বিজ্ঞাপন

মিতুর খুনি সাবেক এসপি বাবুল আক্তার, অভিযোগে অনড় শ্বশুর

June 5, 2020 | 10:17 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে খুনের সঙ্গে সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার জড়িত, এমন অভিযোগে অনড় আছেন মিতুর বাবা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন। মিতু হত্যার রহস্য উদঘাটন হলে অভ্যন্তরীণ আরও অনেক ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পুলিশ চাঞ্চল্যকর এই মামলার তদন্ত ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে বলে অভিযোগ মোশাররফের। এ অবস্থায় মিতুর হত্যাকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান তিনি।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার (৫ জুন) মিতু হত্যার চারবছর পূর্ণ হয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা শাখার কাছে সাড়ে তিনবছর ধরে মামলাটির তদন্তভার ছিল। কিন্তু কার্যত কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় গত জানুয়ারিতে আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্তভার গেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে। তবে গত পাঁচমাসেও পিবিআই মামলার তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেনি বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার সারাবাংলাকে বলেন, ‘জানুয়ারিতে আদালতের নির্দেশ এলেও আমরা মামলার নথিপত্র বুঝে পেয়েছি আরও পরে। করোনা পরিস্থিতিতেই মূলত মামলাটি আমাদের কাছে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা অফিসারদের সঙ্গে বসে তদন্তের গাইডলাইন ঠিক করব। এরপর তদন্ত শুরু হবে।’

বিজ্ঞাপন

গত চারবছরের প্রায় পুরো সময়জুড়ে মামলাটির তদন্তভার ছিল সিএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের কাছে। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত জানুয়ারিতে আদালত সুয়োমোটা জারি করে মামলার তদন্তভার পিবিআইকে দিয়েছেন। এরপর আমরা সব নথিপত্র পিবিআইকে বুঝিয়ে দিয়েছি।’

মামলার তদন্তভার পিবিআইয়ের যাওয়ার পরও কোনো আশার আলো দেখছেন না মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘নিয়ম হচ্ছে, মামলার তদন্ত সংস্থা বা তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হলে সেটা বাদী কিংবা বাদিপক্ষ অথবা ভিকটিমের পরিবারকে জানাতে হবে। বাদী বাবুল আক্তার নিজেই সন্দিগ্ধ। তাহলে গুরুত্বপূর্ণ এই ইনফরমেশন তো মিতুর বাবা হিসেবে আমাকে বিদায়ী তদন্ত কর্মকর্তা অথবা নতুন তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো উচিৎ ছিল। তারা আমাদের কিছুই জানায়নি।’

বিজ্ঞাপন

‘এনজিও কর্মকর্তার সঙ্গে পরকীয়ার জেরে মিতুকে খুন করে বাবুল’

২০১৬ সালে হত্যাকাণ্ডের বছরখানেক পর থেকেই মিতুর বাবা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন দাবি করে আসছিলেন, বাবুল আক্তারের পরিকল্পনায় ও নির্দেশে তার মেয়ে মিতুকে খুন করা হয়েছে। চার বছর পরও এই দাবিতে অনড় থেকে হত্যার নেপথ্যে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

মোশাররফ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০১৩ সালে বাবুল আক্তার কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থাকা অবস্থায় সেখানে কর্মরত ভারতের নাগরিক এক এনজিও কর্মকর্তার (নাম প্রকাশ করা হলো না) সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। মিতু বিষয়টা জানতে পেরে তার মাকে জানিয়েছিল। এটি নিয়ে তাদের মধ্যে যখন অশান্তি শুরু হয়, বাবুল আক্তার আমার মেয়েকে নির্যাতন করা শুরু করে, আমি বিষয়টা তার ঊধ্র্বতন কয়েকজন পুলিশ অফিসারকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু উনারা আমাকে পাত্তাই দেননি। উনারা বলেছিলেন, বাবুল আক্তার সৎ-ভালো অফিসার, সে এমন কাজ করতে পারে না। অথচ শেষপর্যন্ত আমার মেয়েটা মারাই গেল। মেয়েটাকে যে বাবুল মেরেই ফেলবে, এটা আমি আর মিতুর মা কখনো ভাবিনি।’

মিতুর খুনি সাবেক এসপি বাবুল আক্তার, অভিযোগে অনড় শ্বশুর

বিজ্ঞাপন

তদন্তের শুরু থেকে নানা অসঙ্গতির তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, চট্টগ্রামের হাটহাজারী সার্কেল থেকে কক্সবাজার জেলা পর্যন্ত চাকরিকালীন বাবুলের ঘনিষ্ঠ অধঃস্তন অফিসার, বডিগার্ড, অর্ডারলি যারা ছিল, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। কারণ তারা বাবুলের সংসারে অশান্তি এবং পরকীয়ার বিষয়টি জানত। কিন্তু তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্ন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বারবার করেও আমি কোনো সদুত্তর পাইনি। মারা যাওয়ার পর আমার মেয়ের মোবাইলের ২৮টা এসএমএস তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে আমি জমা দিয়েছিলাম। সেগুলো নিয়ে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা বলেছিলাম। কিন্তু সেটিও করা হয়নি।’

হত্যাকাণ্ডের পরপরই বাবুলের জড়িত থাকার বিষয়ে অভিযোগ তোলেননি কেন, জানতে চাইলে সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘বাবুলের ঘনিষ্ঠ কিছু বন্ধুবান্ধব, এর মধ্যে পুলিশ আছে, সাংবাদিকও আছে, তারা শুরু থেকেই আমাদের বিভ্রান্ত করেছে। পরে আমরা বুঝতে পেরেছি যে, তারা আমাদের সামনে ভালো সেজে আমাদের মুভমেন্টটা ফলো করেছে। পরে সেটি বাবুলকে গিয়ে জানিয়ে দিয়েছে। সেটি জানার পর আমি তাদের এভয়েড করা শুরু করি। তখন আমার সামনে অনেক বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়।’

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান মোশাররফ

পুলিশের তদন্তে আস্থা না থাকার কথা জানিয়ে মোশাররফ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি নিজে পুলিশ অফিসার ছিলাম। আমি অনেক মামলা তদন্ত করেছি। আমার ধারণা, মিতু খুন হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যেই তদন্তে যুক্তদের সঙ্গে অনেককিছুই পরিষ্কার হয়ে যায়। তারা জানতে পারেন, বাবুল আক্তার হত্যাকাণ্ডে জড়িত। কিন্তু এরমধ্যেই কিছু ভুলত্রুটি তারা করে ফেলে, যেটা তারা প্রকাশ করতে পারেনি। একটি ঘটনা প্রকাশ করতে গিয়ে যদি আরও পাঁচটি ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়, সেই ভয়ে তারা চুপ করে থাকেন। গত চার বছরে তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার নথিতে চারটি লাইন যোগ করেছে কি না আমার সন্দেহ হচ্ছে।’

মিতুর খুনি সাবেক এসপি বাবুল আক্তার, অভিযোগে অনড় শ্বশুর

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বাবা। আমার মেয়েটাকে কারা খুন করল, সেটা কি আমার জানার অধিকার নেই ? আমার মেয়ের খুনের বিচার পাওয়ার অধিকার নেই ? আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই। আসল খুনি বাবুল আক্তার। সে যাতে কোনোভাবে রক্ষা না পায়, আমি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই। আর প্রধানমন্ত্রীর কাছেও যদি বিচার না পাই, এই বিচারের ভার আমি আল্লাহর কাছে দিলাম।’

তবে চারবছর পরও বরাবরের মতো নিশ্চুপ আছেন বাবুল আক্তার। পুলিশের চাকরিতে ইস্তফা দেওয়া বাবুল আক্তার ঢাকার মগবাজারে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি নিয়েছিলেন।

মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘মগবাজারে হাসপাতালের পাশে একটি বাসায় ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকত। ঘটনার দুইবছর পর থেকে আস্তে আস্তে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এখন মগবাজারেও থাকে না। তবে কোথায় আছে, আমরা জানি না। বাবুলের মা মারা গেছে। মৃত্যুর আগে আমার কাছে খবর পাঠিয়েছিল, বাবুল অপরাধী; আমি যেন তাকে ক্ষমা করে দিই।’

ঘটনাক্রম

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে নগরীর পাঁচলাইশ থানার ও আর নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে বাসার অদূরে গুলি ও ছুরিকাঘাত করে খুন করা হয় মিতুকে। এই ঘটনায় বাবুল আক্তার বাদী হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

হত্যা মামলায় ওই বছরের ৮ জুন ও ১১ জুন নগর গোয়েন্দা পুলিশ হাটহাজারী উপজেলা থেকে আবু নসুর গুন্নু ও বায়েজিদ বোস্তামী থানার শীতল ঝর্ণা থেকে শাহ জামান ওরফে রবিন নামে দুইজনকে গ্রেফতারের খবর জানায়। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মিতু হত্যায় তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর তারা জামিনে মুক্তি পান।

ওই বছরের ২৪ জুন রাতে ঢাকার বনশ্রীর শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবুল আক্তারকে ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে প্রায় ১৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এর ফলে সন্দেহের তীর যায় বাবুলের দিকে। হত্যায় বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাবুল আক্তার স্বেচ্ছায় চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছেন।

২৬ জুন মো. আনোয়ার ও মো. মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম নামে দুইজনের গ্রেফতারের খবর প্রকাশ করে পুলিশ। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমলক জবানবন্দি দেন। তারা হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে জানান, মিতু হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি তাদের ভোলা দিয়েছিল।

এরপর এহেতাশামুল হক ভোলা ও তার সহযোগী মো. মনিরকে গ্রেফতারকরা হয়। তাদের কাছ থেকে পয়েন্ট ৩২ বোরের একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়, যেটি মিতু হত্যায় ব্যবহৃত হয়েছে বলে পুলিশের ভাষ্য। এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে ভোলা ও মনিরকে আসামি করে একটি অস্ত্র মামলা দায়ের করা হয়।

এরপর ১ জুলাই মোটর সাইকেল সরবরাহ করার অভিযোগে মুছার ভাই সাইদুল আলম শিকদার ওরফে সাক্কু ও শাহজাহান নামে দুইজনকে গ্রেতার করা হয়। ভোলা, সাইদুল ও রবিন ইতোমধ্যে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

কিছুদিন নিশ্চুপ থাকার পর ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন বাবুল আক্তার। নানা নাটকীয়তা শেষে ৬ সেপ্টেম্বর বাবুলকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী কয়েক মাসে তদন্তকারী কর্মকর্তার আমন্ত্রণে একে একে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে আসেন মিতু ও বাবুলের মা-বাবা এবং বাবুল আক্তার নিজে। বাবুলের বিরুদ্ধে পরকীয়ার জেরে একজন পুলিশ কমকর্তাকে হত্যার অভিযোগ করতে ঝিনাইদহ থেকে একটি পরিবারের কয়েকজন সদস্যও এসেছিলেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে।

সারাবাংলা/আরডি/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন