তুলে দেওয়া হলে সমাজে ভারসাম্য নষ্ট হবে।’

তিনি বলেন, ‘এমনিতেই আমাদের রাজনৈতিক অবস্থা ভালো না। তার মধ্যে যদি সব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়, তাহলে আমাদের আর কোনো ঐতিহ্য থাকলো না। বিভিন্ন দেশে যখন নারী নেতৃত্বকে উৎসাহিত করছে, তখন বাংলাদেশ থেকে কেন এগুলো বাদ দেওয়া হবে? নির্বাচন কমিশনের আর কোনো কাজ আছে কি না, আমার সেটা জানা নেই।‘

নারী নেত্রী খুশি কবির বলেন, ‘আমরা সামনে যাওয়ার পরিবর্তে পেছনের দিকে যাচ্ছি। বাংলাদেশ সরকার এসডিজি সই করে সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীর সমতা আনতে অঙ্গীকারাবদ্ধ, যেন সমাজের কোথাও নারীরা পিছিয়ে না থাকে। কিন্তু সরকার যদি এখন তা না করতে চায়, তাহলে সরকার স্পষ্টভাবে বলুক আমরা এসডিজি‘র লক্ষমাত্রা গ্রহণও করি না, মানিও না।’

তিনি বলেন, ‘যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, আমরাও এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু এখন আমরা পেছনের দিকে যাচ্ছি। নির্বাচন কমিশনের ৩৩ শতাংশ থেকে সরে আসলে তা হবে অগ্রহণযোগ্য।’

রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন হিসেবে মহিলা সংগঠন থাকায় ৩৩ শতাংশ নারী থাকার বাধ্যবাধকতার প্রয়োজন নেই— ইসির এমন মনোভাব প্রসঙ্গে খুশি কবির বলেন, ‘যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মহিলা সংগঠন রয়েছে, ফলে নারীকে নেতৃত্বে আনতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। এই অবস্থায় নির্বাচন কমিশন ৩৩ শতাংশ থেকে সরে আসলে হবে একটি স্ববিরোধী কাজ।’

তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্র নেই, নিয়মনীতি নেই। তাহলে কি ইসি নির্বাচন করাও বন্ধ করে দেবে?’

তবে অন্যদের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘এটা তুলে নেওয়া উচিত। কারণ ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে ওপর থেকে এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এটি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেন সরকারের ভূত আমাদের ঘাড় থেকে নেমে যাওয়া উচিত। কারণ ওটা ছিল চরমভাবে অগণতান্ত্রিক, আমাদের সংবিধান, আমাদের স্বাধীনতা ইশতিহারের স্পিরিটের পরিপন্থী। তাই ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় যতগুলো অন্যায় অবিচার হয়েছিল, তার জন্য একটি ট্রুথ কমিশন গঠন করে একটা বিহিত করা উচিত।‘

সারাবাংলা/জিএস/এমআই/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন